behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

নারী নিয়ে মশকরা

তসলিমা নাসরিন১৭:০৮, ডিসেম্বর ২৭, ২০১৫

tasleemaগৃহবধূদের গৃহকাজকে বিনে-বেতনের কাজ বলেই মনে করা হয়। কিন্তু কিছু লোক গৃহকাজকে বা সংসারের কাজকে শ্রম হিসেবে বিচার করছেন, এবং গৃহবধূদের পারিশ্রমিক দাবি করছেন। পারিশ্রমিক ঠিক কত হবে তা নিয়েও ভাবছেন। কিছু গৃহবধূ সংসারের কাজকর্ম হিসেব করে নিজেদের জন্য একটি বেতন ঠিক করেছেন। অর্থাৎ তারা মাস গেলে বেতন পাবেন, বাড়ির ভৃত্য যেমন পায়। মেয়েদের নিয়ে মশকরা করলে একধরণের সুখ অর্জন হয়। তাই বোধহয় মশকরার হিড়িক চলে গোটা বিশ্বে।
গৃহবধূ কি তাঁর স্বামীর বেতনভুক কর্মচারী? রান্না করা, কাপড় কাচা, ঘর পরিষ্কার করা, বাচ্চা পড়ানো, রাতে স্বামীকে সঙ্গ দেওয়া ইত্যাদি কাজের জন্য তাঁর পারিশ্রমিক পেতে হবে, আর এই পারিশ্রমিকের টাকা দিয়ে কী করবেন গৃহবধূ? স্বামীর জন্য শার্ট, নিজের জন্য শাড়ি, বাচ্চার জন্য খেলনা গাড়ি, ঘর সাজাবার জিনিস, রান্নার মশলাপাতি এ-সবের বাইরেও তারা আরও খরচ করেন! খাঁচার ভেতর বন্দি মানুষ খাঁচাকেই সাজাবে আবার। স্বামীর টাকা বেতন হিসেবে যখন স্ত্রীর হাতে যাবে, তখন স্ত্রীর কী সাধ্য আছে এই টাকা তিনি খাঁচা অর্থাৎ সংসারের বাইরে অন্য কোথাও খরচ করলেন! নিশ্চয়ই নয়। কারণ স্বামী হয়তো তাঁর ভৃত্যসম স্ত্রীকে বেতন দেবেন, কিন্তু খোঁজ নেবেনই অথবা হিসেব চাইবেনই এই টাকা স্ত্রী কী খাতে খরচ করলেন। স্ত্রী যদি তাঁর বাবা-মা, ভাই-বোনকে টাকাটা দান করেন তবে স্বামীরা এত উদার নন যে মনঃক্ষুণ্ণ হবেন না এই ভেবে যে স্ত্রীর ভালোবাসা কেবল বাপের বাড়ির প্রতি, স্বামী বা শ্বশুর বাড়ির প্রতি নয়। স্ত্রী যদি তাঁর বন্ধুবান্ধব নিয়ে হইচই করেন, টাকাটা খেয়ে, ঘুরে উড়িয়ে ফেলেন তবে বলা হবে স্ত্রী অসম্ভব উগ্র, সংসারে উদাসীন, স্বেচ্ছাচারী, অলক্ষ্মী, চরিত্রহীনা ইত্যাদি। স্ত্রী যদি এই টাকাটা কেবল নিজের জন্য ব্যয় করেন তবে কথা উঠবে, স্ত্রী খুব স্বার্থপর। আর যদি তিনি টাকাটা জমিয়ে রাখেন তবে বলা হবে তিনি সম্ভবত কৃপণ প্রকৃতির। কিছুতেই নিস্তার নেই তাঁর, স্বামীর দেওয়া বেতন সংসারে স্বামীর টাকার মতোই তাঁর ব্যয় করতে হবে, সব তাঁর সংসারেই ঢালতে হবে, তবে আর টাকা ক’টি বেতন হিসেবে এক হাত থেকে আরেক হাতে যাওয়ার প্রয়োজন কী! এক্ষেত্রে ভৃত্যের অনেকটা স্বাধীনতা আছে। ভৃত্য তাঁর বেতন কী খাতে খরচ করল তা নিয়ে কারও জিজ্ঞাসা নেই। ভৃত্য যদি তার বেতনের টাকা কোনও জলে ফেলে দিয়ে আসে, এতে কারও প্রতিবাদ করবার নেই, কিন্তু স্ত্রী ফেললেই স্ত্রীকে নিরন্তর আহত হতে হবে, কেন জলে ফেলা হল, কেন এটি দিয়ে এই কাজটি বা ওই কাজটি করা হলো না।
এর মানে এই যে, তোমাকে স্বাধীনতা দেওয়া হলো, কিন্তু একটি বৃত্ত এঁকে দেওয়া হলো যে, এর বাইরে কোথাও যাওয়া চলবে না। তোমাকে এই টাকাক’টি দেওয়া হলো কিন্তু ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেওয়া হলো, এই টাকা দিয়ে তুমি এই-এই করবে। ছোট ছেলে-মেয়েদের যেমন নানা পর্বে-উৎসবে হাতে টাকা দেওয়া হয় বকশিশ হিসেবে, কিন্তু ছেলেমেয়েরা অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণেই সেই টাকা খরচ করতে বাধ্য হয়, যেমন আইসক্রিম কেনা যাবে না, বাঁশি কেনা যাবে না, তারাবাতি-তাও না, কেনা যাবে একটি জামা অথবা একজোড়া জুতো। টাকা আসলে ওদের মন ভোলাবার জন্য দেওয়া হয়। যেন হাতে নেওয়ার খুশিতে ওরা মগ্ন থাকে, টাকা তো হাতে ওদের থাকে না, তাই ওদের খুশি করা যায় টাকা ছুঁইয়ে। অনেকটা খেলায় জেতা সোনার কাপের মতো, একটু ছুঁইয়ে সরিয়ে ফেলো। আর ছুঁলেই খুশি থাকে যখন ‘মেয়েমানুষেরা’ তখন না হয় একটু ছুঁতে দেওয়া হলো। অমল আনন্দে ভরা থাক মিথ্যের পাত্রখানি।

গৃহবধূদের পায়ে শেকল, হাতে শেকল, ঠোঁটে শেকল, মনে শেকল। এত বেশি শেকল পরা মানুষ হাতে টাকা নিয়ে করবেন কী; নিয়মের বাইরে, দেওয়ালের বাইরে তাঁকে তো বেরোতে দিচ্ছে না কেউ। ‘যাবজ্জীবন’ হওয়া কয়েদির কাছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার মূল্য কিছু আছে? আসলে গৃহবধূর হাতে দেওয়া টাকা গৃহবধূর নিজের টাকা নয়। নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী টাকা খরচ করবার অধিকার তাঁর নেই। তাঁর চলবার, বলবার, দৌড়োবার, টাকা খরচ করবার অধিকার এখনও অর্জিত হয়নি। স্বেচ্ছাচার তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। স্বেচ্ছাচার অর্থ ‘স্ব ইচ্ছা অনুযায়ী আচার’ সম্ভব নয়, কারণ সেই পরিবেশ সমাজে তৈরি হয়নি। আর তা যদি না হয়, নারী যদি সাবলম্বী না হয়, স্বাধীন না হয় তবে পরাধীনতার শেকল আটকা রেখে তাঁকে যতই দুধভাত খেতে দেওয়া হোক সে পরাধীনই। বলদের গায়ে তেল দিলেও সে বলদ, তাকে কলুর তেল ভাঙানোর কাজই করতে হবে।

এক্ষেত্রে কিন্তু নারী মানুষ। যদিও তাঁকে দিয়ে বলদের কাজ করানো হয়। তাঁকে দিয়ে ধোপার, বাবুর্চির, ভৃত্যের, পতিতার, মালির, চৌকিদারের কাজ করানো হয়- কারণ একইসঙ্গে একজন নারী বহু প্রতিভায় ভাস্বর হলে তবেই তিনি সার্থক গৃহবধূ। গৃহবধূদের অধস্তন কর্মচারীরূপে দেখতে কিছু পুরুষের সম্ভবত শখ হয়েছে তাই এটিকেও একটি আধুনিক প্রতিভা বিবেচনা করে তাঁরা পোষ্য প্রাণীটিকে টাকাপয়সা দেবার প্রস্তাব করেছেন। পোষা ময়নার প্রতি যেমন থাকে মালিকের বাড়তি দরদ।

স্বামী হবে বন্ধুর মতো, প্রভু নয়, মালিক নয়।  স্ত্রী তাঁর বেতনভুক কর্মচারী নয়। নারীকে শিক্ষিত হতে হবে, স্বাবলম্বী হতে হবে, সর্বক্ষেত্রে স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। সংসার হবে দু’জনের বিশ্বাস ও ভালোবাসার ক্ষেত্র, এখানের যা-কিছু কাজ, তা দু’জন মিলেই করতে হয়। একজন আরেকজনের ওপর কিছু চাপিয়ে দিলে তা সংসার হয় না, হয় একটা বৈষম্যের কোনও হেরফের হয় না। আগে বৈষম্য ঘোচাবার সংগ্রাম করতে হবে। তাতে গৃহবধূদের অংশগ্রহণও জরুরি, তাঁরা গৃহবধূ হিসেবে সংগ্রাম করবেন না, করবেন নারী হিসেবে। আর স্বামীর কাছ থেকে বেতন পাবার সংগ্রামে নয়, নিজেকে মানুষ হিসেবে সংসারে প্রতিষ্ঠিত করবার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে সকল নারীকে, অর্জন করতে হবে মানুষের সবটুকু অধিকার। স্বামীর বেতন তাঁকে আর যাই দিক, ‘মানুষ’ হতে দেবে না – বরং আধুনিকতার চাটনি (যা খেয়ে পেট ভরবে না, কেবল জিভ জুড়োবে) দেবে, এও এক নতুন শৃঙ্খল বটে।

লেখক: কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ