behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

ওয়ান-ইলেভেন ব্যর্থ নয়!

আনোয়ার পারভেজ হালিম০২:০২, জানুয়ারি ১১, ২০১৬

আনোয়ার পারভেজ হালিমজেনারেল মইন ইউ আহমেদ তার ‘শান্তির স্বপ্নে সময়ের স্মৃতিচারণ’ গ্রন্থে লিখেছেন,  ‘‘১১ জানুয়ারি, ২০০৭ দিনটিকে আমি নাইন-ইলেভেনের অনুকরণে নাম দিয়েছি ‘ওয়ান ইলেভেন।’’ এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও তার বইয়ের অনেক তথ্যই যে অসত্য তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। ওয়ান ইলেভেন নামকরণটি মূলত মিডিয়ার সৃষ্টি।
১১ জানুয়ারি বহুল আলোচিত সেই ওয়ান ইলেভেনের নবম বর্ষপূর্তি। ড. ফখরুদ্দীন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি কেবল সেনা-সমর্থিতই ছিল না, ছিল সেনা-নিয়ন্ত্রিতও। নয় বছরে এ সরকার নিয়ে লেখালেখি কম হয়নি, এমনকি দুই-চারখানা বইও বের হয়েছে। মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর ও ‘শোনাকথা’  এ সবের উৎস। ফলে ১/১১-র পর্দার আড়ালের ঘটনাবলি আজও অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। পেশাগত কারণে আগে থেকেই দুই-চারজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ থাকায় ঘটনার নেপথ্যের ছিটেফোঁটা জানার ও প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছিল। সেই সুবাদে ওয়ান-ইলেভেন নিয়ে এ লেখার অবতারণা।

কোন কোরাইশী!

মইন উ আহমেদের লেখা বইটি পড়লে যে কারও মনে হতে পারে যে, তিনি যেন এক মহামানব। জাতিকে সেবা করার জন্য তার ওপর ওহি নাজিল হয়েছিল! কিছুদিনের জন্য নিঃস্বার্থ সেবা দিয়ে তিনি চলে যাবেন। কিন্তু বাস্তবতা সাক্ষ্য দিচ্ছে, তিনি সে রকম কোনও দরদি ব্যক্তি নন। বরং  তার ছিল দীর্ঘ পরিকল্পনা। এই সেনা প্রধান স্বপ্ন দেখতেন, তিনি দেশের প্রেসিডেন্ট হবেন। জিয়া ও এরশাদের অনুকরণে তিনি গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে কিংস পার্টি গঠনেরও প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এ প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিএনপিতে কোণঠাসা, এককালের তুখোড় ছাত্রনেতা ফেরদৌস আহমেদ কোরাইশীকে। সিদ্ধান্ত হলো, আমরা কোরাইশীর একটা ইন্টারভিউ করব। কোরাইশী ভাই বিকেলে বনানীর অফিসে যেতে বলেন।

সহকর্মী শফিক রহমানকে নিয়ে বিকেলে বনানীর অফিসে যাই। সদ্য চুনকাম করা ঘিয়ে রংয়ের দোতলা বাড়ির সামনে, গেটের বাইরে কয়েক জন সতর্ক দৃষ্টিতে পায়চারী করছেন। সবার ছোট-ছোট চুল। আমাদের দিকেও কড়া নজর। গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই আরেক দৃশ্য। তালাবদ্ধ কলাপসিবল গেটের ভেতরে ৩/৪ জন নিরাপত্তাকর্মী। তাদের চুলেও বাটিছাঁট। মিলিটারি স্টাইলে কর্কশ গলায় এক নাগাড়ে জানতে চান—কোথায় যাবেন, কার কাছে যাবেন, কোথা থেকে এসেছেন ইত্যাদি। বললাম, কোরাইশী ভাইয়ে কাছে এসেছি। আবার প্রশ্ন—কোন কোরাইশী? বললাম, আমরা সাংবাদিক। উনার ইন্টারভিউ করব। এবার আরও কর্কশ জবাব—এখানে কোরাইশী নামে কেউ নেই। আমরা হতবাক, পরস্পর চোখের ইশারায় বাইরে বেরিয়ে আসি। কোরাইশী ভাইকে ফোন করলে তিনি বলেন, আমি তো ভেতরেই আছি, দোতলায়। বললাম, ভাই আপনাকে তো এরা কেউ চেনেন না।

মিনিট খানেকের মধ্যে সিভিল পোশাকে যিনি নিচে নেমে এলেন, তিনি একজন গোয়েন্দা সেনা কর্মকর্তা, আমার পূর্ব পরিচিত। নিরাপত্তাকর্মীদের ধমক-টমক দিয়ে আমাদের ভেতরে নিয়ে গেলেন তিনি। কোরাইশী ভাই ভদ্র মানুষ। অমায়িক ভঙ্গিতে বললেন, স্যরি। ইন্টারভিউ শেষে বিদায়ের আগে তাকে বলেছিলাম, ভাই, কলাপসিবল গেট আটকিয়ে রাজনৈতিক দল! জনগণ যদি অবাধে দলের কার্যালয়ে আসতে না পারে, তাহলে এ দলের রাজনীতি কাদের জন্য? তিনি কোনও জবাব দেননি। আসল ঘটনা এ দলের গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিল একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এরপর ২২ জুন, ২০০৭ কোরাইশীর নেতৃত্বে প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিপি) আত্মপ্রকাশ ঘটে। ততদিনে অংকের হিসাব পাল্টে যেতে থাকে। মইনউদ্দীন আহমেদ আর পিডিপির সঙ্গে নিজেকে জড়াননি। পিডিপিও রাজনীতিতে সাড়া জাগাতে পারেনি। কোরাইশীর সেই সাক্ষাৎকার প্রোবে ছাপার মাসখানেক পর আমরা কভার স্টোরি করেছিলাম, ‘আনসারটেইন ফিউচার অব পিডিপি।’

সিদ্ধান্ত  হতো সেনাসদরে

প্রধান উপদেষ্টা ও অন্য উপদেষ্টাদের কর্মকাণ্ড পুরোটাই ছিল সেনা-নিয়ন্ত্রিত। ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ কোথায় যাবেন, কী করবেন, কী বলবেন আগেভাগে তিনি কিছুই জানতে পারতেন না। তার দৈনন্দিন কর্মসূচির আগাম সিদ্ধান্ত হতো সেনা সদরে।

একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক, ইংরেজি ম্যাগাজিন প্রোবে ছাপা হলো প্রধান উপদেষ্টা  ১৫ আগস্ট জাতির জনকের কবর জিয়ারত করতে টুঙ্গিপাড়ায় যাবেন। খবরটি পরদিন দৈনিক আমাদের সময় রিপ্রিন্ট করে। সকাল বেলা খবর পড়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ফাহিমমুনয়েম বিস্মিত হন। তিনি আমাদের সময়ের সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খানকে ফোন করে খবরের সত্যতা জানতে চান। কারণ, প্রধান উপদেষ্টা টুঙ্গিপাড়ায় যাবেন, আর সে খবর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় বা তার প্রেসসচিব জানবেন না, তা কী করে হয়! অবশ্য নাঈম ভাই প্রেসসচিবকে প্রোবের রেফারেন্স দিয়ে নিস্তার পান। পরে দেখা গেছে, সত্যিই ১৫ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা টুঙ্গিপাড়ায় গিয়েছিলেন। 

লিখতে চেয়েছিলেন ব্রিগেডিয়ার বারী

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলুল বারী দেখা করার জন্য একদিন খবর পাঠালেন। আগের ঠিকানায় নয়, অন্য ঠিকানায়। পরদিন দেখা করতে গেলাম। হাইরাইজ ভবনের সম্ভবত (এখন মনে পড়ছে না) ৮/৯ তলার একটি খুপড়ি কক্ষে মহা প্রতাপশালী সেনা কর্মকর্তা বারী বসে আছেন। তার টেবিলের উল্টোদিকে একটি মাত্র অতিথি চেয়ার, একপাশে একটি পুরানো বেতের সোফা। ক’দিন আগেও তিনি ছিলেন ডিজিএফআইয়ের ভারপ্রাপ্ত ডিজি। মেঝেতে লাল কার্পেটমোড়া সুসজ্জিত বিশাল কক্ষে বসতেন এই ড্যাশিং কর্মকর্তা। হঠাৎই পতন হয়েছে তার। সে অন্য আরেক ঘটনা। ডেপুটেশনে এখানে তাকে আইটি সেক্টরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্রিগেডিয়ারের বাদামি চোখে হতাশার ছাপ। ভীষণ বিমর্ষ মনে হলো। তার করুণ দশা দেখে আমিও ভেতরে ভেতরে বিব্রত। তিনিই প্রসঙ্গ তোলেন, ১/১১-এর পুরো ঘটনা শুরু থেকে লিখতে চাই। জবাবে বললাম, ভালো তো লিখুন। তিনি বললেন, আমি তো ভালো লিখতে পারি না। জানতে চাইলাম, তাহলে উপায় কী। তিনি বললেন, আপনাকে সহযোগিতা করতে হবে। আমি ডিকটেশন দেব। লেখার কাজটা মূলত আপনিই করবেন।

ঠিক হলো পরদিন আমি মোটাসোটা একটি ডায়েরি নিয়ে তার সঙ্গে আবার সাক্ষাৎ করব। ১/১১-এর অন্যতম এক কুশীলবের কাছ থেকে নেপথ্যের পুরো ঘটনা জানা যাবে, আমি মনে মনে খুশি হলাম। কী কী প্রশ্ন করা যায়, ফেরার পথে তার একটা ছক করে ফেলি। কিন্তু পরদিন আমার যাওয়া হলো না। আর ফজলুল বারীর লেখার স্বপ্নও পূরণ হলো না। জানতে পারি যে, তাকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাসে ডিফেন্স অ্যাটাসে পদে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। এটা ওয়ান ইলেভেন সরকারের শেষের দিকের কথা।

১/১১ ব্যর্থ নয়!

প্রায়শ বলতে শোনা যায় ওয়ান ইলেভেন ব্যর্থ হয়েছে। আসলে এটি সঠিক নয়। কারণ, ওয়ান ইলেভেনের স্ক্রিপ্টে যা যা ছিল, এর অ্যাক্টররা সেভাবেই অ্যাক্টিং করেছে।  শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। মইনউদ্দিন ওফখরুদ্দীনরা সফলভাবেই সে চেষ্টা করেছেন। যদিও তারা এই দুই জননেত্রীকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে পারেননি। কিন্তু তারা বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে অবিশ্বাসের বীজ বপন করতে সক্ষম হয়েছেন। উপরন্তু নেতাদের ওপর যে হামলা-মামলা, জুলুম ও নির্যাতন চালিয়েছে সে ক্ষত এখনও দূর হয়নি। বিশেষত, ১/১১-এর ধাক্কা সামলিয়ে বিএনপি আজও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ভোগ করছে একচ্ছত্র আধিপত্য। যা রাজনীতির ভারসাম্যকে ক্ষুণ্ন করছে। সুতরাং, ওয়ান-ইলেভেনকে ব্যর্থ বলি কী করে!

লেখক: সাংবাদিক

 ***প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ

 
 
 
 
Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ