behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

রাজনীতি ও শীত

চিররঞ্জন সরকার১১:২১, ডিসেম্বর ২৭, ২০১৫

শীত ও রাজনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন দু'টি প্রসঙ্গ। একটির সঙ্গে অন্যটির বৈধ ও যৌক্তিক কোনও সম্পর্ক নেই। শীত হচ্ছে প্রকৃতির খেলা। আর রাজনীতি হলো রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদের ক্ষমতায় যাওয়া অথবা ক্ষমতায় টিকে থাকার কলা-কৌশল। একে প্রহসনও বলা যেতে পারে। শীত আসে আবার শীত চলেও যায়। কিন্তু রাজনীতির প্রহসন শেষ হয় না। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে তা চলতেই থাকে। আমাদের দেশটা হচ্ছে অসম্ভবের দেশ। কেউ-কেউ সব সম্ভবের দেশও বলে থাকেন। যা হওয়া উচিত নয়, সম্ভব নয়, বাঞ্ছিত নয়— এমন ঘটনাই এখানে বেশি ঘটে। আবার যা স্বাভাবিক, সঙ্গত, কাঙ্ক্ষিত— এমন অনেক কিছুই এখানে ঘটে না। তারপরও দেশটা টিকে আছে। আমরাও টিকে আছি। বাংলাদেশ সত্যিই বিশ্বের বিস্ময়!
শীত আমাদের যতই শীতল ও শীতার্ত করুক না কেন, এ নিয়ে তেমন কোনও আলাপ-আলোচনা তোলপাড় বা লেখালেখি হয় না। অথচ রাজনীতি নিয়ে আমাদের দেশে কী তোলপাড়ই না হয়! সর্বশেষ বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বক্তৃতা দেওয়ার পর রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। বিএনপি নামক দলটির নেতানেত্রীরা অবশ্য মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাদের অশ্রদ্ধা নানাভাবেই প্রকাশ করে আসছেন। রাজাকারদের সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় গিয়ে তাদের মন্ত্রী বানানো, চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীদের দলের শীর্ষ নেতার পদ দেওয়া, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে একাত্ম হয়ে পথ চলা, রাজাকারের ভাষায় কথা বলা—এ সবই তাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থানকেই জানান দেয়। তারপরও দলটি নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল বলে দাবি করে! সব সম্ভবের দেশ বলে কথা!
যা হোক, এই শীতের ঋতুতে বিজয়ের মাসে খালেদা জিয়ার উক্তিটি শীতের আমেজকে হাল্কা করে দিয়েছে। এটা অবশ্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। শীতকালকে আমরা যত উপেক্ষাই করি না কেন, এ সময় রাজনীতি কিন্তু বেশ জমে ওঠে। রাজনীতির ভরা জোয়ার বা তেজকটাল বলা যায় এই শীতকালকে। আমাদের জাতীয় জীবনের সব তাৎপর্যময় দিবসগুলোও এ শীতকালেই। ১৬ ডিসেম্বর, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ— সবই হচ্ছে শীতকালীন ঘটনা। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানও সংঘটিত হয়েছে শীতকালেই। আসলে শীতকালে এদেশের মানুষের মধ্যে এক ধরনের তেজ চাড়া দিয়ে ওঠে। এর একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে শীতের সবজি। নানা জাতের, নানা স্বাদের বিচিত্র টাটকা সবজি খেয়ে শরীরের মধ্যে এক ধরনের টগবগে ভাব আসা স্বাভাবিক। আর শরীরে তেজ থাকলে, তেল থাকলে তা বের হবেই। এই তেজের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আন্দোলন, মানি না মানবে না— ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। কথায়ও আছে- পেটে খেলে পিঠে সয়। আন্দোলন তো এক ধরনের পিঠে সওয়াই। হামলা-মামলা, ধাওয়া, লাঠি-গুলি-টিয়ার গ্যাস, চিৎকার, স্লোগান, দৌড়-ঝাঁপ ইত্যাদিতে শক্তি ক্ষয়ের সম্মিলিত যোগফল। পেটে খাবার না থাকলে, তেজ না থাকলে কী আর এসব করা সম্ভব?
একবার শীতের শাক-সবজির কথা ভাবুন। গুলশান-বনানীর মন-কেমন করা ‘ঊর্বশী’র মতো ধবধবে ফুলকপি, আঁটসাঁট নববধূর মতো বাঁধাকপি, ঘুষখোর ট্রাফিক সার্জেন্টের পাটকরা পোশাকের মতো চকচকে শিম, কুমারীর রাঙা ওষ্ঠের মতো টকটকে লাল টমেটো, কিশোরের রঙিন স্বপ্নের মতো সুন্দর সুন্দর গাজর, সুলতানের আঁকা স্বাস্থ্যবান ছবির মতো ঢাউস-ঢাউস বেগুন আর হালকা সবুজ কচি লাউ, সাদায় মেশানো রাক্ষুসে সাইজের মুলা, পালঙ্কে রাখার মতো গাঢ় সবুজ পালং শাক, সাপের মতো লকলকে লাউডগা আরও কত কি!

কই মাছ দিয়ে ফুলকপির তরকারি, চিংড়ি মাছ দিয়ে লাউ বা বাঁধাকপির ঘণ্ট, আলু-বেগুন-শিম-কপি সহযোগে পাঁচফোড়ন দেওয়া তরকারি, ডালের বড়াসহ মাগুর কিংবা বোয়াল মাছের হালকা ঝোল, ধনিয়া পাতা কাঁচামরিচ সহযোগে বাটা, ফুলকপির সঙ্গে বেসন মিশিয়ে বড়া, সর্ষে ফুলের বড়া, পেঁয়াজু, বেগুনি, গরম মুড়ি, মাদকতা মেশানো খেজুর রস ও খেজুর গুড়, নানা জাতের পিঠা, হাঁস কিংবা পাঁঠার মাংস—এমনি অসংখ্য উপাদেয় খাদ্যসুখ আমাদের 'মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে' উচ্চারণ করতে উৎসাহিত করে। আসলে শীতকালটা হচ্ছে সুখের কাল, উপভোগের কাল (দরিদ্রদের জন্য নয়, অবশ্যই। তাদের নিয়ে এদেশে কেউ কী ভাবে? তাদের জন্য এ লেখাও নয়)! শীতের রাতে চিকেন ফ্রাই, একটু নেশাজাতীয় পানীয়, বেগম আক্তারীর ঠুমরি, নরম-গরম বিছানা আর প্রিয়জনের সান্নিধ্য—এর চেয়ে সুখ, এর চেয়ে কাঙ্ক্ষিত আর কী হতে পারে? তবে এ সুখেরও একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। এ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াটাকেই শীতের রাজনীতি বলা যায়। তা না হলে শীতকালে রাজনীতির মঞ্চ এত সরগরম হবে কেন?

আমাদের দেশে শীতের রাজনীতি আছে, তবে শীতকে নিয়ে রাজনীতি এখনও শুরু হয়নি। বন্যার সময় যেমন বলা হয় 'ভারতীয় বন্যা', শীতকে তেমনভাবে ভারতীয় বা পাকিস্তানি শীত বলার প্রবণতা এখনও শুরু হয়নি। তবে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের যে স্বভাব, তাতে অচিরেই হয়ত শীতকে নিয়ে রাজনীতি শুরু হওয়াটাও বিচিত্র নয়। বিএনপি-জামায়াতপন্থীরা বলবেন, এই শীত জোট সরকারের সীমাহীন অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও লুটপাটেরই ফল। তারা আরও বলবে, এই শীত ভারতীয় শীত, ওই প্রতিবেশী দেশটি ষড়যন্ত্র করে তাদের দেশীয় এজেন্ট ক্ষমতাসীনদের মাধ্যমে এ অবৈধ শীতকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এই শীত দিয়ে তারা বিরোধী দলের আন্দোলন দমন করতে চায়। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা জানে না জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ২০ দলীয় জোট এমন আন্দোলন গড়ে তুলবে যে শীত এবং মহাজোট সরকার পালাবার পথ পাবে না। পক্ষান্তরে ক্ষমতাসীনরা বলবে, এই শীত জামায়াত-বিএনপিওয়ালাদের ষড়যন্ত্রেরই অংশ। এর মধ্যে নোবেলবিজয়ী কারো কারো কারসাজি আছে। আমাদের কাছে এ ব্যাপারে প্রমাণ আছে। এটা মহাজোট সরকারের ভাবমূর্তি নষ্টের চক্রান্ত। একটি মহল শীতের ধোয়া তুলে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে চায়। কিন্তু জনগণ তা হতে দেবে না। আমরা যেকোনও মূল্যে এই ষড়যন্ত্রের শীতকে বিদায় করবো। প্রয়োজনে ভারত থেকে গরম আমদানি করব।

অধিক শীতে নারকেল তেল, ঘি ইত্যাদি জমে গেলেও মানুষের মাথার নার্ভগুলো এ সময় কেন জানি ঢিলা হয়ে যায়। হাইকোর্টের সামনের মোড়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাগলের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। রাস্তাঘাটে 'শ্রীপুরের বটিকা', নানা রকম চুলকানির মলম, জটিল-কঠিন-দুরারোগ্য সব রোগের ওষুধ, সালসা, তাবিজ ইত্যাদি নিয়ে ক্যানভাসাররা আবির্ভূত হন। বিরোধীদল ও জোটের আন্দোলন-আন্দোলন খেলা, চূড়ান্ত আন্দোলনের হুমকি, ক্ষমতাসীনদের লুটপাট, দুর্নীতি ও মিথ্যাচার, উৎসব, বই মেলা, পিকনিক, বিয়ে, সম্মেলন, খুন-হত্যা-সড়ক দুর্ঘটনা, নারী নির্যাতন, ছিনতাই, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ইত্যাদি শীতকালে প্রকট হয়ে দেখা দেয়। পুরনো বাতের ব্যথা, অম্লতা, পিত্তশূল, নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিসসহ নানারকম কোল্ড-ডিজিজ শীতের অতিথি পাখির মতো ব্যাপকভাবে ফিরে আসে।  

শীতের অনেক সুখের উপকরণ আছে। আবার অনেক কু-উপসর্গও আছে। শীতের প্রধান দু'টি উপসর্গ হচ্ছে অকারণ উত্তেজনা আর চুলকানি। এর কারণ সম্ভবত শীতের বিভিন্ন উপাদেয় খাদ্য ও শীতের পোশাক। শীতকালে আমাদের অনেক ভারি ভারি গরম পোশাক পরতে হয়। এর দু-একটা গায়ে চাপালে তালপাতার সেপাইকেও রেসলিংয়ের ফাইটারদের মতো মনে হয়। এ অবস্থায় শরীরে বাড়তি উত্তেজনা দেখা দেয়াটা অস্বাভাবিক নয়। চুলকানির উৎসও মোটামুটি একই অর্থাৎ ওই শীতবস্ত্র। পরচর্চায় অভ্যস্ত আমাদের শরীরে সারাদিন এসব 'বিজাতীয়' শীতবস্ত্রের আচ্ছাদন থাকার কারণে পোশাকও একসময় পরচর্চা শুরু করে। আর তাই চুলকানি দেখা দেয়। টাটকা শাক-সবজির উত্তেজনা আর বিজাতীয় শীতবস্ত্রের চুলকানি—এ দু'য়ে মিলে শীতকালে রাজনীতির ময়দান অকারণেই গরম হয়ে ওঠে। আন্দোলন, ক্ষমতা থেকে ফেলে দেয়ার হুমকি, ক্ষমতা না ছাড়ার দম্ভ, উল্টা-পাল্টা কথা, অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা, নৈরাজ্য ইত্যাদি হয়ত শীতকালীন চর্মরোগ ও উত্তেজনারই বহিঃপ্রকাশ।

আজ থেকে বহু বছর আগে এক শীতপ্রধান দেশের মহাকবি লিখেছিলেন: 'শীতের বাতাস তুমি বও, তুমি বও/ মানুষের অকৃতজ্ঞতার মতো তুমি নির্দয় নও।' কবির সেই দেশে মানুষ ছিল। সে মানুষের মধ্যে অকৃতজ্ঞতাও ছিল যা নিয়ে কবি ক্ষুব্ধ কবিতা লিখেছিলেন। আমাদের দেশে আপাতত ভয়ানক শীত নেমে এলেও এ শীতার্ত মানুষগুলোকে নিয়ে কোনও কান্না নেই, নেই কোনও তৎপরতা। স্বার্থপর রাজনীতিক ও তাদের মতলববাজ অনুসারীরা কারণে-অকারণে এলাকাবাসী ও জনগণকে শুভেচ্ছা জানাতে রং-বেরংয়ের পোস্টার ছেপে টাকার শ্রাদ্ধ করছেন। কিন্তু শীতার্ত মানুষের জন্য একটু বস্ত্রের ব্যবস্থা করতে তাদের কোনও উদ্যোগ নেই। আমাদের দেশে আসলে বর্তমানে কোনও 'মানুষ' নেই। এখানে একদল আছে নেতা, অন্য দল জনতা। একদল প্রভু, অন্যরা ভৃত্য। প্রভুদের জীবনে শীত স্পর্শ করে না, স্পর্শ করে রাজনীতি। এই রাজনীতিকে পুঁজি করে তারা সবকিছু বাগিয়ে নেয়। ভোগ-লালসা, সুখ, আনন্দ-উৎসব সবকিছু। কিন্তু এই রাজনীতি জনতারূপী ভৃত্যদের স্পর্শ করে না। তাদের জীবনে শুধু শীত, কেবলই শীতের প্রকোপ। শীতের কষাঘাতে তাদের জীবন জর্জর। তাদের জীবনে কোন গরম বা উত্তাপের প্রস্তাব নেই। নেই শীতের সবজি কিংবা শীতের পোশাক। তাই তাদের কোন উত্তেজনাও নেই, চুলকানিও নেই। কোটরাবদ্ধ ব্যাঙের মতো গুটিসুটি মেরে কোনরকমে নিশ্চুপ তাদের বেঁচে থাকা!

লেখক: কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ