behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

প্রেম

তসলিমা নাসরিন১১:০৮, জানুয়ারি ০৩, ২০১৬

তসলিমা নাসরিনভালোবাসার সঙ্গে প্রেমের পার্থক্য খুব স্পষ্ট। ভালোবাসার ব্যাপ্তি অনেক বেশি। আমরা আমাদের বাবা-মা-ভাই-বোন-বন্ধু-বান্ধবীদের ভালোবাসি। আত্মীয় এবং স্বজনের মধ্যে এই ভালোবাসা গড়ে ওঠে দীর্ঘদিন একসঙ্গে বাস করা বা মেলামেশার কারণে। এই ভালোবাসায় শরীরী তৃষ্ণা নেই। কিন্তু হঠাৎ করে দু’জন মানুষের মধ্যে যে ভালোবাসা গড়ে ওঠে, সে ভালোবাসার মানুষকে কাছে পাওয়ার আকুলতা অনুভূত হয় শরীরে, সেই ভালোবাসা দ্রুত কিংবা ধীরে গড়িয়ে প্রেমে রূপান্তরিত হয়। কোনও ঈশ্বরপ্রেম বা প্রকৃতিপ্রেম নয়, নারী পুরুষের প্রেমের কথা বলছি, যৌনতা ছাড়া এই প্রেম সম্ভব নয়। যে যাই বলুক না কেন যে, প্রেমের সঙ্গে শরীরের সম্পর্ক নেই, প্রেম শুধু প্রেমই, প্রেম স্বর্গীয়। একসময় ঈশ্বরপ্রেমের মতো নারী-পুরুষের কামগন্ধহীন প্রেম শুরু হলেও বেশিদিন টিকে থাকেনি। প্রেমের কিন্তু বিবর্তন ঘটেছে, বিবর্তন প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকে, খালি চোখে একে দেখা যায় না। শতাব্দী গেলে নজর পড়ে। এখন প্রেম কেবল চুম্বনের জন্য আর একটু-আধটু শরীর স্পর্শের জন্য তুলে রাখা হয়  না। তো এই প্রেম-কোটেড যৌনতা-বটিকাটি আসলে কার জন্য? কার আনন্দ বা তৃপ্তির জন্য? পুরুষশাসিত এই সমাজে এই বটিকার স্বত্বাধিকারী যে পুরুষ, তাতে নিশ্চয়ই কারও সন্দেহ নেই। প্রেম এবং যৌনকর্মে পুরুষের ভূমিকাটি প্রধান, নারীর ভূমিকা নিতান্তই গৌণ।
সমাজে অবস্থান যার যেরকম। পুরুষ ওপরে, নারী নিচে। পুরুষ প্রেমের প্রস্তাব দেবে, পুরুষই উদ্যাগ নেবে যে-কোনও পদক্ষেপ রচনার, স্পর্শ, চুম্বন ইত্যাদি ইত্যাদি যা আছে পুরুষই করবে, নারী থাকবে আনত চোখে, লাজরাঙা মুখে, আড়ষ্টতায় আচ্ছন্ন হয়ে। যৌনতার বেলাতেও একই, পুরুষ পরিচালক এবং প্রধান অভিনেতা, নারী পার্শ্বচরিত্রে। পুরুষ সক্রিয়, নারী নিষ্ক্রিয়। নারী যে নিষ্ক্রিয়, তার কারণ কিন্তু নারী নয়। পুরুষ। পুরুষ বেদ-বাইবেল-কোরান রচনা করে, সমাজের নীতিনিয়ম তৈরি করে নিজেরা প্রভু সেজে বহুকাল বসে আছে। প্রভু পুরুষ যেভাবে চায়, সেভাবেই সমাজের সব নিয়ম চলে, এটিও চলে। নারী হচ্ছে পুরুষের খিদে-তৃষ্ণা মেটাবার বস্তু, সুখ জোগাবার যন্ত্র। কামপ্রকাশে বা যৌন আচরণে সক্রিয় হলে নারীকে বেশরম বা বাজারের বেশ্যা বলে গালি দিতে দ্বিধা করে না কোনও পুরুষই। আসলে যৌনশিক্ষায় নারী অপটু হলে পুরুষ খুব আহ্লাদিত হয়। অপটু হলে নিজের পটুত্ব দেখিয়ে একধরনের পুলক অনুভব করে, আবার নারীটি তার হাতের মুঠোর মধ্যেই আছে ভেবে পুলকিত হয়। নারীর শরীরের ওপর সবচেয়ে কম অধিকার নারীর। শরীর সম্পর্কে নারী যত কম জানে, কম বোঝে, তত তাদের শরীরটির মালিকানা আদায় করতে পুরুষের সুবিধে। সতীসাধ্বী নারী নিয়ে আনন্দ পুরুষের। পুরুষকে সুখী করার জন্য, খুশি করার জন্য জীবন নারীর। বেশির ভাগ নারীই জানে না যৌনতা আসলে নারীকে আদৌ কোনও তৃপ্তি দেয় কি না। সঙ্গমের শীর্ষসুখ কী—অনেক নারীর সারাজীবন জানাই হয় না। দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য প্রকট, তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রেমের ক্ষেত্রেও বৈষম্য প্রকট হতে বাধ্য। যৌথ জীবনের আর সব কিছুর মতো প্রেম এবং যৌনসম্পর্কেও যদি নারী-পুরুষের বৈষম্য থাকে তবে সেই প্রেম তো নয়ই, যৌনসম্পর্কও সত্যিকার যৌনসম্পর্ক নয়, নিতান্তই ধর্ষণ।

নারীকে দমিত করার যত অস্ত্র পুরুষের আছে, সবচেয়ে ধারালো অস্ত্রের নাম প্রেম। এই প্রেম দিয়েই যে-কোনও নারীকে পুরুষেরা কাবু করতে পারে, এই অস্ত্রই শিক্ষিত, সচেতন, স্বনির্ভর, শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ানো যেকোনও নারীর মেরুদণ্ড ভেঙে গুঁড়ো করার জন্য যথেষ্ট। নারীর শেষ শক্তি যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে, সেটিও হরণ করা যায় এটি দিয়ে। এই অস্ত্র দিয়েই হাতের মুঠোয় নিয়ে নেওয়া যায় নারীর হৃদয় আর শরীর, দুটোই। কোনও সভ্য দেশে, যেখানে নারীর সমানাধিকার বিরাজ করছে, সেখানে নারী-পুরুষের সম্পর্কের মধ্যে কোনওরকম বৈষম্য উঁকি দেয় না। কেউ কাউকে নিজের সম্পত্তি করে না, ব্যক্তিস্বাধীনতার মূল্য সেখানে সবচেয়ে বেশি। প্রেম কখনও কোনও কারাগার নয়। কোনও শেকল নয় হৃদয়ে আর শরীরে জড়াবার। প্রেম আনন্দের জন্য, মুক্তির জন্য। আমার বিশ্বাস, যতদিন না নারী মানুষ হিসেবে তার পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করছে, ততদিন প্রেম কেবল পুরুষের নিজস্ব সম্পত্তি হয়েই থাকবে, অস্ত্র হয়েই থাকবে প্রেম, মঞ্চ একাই অধিকার করে নেবে তারা, মূল চরিত্র তারা আর নারী পার্শ্বচরিত্রেই ফিক্সড।

তবে নতুন প্রজন্মের, যদিও অল্প সংখ্যক, তরুণীর মধ্যে সচেতনতার স্ফুলিঙ্গ দেখছি,তারাও যে ইচ্ছে করলে বেশ সাহসী এবং বেপরোয়াভাবে তরী ভাসাতে পারে উজানে, তা প্রমাণ করছে। পতিব্রতা হওয়ার সংস্কার তারা পুড়িয়ে-উড়িয়ে-ভাসিয়ে-ডুবিয়ে দিয়েছে বলতে গেলে। বিয়ের আগের কুমারিত্ব, বিয়ের পরের সতীত্ব, মাতৃত্ব ইত্যাদির প্রাচীন প্রাচীন গন্ধ নাকে লাগছে, নাক সিটকে শরীরকে বহু বছরের শেকল থেকে মুক্ত করছে।

একটা সময় ছিল, যখন ঘাড় ধরে বাচ্চা-মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হত ঘাটের মড়ার সঙ্গে। সেই সময় গেছে, বাল্যবিবাহের কালো অধ্যায় শেষ হওয়ার পর সাদা কোনও কিছুর উদ্ভব ঘটেছে তা নয়। এখনও শিশু কিশোরদের ‘পিতা মাতা যাহা বলিবে তাহা পালন করিতে’ বাধ্য করা হয়। ঘাড় ধরে বিয়ে না দেওয়া হলেও  ঘাড় ধরে সরিয়ে দেওয়া হয় বড়দের আলোচনা থেকে। প্রেম এবং যৌনতাকে বালক-বালিকাদের ত্রিসীমানা থেকে সরিয়ে রেখে সমাজের জ্ঞানীগুণীরা তাদের নিষ্পাপ রাখার চমৎকার ব্যবস্থা করেছেন ভেবে তৃপ্তি পান। যৌনতা সম্পর্কে বালক-বালিকাদের ঘুম হারাম করা কৌতূহল মেটানোর কোনও ব্যবস্থা নেই কোথাও। ইস্কুলের পাঠ্য বইয়ে যৌনশিক্ষা কি অবশ্যপাঠ্য করা উচিত নয়! উচিত। যতদিন না করা হবে, ততদিন তারা নিষিদ্ধ জিনিসের কৌতূহলে, আকর্ষণে, মোহে দিকবেদিক ছোটাছুটি করে অজ্ঞানতার ডোবায় পড়ে খাবি খেতে থাকবে। তার চেয়ে জানিয়ে দাও না নারী কী, পুরুষ কী, গোপন কথাটি জানিয়ে দাও প্রজননতন্ত্রের, কী করে সন্তান উৎপাদন হয়, বীর্য কী, শুক্রাণু কী, কী করে ডিম্বের খোঁজে লক্ষ লক্ষ শুক্রাণু জরায়ু জুড়ে গোল্লাছুট খেলে! যৌনসংসর্গের নিরাপদ দিক সম্পর্কে জেনে নিলে বিপদের কাদায় পা পিছলে পড়া থেকে বিরত থাকতে পারে অল্পবয়সী  ছেলেমেয়ে। কতদিন পর্যন্ত সন্তানদের গলায় দড়ি বেঁধে দড়িটি নিজের হাতে রাখতে চায় অভিভাবকরা, ঠিক কত বয়স হলে নিষেধের বেড়া ডিঙোবার স্বাধীনতা তারা দিতে চায় বালক-বালিকাদের, তা জানতে চেয়ে উত্তর যা পেয়েছি তা হলো, বালকের বেলায় কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই, বালিকার বেলায় আছে। বালিকাকে, সম্ভব হলে, আজীবন আগলে রাখবে তারা। বালিকা ঘরে বন্দি হয়ে থাকবে, সময় হলে কেবল বিয়ের পিঁড়িতে বসবে।  

কিন্তু দিন দিন অনেক মেয়েরই সময় হলেও বিয়ের পিঁড়িতে বসা হচ্ছে না। হচ্ছে না মানে তারা বসছে না। একসময় বলা হত, মেয়েরা কুড়িতেই বুড়ি হয়ে যায়। এই ধারণার পাথরকে ঠেলে সরিয়ে তিরিশোর্ধ্ব যুবতীরা দিব্যি নো চিন্তা ডু ফুর্তি বলে লেখাপড়া, চাকরিবাকরি, ব্যবসা বাণিজ্যে মনপ্রাণ ঢেলে দিচ্ছে। নিজের দক্ষতা এবং মেধার জোরে নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে, নিজের সম্মানরক্ষা করছে। বয়স হয়েছে অথচ বিয়ে হচ্ছে না বলে কোনও হাপিত্যেশ নেই। যে-কোনও পুরুষ পেলেই বিয়েতে রাজি হয়ে যাচ্ছে না। আত্মীয়রা পাত্র ধরে নিয়ে আসবে আর পাত্রটির আগাপাশতলা না জেনেই মেয়ে রাজি হয়ে যাবে, নৈব নৈব চ। আগে জানতে হবে, শুনতে হবে, তারপর তো বিয়ে! প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন, ‘তোমাদের আগে প্রেম, পরে বিবাহ’। তোমাদের বলতে পশ্চিমিদের। বেঁচে থাকলে তিনি নিশ্চয়ই এখন বলতেন, ‘তোমাদের আগে যৌনসম্পর্ক, পরে প্রেম।’ কিন্তু প্রমথ চৌধুরীর তোমাদের এখন আর কেবল তোমাদের নেই, আমাদেরও হয়ে গেছে। শহুরে শিক্ষিতদের মধ্যে প্রেম করে বিয়ে করা চালু হয়েছে খুব বেশিদিন আগে নয়। তবু বিয়ে মানে এখনও বেশির ভাগের কাছে বিধির নিবন্ধ, মা বাবার মর্জিনির্ভর। খবরের কাগজ, প্রজাপতি অফিস, কম্পিউটারে পাত্রপাত্রী চাই বিভাগ ঘটকের দায়িত্ব নিয়েছে। তার মানে এটা করে কনে দেখা, দরদস্তুর, সব শেষে বলতে গেলে ব্যক্তিগতভাবে সম্পূর্ণ অচেনা দু’জনের বিয়ে। বনিবনা না হলে স্বামীকে ত্যাগ করছে। বনিবনা হলেও মাতৃত্বের ঝামেলা পোহাতে চাইছে না। এই মেয়েরা পাছে লোকে কিছু বলবে বলে মোটেও গুটিয়ে রাখছে না নিজেদের, কুঁকড়ে যাচ্ছে না সংকোচে, নিজেদের ইচ্ছের শরীরে পেট্রোল ঢেলে দাউদাউ আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে না, গলায় ফাঁস পরিয়ে নিজেদের স্বপ্নগুলো ঝুলিয়ে দিচ্ছে না কড়িকাঠে। প্রেম করছে, কিন্তু প্রেম করলেই যে বিয়ে করতে হবে, তার কোনও মানে দেখছে না। প্রেম হওয়া মানেই যে প্রেমকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হবে যেন তেন প্রকারে, তারও যুক্তি দেখছে না। প্রেমিকের সঙ্গে গভীর আবেগে শরীর মেলাতেও কোনওরকম দ্বিধা করছে না। যৌনসম্পর্কের কারণে শরীর দূষিত হয়ে উঠবে এমন কোনও গ্লানিতে তারা ভুগছে না। প্রেমিকের আচার-ব্যবহার পছন্দ না হলে কেঁদেকেটে তারা তাদের পূর্বনারীদের মতো নাওয়া-খাওয়া বাদ দিচ্ছে না, আত্মহত্যা করছে না, বরং প্রেমিককে টা-টা বাই-বাই বলে বিদায় দিচ্ছে। আবার নতুন করে কারও সঙ্গে প্রেম হচ্ছে। প্রেমে মানুষ একবারই পড়ে, প্রথম যে প্রেমটি হয়, সে প্রেমটিই আসল প্রেম, এর পরের প্রেম আর প্রেম নয়- এই আজগুবি কথাও ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে আস্তাকুঁড়ে। প্রেমে মানুষ যে-কোনও বয়সে পড়তে পারে, পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর, আশিতেও। শতবার প্রেম হতে পারে, এক প্রেমের বোঝাই সারাজীবন বয়ে বেড়াতে যে হবে, সে কোনও কথা নয়, প্রেম ক্ষণস্থায়ী হলেও হতে পারে সুন্দর, আবার দীর্ঘস্থায়ী প্রেমও কিন্তু হতে পারে একঘেয়ে।

লেখক: কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ