behind the news
IPDC  ad on bangla Tribune
Vision  ad on bangla Tribune

গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে সৌদি মদদ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা১২:৪৮, জানুয়ারি ০৭, ২০১৬

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজামধ্যপ্রাচ্য আর উপসাগরজুড়ে উত্তেজনা। সৌদি আরব নিজে শুধু ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেনি, সঙ্গে নিয়েছে বাহরাইন আর সুদানকে। ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ককে কিছুটা নিচে নামিয়ে এনেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতও।
সৌদি আরব সম্প্রতি ৪৭ জনের শিরশ্ছেদ করেছে। এর মধ্যে আছেন শিয়া সম্প্রদায়ের নেতা শেখ নিমর আল নিমর। যা নিয়ে উত্তেজনা বাড়ে ইরান আর সৌদি আরবের মাঝে। তেহরানে সৌদি দূতাবাসে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। ইরান সরকার এর নিন্দা জানালে এরপর পরই সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছেদ করার ঘোষণা দেয়।
এটি এখনও পরিষ্কার নয় যে সৌদি আরবের চিন্তায় কী ছিল যখন আরও ৪৬ জনসহ শেখ নিমরের শিরশ্ছেদ করা হয়। কারণ একদিকে এতগুলো মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, অন্যদিকে ছিল ইয়েমেনে একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা।
শুধু কি ইরান শেখ নিমরে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেছিল? তা নয়। জাতিসংঘ মহাসিচব বান কি মুন আবেদন জানিয়েছিলেন শিরশ্ছেদ না করতে। আর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই পুরো বিচার প্রক্রিয়াকেই প্রহসন বলে উল্লেখ করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, সৌদি আরব কি এর মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে ধর্মীয় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব উসকে দিচ্ছে?  

সৌদি আরব কাজটি করেছে আঞ্চলিক রাজনীতিকে মাথায় রেখে। ইসরায়েলের মতো সৌদি রাজ পরিবার পরিচালিত সরকারও পশ্চিমাদের নিরংকুশ সমর্থন পেয়ে থাকে তাদের যেকোনও কর্মকাণ্ডে। ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা যেমন ইসরায়েলকে ক্ষুব্ধ রেখেছে, তেমনি বিক্ষুব্ধ সৌদি আরব। আর এমন এক প্রেক্ষাপট থেকেই আন্তর্জাতিক ময়দানে পা ফেলতে শুরু করেছে সৌদি আরব। হাতে আছে শিয়া-সুন্নি বিরোধের উপকরণ।

সিরিয়ায় যা ঘটেছে তা নিয়ে সৌদি আরব অসন্তুষ্ট। বিশেষ করে রাশিয়ার চাপে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের আপাতত ক্ষমতায় টিকে যাওয়াটা নিশ্চিত হওযার পর থেকে অসহিষ্ণু আচরণ করছে সৌদি আরব। অসহিষ্ণুতার আরেকটি কারণ সুন্নিবাদি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর এক সুরে কথা বলা।      

শেখ নিমরের অপরাধ তিনি আল সৌদ পরিবারের রাজতন্ত্র শাসিত সৌদি আরবে গণতন্ত্র চর্চার কথা বলেছিলেন। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেছেন কে সুন্নি আর কে শিয়া সে বিবেচনা তারা করেননি, তারা দেখেছেন কে বা কারা সন্ত্রাসী। কিন্তু শেখ নিমরের সন্ত্রাসী যোগাযোগের বা কর্মকাণ্ডের কোনও তথ্য তারা উপস্থাপিত করেননি। বাহরাইন সৌদিদের পক্ষে থাকছে, কারণ সেখানে সৌদি আরব শাসক গোষ্ঠীকে টিকিয়ে রাখতে সব ধরনের সাহায্য দিচ্ছে। 

সিরিয়ায় যুদ্ধ বন্ধ করতে কূটনৈতিক উদ্যোগের সবই যাবে আসাদের পক্ষে। অস্বস্তি তাই তুরষ্কে, কাতারে এবং সৌদি আরবে। রিয়াদ আর তেহরানের মধ্যকার নতুন এই উত্তেজনা নতুন করে রচনা করছে মধ্যপ্রাচ্য আর উপসাগরীয় রাজনীতি। সৌদিদের ইয়েমেন রাজনীতিও হালে তেমন একটা পানি পায়নি।

ইয়েমেনে আক্রমণ করেছে সৌদি আরব, কারণ হুতি বিদ্রোহীরাও শিয়াপন্থি। জাইদি শিয়া গোষ্ঠীর সমর্থনপুষ্ট হুতিদের সঙ্গে ইরানের যোগাযোগ অনেকটাই অস্পষ্ট। এখন পর্যন্ত ইয়েমেনে সৌদি সামরিক বাহিনীর যে শত শত বোমা ফেলা হয়েছে তাতে খুব কমই হুতি বিদ্রোহীর ক্ষতি হয়েছে। মারা গেছে এই গরিব দেশটির বেসামরিক নাগরিক। ঘর বাড়ি হারিয়েছে চরম দরিদ্র পরিবারগুলো।

সৌদি রাজতন্ত্র বরাবরই ইরান ও শিয়াবিরোধী সংস্কৃতিকে লালন করে। এ চর্চা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সৌদি আরবের ঘরেও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের আগুন লাগার আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশটির প্রায় ১৫ শতাংশ নাগরিকই শিয়া। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের বিস্তার ঘটতে থাকলে শুধু সৌদিরা নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই তা হবে বিপজ্জনক।

সৌদি আরবে বলতে গেলে সেই অর্থে অন্য কোনও শিল্প বাণিজ্য নেই। রাজ পরিবার প্রায় শতভাগ তেলের ওপর নির্ভরশীল। সিরিয়া সঙ্কটের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম পড়তে পড়তে তলানিতে ঠেকছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কিছুটা ভালোর দিকে। ধারণা করা হয়, আঞ্চলিক রাজনীতিতে রিয়াদের কর্তাব্যক্তিরা এক ধরনের হুমকি অনুভব করছেন। আর এসব কারণেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বকে পুঁজি করতে চাইছে সৌদি সরকার। তবে কাজটি কতটা বিবেচনা করে করা হচ্ছে তা নিয়ে সংশয় আছে। কারণ এ ধরনের দ্বন্দ্ব উসকে দিলে চরমপন্থিদেরই জয় হয়।

সৌদি রাজ পরিবারের ভেতরে নানা সমীকরণের কথা শোনা যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নায়েফ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না বলেই আওয়াজ আছে। ইয়েমেনের সঙ্গে যুদ্ধটিও সুখকর হয়নি। এমন অবস্থায় গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের সুর নতুন করে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে সৌদি রাজনীতিকে কোথায় নেয় দেখার বিষয়। 

নতুন বছর, ২০১৬ শুরু হলো মধ্যপ্রাচ্য আর উপসাগরীয় অঞ্চলে মুসলমানদের দু’টি প্রধান গোষ্ঠীর এই দ্বন্দ্ব দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া সুন্নি ছিল, কিন্তু প্রকাশ্য বিরোধ আর রক্তারক্তি শুরু হয় ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের পর। সৌদি আরব তখন থেকেই বিষয়টি নিয়ে খেলছে। প্রতিবেশী বাহরাইনের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়ারা সুন্নি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামলে সৌদি আরব তা দমাতে এগিয়ে যায়। সৌদি আরবের সংখ্যালঘু শিয়ারাও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছে।

নিজদেশে এবং আশে পাশে রাজনৈতিক সংস্কার ও গণতন্ত্রের যেকোনও দাবির ভেতর সৌদি আরব শিয়াদের ষড়যন্ত্র দেখতে পায়। দেখতে পায় তাতে ইরানের মদদ আছে।

ধীরে ধীরে সৌদি আরবে রাজতন্ত্রবিরোধী মনোভাব যতটা তীব্র হচ্ছে, সৌদি সরকারও ততটা শিয়াবিরোধী হয়ে উঠেছে, হয়ে উঠছে ইরানবিরোধী।

সংস্কারের নতুন আহ্বানের ব্যাপারে সৌদি কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন। এ কারণেই সৌদি আরবের আইএস-বিরোধী কণ্ঠ একদম ক্ষীণ। সেখানে ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিরা যখন শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী হামলা চালায় সৌদিদের কোনও আওয়াজ পাওয়া যায় না। অনেকটা আমাদের দেশের অনুভূতিওয়ালা মোল্লা গোষ্ঠীর মতো। সৌদি আরবের রাজ পরিবারের এখন শেষ দর্শন মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব উসকে দিয়ে নিজেদের টিকে থাকার চেষ্টা করা। শিয়া সুন্নির এই বৈশ্বিক বিরোধ আমাদের দেশের সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর জন্যও মজাদার উপকরণ। আমাদের বিপদটা সেখানেই।

 লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

IPDC  ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ