রওশনের মন্তব্য বনাম চাকরির বাজার

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১১:১০, জানুয়ারি ১০, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৬, জানুয়ারি ১৩, ২০১৬

আমীন আল রশীদ‘কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকায় দেশে সাংবাদিকের সংখ্যা বেড়ে গেছে।’ ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের এই বক্তব্যে স্বভাবতই সাংবাদিকরা নাখোশ হয়েছেন। সাংবাদিক হিসেবে আমিও তার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাই। কিন্তু মিসেস এরশাদের এই কথায় দেশের চাকরির বাজারের একটা ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে বলে মনে হয়।
আমাদের চাকরির বাজারে সঙ্কট প্রধানত দুটি। প্রথমত ভালো চাকরির সুযোগ কম। দ্বিতীয়ত সরকারি চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে অনেক বেশি  গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ঘুষ ও রাজনৈতিক তদবির। একটা সময় পর‌্যন্ত ঘুষ অথবা তদবির- দুটির যেকোনো একটি হলেই চলত। এখন দুটিই লাগে।
এ দুই সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে সরকারি চারকিতে অদ্ভুত কোটা পদ্ধতি। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল ধারায় নিয়ে আসতে কোটা পদ্ধতি থাকা হয়তো দোষের নয়। কিন্তু অর্ধেকেরও বেশি পদ যদি কোটার নামে চলে যায়, তখন মেধাবীদের প্রতিযোগিতার মাঠ অনেক সঙ্কুচিত হয়। আখেরে যা জন্ম দেয় বৈষম্যের। তাছাড়া এই কোটা পদ্ধতি আরও কত বছর বহাল থাকবে, সেটিও পরিস্কার নয়। অধিকাংশ মানুষই এ বিষয়ে কথাও বলতে ভয় পায়। কারণ এখানে স্পর্শকাতর কিছু বিষয় রয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে এর ফলে অনেক মেধাবী ও যোগ্য লোককে বেকারত্বের ঘানি টানতে হয়।তুলনামূলক কম যোগ্যতার লোকেরা অনেক বড় বড় পদে বসে যাওয়ার সুযোগ পায়।  
এরকম বাস্তবতায় বর্তমানে সরকারি চাকরির কত শতাংশ একেবারেই মেধা ও যোগ্যতায়, কোনো ধরনের তদবির বা ঘুষ ছাড়া হচ্ছে, সে বিষয়ে একটা নিরপেক্ষ অনুসন্ধান চালানো গেলে সম্ভবত খুব ভয়াবহ চিত্রই ফুটে উঠবে।

 খুব সম্প্রতি আমার এক পরিচিত জানালেন, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরির জন্য তিনি মধ্যস্থতাকারীর সঙ্গে ১০ লাখ টাকায় চুক্তি করেছেন। প্রশ্ন হলো একজন কম্পিউটার অপারেটরের বেতন কত আর চাকরি পাওয়ার পরে ঘুষ না খেলে ওই ঘুষের ১০ লাখ টাকা তিনি কত বছরে শোধ করবেন বা আদৌ শোধ করতে পারবেন কি না?

২.

দেশে বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ থেকে পাস করার পর চাকরির জন্য বছরের পর বছর ঘুরে ক্লান্ত ও হতাশ মানুষের সংখ্যা কত, তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্যালাপের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- চাকরির জন্য বিশ্বের খারাপ ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০ নম্বরে। ১৫৮ দেশের কর্মজীবী মানুষ এই গবেষণা জরিপে অংশ নেন। যেখানে বাংলাদেশের মাত্র ২ ভাগ মানুষ নিজের চাকরি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চাকরির ভালো-মন্দ নির্ভর করে অর্থনীতির উপর। অর্থনীতি শক্তিশালী হলে চাকরি ভালো হয়। এছাড়া গুণগত শিক্ষা, দুর্নীতির মাত্রা এবং সর্বোপরি আইনের শাসনের উপরও ভালো চাকরি নির্ভর করে।

 দেশে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে। শিল্প-কারখানা বাড়ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বাড়ছে। তারপরও কেন চাকরির বাজার নিয়ে এত হতাশা? অনেকে এজন্য যুগোপযোগী এবং গুণগত শিক্ষার অভাবকে দায়ী করেন। স্বাধীনতার ৪৪ বছরেও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় খুব একটা সংস্কার আনা যায়নি। যেসব উদ্যোগ বর্তমান সরকার নিয়েছে, তা নিয়েও বিতর্ক আছে। বিশেষ করে জিপিএর নামে যে মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছে তাতে এখন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না শিক্ষার মান আসলে কেমন। কারণ জিপিএ ফাইভ পাওয়ার পরও তাদের অনেকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় টিকছে না। সেইসাথে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় যে নৈরাজ্য, তা বিশ্বের আর কোনও দেশে আছে কি না, সন্দেহ।

 শিক্ষাব্যবস্থার এই দুর্বলতার বাইরে দেশে চাকরির বাজার নিয়ে হতাশার একটা বড় কারণ অবশ্যই দুর্নীতি ও আইনের শাসনের অভাব।যখন ঘুষ ও তদবিরই চাকরি পাওয়ার প্রধান শর্ত, তখন সেখানে মেধা ও যোগ্যতা গৌণ হয়ে যায়।আবার অনেক অযোগ্যরা যেমন বড় বড় পদে বসে থাকেন, তেমনি অনেক যোগ্য লোক তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ ও বেতন পান না।

 নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও বেকারত্ব বাড়ার একটি কারণ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ২৫-২৮ বছরের আগে স্নাতকত্তোর শেষ করতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়স শেষ হয়ে যাচ্ছে দ্রুত।

 

চাকরির আবেদনে অধিকাংশ সময়ই অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। কিন্তু অনেকে এমন প্রশ্নও করেন যে,‘চাকরি না পেলে আমি অভিজ্ঞতা অর্জন করব কীভাবে?’ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করে বের হবার পরও কর্মজীবন নিয়ে অধিকাংশের সুনির্দিষ্ট পকিল্পনা থাকে না। অনেক সময় পরিকল্পনা করেও খুব একটা লাভ হয় না। যে কারণে দেখা যায়, যে বিষয়ে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করলেন, ভালো ফল পেয়েছেন, কিন্তু চাকরি করছেন এমন বিষয়ে যা তার পড়ালেখার ধারেকাছেও নেই।

 ৩.

সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ যা বলেছেন,তা হলো দেশে এখন যতগুলো টিভি চ্যানেল আছে, এত দরকার নেই। এত সাংবাদিকও দরকার নেই। তার এই কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণের হাজারও সুযোগ আছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন সাংবাদিকতা অত্যন্ত সম্মানজনক পড়াশোনার বিষয় এবং সংখ্যায় অনেক বেশি গণমাধ্যম আছে বলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিষয় নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষার্থীদের সামনে চাকরির একটা বড় বাজার নিশ্চিত থাকে। সুতরাং ‘এত মিডিয়া দরকার নেই’ বলে রওশন এরশাদ যখন মন্তব্য করেন, তখন তার নিজেকেইে এই প্রশ্নটি করা উচিত যে, তার স্বামী জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন দেশের গণমাধ্যমের কী চেহারা ছিল, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বলতে আদৌ কিছু ছিল কি না?

 তাছাড়া ‘অন্য কোনও চাকরি পাননি বলে সাংবাদিক হয়েছেন’- এই ধারণার দিন শেষ। কারণ সাংবাদিকতা এখন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পেশা। এই পেশার লোকেরা অন্য বহু পেশার মানুষের চেয়ে অনেক ভালো বেতন পান। একটু সিনিয়র হলেই গাড়ি পান। সুতরাং শিক্ষার্থীদের এখন প্রথম পছন্দের চাকরির অন্যতম সাংবাদিকতা।

তবে এটি ঠিক যে, সাংবাদিকতা পেশার কিছু বিপরীত চিত্রও আছে। যেমন একদিকে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি সাংবাদিকতার মানও নিম্নগামী হচ্ছে। হাতেগোণা কিছু প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে বাকিরা যে ধরনের সাংবাদিকতার চর্চা করে,সেগুলোকে আদৌ সাংবাদিকতা বলা যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিশেষ করে এখন ইন্টারনেটের সুবিধায় অনলাইন গণমাধ্যমের ছড়াছড়ি, যেখানে কয়েকটি প্রথিতযশা প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে অধিকাংশের সংবাদ মান ও সংবাদ জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন করাও বোকামি।আবার এদের সংখ্যা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে যে, আপনার পরিচিত এরকম অনেককেই পাবেন যারা কোনও না কোনও ডটকমের ‘সাংবাদিক’। অথচ আপনি হয়তো সেই প্রতিষ্ঠানের নামও শুনেছেন এই প্রথম।

 এত প্রতিষ্ঠান হওয়া নিশ্চয়ই দোষের নয়। কিন্তু তারা কী ধরনের সাংবাদিকতার চর্চা করে এবং যারা নিজেদের সাংবাদিক বলে দাবি করেন, তারা আসলেই কতটা সাংবাদিক, সেটিও বিবেচ্য। আর এটি বিবেচনা করা হয় না বলেই রওশন এরশাদ খোদ সংবাদ সম্মেলনেই এ কথা বলার সাহস পান যে,‘দেশে কর্মসংস্থানের অভাবে সাংবাদিক বেড়ে গেছে।’তিনি এখানে সাংবাদিক বলতে কাদের বুঝিয়েছেন, সেটি সচেতন পাঠকমাত্রই অনুধাবন করতে পারেন।

 ৪.

তবে এসব সঙ্কটের ভেতরেও সম্প্রতি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য কার্যকর হয়েছে অষ্টম পে-স্কেল। সরকারি কর্মীদের জন্য নববর্ষ ভাতাও চালু হয়েছে। সব মিলিয়ে আগামী তিনবছর বেতন-ভাতা খাতে সরকারের বাড়তি খরচ হবে ২৩ হাজার ৮২৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা। ফলে যাদের বেতন বাড়ানো হয়েছে, বর্ধিত বেতনে তাদের জীবন আরেকটু উন্নত হবে। দৈনন্দিন খরচ মেটানোর পরে অবসর আনন্দের মাত্রাটা বাড়বে। কিন্তু যাদের চাকরি রয়েছে, তাদের অবসরের বয়স এবং বেতন বাড়ানোর চেয়ে যারা বেকার, তাদের চাকরি দেয়া অনেক বেশি জরুরি, নৈতিক এবং কল্যাণকর। যদি সেটি করা হত, তাহলে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া আরেকটু গতি পেত বলে মনে হয়।

লেখক : যুগ্ম বার্তা সম্পাদক ও উপস্থাপক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ