behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

ভারত-পাকিস্তান সম্প্রীতি কেন বার বার ব্যর্থ?

আনিস আলমগীর১৯:৪০, জানুয়ারি ১২, ২০১৬

Anis Alamgirভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এক কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছেন। গত ২৫ ডিসেম্বর নরেন্দ্র মোদি কাবুল থেকে দিল্লি যাওয়ার পথে লাহোরে যাত্রাবিরতি করেন। নাতির বিয়ে উপলক্ষে নওয়াজ শরিফ তার পৈতৃক বাসভবন লাহোরেই ছিলেন। দুজনের ২ ঘণ্টা বৈঠক হয়েছিল। উভয়ে পাক-ভারত সম্পর্কে একটা উষ্ণতা আনয়নের উদ্যোগ নিতে সম্মত হয়েছিলেন।
গত ডিসেম্বরে পাকিস্তানের নিরাপত্তা উপদেষ্টা লে. জে. (অব.) নাছির খাঁন জনজুয়া এবং ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে ব্যাংককে ৪ ঘণ্টাব্যাপী এক আলোচনা বৈঠক হয়েছিল। সেখান থেকেই উভয় দেশের মাঝে কূটনীতির একটা নূতন দিগন্ত খুব দ্রুত উম্মোচিত হয়ে উঠেছিল, যার কারণে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের পাকিস্তান সফর আর নরেন্দ্র মোদির যাত্রাবিরতি। সম্ভবত ভারতের অজিত দোভাল আর-পাকিস্তানের নাছির খাঁন জানজুয়া রক্ষণশীল প্রকৃতির লোক নন। তারা অতীতকে পেছনে ফেলে সম্মুখে অগ্রসর হতে চেয়েছিলেন। অল্প সময়ের মাঝে উভয়ে তথ্যের আদান-প্রদান করে সম্পর্কটা সহজ করে তুলতে পেরেছিলেন, যে কারণে জানুয়ারির ১৪ ও ১৫ তারিখ উভয় দেশের পররাষ্ট্র সচিবদ্বয়ের মাঝে ইসলামাবাদ বৈঠক হওয়ার একটা কর্মসূচিও স্থির হয়েছিল। কিন্তু এরই মাঝে ভারতের পাঠানকোটে সন্ত্রাসী হামলা সব উদ্যোগের উষ্ণতার মাঝে মনে হয় জল ঢেলে দিল।
পাঠানকোট পাঞ্জাবের সীমান্তবর্তী এলাকা। পাঠানকোটে ভারতের একটি এয়ার বেইজের ইউনিট রয়েছে। যেখানে পাকিস্তানের ছয় জন সন্ত্রাসী ভারতীয় এয়ার ফোর্স সেনাদের পোশাক পরে ঢুকে পড়েছিল। সন্ত্রাসীরা আক্রমণ চালিয়েছে তবে ভারত ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করেনি। দীর্ঘ ৮০ ঘণ্টা তৎপরতা চালিয়েছে ভারত এবং সন্ত্রাসীদের হত্যা করেছে। তবে ভারতের একজন লে. কর্নেলসহ ৭ সেনা সদস্য মারা গেছেন। ভারত ২ জানুয়ারি সন্ত্রাসী হামলার কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে সত্য, তবে সরাসরি পাকিস্তানকে দায়ী করেনি। নওয়াজ শরিফ তখন শ্রীলংকা সফরে ছিলেন। তিনি নরেন্দ্র মোদিকে কলম্বো থেকে আশস্ত করেছেন যে পাকিস্তানে ফিরে এসে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।

পাকিস্তান এ হামলার নিন্দা করেছে এবং শান্তি প্রক্রিয়া বানচালের ষড়যন্ত্র বলেও উল্লেখ করেছে। পাকিস্তানের প্রধান সেনাপতি রাহিল শরিফ রাওয়ালপিন্ডিতে সেনা অধিয়ানকদের এক সমাবেশে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স-এর কথা বলেছেন। গত ৬ জানুয়ারি নওয়াজ শরিফ রাওয়ালপিন্ডিতে ফিরে এসে ভারত কর্তৃক সরবরাহকৃত তথ্য উপাত্তর ভিত্তিতে ইনকোয়ারি শুরু করারও নির্দেশ দিয়েছেন। পাঞ্জাবের পুলিশ তৎপরতা শুরু করেছে। দক্ষিণ পাঞ্জাবে সন্ত্রাসী সংগঠন জশনে মুহাম্মদ-এর তৎপরতা বেশি। সন্ত্রাসীদের সামরিক আদালতে বিচার করার ব্যবস্থা আগেই নেওয়া হয়েছে। সরকার দ্রুত বিচারে প্রয়োজন মনে করলে ধৃত সন্ত্রাসীকে সামরিক আদালতেও পাঠাতে পারেন।

পাকিস্তানে একটা জনপ্রিয় কথা প্রচলিত রয়েছে, সব সন্ত্রাসী সংগঠনের অভিভাবক নাকি পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। সে কারণে বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে যখন তারা সন্ত্রাস নির্মূলে চেষ্টা চালায় তখন হয় তাদেরকে হতাশ হতে হয়, না হয় ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়।

আমি অনেক লেখায় বলেছি পাকিস্তান এবং ভারতের মাঝে সম্পর্ক ভাল হওয়া খুবই কঠিন ব্যাপার।পাকিস্তানের স্রষ্টা কায়দে আজম মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান নামক একটা সেক্যুলার মুসলিম রাষ্ট্রের সৃষ্টি করেছিলেন কিন্তু তার ও লিয়াকত আলির মৃত্যুর পর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রটাকে ইসলামিক রাষ্ট্রের রূপ দেওয়ার এক অব্যাহত চেষ্টায় রয়েছে। ইসলামিক রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার সোল এজেন্সি নিয়েছেন পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। ধর্মকে জড়িত না করলে মানুষের আবেগ কাজে লাগানো সম্ভব হয় না। আবার এ ধর্মীয় রাষ্ট্রটির একটা প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রও থাকতে হবে তা হলো ‘হিন্দুস্থান’। এসব ঠিক ঠাক উজ্জীবিত রাখতে পারলে পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর কদর সাধারণ মানুষের কাছে কখনও হের ফের হবে না। তাদের অবস্থান থাকবে আন-চ্যালেঞ্জ।

পাকিস্তানে একটা জনপ্রিয় কথা প্রচলিত রয়েছে, সব সন্ত্রাসী সংগঠনের অভিভাবক নাকি পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। সে কারণে বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে যখন তারা সন্ত্রাস নির্মূলে চেষ্টা চালায় তখন হয় তাদেরকে হতাশ হতে হয়, না হয় ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়। সন্ত্রাস কবলিত না হলে রাষ্ট্রটার হয়ত আরও বহু উন্নতি হতো। কিন্তু সন্ত্রাসের জন্য রাষ্ট্রটা পেছনে পড়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাসের হোতা হলো ইসলামের নামে গঠিত সন্ত্রাসী শক্তিগুলো। জশনে মুহাম্মদ, লস্করে তৈয়বা, তালেবানে পাকিস্তান- এগুলোই হলো ইসলামিক সন্ত্রাসী সংগঠন। সবগুলো সংগঠনই আন্ডার গ্রাউন্ড সংগঠন। জামায়েতে ইসলামী, জামায়াতে ওলামায়ে পাকিস্তান- এ’টি হচ্ছে বৃহত্তর ওভার গ্রাউন্ড ইসলামিক দল। নওয়াজ শরিফের মুসলিম লিগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পূর্বে পাকিস্তান পিপলস পার্টি ক্ষমতাসীন ছিল। তখন মওলানা ফজলুর রহমানের জামায়াতে ওলামায়ে ইসলাম পিপপল পার্টির সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছিল।

মোহাজের কওমি মুভমেন্ট-ও কোয়ালিশনের পার্টনার ছিল। পাকিস্তান পিপলস পার্টি সেক্যুলার রাজনৈতিক দল। জুলফিকার আলি ভুট্টো এ দলটার প্রতিষ্ঠাতা। নওয়াজ শরিফের পূর্বে পাকিস্তান পিপলস পার্টির কোয়ালিশন সরকারটাই একমাত্র সরকার যারা পরিপূর্ণ পাঁচ বছর ক্ষমতায় থেকে নির্বাচনের পরে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পেরেছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ৬৮ বছরের ইতিহাসে এটাই একমাত্র ব্যতিক্রম। পাকিস্তানে শিয়া, সুন্নি, কাদিয়ানি, সম্প্রদায়ের বসবাস। সুন্নিরা শিয়া এবং কাদিয়ানিদেরকে মুসলমান মনে করে না। একে-অপরকে নিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টায় লেগে আছে যুগের পর যুগ। সম্ভবত সে কারণেই মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ রাষ্ট্রটাকে সেকুলার মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। পাকিস্তান গণ-পরিষদের উদ্বোধনী সেশনে তিনি তার সেই অভিলাষের কথা ব্যক্ত করেছিলেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক বছরের মাঝে তার মৃত্যু হওয়ায় তিনি তার অভিলাষ অনুসারে রাষ্ট্রটার রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে যেতে পারেননি। তার মৃত্যুর পর পরই লিয়াকত আলি খানকে ও রাওয়ালপিন্ডির জনসভায় গুলি করে হত্যা করা হয়। লিয়াকত আলি খাঁনের হত্যার বিচার কখনও হয়নি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সামরিক চক্রই তার হত্যার পেছনে ছিল। সে থেকেই পাকিস্তানের রাজনীতিতে সামরিক চক্রের লীলা আরম্ভ হয়েছিল। যা এখনও অব্যাহত রয়েছে।

পাঠানকোটের হামলার জন্য ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করেনি। ভারত বলেছে বিশেষ কোনও গোষ্ঠীর কাজ হবে এ আক্রমণ। বহুদিন পরে ভারত পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ গোলযোগটা সম্ভবত বুঝতে পেরেছে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থাটাকে গড়ে তুলেছে আমেরিকার সিআইএ। আফগানিস্তানে সোভিয়েতের উপস্থিতির পর তারা আইএসআইকে মনের মতো করে গড়ে তুলেছিল। ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মাঝে সম্ভবত পাকিস্তানের আইএসআই-ই খুব শক্তিশালী। তারা লাদেনকে আমেরিকার দৃষ্টির আড়াল করে রেখেছিল বহু বছর। এই সংস্থাটাকে আয়ত্তে রাখা অনেক সময় পাকিস্তান সরকারের পক্ষেও সম্ভব হয় না।

কিউবা সংকটের সময় সিআইএ প্রেসিডেন্টের অজান্তে এত সব কাজ করেছিল যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কেনেডি একবার এ নিয়ে অশ্রু বিসর্জন করেছিলেন প্রকাশ্যে। এ অভ্যাসটা সিআইএ পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর মাঝে খুব ভালভাবে প্রবেশ করিয়ে দিতে পেরেছে। মনে হয় পাঠানকোটের ঘটনায় আইএসআই-এর কোনও লীলা থাকতে পারে। অবশ্য পাকিস্তানের প্রধান সেনাপতি জেনারেল রাহিল শরিফ পাঠানকোটের ঘটনার পর সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স-এর কথা বলেছেন। গভীরভাবে মনোনিবেশ করলে কোনও কোনও সময় অনেক ঘটনায় পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও আইএসআই-এর কাজের মাঝে সমন্বয়হীনতা উপলব্ধি করা যায়।

আগামী ১৫ জানুয়ারি ২০১৬ পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে ইসলামাবাদে যে বৈঠক অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে তা এখনও অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাঠানকোটের ঘটনায় উভয় রাষ্ট্র বিব্রত। তবে কেউই অনঢ় অবস্থানে নন। পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের ‘সমন্বিত দ্বিপাক্ষিক সংলাপ’- এ পাঠানকোটের ঘটনাও উঠে আসবে ধারণা করা হচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে টেলিফোনে বলেছেন তিনি যেন ভারতের টেলিভিশন দেখে কোনও সিদ্ধান্ত না নেন। বিষয়টা খুবই আশাপ্রদ।

পরিশেষে, এ শতাব্দীটা এশিয়ার শতাব্দী হয়ে উঠবে যদি এশিয়ার দেশগুলো কলোনিয়াল লিগ্যাসি পরিত্যাগ করে নিজেদের বিরোধগুলো নিজেরা মিটিয়ে ফেলতে পারে।

 

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anisalamgir@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ