behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

পাকিস্তানি ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর গণবিচারের নেতৃত্বে মন্ত্রী কেন?

ফজলুল বারী১২:০৮, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৫

Fazlul Bariবাংলাদেশের জন্মশত্রু রাষ্ট্র পাকিস্তানের ক্রমাগত ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে এখন ফুঁসছে বাংলাদেশ! এই বাংলায় তাদের পক্ষ নেওয়ার মতো কিছু যুদ্ধাপরাধী, তাদের আণ্ডাবাচ্চার দল, খালেদা জিয়ার মতো কিছু লোক ছাড়া কেউ নেই। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, সাকা চৌধুরী, আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসির পর পাকিস্তানি ঔদ্ধত্যের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের গণমানসে একাত্তরের পাকিস্তানি ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। সিমলা চুক্তির মাধ্যমে ওই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলে তাদের হাতে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু পাকিস্তান যেহেতু একটি বিশ্বাসঘাতক, বেঈমান, মিথ্যাবাদী রাষ্ট্র তাই তারা সেই ১৯৫ জনেরও বিচার করেনি। উল্টো এখন বাংলাদেশে যাদের বিচার চলছে তার বিচার নিয়ে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছে। বাংলাদেশে গণআদালতের মাধ্যমে সেই ১৯৫ জনের প্রতীকী বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী শাজাহান খানকে করা হয়েছে সেই বিচার কমিটির আহ্বায়ক! আমার প্রশ্ন এখানে ক্ষমতাসীন একজন মন্ত্রীর নেতৃত্বে কমিটি অথবা বিচার কেন? তাও আবার শাজাহান খানের মতো একজন বিতর্কিত মন্ত্রীর নেতৃত্বে! এভাবে কিন্তু ভালো একটি উদ্যোগকে শুরুতেই খেলো, প্রশ্নবিদ্ধ করে দেওয়া হচ্ছে!
এক্ষেত্রে গণআদালতে গোলাম আজমের বিচার প্রক্রিয়া প্রস্তুতির কথা মনে করিয়ে দেই। গণআদালত সফল হয়েছিল শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মতো একজন ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বের কারণে। শিক্ষকতার পেশা ছিল শহীদ জননীর। মুক্তিযুদ্ধে স্বামী-সন্তান হারিয়ে জীবন সূচি তার বদলে যায়। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি শুধু হয়ে যান শহীদ রুমির মা। রুমির যুদ্ধফেরত সহযোদ্ধাদের মা। শহীদ জননী। একাত্তরের ডায়েরির পাতাগুলোর সঙ্গে দৈনিক বাংলার লাইব্রেরিতে পরিশ্রমী গবেষণা মিলিয়ে লিখে ফেলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক প্রামাণ্য সম্ভার ‘একাত্তরের দিনগুলি’। এই একটি অমর সৃষ্টি বই তার শিক্ষক পরিচয়টি হারিয়ে দেয় লেখক পরিচয়ের আড়ালে। সম্ভবত এখন পর্যন্ত ‘একাত্তরের দিনগুলি’ই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সবচেয়ে পঠিত-বিক্রিত বই। এমন একজন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লেখক- শহীদ জননীর নেতৃত্বে গণআদালত হয়েছিল বলেই সেটি এতটা সফল হয়েছিল। খালেদা জিয়ার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সেদিন ঢাকা শহরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষের ঢল নেমেছিল। এখন খালেদা জিয়াও যে বলেন তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চান কিন্তু সে বিচার হতে হবে স্বচ্ছ আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন(!), কিন্তু সেই খালেদা জিয়া সেদিন গণআদালত ঠেকাতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন! রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দিয়েছিলেন শহীদ জননী সহ ২৪ জন বিশিষ্ট নাগরিকের বিরুদ্ধে!

অবশ্য সেই গণআদালত গঠনও তখন সহজ ছিলো না। স্বৈরাচারি এরশাদের পতনের পর মানুষ যখন উৎসবে মশগুল সেই ফাঁকে পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আজমকে জামায়াতের আমির ঘোষণা করা হয়! এই গোলাম আজম বাংলাদেশ স্বাধীন হবার প্রাক্কালে পাকিস্তানে পালিয়ে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরও গঠন করে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি! জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার পর জিয়া তাকে দেশে ফিরিয়ে আনেন! পাকিস্তানি পাসপোর্টে সে বাংলাদেশে এসেছিল। আর যায়নি। জিয়া-এরশাদ তাকে এখানে নিরাপত্তা দেন! সেই পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আজমকে জামায়াতের আমির ঘোষণার পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বিজয় উৎসবে এর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদের-ঘৃণার ডাক দেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। তার তেমন একটি জ্বালাময়ী বক্তৃতা এর আগে আমি অন্তত কখনও শুনিনি। এরপর সিদ্ধেশ্বরীর আমিনাবাদ কলোনীতে লেঃ কর্নেল (অবঃ) কাজী নুরুজ্জামানের বাসায় কয়েকদিনের ধারবাহিক আলোচনায় গঠন করা হয় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

কিন্তু তখনকার আওয়ামী লীগ শুরুর দিকে এই কমিটিকে সন্দেহের চোখে দেখে! কারণ জাহানারা ইমাম কখনও আওয়ামী লীগ করেননি। কাজী নুরুজ্জামানরা চৈনিক বামপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আওয়ামী লীগ তখন অধ্যাপক আব্দুল মান্নান চৌধুরী, অধ্যক্ষ আহাদ চৌধুরী এদের নেতৃত্বে নির্মূল কমিটির পাল্টা গঠন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি। উদ্দেশ্য এক। গোলাম আজমের বিচার। পরে নির্মূল কমিটি- চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি মিলিয়ে গঠন করা হয় জাতীয় সমন্বয় কমিটি। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হন সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক। আওয়ামী লীগ প্রথম চেয়েছিল এই সমন্বয় কমিটির আহবায়ক হবেন কবি সুফিয়া কামাল। কিন্তু সুফিয়া কামাল তখন নিজের থেকে বলেন, জাহানারা এর আহ্বায়ক হোক। তখন আর আওয়ামী লীগও তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। আওয়ামী লীগের পক্ষে জননেতা আব্দুর রাজ্জাক সর্বক্ষণিক সময় দেন গোলাম আজমের বিচারের আয়োজনে। কাজী আরেফ আহমদ, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, শিরীন আখতার সহ তৎকালীন বাম নেতৃবৃন্দ নানাভাবে সেই আয়োজনে যুক্ত ছিলেন। শাহরিয়ার কবিরের নেতৃত্বে একদল তরুণ সাংবাদিক ছিলেন পুরো আন্দোলনের মিডিয়া ভ্যানগার্ড। আর সবকিছুর পেছনে ছিলেন শেখ হাসিনা। শহীদ জননীর মতো ব্যক্তিত্বের নেতৃত্ব আর পেছনের এমন অনেক মানুষের গুরুত্বপূর্ণ সহায়তার কারণেই এতোটা সফল হয়েছিল গণআদালতে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমের বিচার। কিন্তু এখন যে নেতৃত্ব শাহজাহান খানের, ইনি কে?

আওয়ামী লীগের যে মন্ত্রীরা সবচেয়ে বিতর্কিত তাদের পাঁচজনের তালিকা করলে সেখানে শাজাহান খানকে বাদ দেওয়া যাবে না। তারেক মাসুদ-মিশুক মুনিরের মৃত্যুর পর ইনি কি সব রুঢ় মন্তব্য করেছিলেন তা কি লোকজন ভুলে গেছে? ইনি মূলত পরিবহন শ্রমিক নেতা। যে পরিবহন শ্রমিকদের বেশিরভাগ প্রতিদিন কারণে-অকারণে দেশের মানুষদের জিম্মি করে, ইনি তাদের নেতা! ইনি কী করে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিচার প্রক্রিয়ার নেতা হন? তিনি নেতা হলে পরিবহন শ্রমিকদের দিয়ে মাঠ ভরিয়ে দেবেন সে জন্যে? বাংলাদেশের এতটা দৈন্য সৃষ্টি হয়নি। টেকনিক্যালিও ইনি তথা ক্ষমতাসীন সরকারের একজন মন্ত্রী তা হতে পারেন না। গণআদালত গোলাম আজমের অপরাধকে মৃত্যুদণ্ড তূল্য বলে রায় দিয়ে তা কার্যকরের দায়িত্ব দিয়েছিল সরকারকে। কিন্তু শাজাহান খান নিজেইতো সরকারে আছেন। কাজেই বিচারটা আমরাই করি। শাজাহান খানরা যেন তা বাস্তবায়ন করেন। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিচার প্রকিয়াটি নিয়ে প্রশ্ন বাড়ার আগে শাহজাহান খানকে এখান থেকে সরানো হোক। কামাল লোহানী, আবেদ খান বা কোনও শহীদ জননীকে এর নেতৃত্বে আনা যেতে পারে। ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর কতজন বেঁচে আছেন তাও আমাদের নিশ্চিত জানতে হবে। কারণ আমাদের আইনে মৃত ব্যক্তির বিচারের বিধান নেই। সে কারণে যুদ্ধাপরাধী যারা বিচার চলা অবস্থায় মারা যাচ্ছেন তাদের বিচার প্রক্রিয়া সেখানেই শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। সিরিয়াস এই বিচার প্রক্রিয়াটি নিয়ে আমাদের শুরু থেকে সিরিয়াস থাকতে হবে। কোনওক্রমে যাতে বিষয়টি হাস্যকর না হয়।

লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ