behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

শুভবুদ্ধির জাগরণ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা১৩:০৫, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৫

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাপ্রতি বছরই থাকে ঘটনাবহুল। ২০১৫ সালটিও ব্যতিক্রম ছিল না। বিশ্ববাসী যেমন নানা ঘটনার সাক্ষী, বাংলাদেশের মানুষও দেখেছে সরকার বিরোধিতার নামে মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতা আর সংঘাতে পূর্ণ আগুন সন্ত্রাসের রাজনীতি। অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতার সাথে সামগ্রিকভাবে উন্নয়নের বড় যজ্ঞ চললেও বিনিয়োগে ছিল স্থবিরতা। গত বছরের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির হিসেব খুঁজতে-খুঁজতে নতুন বছরকে সামনে রেখে মানুষের মনে উঁকি দিচ্ছে তাই নতুন-নতুন স্বপ্নের। বাংলাদেশে ইংরেজি নববর্ষ পালনের ধরন বাংলা নববর্ষ পালনের মতো ব্যাপক না হলেও এ উৎসবের আন্তর্জাতিক ছোঁয়া থেকে বাংলাদেশের মানুষও বিচ্ছিন্ন নয়।
রাজনৈতিক সহিংসতা, নানা দুর্যোগ-দুর্ঘটনা আর ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে শেষ হলো বছরটি। তবুও মানুষ ২০১৬-কে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে স্বাগত জানায়। কারণ তারা অতীতকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে চায়। নতুন বছরে মানুষের চাওয়া সুস্থ রাজনীতি, বিনিয়োগে গতি, আরও কর্মসংস্থান এবং গতিশীল উন্নয়ন।
এ চাওয়া খুব স্বাভাবিক চাওয়া, তবুও তা পূরণ হয় না। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পেরিয়ে যে বাংলাদেশ, তার এখন যৌবনদৃপ্ত দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যাওয়ার সময়। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উন্নয়নের যে স্রোতধারা চালু রেখেছেন তার সাথে প্রয়োজন সুষ্ঠু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। গত সাত বছরে আমরা দেখেছি শেখ হাসিনার উন্নয়ন অবকাঠামো বিনির্মাণের এক জোয়ার সৃষ্টি করেছেন। তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে চলছে বাংলাদেশ। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই যে গতি তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি অর্থনৈতিক নেতৃত্ব। ব্যাংক ও আর্থিকখাতে লাগামহীন ঋণ কেলেঙ্কারি ও বিশৃঙ্খলা, পুঁজি বাজারের নিস্তব্ধতা, বিনিয়োগে স্থবিরতার এমন দীর্ঘ নজির অতীতে দেখা যায়নি। এমন বাস্তবতায় নতুন বছরে প্রধানমন্ত্রী কি তার অর্থনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তন আনবেন? দেখার বিষয় সেটি।

সংসদ নির্বাচন আর মানবতাবিরোধীদের বিচার প্রশ্নে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় বিরোধী জোট যে দাবদাহ সৃষ্টি করেছিল তার কোনও সুষ্ঠু পরিণতি আমরা দেখিনি। তাই নতুন বছরে কী ধরনের রাজনীতি বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি দলকে সঙ্গে রেখে করবে তার দিকে তাকিয়ে মানুষ। তবে বছরের শেষভাগে এসে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্য, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে গয়েশ্বর রায়ের অশালীন বক্তব্য এই দলের রাজনীতি যে এখনও স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের চাপে রয়েছে তার নির্দেশনা দেয়।   

বিশ্বব্যাংকের হিসেবে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে বাংলাদেশ। ছয় শতাংশের ওপরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। ঊর্ধ্বমুখী ধারায় রয়েছে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়। তবে এরপরও বলতে হয় যে আড়ালে থেকে যাচ্ছে সমাজে আয় বৈষম্য, সুশাসনের অভাব, শিক্ষার নিম্নমান, অবকাঠামো দুর্বলতা ও উন্নয়নকাজে গুণগত মানের সংকটসহ অর্থনীতির অনেক দুর্বলতা।

বেশ কয়েকবছর আগে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছিলেন বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশলগুলো অন্যায্যতা ও তীব্র বৈষম্যের জন্ম দিয়েছে, যা বাংলাদেশে দুটি সমাজ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের সমসাময়িক এ চরিত্রের সঙ্গে তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অর্থনীতির মিল আছে। এমন নির্মম সত্য সম্পর্কে ক্ষমতাসীন সরকার ও বিরোধী দলকে এখনই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

তবে জঙ্গিবাদের যে মহড়া আমরা দেখেছি তা নিয়ে বেশি সতর্কতার প্রয়োজন। সমাজের নানা স্তরে সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদের এই উত্থানকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। বাহ্যিকভাবে আমাদের প্রজন্ম আধুনিক হয়েছে, পোশাক-আশাকে পাশ্চাত্য ধারা বেড়েছে। কিন্তু মননে বা চিন্তায় কতটা পিছিয়ে আছে তার একটি বড় প্রমাণ পহেলা বৈশাখের জমায়েতে নারীদের ওপর উগ্রবাদীদের হামলা, শিয়া ও আহমদিয়া মসজিদে আক্রমণ, টার্গেট করে মুক্তমনা লেখকদের হত্যা করা। ধর্মান্ধতার এমন প্রকাশ আমাদের মুক্তচিন্তার পথ রোধ করে দিচ্ছে।

রোগ নির্ণয় যেমন ঠিক চিকিৎসার পূর্বশর্ত, তেমনি আজ জাগ্রত তারুণ্যকে সর্বাগ্রে খুঁজে বের করতে হবে আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতার কারণ। আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনগ্রসরতার কারণ- অশিক্ষা-কুশিক্ষা, ধর্মান্ধ চিন্তা-চেতনা, কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িকতা, আমাদের ঐতিহ্য-ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক, সর্বোপরি আমাদের আত্মপরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির যে তৎপরতা তা প্রতিরোধে নতুন বছরে দেখতে চাই সাংস্কৃতিক জাগরণ। একটি জাতির সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবস্থা হলো তার মূল্যবোধ, চিন্তা, চেতনা, যুক্তিবোধ ও বিশ্বাস। আশা করি সেই বিশ্বাস যারা ধ্বংস করতে চায় তার বিপক্ষে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের বছর হবে এটি। সামগ্রিকভাবে মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদের যে অবস্থা চলছে তা আমাদের সাংস্কৃতিক সংকট। আর্থ-সামাজিক বিষয়গুলো হলো সংস্কৃতির বস্তুগত দিক, যার সমাধান করতে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আন্দোলনের বিকল্প নেই। এ সংকট থেকে উত্তরণে আমাদের প্রয়োজন চিন্তার মুক্তি। চিন্তার মুক্তির অপরিহার্য পূর্বশর্ত হচ্ছে যুক্তিবাদ।

চিন্তার মুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ সৃষ্টি, সকল প্রকার কুসংস্কার-নিয়তিবাদ-অদৃষ্টবাদ-ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা প্রভৃতির বিপরীতে মুক্ত-চিন্তা ও যুক্তিবাদের বিকাশ বড় চাওয়া। কিন্তু তার জন্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির দেশব্যাপী নতুন করে জাগরণ সৃষ্টির প্রয়াস নিতে হবে। সংগঠিত হয়ে না দাঁড়ালে, অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চর্চার দিকে এগুতে না পারলে পশ্চাৎপদতার এ অচলায়তন ভাঙা সম্ভব হবে না। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে মধ্যযুগীয় ধর্মীয়গোষ্ঠীর জেগে ওঠাকে মোকাবেলা করা জন্য অপরিহার্য একটি আপোষহীন মনস্তাত্ত্বিক লড়াই, যা সম্ভব হবে একটি নিরবচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের মাধ্যমে। নতুন বছরে যাত্রা শুরু হোক তারই। তবেই হবে মানুষের শুভবুদ্ধির জাগরণ।

লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ