প্যারিস হামলায় আইএসের বৈশ্বিক উত্থান!

Send
বিপ্লব শাহরিয়ার
প্রকাশিত : ১৪:২৯, নভেম্বর ২১, ২০১৫ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪৪, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৫

Biplobপ্যারিসে শুক্রবারের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা চালানো হয় বাতাক্লঁ কনসার্ট হলে। মার্কিন নেতৃত্বে চলা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর সঙ্গীতের ওপর এমন ভয়াবহ হামলা এই প্রথম। বাতাক্লঁ কনসার্ট হলে তখন পারফর্ম করছিল মার্কিন ব্যান্ড দল ঈগলস অব ডেথ মেটাল। এই ব্যান্ডের ব্যবস্থাপক ছিলেন নিক আলেক্সান্ডার। হামলার পর থেকেই নিকের বান্ধবী পলিনা বার্কলে পাগলের মতো সাহায্য চেয়ে টুইটারে একের পর এক বার্তা পাঠাচ্ছিল। প্রিয়তমের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরও থামেনি বার্কলের টুইটিং। বরং টুইটারে তার একটি হ্যাশট্যাগ এখন ভীষণ আলোড়ন তুলেছে। বার্কলে টুইট করেছে #f***terrorism। আসলেই সন্ত্রাসবাদকে বিদায় বলার সময় এসেছে। সময় এসেছে বলাটাও ভুল। বরং অনেক দেরি হয়ে গেছে আমাদের। এ কারণেই দিতে হচ্ছে এতো খেসারত।

প্যারিস হামলা বেশ কয়েকটি বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে অনেক সমীকরণ। সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলা বাদ দিলে আইএসের প্রায় সবগুলো হামলাই চালানো হয়েছে সিরিয়া, ইরাক আর প্রতিবেশী তুরস্কে। আঙ্কারা থেকে সিনাই; বৈরুত থেকে প্যারিস। সবশেষ ঘটনাগুলোতে চোখে রাখলে দেখা যাবে আইএসের ভয়াবহ হামলাগুলোর তালিকায় ফরাসি রাজধানী যোগ হওয়ায় গেল পাঁচ সপ্তাহে নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৫০০। সবগুলো হামলারই দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট। যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। তাই এই দাবিকে পুরোপুরি মেনে নেওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়নি এখনও। এসব হামলার মাধ্যমে আইএসের বার্তা খুব স্পষ্ট।

তাদের কার্যক্ষমতা এখন বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে। তাদের ভাষায় কোনও শত্রুকেই ছাড় দেবে না আইএস। আরেকটি ভয়ঙ্কর দিক হলো, এ ধরনের হামলা এখন যেকোনও জায়গাতেই হতে পারে। হামলার ক্ষেত্র যেমন বাড়ছে, একইভাবে বাড়ছে আইএসের নেটওয়ার্ক। হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর শক্ত ঘাঁটি বৈরুতেও বড় ধরনের হামলা চালাতে সক্ষম আইএস। সেখানেও তারা প্রথমবারের মতো আত্মঘাতী হামলা চালানোর দাবি করেছে। সেটি প্যারিস হামলার ঠিক আগের দিন। যেখানে মারা যায় ৪০ জন। এমনকি ৩১ অক্টোবর সিনাইয়ে যে রুশ বিমান দুর্ঘটনায় ২২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, সেটিকেও ভূপাতিত করার দাবি করছে এই জঙ্গিগোষ্ঠী। এটাকে বেশ শক্ত দাবি বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার কোনও কারণ উল্লেখ করতে পারেনি মিসরীয় কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, বোমা বিস্ফোরণেই বিমানটি উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

সিনাইয়ের আকাশে রুশ বিমান বিধ্বস্ত। এরপর প্যারিসে সমন্বিত হামলা। দুটি ঘটনাকে কাকতালীয় বলার সুযোগ খুব একটা আছে বলে মনে হয় না। আবার সিরিয়ায় আইএসবিরোধী অভিযানের কারণেই যে এ দুটি হামলা চালানো হয়েছে, তারও কোনও শক্ত প্রমাণ নেই। তবে এগুলোর মধ্যে একটি যোগসূত্রের আশঙ্কা থেকেই যায়। আর এই যোগসূত্রের প্রমাণ মিললে সেটি হবে বিশ্বশান্তির জন্য বড় হুমকি। কারণ এ ধরনের হামলা আইএসকে সবচেয়ে শক্তিশালী সন্ত্রাসী গ্রুপ হিসেবে প্রমাণ করে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে যারা কাজ করছেন, আইএসের কর্মকাণ্ডে তারাও দেখছেন বড় ধরনের পার্থক্য। বিশেষ করে জানুয়ারিতে প্যারিসেই শার্লি এবদো কার্যালয়ে হামলা চালানোর আগের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমানের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখছেন তারা। ওই সময়ে আইএসের কর্মতৎপরতা আর সাম্প্রতিক হামলাগুলো বড় বেশি আতংক তৈরি করছে। যেকোনও অবস্থায় যেকোনও জায়গায় হামলা চালাতে এই গোষ্ঠীটি এখন অনেক বেশি সক্ষম। প্যারিসের ছয়টি ভেন্যুতে যেভাবে সমন্বিত হামলা চালানো হয়েছে, তাতে বোঝাই যাচ্ছে আইএস জঙ্গিরা ভালোই প্রশিক্ষিত।

সেটাই যদি হয়, তাহলে বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে বৈকি। কারণ ওই হামলার পর টুইটার বার্তায় আইএস জানিয়েছে, তাদের আটজন এতে অংশ নেয়। ফরাসি কর্তৃপক্ষও বলছে, আটজন হামলাকারী নিহতের কথা। কিন্তু আইএস এ কথাও বলেছে, 'এটি বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা'। মাত্র আটজন যে ধরনের ভয়াবহ হামলা চালালো, তাতে আইএস জঙ্গিরা যে উচ্চতর প্রশিক্ষণ পাচ্ছে- সেটি না বোঝার কিছু নেই। আর বৃষ্টির প্রথম ফোঁটাতেই যদি এতো মৃত্যু হয়, তবে মুষলধারে বৃষ্টিতে কী হবে? তা মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত পশ্চিমা বিশ্ব? কিংবা আক্রান্ত দেশগুলো? প্যারিস হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র-বিস্ফোরক, সময় নির্ধারণ আর হামলাকারীদের নিজেদের মধ্যে সমন্বয় থেকেই বোঝা যাচ্ছে, তারা সাধারণ কোনও জঙ্গি নয়। প্যারিসকে মৃত্যুর নগরী বানিয়ে আইএসের বৈশ্বিক উত্থানের বার্তা মিলেছে।
শোক করছে ফ্রান্স। কিন্তু প্যারিসের জন্য প্রার্থনা করছে গোটা বিশ্ব। কিন্তু এই প্রার্থনাই শেষ কথা নয়। এই প্রার্থনাই যথেষ্ট নয়। এমন একটা ব্যবস্থায় আসতে হবে, যাতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এক হতে পারে বিশ্ব। এমন একটা মানসিক পরিবর্তন ঘটাতে হবে যাতে সন্ত্রাসকে দেখা হবে সন্ত্রাস হিসেবেই। সেখানে দেওয়া হবে না ধর্মের লেবাস। ধর্মের নামে চলবে না মানবতাবিরোধী অপরাধ। বন্ধ হবে ধর্মযুদ্ধ। ইসলামে যুদ্ধ-বিগ্রহের ইতিহাস যেমন সত্য, একইভাবে এটাও সত্য যে ইসলাম প্রকৃত অর্থেই শান্তির ধর্ম। এর আগেও বহু ধর্মযুদ্ধ হয়েছে, বহু ধর্মের কিছু মানুষের পক্ষ থেকে। তারা কখনও জিহাদি, কখনওবা ক্রুসেডার হিসেবে পরিচিত। কিন্তু তাদের আসল পরিচয় তারা কোনও ধর্মেরই প্রতিনিধি নয়। তারা কেবলই সন্ত্রাসী। শান্তিপ্রিয় মুসলমানদের তাই সাফ কথা, 'আইএস ইসলামের প্রতিনিধি নয়'।

ধর্মের নামে এ ধরনের সন্ত্রাস আর রক্তের হোলি খেলা বন্ধে নির্মূল করতে হবে আইএসের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলোকে। তবে কয়েকটি সংগঠনকে নির্মূল করলেই যে পৃথিবী থেকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ কর্পুরের মতো উবে যাবে- তা ভাবার কোনও কারণ নেই। আল-কায়েদার সৃষ্টি আর উত্থান নিয়ে যেমন বিতর্ক আছে, একই বিতর্ক তৈরি হয়েছে আইএস গোষ্ঠীকে নিয়েও। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অনেক বিশ্বনেতার বিশ্বাস- এসব জঙ্গিগোষ্ঠী তৈরির পেছনে পশ্চিমা কোনও কোনও দেশের হাত রয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক থেকে শুরু করে অপরাধবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশও তাই মনে করে। রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনও দেশ এসবের পেছনে জড়িত কিনা সেই প্রমাণ না পেলে এই বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে এটাতো ঠিক, ধর্মের নামে জিহাদের মতবাদ (ideology) ছড়িয়ে দিচ্ছে কিছু মানুষ, কয়েকটি গোষ্ঠী। প্রকৃত অর্থেই তাদের কোনও ধর্ম আছে কিনা, কোনও দেশ আছে কিনা- সেটাও ভাবনার বিষয়। নির্মূল করতে হলে এই মানুষগুলোকে, এই গোষ্ঠীগুলোকে নির্মূল করতে হবে। সে কারণেই একটি প্ল্যাটফর্মে আসতে হবে গোটা বিশ্বকে। অস্ত্র ব্যবসা, প্রাকৃতিক সম্পদের হিসেব-নিকেশ সবকিছুকে একপাশে সরিয়ে ফেলে শুধু মানবতার কারণে সবাইকে এক হতে হবে। সেজন্য আসলে দরকার তেমন একজন বিশ্বনেতার। সেরকম কেউ আজকের দুনিয়ায় আছেন কি?

আক্রান্ত মানুষ সহমর্মিতা চায়। কোনও কুতর্ক কিংবা বিদ্বেষ চায় না। সাধারণ মানুষ মুক্ত স্বাধীন, প্রগতিশীল একটি মানবিক বিশ্বের পক্ষে। ধর্মের নামে উগ্রবাদীদের হাতে এই বিশ্ব চলে যাক- তা কারও কাম্য নয়। কারণ সাধারণ মানুষগুলো আশা নিয়ে বেঁচে থাকে। বেঁচে থাকে বিশ্বাস নিয়ে। সেই আশা আর বিশ্বাসের কারণেই কালো রাত্রির পরও আলোর শহর হয়ে টিকে আছে প্যারিস। আলোর পৃথিবীতে টিকে থাকবে মানুষ, টিকে থাকুক মানবতা।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, এসএটিভি

shahariar@journalist.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ

 
 
 
 

লাইভ

টপ