behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

পাঠ্যবই এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা

ড. সীনা আক্তার১২:৫৯, জানুয়ারি ০৫, ২০১৬

ড. সীনা আক্তারশিশুদের হাতে নতুন শ্রেণির নতুন বই এবং চোখেমুখে আনন্দ উচ্ছ্বাস, মন প্রশান্তি করা এক দৃশ্য! শিক্ষা প্রসারে বিনামূল্যে বই বিতরণ চমৎকার একটি কার্যক্রম এবং এর সফলতা অর্জন উল্লেখযোগ্য। কিন্তু শিক্ষার মান নিয়ে সচেতন সবাই উদ্বিগ্ন। যেমন, ক’দিন আগে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা শিক্ষা-ব্যবস্থার মান নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। এমনকি স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিশ্বমানের শিক্ষা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বলাবাহুল্য, ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতে এবং সমাজ-সংস্কৃতিতে।
মানসম্পন্ন শিক্ষার অভাবে আমাদের প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না, এতে দেশ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কিছুদিন আগে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে জানা গেছে, আমাদের দেশের বিভিন্ন খাতে কাজ করে বিদেশিরা বেতন-ভাতা বাবদ প্রতিবছর ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার নিয়ে যাচ্ছেন, যা ৩২ হাজার কোটি টাকার সমান (প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসেবে)। এছাড়া, সঠিক শিক্ষার অভাবে নৈতিক মূল্যবোধের অভাব, সামাজিক যোগ্যতা-দক্ষতার অভাব, সামাজিক হানাহানি, পরস্পরের প্রতি অসম্মান, অসহিষ্ণুতা সৃষ্টি হয় বা হচ্ছে। এ অবস্থা উত্তরণে প্রাথমিক পর্যায়ে মানসম্পন্ন  শিক্ষা নিশ্চিত করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রাথমিকে সঠিক শিক্ষা শিশুদের পরবর্তী শিক্ষার ভিত্তি তৈরি করে এবং সার্বিক উন্নয়নের জন্য তাদের প্রস্তুত করে। শিক্ষাগ্রহণে সময়মত পাঠ্যবই প্রাপ্যতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে মানসম্পন্ন শিক্ষায় পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়ার সুযোগ, বইয়ের বিষয়বস্তু এবং শিক্ষাদান পদ্ধতি (teaching methods) অধিক গুরুত্বপূর্ণ। স্বভাবগতভাবেই শিশুরা কৌতুহলী, সেজন্য তাদের জ্ঞানার্জনকে গণ্ডির ভেতর নিয়ে আসা উচিত নয় বরং জ্ঞানের দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া দরকার। আমাদের দেশে অধিকাংশ অভিভাবকের বাড়তি বই কেনার সামর্থ্য নেই। তাছাড়া অধিকাংশ অভিভাবক পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়াকে মূল্যহীন হিসেবেই দেখেন। ফলে শিশুদের নিজ পাঠ্য বইয়ের বাইরে জানার-শেখার-কল্পনা করার সক্ষমতা তৈরি হয় না। নির্দিষ্ট কিছু পাঠ্যবই পড়ে, মুখস্থ করে এবং পরীক্ষার খাতায় লিখে হয়তো ভাল ফল করা যায় কিন্তু তা জ্ঞানের মহাসাগরে অতি ক্ষুদ্র ঢিলের সমতুল্য।
গত কয়েক বছর থেকে সরকার প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের নতুন বই দিচ্ছে। আমার কৌতুহল এক বছর পর বিতরণ করা সেই বইগুলোর কী হয়! ওগুলো কী ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়, না কী নষ্ট হয়ে যায়! ওগুলো কী সংরক্ষণ করা হয়?

তবে এক বই তিন বছর ব্যবহার করা যায়। শিক্ষা বিভাগে কর্মসূত্রে দেখি যুক্তরাজ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, মানে নার্সারি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই কিনতে হয় না। এমনকি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বই না কিনলেও চলে। সরকার থেকে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বই দেওয়াও হয় না। তবে স্কুলে শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত বইয়ের ব্যবস্থা থাকে। প্রাথমিক স্কুলে একজন শিক্ষার্থীর পড়ার উপযোগী বই তার নিজের শ্রেণিকক্ষে মজুত থাকে, যেমন: সাহিত্য, বিজ্ঞান, অংক সহ বিভিন্ন বিষয়ের বই। বাচ্চারা নির্দিষ্ট সময়ে সে বই নাড়া চাড়া করে, পড়ে, চাইলে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারে পড়ার জন্য এবং পড়া শেষে স্কুলে ফেরত দিতে হয়।

শ্রেণিকক্ষ ছাড়া স্কুলের লাইব্রেরিতেও নানা বিষয়ে বই আছে। শিক্ষার অংশ হিসেবে শিশুদের লাইব্রেরির বই পড়তে হয় বাড়িতে। বই, বইয়ের ছবি, বিষয় বা গল্প দেখে শিশুরা বই পছন্দ করে বাড়িতে নিয়ে যায়। বয়স এবং শ্রেণিভেদে শিশুদের পড়া বই থেকে বিষয়বস্তু ক্লাসে সবার সামনে বলতে হয়; বইয়ের সারাংশ বলতে এবং লিখতে হয়;  বই পড়ে কেমন মনে হয়েছে এবং কেন, তা বলতে ও লিখতে হয়। প্রত্যেক শিশুর মেধা ও আগ্রহ স্বতন্ত্র এবং সে অনুযায়ীই সে শিক্ষাগ্রহণ করে। শিক্ষকরা এতে উৎসাহিত ও সহযোগিতা করে, কর্তৃত্ব করে না। এই প্রক্রিয়ায় একজন শিশু নিজের পছন্দমত অনেক বই পড়তে পারে। এছাড়া শেখে বই ভাগাভাগি করে পড়তে, বই যত্ন করতে কারণ শিশুদের শেখানো হয় শ্রেণিকক্ষের বইগুলো গুছিয়ে রাখতে। শ্রেণিকক্ষে আরও থাকে না-না শিক্ষা উপকরণ যেমন- খাতা, পেন্সিল, রঙ পেন্সিল, রঙ ইত্যাদি।

আমাদের সময়ে বিনামূল্যে বইয়ের ব্যবস্থা ছিল না কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই দেওয়া-নেওয়ার প্রচলন ছিল। এই ব্যবস্থাটা সাধারণত চলতো শিক্ষার্থীদের মধ্যে, ছোটরা বই চাইছে বড়দের কাছে।  বছরের শেষের দিকে ছোটদের কেউ না কেউ আমার বইগুলো পাওয়ার জন্য অগ্রীম বলে রাখতো। আমার অতি যত্নে ব্যবহার করা বইগুলো পরের বছর কে ব্যবহার করছে তা জেনে আমিও খুশি হতাম। আমিও কোনও এক শ্রেণিতে আমার এক আত্মীয়ের বই পেয়েছিলাম নতুন শ্রেণির জন্য। নতুন বা পুরোনো যাই হোক নতুন বর্ষে নতুন শ্রেণির বই সবসময়ই ছিল বিশেষ কিছু। আমরা ক্যালেন্ডারের চকচকে পাতা দিয়ে বই এ মলাট দিতাম। মলাট পুরোনো হলে নতুন মলাট। ফলে বই পুরোনো হলেও দেখতে নতুনের মতোই দেখাতো এবং এক সেট বই ঘুরে-ঘুরে অন্তত তিনজন ব্যবহার করতে পারতো। এতে পরস্পরের প্রতি এক ধরনের আস্থা, দায়িত্বশীলতা এবং সহানুভূতিপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হতো, যা আমাদের সামাজিক দক্ষতা অর্জনে সহায়ক ছিল।

মানবসম্পদ তৈরির আরেক অন্তরায় বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়া। শিক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে জানা যায়, ‘৯ থেকে ১০ শতাংশ শিশুরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যায় না। বাকিরা স্কুলে গেলেও ৪৮ শতাংশ শিশু পঞ্চম শ্রেণির আগেই ঝরে পড়ে। বাকিদের মধ্যে এসএসসির আগে ৪২ শতাংশ ঝরে যায়’। আমার মতে এই ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ দুর্বল শিক্ষাদান পদ্ধতি। শিশুদের কাছে শিক্ষাগ্রহণকে আনন্দের এবং উপভোগ্য করলে ঝরেপড়া কমানো সম্ভব।

বিষয়টা আরও পরিষ্কার করার জন্য শিক্ষাপ্রদান পদ্ধতির একটা তুলনামূলক উদাহরণ দিচ্ছি। যেমন: বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে আমি নবম শ্রেণিতে প্রজাপতির জীবনচক্র পড়েছিলাম। আমাদের বিজ্ঞান বইয়ে বৃত্তাকারে সেই জীবনচক্রের একটা ছবি ছিল এবং সেই ছবি ব্যবহারিক খাতায় এঁকে পরীক্ষায় জমা দিতে হতো, ব্যবহারিক শিক্ষা ওই পর্যন্তই ছিল। কিন্তু বিদেশে শিশুরা এই প্রজাপতির জীবনচক্রটি দেখে, শিখে তাদের প্রথম শ্রেণিতেই- নার্সারিতে। এর জন্য তেমন অর্থব্যয় করতে হয় না।

যেমন: ক্লাসের মধ্যে ছোট অ্যাকুরিয়ামের মতো একটা কাচের বক্স। সেই বক্সের অর্ধেকটায় মাটি, তার ওপর কিছু ঘাস এবং পাতা সহ গাছের ডাল। এর ভেতরে আছে কয়েকটা শুঁয়োপোকা। শুঁয়োপোকাগুলো ঘাস-পাতা খায়, ঘুরে বেড়ায়, বিশ্রাম নেয়, মল ত্যাগ করে এবং বাচ্চারা তা দিনের পর দিন দেখে। পাশাপাশি বাচ্চারা শুঁয়োপোকার গল্প শুনে, ছড়া শোনে, শেখে এবং এদের প্রজাপতি হয়ে ওঠার অপেক্ষায় থাকে। বিস্ময়ের সাথে শিশুরা দেখে একদিন শুঁয়োপোকা প্রজাপতি হয়ে উড়ে যায়।

শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাঠ্য বইয়ের ব্যবস্থা করা শিক্ষার প্রথম শর্ত যা সরকার সফলতার সঙ্গেই পালন করছে কিন্তু এতে আত্মতুষ্ট হওয়ার কিছু নেই, কারণ মানসম্পন্ন শিক্ষা অর্জনে আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে। প্রতিটা শিশুর জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে পাঠ্যবইয়ের বাইরে বইসহ শিক্ষার অন্যান্য উপকরণের সহজলভ্যতা এবং শিক্ষাদান পদ্ধতিতে আমুল সংস্কার অত্যাবশ্যক।

লেখক: সমাজবিদ, যুক্তরাজ্য।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ