behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

সৌদি জোটের ভবিষ্যত কী?

আনিস আলমগীর১১:১৩, ডিসেম্বর ২৪, ২০১৫

Anis Alamgirইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে দুটি জোট সক্রিয় রয়েছে। একটা রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন জোট আর অন্যটি হলো আমেরিকার নেতৃত্বাধীন জোট। আমেরিকান জোটের একজন সক্রিয় সদস্য সৌদি আরব। এই সৌদি আরব হঠাৎ তার নেতৃত্বে আরেকটা জোট গঠন করেছে। এ জোটকে বলা হচ্ছে ইসলামিক মিলিটারি অ্যালায়েন্স টু ফাইট টেরোরিজম। সৌদি আরবের এ জোটে বাংলাদেশকে যোগদানের জন্য অনুরোধ করেছে। বাংলাদেশ সৌদি অনুরোধে সাড়া দিয়ে জোটে যোগদানের তার সম্মতির কথাও ইতোমধ্যে জানিয়েছেন।

এর আগে, আমেরিকা তার জোটে যোগদানের জন্য বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছিলো কিন্তু বাংলাদেশ সে অনুরোধ রক্ষা করেনি। সৌদি আরব যখন ইয়েমেনে বোম্বিং শুরু করেছিল তখন পাকিস্তানকে তার সঙ্গে যোগদানের জন্য অনুরোধ করেছিল। কিন্তু পাকিস্তান তার অনুরোধ রক্ষায় তাদের অপরাগতার কথা বলেছিল। সৌদিরা যে নতুন জোটের জন্ম দিলেন তাতে না জানিয়ে পাকিস্তানকে রাখায় তারা বিস্মিত হয়েছে, তবে না থাকার কথা বলেনি।

একটা সামরিক জোট গঠন করতে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, এখানে কিন্তু কোনও প্রক্রিয়াই অনুসরণ করা হয়নি। সবার সঙ্গে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল জুবায়ের টেলিফোনে আলাপ করেই অনেকটা জোটের ঘোষণা দিলেন। বাংলাদেশকে বলা হয়েছে তথ্যের আদান-প্রদানের সহায়তার জন্য জোট গঠন করা হচ্ছে। মুসলমান দেশগুলোর ওআইসি জোট রয়েছে, আবর দেশগুলোর রয়েছে আরব লীগ, আবার উন্নয়নশীল আটটি মুসলিম দেশের রয়েছে ডি-এইট জোট। সময়ে সময়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলো মিলিত হয়ে খোশ গল্প করা ছাড়া মুসলিম উম্মার উপকারে আসে এমন কোনও কর্ম উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখিনি আমি।  ওআইসি এবং ডি-এইট-এর একাধিক শীর্ষ সম্মেলনের সংবাদ সংগ্রহ করার অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, তারা যত বলে তার কিছুই করে না। সে কারণে সৌদি উদ্যোগে গঠিত এ জোট কতটা কাজের কাজ করবে সন্দেহ আছে।

কোন এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য জোট গঠন করা হয়েছে—সৌদি আরব তার কোনও বিস্তারিত বিবরণ পেশ করেনি। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী শুধু বলেছেন ‘৩৪ রাষ্ট্রের এ জোট সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।’ জোটের কর্মসূচির কিছুই এখনও সম্মিলিত আলোচনার মধ্য দিয়ে স্থির হয়নি। জোট সন্ত্রাস উৎপীড়িত রাষ্ট্রে প্রয়োজনে সৈন্য পাঠাবে। অবশ্য তিনি এ কথা বলার সময় সম্মিলিত আলোচনার কথাও উল্লেখ করেছেন।

সৌদি আরব মুসলিম উম্মাহর শ্রদ্ধাভাজন রাষ্ট্র। কারণ সৌদি আরব (১) মুসলিম উম্মার পবিত্রতম স্থান দুই হারাম শরীফের খাদেম। (২) সৌদি আরবের অডেল অর্থ সম্পদ রয়েছে। (৩) সৌদি আরবে মুসলিম উম্মার দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু সৌদি আরবের কতগুলো বিপজ্জনক দিকও রয়েছে। তারা আমেরিকার প্রভাব বলয়ের বাইরে আসতে পারে না। শেষ পর্যন্ত সৌদি আরব আমেরিকার নাচের পুতুল হয়ে যান। ১৯৭৯ সাল থেকে ইরান যেভাবে আমেরিকার সমস্ত বৈরিতা মোকাবেলা করে টিকে আছে এবং বিশ্বের দরবারে নিজের জন্য একটা শ্রদ্ধার আসন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে, সৌদি আরবের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশের কিছু বিশ্লেষক সৌদি সামরিক জোটে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়ে বিরূপ কথাবার্তা বলা আরম্ভ করেছেন এবং আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন যে, এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ আইএস-এর টার্গেট হয়ে যাবে। আইএস এর খলিফা বাগদাদি আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশকে তার টার্গেটের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন বেশ ক’দিন আগে এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে খতম করার অভিলাষও ব্যক্ত করেছেন। সুতরাং নতুনভাবে আর কিছু করার নেই। আইএস তার অস্থিত্ব নিয়ে টিকে আছে ইরাক-সিরিয়ার কিছু অঞ্চলে। তার বাইরে গিয়ে অন্যকোনও অঞ্চল আক্রমণ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। রাশিয়ার আক্রমণের পর সিরিয়ায় ও বহু এলাকা আইএস-এর হস্তচ্যুৎ হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে তার কিছু সমর্থক তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ইসলামিক সংগঠনের আওতায়। নাইজিরিয়ার বোকো হারাম যেভাবে আবু-বক্কর বাগদাদির আনুগত্য প্রকাশ করে তার অন্তর্ভুক্তির কথা ঘোষণা করেছে, অন্য কোনও দেশে কোনও ইসলামিক সংগঠন সেরূপ কিছু করেনি। সোমালিয়া ছাড়া অন্য কোনও মুসলিম দেশে বোকো হারামের মতো শক্তিশালী সংগঠনও নেই।

বাংলাদেশে জেএমবির কিছু কর্মকাণ্ড মাঝে-মাঝে পরিলক্ষিত হচ্ছে। চট্টগ্রামের সদর ঘাটে ক’দিন আগে জেএমবির কিছু সদস্য ডাকাতির করার সময় আটক হয়েছে। ইন্টারোগেশনে তারা বায়েজিদ  বোস্তামিতে ল্যাংটা ফকির হত্যার কথা স্বীকার করেছে এবং অর্থাভাবে ডাকাতি করছে বলেও স্বীকার করেছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নন-স্টেট সংগঠনগুলো কঠোর প্রতিরোধের সম্মুখীন হলে কখনও টিকতে পারবে না।

গত জুমায় চট্টগ্রামের বিএনএস ঈশা খাঁর মসজিদে যারা বোমা মেরেছেন, মুসল্লিরাই তাদেরই ধরেছেন। জেএমবির যে সব ক্যাডার ধরা পড়ছে, দেখা যাচ্ছে তারা উচ্চশিক্ষিত আলেমও নন বা ভালো ইংরেজি শিক্ষিতও কেউ নন। আমার মনে হয়, প্রতিরোধ আরও কঠোর হলে জেএমবির এসব ক্যাডার হয়ত এ সব কাজ ছেড়ে দেবে, না হয় সংঘবদ্ধ ডাকাত দলে হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। কিছু বয়স্ক আলেম মধ্যপ্রাচ্য থেকে টাকা এনে অবুঝ-যুবকদের ধর্মের কথা বলে টাকা দিয়ে এ সব কাজ করাচ্ছেন। সুতরাং মনে হয় এসব নন-স্টেট অর্গনাইজেশন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। প্রয়োজনে প্রতিরোধ কঠোর হলেই হবে। কত বিপ্লবী অর্থাভাবে বিলীন হয়ে গেছে, তার বহু করুণ কাহিনী অনেকের জানা আছে। রানা প্রতাপ সিং আকবরের সময়ে পাহাড়ে যে আশ্রয় নিয়েছিল, আর সমতলে আসতে পারেনি।

সিরিয়ার ব্যাপারে নিরাপত্তা পরিষদ একটা প্রস্তাব গ্রহণ করেছে সব বিদ্রোহীরাই বিভিন্নখানে বিভিন্নভাবে আলাপ-আলোচনায় অংশগ্রহণ করছে। সিরিয়ার বিষয়টা একটা রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়। এখন সিরিয়া সম্ভবতো আইএস  মুক্ত হওয়ার অপেক্ষায়। অবশিষ্ট রইল ইরাক আর ইয়েমেন। ইয়েমেনের বিষয়টা শিয়া সুন্নির ব্যাপার। ইরানের উপস্থিতি ছাড়া এ সমস্যার সমাধান করা হয়ত সম্ভব হবে না।

সম্ভবতো অল্প কয়দিনের মধ্যে সৌদি সরকার এ জোটের বৈঠক করবে। সদস্য দেশগুলোর অধিকাংশ সদস্যের যুদ্ধ করার মতো সঙ্গতি নেই। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মিশর, তুরস্কের যুদ্ধ করার ক্ষমতা থাকলেও তারা কোনও যুদ্ধে জড়িত হবে বলে মনে হয় না। সুতরাং, প্রাথমিক আলাপ আলোচনা ছাড়া এ জোটের গতি-প্রকৃতি বোঝা যাচ্ছে না।

বিশ্বে বাংলাদেশের সামরিক নেতৃত্বের প্রশংসা রয়েছে কারণ বাংলাদেশের সেনা সদস্যরা জাতিসংঘের অধীনে বহুদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। বাংলাদেশের এ অভিজ্ঞতাকে সৌদি আরব কাজে লাগাতে হয়ত বা উৎসাহিত হবে। কিন্তু যুদ্ধের ক্ষেত্র কোথায়? ইরাকে বহুজাতি অপারেশন চলছে। সুতরাং বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্রদেশের এ অপারেশনে অংশগ্রহণ কখনও সম্ভব নয়। আর ইরাকে স্থল যুদ্ধের প্রয়োজন। তুরস্ক, মিশর এবং সৌদি আরবই এ অপারেশনের জন্য যথাযথ শক্তি। কারণ বাংলাদেশের সৈন্যরা মরু অঞ্চলে যুদ্ধে অভ্যস্ত নয়। সর্বোপরি ইরাকে যুদ্ধ করতে ইরান নিশ্চয়ই সম্মত হবে। তার অংশগ্রহণ জরুরি। সিরিয়ার সমস্যা সমাধানেও ইরানের অংশগ্রহণ দরকার আছে। ইয়েমেন সমস্যা সমাধানেও ইরানকে দরকার। দুটিই শিয়া অধ্যুষিত যুদ্ধ বিধ্বস্ত রাষ্ট্র।

বাংলাদেশের বহুলোক সৌদি-আরবসহ মধ্য প্রাচ্যের প্রত্যেকটি দেশে কাজ করে। তাদের সঙ্গে আমরা সুখে দুঃখে জড়িত। সুতরাং তাদের কোনও কথা মুখের ওপর না করা সম্ভব নয়। সৌদি জোটে বাংলাদেশের অংশ নেওয়া ইতিবাচক ফল নিয়ে আসবে, সেটা আস্তে-আস্তে চোখে পড়বে অনেকের। দীর্ঘদিন ওমরাহ ভিসা বন্ধ রেখেছিল সৌদি আরব। জোটে যোগদানের পরই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে সৌদি আরব। সামনে হয়তো শ্রমিক নিয়োগও শিথিল করবে তারা।

যারা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্দরের খবর রাখেন তারা জানেন, সৌদি আরব বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে কতটা গুরুত্ব বহন করে ও কর্তৃত্ব রাখে। বাংলাদেশ সৌদি জোটে যোগ দিতে সম্মত হয়ে ভালোই করেছে। বৈঠক করলে বোঝা যাবে, কারা যুদ্ধে সম্মত হয়, কারা না করে। আমেরিকা তুরস্ককে স্থলযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য অনুরোধ করেছে কিন্তু তারা স্থলযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেননি। পাকিস্তান যুদ্ধ করতে সম্মত নয়—ইয়েমেন যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রস্তাবে না-সূচক জবাব দিয়ে তা জানিয়ে দিয়েছিল। মনে হয়, ‘ইসলামিক মিলিটারি অ্যালায়েন্স টু ফাইট টেরোরিজম’ নামের এ জোটটি সৌদি আরব গঠন করলেও শেষ পর্যন্ত এ জোটের কেউই স্থল যুদ্ধে সম্মত হবে না। সুতরাং এ জোট কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ