খালেদার মুখে ভৌতিক শব্দ

Send
নাদীম কাদির
প্রকাশিত : ২২:৩৯, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৫ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:২৭, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৫

নাদীম কাদিরইস্ট লন্ডনে সাপ্তাহিক বাংলা পোস্টের আয়োজনে বিজয় দিবস নিয়ে একটি আলোচনা সভায় গিয়েছিলাম। যুদ্ধের সময়, যুদ্ধের আগেকার ঘটনা এবং এখানে (ব্রিটেনে) জন্ম নেওয়া বা এখানে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি-ব্রিটিশদের মনে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিভাবে প্রবেশ করানো যায়- এসবই ছিল আলোচনার বিষয়।
বাংলাদেশের যুদ্ধের ও তার পরবর্তী ইতিহাসকে বিকৃত করার যে অপপ্রয়াস তার প্রতিবাদে সেখানে বেশ  উচ্চকণ্ঠ ছিল সবাই। এটা শুরু হয়েছিল অপরাধী সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর হাত ধরে, যারা বাংলাদেশের জনগণের হাত থেকে তাদের গা বাঁচানোর জন্য ওই অপচেষ্টার শুরু করে।
এরপর বললেন ইশহাক কাজল। তিনি বাংলাদেশি ডায়াসপোরা কমিউনিটির নেতা ও একজন নামকরা সাংবাদিক। তিনি বললেন যে, একটু আগে তিনি খবরে শুনেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নাকি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নিহত ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রচারিত খবরে তাকে বলতে শোনা গেছে, “স্বাধীনতা যুদ্ধে ঠিক কী পরিমাণ মুক্তিযোদ্ধা নিহত হয়েছে তা নিয়ে বিতর্ক আছে। এই বিতর্ক নিয়ে অনেক বই ও নথিপত্রও আছে।”
অন্য কিছু বলার আগে সবার আগে আমি ওই দলীয় নেতাকে বলতে চাই, আমি যা বলবো তার প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলবো। সেনা পরিবারের সদস্য হিসেবে ১৯৭১ এর দিকে চট্টগ্রামে থাকার সুবাদে আমি তাকে শৈশব থেকেই চিনি। তাকে অসম্মান করা কখনই আমার অভিপ্রায় ছিল না। কিন্তু তিনি যা বলেছেন তা এতটাই অগ্রহণযোগ্য যে আমি এ লেখাটা লিখতে বাধ্য হচ্ছি। কেননা, তার কথাটা আমার শহীদ পিতা ও তার মতো আরও অন্যদের জন্য অপমানজনক। তা ছাড়া তার ওই কথায় সেসব পরিবারও অপমানিত হয়েছে যারা কিনা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর হত্যাকাণ্ড চাক্ষুষ করেছিলেন।
আমার বাবা ছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমানের সাত বছরের সিনিয়র। আজকের এই স্বাধীন দেশের জন্য তিনি তার জীবন দিয়েছিলেন। তাদের ওই আত্মত্যাগের জন্যই পরে মেজর জিয়াউর রহমান শুধু জেনারেলই হননি, প্রেসিডেন্টও হয়েছিলেন; তা যেভাবেই তিনি অফিস দখল করেন না কেন।
আমার মনে পড়ে, ইস্ট লন্ডনে বিজয় দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে যুদ্ধের কথা ওঠা মাত্রই আমি কতটা আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলাম। শুধু যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কারণেই যে হই তা নয়, একা আমার মাকে যে ট্র্যাজেডির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল তা ভেবেই আবেগতাড়িত হই।  তার মতো মায়েরাই এমন এক প্রজন্মকে উপহার দিয়েছেন যাদের প্রায় সবাই স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনাধারী।

আমি আমার সহকর্মীদের প্রায়ই বলি, একজনের সঙ্গে আরেকজনের আদর্শগত অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু তাই বলে ইতিহাস বিকৃত করতে হবে কেন? তাই বলে মিথ্যে বলতে হবে কেন? এর মানে এটাও নয় যে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য বিদেশি বন্ধুদের কাছে মিথ্যে বলে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে হবে।

লন্ডনের আসার পর থেকে অনেক পেশার মানুষের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। তাদের অনেকেই এটা দেখে অবাক হয়েছিলেন যে বাংলাদেশিদের অনেকে তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে নিজের দেশের মানহানি করতে দ্বিধা করেনি। ওই লোকগুলোর তো আসলে বাংলাদেশ ছেড়ে পাকিস্তান চলে যাওয়া উচিৎ।

এই প্রসঙ্গে দেশের অনেক ঘৃণিত ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারি। যার মধ্যে জামায়াতের অনেক নেতাও ছিলেন। তবে আমি কখনই তাদের মন্তব্য বিকৃত করিনি। আমার ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে জানার পরও তারা আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছিলেন, কারণ আমি বস্তুনিষ্ঠ ছিলাম। এটাই হলো সাংবাদিকতা।

আজ আমি অবসরপ্রাপ্ত সাংসদ মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তমকে আহ্বান জানাতে চাই তিনি যেন এগিয়ে এসে সত্যটা বলেন, যা আমি, তিনি জানি ও আমার মা জানতেন। আংকেল, আপনার কথা বলার এখনই সময়, আমি আপনার সঙ্গে আছি।

আমাদের শহীদদের প্রতি অসম্মান এবং যুদ্ধ নিয়ে ও সোনার বাংলার স্বাধীনতার জন্য যে বাঙালিরা শহীদ হয়েছে তাদের নিয়ে ঠাট্টা করাটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না।

লেখক: সাংবাদিকতায় জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারসোল্ড স্কলার এবং লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

/এফএ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ