behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

বিচারের সাফল্য এবং...

গোলাম মোর্তোজা১৫:০৭, জানুয়ারি ০৬, ২০১৬

গোলাম মোর্তোজাপৃথিবীতে আর কোনও দেশের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার নিয়ে এত আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছিল বলে জানা যায়নি। জানা যায় না, সব মুক্তিযোদ্ধাদের ‘আম্মাকে’ সরকারি দমন পীড়নের কথাও। একটি হত্যাকাণ্ডেরও বিচার হয়, হওয়ার কথা। সেখানে শত শত মানুষ সরাসরি হত্যা এবং ৩০ লাখ মানুষ হত্যার পেছনে ভূমিকা রাখার দায়ে অপরাধীদের বিচার হবে, তা নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হবে কেন? এত আলোচনা, যুক্তি-তর্কই বা দিতে হবে কেন?
বেদনাদায়ক হলেও সত্যি যে, এখনও যুক্তি-তর্ক, আলোচনা করে বারবার প্রমাণ করতে হচ্ছে তারা অপরাধী। বিচারের দীর্ঘসূত্রিতায় চাপা পড়ে যাচ্ছে অনেক জনসম্পৃক্ত বিষয়।

মানবতাবিরোধী বিচারের প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

১. যারা বলেন, আমরাও বিচার চাই তবে তা ‘স্বচ্ছ’ এবং ‘আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন’ হতে হবে, তাদের জন্যে আগেও বলেছি আবারও বলছি।  ‘স্বচ্ছ’ এবং ‘আন্তর্জাতিক মান’ মানে কী? এই শব্দ দুটি কোনও বায়বীয় শব্দ নয়।
‘স্বচ্ছ’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে যে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে তা যথাযথভাবে, দৃশ্যমানভাবে, যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা গেল কি না। অপরাধীরা যে অপরাধ করেছিল, তার প্রমাণ তাদের পত্রিকা ‘সংগ্রাম’-এ রয়ে গেছে।  প্রতিটি অভিযোগ দৃশ্যমানভাবে আদালতে উভয়পক্ষের উপস্থিতিতে যুক্তি-তথ্য প্রমাণসহ তুলে ধরা হয়েছে। আগামী পক্ষ প্রতিটি অভিযোগ যুক্তি দিয়ে মিথ্যা প্রমাণ করতে চেয়েছে। তা করেছে দীর্ঘ সময় নিয়ে। মনে রাখা দরকার, নিজামীর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ২০১০ সালে, এটা ২০১৬ সাল। এত সময় নিয়ে আত্মপক্ষসমর্থন করেছে নিজামী। অন্যান্য অপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রেও একই কথা। সুতরাং পুরো প্রক্রিয়াটি যে ‘স্বচ্ছ’ হয়েছে তাতে কোনও সন্দেহ থাকার সামান্যতম কারণও নেই।

এবার আসি ‘আন্তর্জাতিক মান’ প্রসঙ্গে। ১৯৭৩ সালে করা যে আইন সংশোধন করে, যুগোপযোগী করে বিচার করা হচ্ছে তা মানসম্পন্ন কিনা, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কিনা? বিচার প্রক্রিয়ার প্রথম দিকে আইনের কিছু বিষয় নিয়ে দেশ-বিদেশের কেউ কেউ কিছু কথা বলেছেন। বাংলাদেশ সেসব কথা আমলে নিয়ে তা সংশোধন-পরিমার্জন করেছে। পরবর্তীকালে আর কেউ এই আইনের ‘মান’ বা আন্তর্জাতিক মান’ নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। আমেরিকা, ইউরোপের দেশগুলো এই আইনের ‘মান’ মেনে নিয়েছে। এখনও যারা কথা বলছেন, টমি ক্যাডম্যানসহ তারা নিজামীদের পক্ষের লবিষ্ট। তারা কথা বলছেন অর্থের বিনিময়ে। ফলে এদের কথার গুরুত্ব নেই। সর্বোপরি এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় দেশের বেশির ভাগ মানুষের মতামতের প্রতিফলন ঘটেছে।

ফলে নির্দ্বিধায় বলা যায়, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার ‘স্বচ্ছ’ এবং আন্তর্জাতিক মান’ নিশ্চিত করেই হচ্ছে।

২. যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে বারবার আলোচনায় আসে ন্যুরেমবার্গ এবং টোকিও ট্রায়ালের দৃষ্টান্ত। পৃথিবীর ইতিহাসে যত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ট্রাইব্যুনাল হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করে

বোঝা যায়, বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল সবচেয়ে ‘স্বচ্ছ’ এবং ‘আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন’।  কারণ এই ট্রাইব্যুনালই আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সর্বোচ্চ সুযোগ দিয়েছে, বিচারের সর্বশেষ ধাপ আপিল, রিভিউ এবং রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগসহ। আগামীতে পৃথিবীর যে কোনো দেশে যখন মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের ট্রাইব্যুনাল গঠিত হবে, বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে আসবে।

৩. আমার ধারণা দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসে, বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনালের কিছুটা সমালোচনার মুখে পড়ার সম্ভাবনা থাকবে। কারণ এই ট্রাইব্যুনাল অনেক বেশি সময় নিয়ে বিচার করছে। অপরাধীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ অনেক বেশি দিয়েছে। ২০১০ সালে শুরু হওয়া বিচার শেষ হচ্ছে ২০১৬ সালে! রিভিউ, রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগের পর রায় কার্যকর হতে আরও কিছুদিন সময় লেগে যাবে। বর্তমান এবং আগামী পৃথিবীর কোনো দেশের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে এত সময় দেওয়ার মতো সময় নেই, থাকবে না। তাদের আরও অনেক জনগুরুত্বপূর্ণ সম্পন্ন কাজ আছে, থাকবে।

তারা অপরাধীর বিচার করতে চাইবে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে। সেক্ষেত্রে বাধ সাধবে বাংলাদেশের বিচারের দৃষ্টান্ত। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের দৃষ্টান্তঅনুসরণ করেই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। বিচারহীনতার এই বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। রাজনৈতিক বিবেচনায় এখন অনেকে তা স্বীকার করতে চাইবেন না। তবে ভবিষ্যতে স্বীকার করতেই হবে।

৪. কোনো বিচারিক প্রক্রিয়াই এত দীর্ঘ সময় নিয়ে সম্পন্ন হওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশের ক্ষেত্রে তা বেশি বিবেচিত হওয়া উচিত। কারণ আমাদের সরকার এই বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন যত জনবিরোধী কর্মকাণ্ড, অন্যায়-অনিয়ম-দুর্নীতি, তা এই বিচারের দোহাই দিয়ে জায়েজ করে নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। দেশের মানুষ এই বিচার নিয়ে ব্যস্ত থাকে। জনস্বার্থবিরোধী কাজগুলো চাপা পড়ে যায়।

৫. মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সরকারের দৃঢ়তার প্রশংসা করতেই হবে। কিন্তু এই বিচার করছে বলে অন্য অন্যায়গুলো জায়েজ হয়ে যেতে পারে না। বিচারের দীর্ঘসূত্রতার জন্যে গণমাধ্যম বা জনমানুষ অন্য অনিয়মগুলোর দিকে ততটা নজর দিতে পারে না। যেমন দেশ থেকে এক বছরে পাচার হয়ে গেল কমপক্ষে ৭৬ হাজার কোটি টাকা। ১০ হাজার কোটি টাকার পদ্মাসেতু বারবার বাজেট বাড়িয়ে ২৮ হাজার কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়া হলো। আগামীতে খরচ আরও বাড়ানো হবে। চার লেন সড়ক, ফ্লাইওভারগুলোর খরচ একেকবার কয়েকশ কোটি টাকা করে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। প্রায় ছয়শ কোটি টাকার হাতিরঝিল প্রকল্পে ইতিমধ্যে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়ে গেছে।

আরও কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই যে বাজেট বাড়ানো, অর্থের লুটপাট, এসব তো জনগণেরই অর্থ। পাচার হওয়া টাকা তো এদেশের জনগণের। বিষয়গুলো জনমানুষের আলোচনায় থাকছে না, আলোচনায় থাকছে নিজামীদের বিচার। বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা গেলে, অন্য বিষয়গুলোর দিকে জনদৃষ্টি থাকত। সরকার কিছুটা চাপ অন্তত অনুভব করত।

৬. মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের সাফল্যের আড়ালে, ব্যাংক থেকে ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা লুটের বিষয় চাপা পড়ে গেছে। চাপা পড়ে গেছে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি। চাপা দিয়ে রাখা হচ্ছে ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর ‘রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র’ প্রসঙ্গ। কোনও আলোচনাই হচ্ছে না বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্যে হুমকিস্বরূপ ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র’ নিয়ে।

এত কম নিরাপত্তায় পৃথিবীর কোনও দেশে ভয়ঙ্কর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হয়নি।

৭. বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার চুক্তি, অস্ত্র কেনার চুক্তি করছে- কিন্তু এ নিয়ে তেমন কোনও আলোচনা-পর্যালোচনা হচ্ছে না। দেশীয় বিশেষজ্ঞদের মতামত এসব ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উপেক্ষিত থাকছে। ১২০ ডলারের তেল ৩০ ডলারে কিনেও জনগণের কাছে পূর্বের দামেই বিক্রি করা হচ্ছে। দুর্নীতির মাধ্যমে এসব খাত থেকে অর্জিত অর্থ চলে যাচ্ছে অল্প কিছুসংখ্যক মানুষের পকেটে। ভিওআইপির মাধ্যমে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা লুট হয়ে যাচ্ছে। কোনও প্রতিরোধ হচ্ছে না। সবকিছু ছাপিয়ে বারবার আলোচনায় আসছে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের সাফল্যের প্রসঙ্গ। সরকার এই সুযোগ ভালোমতোই গ্রহণ করছে।

৮. সবকিছু মিলিয়ে বলতে চাই, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে সম্পন্ন হওয়া উচিত। অজানা সময় পর্যন্ত চলা উচিত নয়। বাংলাদেশ এখন তার ‘স্বর্ণযুগ’ পার করছে। কর্মক্ষম জনসংখ্যা এখনই সবচেয়ে বেশি। আগামী বিশ-পঁচিশ বছর পর যা থাকবে না। অর্থনীতি এখন একটা শক্ত ভিত্তির উপর আছে।  এখন আমাদের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

তিনটি পদ্মাসেতুর অর্থ আমরা একটি পদ্মাসেতুর পেছনে ব্যয় করছি- এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এর জন্যে সরকারের ওপর গণমাধ্যম এবং জনমানুষের চাপ তৈরি করা দরকার। বড় বিরোধী দল বিএনপির এক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু অদ্ভুত কারণে তারা জামায়াতের দায় নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে ‘যদি’ ‘কিন্তু’ ‘তবে’- নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকছে।

৯. মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে ‘স্বচ্ছ’ ‘আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন’- এসব অহেতুক বিষয় নিয়ে তর্ক করার সময় এখন বাংলাদেশের হাতে নেই। থাকা উচিত নয। বিচার নিয়ে ছোটখাটো কিছু বিচ্যুতি আছে। যেমন সাকার রায় ফাঁস, স্কাইপ বিতর্ক, সাঈদীর একজন সাক্ষী নিয়ে বিতর্ক না হলে ভালো হতো। তবে এসবের কোনও কিছুতেই অপরাধীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

এখন সময় রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জনের। সামনে এগিয়ে যাওয়ার। সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় এখন। এখন সময় সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার। অহেতুক প্রসঙ্গ নিয়ে সময় নষ্ট করার সময় এখন নয়। বিএনপিকে বিষয়টি বুঝতে হবে। তাহলেই সরকারকে চাপে রাখা যাবে, সঠিক পথে রাখা যাবে। বিএনপি যে দাবি আদায় করতে চায় ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ তা সঠিক পথে সরকারকে চাপে রেখেই আদায় করতে হবে।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ