প্লিজ, না জেনে লিখবেন না!

Send
মো. আবু সালেহ সেকেন্দার
প্রকাশিত : ১৩:০৪, জানুয়ারি ১২, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৭, জানুয়ারি ১৩, ২০১৬

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য নানা মহল থেকে প্রায়শই শোনা যাচ্ছে। অনেক গণমাধ্যমে সেই বিভ্রান্তিকর সংবাদ ও কলাম প্রকাশিত হচ্ছে। আবার কোনও কোনও গণমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলনকে বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। যদিও এ আন্দোলন বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন নয়। এ আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পক্ষ থেকে যে দাবি উত্থাপন করা হয়েছে সেই দাবি পূরণ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত কোনও শিক্ষকের এক পয়সা বেতন বৃদ্ধি পাবে না। তাহলে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে কেন তারা আন্দোলন করছেন?

মো. আবু সালেহ সেকেন্দারপ্রকৃতপক্ষে এ আন্দোলন মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন। ৭ম পে স্কেলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা জাতীয় বেতন স্কেলের সর্বোচ্চ ধাপে বেতন পেতেন। বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকদের মতোই মন্ত্রীপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব, সিনিয়র সচিব ও সচিবরাও সর্বোচ্চ ধাপে বেতন পেতেন। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়োজ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের এক-চতুর্থাংশ অধ্যাপক ওই ধাপে বেতন পেতেন। কিন্তু ৮ম বেতন স্কেলে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাতিল করায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সেই সুযোগ আর থাকছে না। সদ্য ঘোষিত বেতন স্কেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সর্বশেষ বেতনের ধাপ হবে যুগ্ম সচিব সমমর্যদার গ্রেড-৩। পাশাপাশি ৮ম জাতীয় পে স্কেলে নতুন দুটি ধাপ সৃষ্টি করায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বর্তমান অবস্থান হবে বেতন স্কেলের ৫ম ধাপে।

নিচের ছকটি ভালভাবে লক্ষ্য করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে:

ক্রমিক নং৭ম পে স্কেল   অবস্থান৮ম পে স্কেলঅবস্থান
১.গ্রেড-১বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক, মন্ত্রীপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব, সিনিয়র সচিব, সচিবমন্ত্রী পরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবমন্ত্রী পরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিব
২.গ্রেড-২অতিরিক্ত সচিবসিনিয়র সচিবসিনিয়র সচিব
৩.গ্রেড-৩যুগ্ম সচিবগ্রেড-১সচিব
৪.গ্রেড-৪----------------গ্রেড-২অতিরিক্ত সচিব
৫.গ্রেড-৫-----------------গ্রেড-৩যুগ্ম সচিব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

 

৭ম পে স্কেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেতন পেতেন কিন্তু অষ্টম পে স্কেলে এসে তারা বেতন পাবেন বেতন স্কেলের ৫ম ধাপে। অষ্টম বেতন স্কেলে সূক্ষ্ম চালাকি রয়েছে সেই কারণে অনেকের পক্ষে কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন ও মর্যদার অবনমন হয়েছে বিষয়টি বুঝতে সমস্যা হচ্ছে। আপনি ক্রমিক নম্বরের দিকে খেয়াল করলে বিষয়টি সহজে বুঝতে পারবেন। যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন ক্রমিক নং অনুসারে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ধাপ বা ১ নং ক্রমিকে বেতন পেতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা। কিন্তু ৮ম  পে স্কেলের গেজেট ঘোষণার পর তারা এখন ৫ নং ক্রমিকের ধাপে বেতন পাবেন। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নয়; অন্য যে কোনও পেশার মানুষ এমন অবনমন মেনে নেবেন কি? এমনকি তুষার আবদুল্লাহরও যদি এমন অবনমন ঘটে তিনি কি তা মেনে নেবেন? 

দুই.

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা আমলা হতে চেয়েছেন এমন তথ্য তুষার কোথায় পেয়েছেন জানাবেন কি? আর রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ছাত্রটির পাশে বসতে চাওয়ার সুযোগ শিক্ষকরা নিতে চেয়েছেন এমন বক্তব্যের উৎস জানালে খুশি হব! বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন নিয়ে যারা সোচ্চার তারা নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস না নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিচ্ছেন বলে তিনি যে অভিযোগ উত্থাপন করেছেন তা যদি সত্য হয়; তবে আমরাও ওই ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছি। আর কোন কোন শিক্ষক এমনটি করছেন তা যদি তুষারের জানা থাকে; তবে একজন সচেতন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে তিনি তা প্রকাশ করবেন বলে আশা রাখি। কিন্তু ঢালাও ভাবে আন্দোলনকারী সব শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা কী ঠিক? প্রথমে জানতে হবে: বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়জন শিক্ষক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন। ৩৭ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১২ হাজার শিক্ষক রয়েছেন। এর মধ্যে হয়ত শতাধিক শিক্ষক নিয়মিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস নেন। আর ওই শতাধিক শিক্ষকের জন্য পুরো ১২ হাজার শিক্ষককে ঢালাওভাবে অভিযোগের তীরে বিদ্ধ করা কতোটুকু যৌক্তিক?

আর যারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেন, এনজিওতে কাজ করেন অথবা মধ্যরাত্রে টকশোতে যান তারা যেন কোনও অনৈতিক কাজ করেন না। বিশ্ববিদ্যালয় কী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কাজ কী এ সম্পর্কে ধারণা নেই বলেই অনেকে এমন মন্তব্য করেন। আমরা প্রায়ই অন্য পেশা বা অন্য স্তরের শিক্ষকদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মিলিয়ে ফেলি। আর এমন মিলিয়ে ফেলার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কাজ নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপন করি। প্রথমে জানা দরকার: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কাজ ১. জ্ঞান আহরণ করা, ২. জ্ঞান সৃষ্টি করা, ৩. জ্ঞান বিতরণ করা। জ্ঞান বিতরণ করার ক্ষুদ্রতম একটি অংশ ক্লাসে ছাত্রদের পড়ানো। পাশাপাশি জ্ঞান বিতরণের হাজার হাজার মাধ্যম আছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে টকশো জ্ঞান বিতরণের অন্যতম মাধ্যম হতে পারে। আর এনজিও বা অন্যত্র শিক্ষকরা সাধারণত গবেষণার সঙ্গে যুক্ত কাজগুলো করেন। যা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কাজের অংশ। এতে অনৈতিক কিছু নেই।

বরং বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বার্থে বেশি করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান, এনজিওর গবেষণা কাজে যুক্ত হওয়ার দরকার। নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা টকশোতে যতো বেশি যাবেন, জাতি ততোই উপকৃত হবে। আর এক্ষেত্রে বলে রাখা ভাল, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা ওই ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত হন আইন মেনে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান অথবা এনজিওর সঙ্গে যুক্ত হতে প্রয়োজনীয় আইনগত অনুমতি নিয়েই তারা ওই সব কাজে যুক্ত হন। আর আইন মেনে যদি কেউ কাজ করেন তবে তিনি দোষী হবেন কেন?

তিন.

কম হলেও অনেক টকশোতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার আছে। গাড়ি ছোট না বড় সেই প্রসঙ্গ উত্থাপন করা তো দূরের কথা অনেক সময় নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে নিজ ব্যবস্থপনায় টকশোতে অংশগ্রহণ করেছি। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, কোন শিক্ষক গাড়ির সাইজের মাপ নিয়েছেন আশা করি তুষার তা প্রকাশ করবেন। আর একজন বা দুইজন শিক্ষকের গাড়ির মাপ নেওয়ার বিষয়কে ১২ হাজার শিক্ষকের আন্দোলনের প্রসঙ্গে উত্থাপন করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত?

পরিশেষে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য দুর্ভাগ্য হচ্ছে, আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে, যাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়াতো দূরের কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ার যোগ্যতা ছিল না এমন অনেকের কাছ থেকে উপদেশ শুনতে হচ্ছে। অবশ্যই এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরাই দায়ী। কারণ প্রথম থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেডারেশনের নেতারা তাদের প্রকৃত দাবি কী তা জাতির সামনে তুলে ধরতে পারেনি। এমনকি চলমান সর্বাত্মক কর্মবিরতির কারণ হিসেবে তারা যে প্রেস রিলিজ দিয়েছেন সেখানেও অস্পষ্টতা রয়েছে। তুষারের মতো খ্যাতিমান, সচেতন, মেধাবী, বুদ্ধিমান ও দক্ষ সাংবাদিকই যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রকৃত আন্দোলন সম্পর্কে বুঝতে পারেননি সেখানে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা তা সহজে উপলব্ধি করা যায়। তাই  বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেডারেশনের কাছে বিনীত অনুরোধ করছি: আপনারা আপনাদের অবস্থান ও দাবিগুলো সুস্পষ্টভাবে জাতির কাছে তুলে ধরুন। কাদা না লাগিয়ে মাছ ধরতে চাইলে বড় জোর পুঁটি মাছ ধরা যাবে। ওই নীতিতে আর যাই হোক সাধারণ শিক্ষকদের প্রকৃত দাবি আদায় সম্ভব নয় তা নিশ্চিত করে বলা যায়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 salah.sakender@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ

 
 
 
 

লাইভ

টপ