Vision  ad on bangla Tribune

একটি বিজ্ঞাপন এবং বর্ণবাদী মন

হারুন উর রশীদ২০:২৮, জানুয়ারি ১১, ২০১৬

হারুন উর রশীদথাইল্যান্ডে এই সময়ে একটি পণ্যের বিজ্ঞাপন চরম সমালোচনার মুখে পড়েছে। আর ব্যাপক সমালোচনার মুখে বিজ্ঞাপনটি প্রত্যাহারও করা হয়েছে। প্রত্যাহার হলেও আমাদের আধুনিক মনে বর্ণবাদের যে নতুন রূপ তা উলঙ্গ হয়ে পড়েছে।
এই বিজ্ঞাপনটি হল রং ফর্সাকারী একটি ক্রিমের বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘গায়ের রঙ ফর্সা হলেই জয় সুনিশ্চিত।’ বিজ্ঞাপনের নারী মডেল বলেন,‘ গায়ের রং ফর্সা হওয়া আমাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।’
বিউটি কোম্পানি ‘সিউল সিক্রেট’ তাদের বিজ্ঞাপনটি সমালোচনার মুখে প্রত্যাহার করে নিলেও থাইল্যান্ড থাম্মাসাত বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ইউকতি মুকদাউইজিত্রা বিবিসিকে জানান, ‘থাইল্যান্ডে বহুদিন ধরেই ফর্সা রংকে আভিজাত্যের প্রতীক মনে করা হয়। এখানে পশ্চিমের প্রভাবও বিদ্যমান। পশ্চিমাদের অনুকরণে সাদা হতে চাওয়ার এই প্রবণতা বেড়ে গিয়েছে।’
থাইল্যান্ড ছেড়ে এবার বাংলাদেশের দিকে একটু তাকাই। এখানেও বহুজাতিক কোম্পানিসহ নানা দেশি প্রতিষ্ঠান-এর রং ফর্সাকারী ক্রিম, লোশন এবং সাবানের জমজমাট বাজার। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর বিজ্ঞাপনের সিংহভাগই দখল করে আছে তাদের বিজ্ঞাপন। মাত্র ২১দিনে গায়ের রং ফর্সা করার ধন্বন্তরী ক্রিমও বিক্রি হয় বাংলাদেশে। বিক্রি হোক, কেউ ফর্সা হোক তাতে আমার আপত্তি নেই। আপত্তি বিজ্ঞাপনের ভাষায়। একটি বহুল পরিচিত বহুজাতিক কোম্পারি ক্রিমের বিজ্ঞাপনের ভাষা থাই বিজ্ঞাপনের চেয়েও খারাপ। তাদের বিজ্ঞাপনে চাকরির সাফল্য, বিয়ে সবকিছু নির্ভর করছে রং ফর্সা হওয়ার ওপর।

এমনকি বিজ্ঞাপনে কালো মেয়ে ও ফর্সা মেয়েকে পাশাপাশি দেখান হয়। কালো মেয়ে যে সামজিকভাবে ‘অগ্রণযোগ্য’ তাও বিজ্ঞাপনের ভাষায় প্রকাশ করা হয়। আর ক্রিম মেখে ফর্সা হওয়ার পর তার জীবনই পাল্টে যায়!

এই ধরনের বিজ্ঞাপন নিয়ে থাইল্যান্ডে সমালোচনার ঝড় উঠলেও আমরা চুপচাপ। শুধু চুপচাপই নয় বর্ণবাদ ছড়নো এই বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আবার নানা ফাউন্ডেশন খুলে নারী উন্নয়নের নামে কাজ করে। আমরা বুঝি আর না বুঝি তাদের আসল উদ্দেশ্য তাদের রং ফর্সাকারী ক্রিমের প্রচার ও বিক্রি বাড়ান। এতে সহায়তা করে একশ্রেণির প্রভাবশালী গণমাধ্যম। বর্ণবাদ ছড়িয়ে ব্যবসার প্রসারেও সহায়তা করে তারাই দু’পয়সা কামিয়ে নেয়। এখন পুরুষের রং ফর্সা করার ব্যবসাও এগোচ্ছে দ্রুত গতিতে।

থাইল‌্যান্ডের সাধারণ মানুষ ফর্সা রংকে আভিজাত্যের প্রতীক মনে করে। এটা এক থাই অধ্যাপকের কথা। আমাদের দেশেও কি তাই? এই প্রশ্নটির জবাব পওয়া যাবে গত বছরের একটি আলোচিত বিয়ের ঘটনা ব্যখ্যা করলে। অভিনেত্রী সুমাইয়া শিমুর বিয়ের কথা আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। তিনি যে তরুণ পেশাজীবীকে বিয়ে করেছেন তার গায়ের রং কালো। আর সেই ঘটনায় আমাদেও বর্ণবাদী মানসিকতা প্রকাশ হয়ে পড়ে। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কী হেনস্তাই না করা হয়েছে শিমুকে। অপমান করা হয়েছে তার ‘কালো বরকে’। পারলে কেউ কেউ শিমুকে তখন ফাঁসি দিয়ে ফেলতেন কালো মানুষকে বিয়ে করার অপরাধে।

আর আমাদের পাত্রপাত্রী’র বিজ্ঞাপনে পাত্রী হিসেবে ‘ফর্সা’ মেয়েই চাওয়া হয়। এনিয়ে বিস্তর কথা হয়েছে। তাই সে আলোচনায় না গিয়ে বলা যায় মুখের মহানুভবতা বাস্তবকে আর থাকেনা।

ইউরোপ-আমেরিকার উদাহরণ এখন আর দরকার নেই। আমাদের পাশের দেশ ভারতও রং ফর্সাকারী ক্রিমের বিজ্ঞাপনের ব্যাপারে নতুন নীতিমালা প্রয়োগ করেছে ২০১৪ সালে। এডভারটাইজিং কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার নীতিমালায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে,‘ বিজ্ঞাপনে গায়ের রং বা কোনও জাতি-গোষ্ঠী নিয়ে বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবেনা। সৃষ্টি করা যাবেনা সামাজিক বৈষম্য।’ আর বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত না এমন তথ্যও প্রচার করা যাবেনা। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সেই নীতিমালা মেনেই ভারতে এখন বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। কিন্তু বাংলাদেশে তারা একই কোম্পানি সেই নীতিমালা মানছেনা। আর মানানোরও যেন কেউ নেই।

আর ইউএস ফুড এন্ড ড্রাগ এ্যাডমিনেষ্ট্রেশন এধরণের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করেছে অনেক আগেই। তারপরও এধরনের কোনও বিজ্ঞাপন হলে তা ধরার জন্য ওৎ পেতে বসে আছে। সরাসরি অভিযোগ নিতে তারা ২৪ ঘণ্টা জেগে থাকে।

১৯৯৩ সালে বিশ্ব থেকে অফিসিয়ালি বর্ণবাদ বিদায় হয়। আর ১৯৯৪ সালে দক্ষিন আফ্রিকার নির্বাচনে জয়ী হয় নেলসন ম্যান্ডেলার এএনসি।

কিন্তু আসলে কি বর্ণবাদ বিদায় হয়েছে? হয়নি। কালো সাদার এই বর্ণ বৈষম্য বরং নতুন করে উস্কে দেয়া হচ্ছে। আমাদের মগজে এখনো ‘সাদা প্রভুদের’ বসবাস। আর এই বর্ণবাদ আমরা প্রকাশ করে ফেলি বা প্রকাশ হয়ে পড়ে। আমরা নিজেরাও চাই গায়ের রং ফর্সা করতে। কারণ আমাদের মানসিকতায় এখনও বর্ণবাদ। আর বহুজাতিক কিছু কোম্পানি বর্ণবাদ চাষ করে তাদেরও ব্যবসা বাড়াচ্ছে।

এডভারটাইজিং কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া একটি কথা বলেছে। আর তা হল সৌন্দর্যের একক কোনও মাপকাঠি নেই। সৌন্দর্যের একক কোনও মডেল নেই। তাই ফর্সা সুন্দর, কালো অসুন্দর নির্ধারণ করে দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। এর নেই কোনও যুক্তি।

আর একারণেই হয়তো শৈশব থেকে শ্বেতি রোগে আক্রান্ত উইনি এখন কানাডার সাড়া জাগানো মডেল। তারুণ্যের জনপ্রিয় এই মডেল-এর গোটা শরীরে সাদা ছোপ ছোপ দাগের কারণে স্কুলে অনেকেই তাকে ডাকতো গরু কিংবা জেব্রা বলে। তাকে স্কুলও ছাড়তে হয়েছিল। কিন্তু বৈচিত্র্য যখন সৌন্দর্য তখন উইনিও এখন এক ব্যতিক্রমী সুন্দর। যে স্থাপন করেছে সৌন্দর্যের এক নতুন সংজ্ঞা।

লেখক:সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ