বাক স্বাধীনতা, অনুভূতি বনাম আইনের শাসন

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১২:৩৮, জানুয়ারি ১৮, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪৬, জানুয়ারি ১৮, ২০১৬

আমীন আল রশীদ‘থাবা বাবা’ নামে পরিচিত আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘সরকার আইনের শাসনে বিশ্বাসী। এ রায়ের ফলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তচিন্তা ও বাক স্বাধীনতা নিশ্চিতে এই রায় আসলেই কতটা ভূমিকা রাখবে, তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। কিন্তু এই ঘটনা এ কারণে সাধুবাদযোগ্য যে, এর মধ্য দিয়ে দেশে ব্লগার হত্যার বিচার শুরু হলো। আশা করা যায় অন্যান্য ব্লগার, লেখক ও প্রকাশক হত্যারও বিচার হবে।
ব্লগার শব্দটি নতুন নয়। ইন্টারনেটে যারা লেখালেখি করেন, তাদেরকেই ব্লগার বলা যায়। তবে বাংলাদেশের মানুষের কাছে শব্দটি বিস্তৃত এবং অনেকটা নতুনভাবে আবির্ভূত হয় রাজীব হত্যা, আরও পরিস্কার করে বললে, একজন যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরুর পরে।
শাহবাগের ওই আন্দোলন চলাকালীন ধর্মীয় নানা বিষয়, বিশেষ করে সৃষ্টিকর্তা, ইসলাম ও মহানবীকে নিয়ে ব্লগের কিছু লেখালেখি যখন একাধিক দৈনিকে প্রকাশিত হয়, তখন ব্লগারদের বিষয়ে দেশের মানুষের মধ্যে একটা নেতিবাচক ধারণার ‍সৃষ্টি হয় এবং অনেকেই এটা বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, ব্লগার মানেই নাস্তিক। বাস্তবতা হলো ব্লগার মানেই নাস্তিক নয়। আবার সব নাস্তিকও ব্লগার নয়।
রাজীব খুন
২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পল্লবীতে নিজ বাসার সামনে খুন হন গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক ও ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার। তাকে কুপিয়ে খুন করা হয়। গত ৩১ ডিসেম্বর এই হত্যা মামলার রায় দেয়া হয়, যেখানে আট আসামির মধ্যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে তারা হলেন নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফয়সাল বিন নাইম ওরফে দিপ এবং রেদোয়ানুল আজাদ রানা। এর মধ্যে রানা পলাতক। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেছেন, ‘শুনেছি ব্লগাররাও এমন কিছু লেখেন, যা পড়লে নাকি মারতে ইচ্ছে করে। আসলে আমরা সবাই ধৈর্যহারা হয়ে গেছি। সকলকেই ধৈর্য ধরতে হবে। আইন হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও ক্রসফায়ারের নামে আইন হাতে তুলে নিচ্ছে, সেটাও বন্ধ করতে হবে।’ বিচারকের প্রশ্ন, ‘কেউ কিছু লিখলেই তাকে মেরে ফেলতে হবে?’
২০১৩ সালে রাজীবকে খুন করার মধ্য দিয়ে যে ব্লগার হত্যা শুরু হয়, তারপর একে একে খুন হয়েছেন লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান, অনন্ত বিজয় দাশ ও নিলাদ্রী চট্টোপাধ্যায় এবং সবশেষ জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্ত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপন। যেদিন দীপনকে রাজধানীর আজিজ মার্কেটে ঢুকে খুন করা হয়, সেদিনই লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর কার্যালয়ে ঢুকে হামলা চালানো হয় লেখক ও এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল, ব্লগার তারেক রহিম ও রণদীপম বসুর ওপর। শুদ্ধস্বর অভিজিৎ রায়ের বইয়ের অন্যতম প্রকাশক।

বাক স্বাধীনতা ও ধর্মীয় অনুভূতি

স্বাধীনতা মানে যেমন যা ইচ্ছে তা-ই করা নয়, তেমনি বাক স্বাধীনতার মানেও যা খুশি তা বলা বা লেখা নয়; এই বাস্তবতা মেনেই এটি বলা যায় যে, প্রত্যেকেরই কোনও না কোনও ধর্ম বা বিশ্বাসের প্রতি আস্থা থাকতে পারে। এবং এটি প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বিষয়। তাই কেউ যদি তার ওই অনুভূতিতে আঘাত দেন তখন আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির সংক্ষুব্ধ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই ক্ষুব্ধ হওয়ার প্রতিক্রিয়া তিনি কীভাবে ব্যক্ত করবেন, তা নির্ভর করে কোন ধরনের সমাজে আমরা বাস করছি তার ওপর।

বর্তমানে আমরা যে ধরনের সমাজে বাস করছি, সেখানে ধর্মীয় অনুভূতিসম্পন্ন লোকের সংখ্যা বেশি এবং এ কারণে কোনও ব্লগার বা লেখক যখন ধর্মীয় (তা যে ধর্মেরই হোক না কেন) অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে কিছু লেখেন, তখন অনেকেই ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় এই সংক্ষুব্ধ হওয়ার প্রতিক্রিয়ায়।

কেউ হয়তো তার ধর্ম বা তার অবতার কিংবা সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে আপত্তিকর (সেটি যতই যৌক্তিক বা বিজ্ঞানসম্মত হোক না কেন) লেখা পড়ে মনে মনে কষ্ট পান; কেউ হয়তো এই কষ্ট বা ক্ষোভ অন্যের সঙ্গে শেয়ার করেন; কেউ হয়তো বলেন এসব লেখা উচিত নয়; কেউ আবার সম্ভব হলে লেখককে ব্যক্তিগতভাবে এসব না লেখার অনুরোধ করেন; আবার কেউ ওই লেখার প্রতিবাদে পাল্টা যুক্তি দিয়ে লেখেন; অর্থাৎ লড়াইটা তখন হয় বুদ্ধিবৃত্তিক- কলমে-কলমে। একটি সহনশীল ও গণতান্ত্রিক সমাজে এটিই স্বাভাবিক চর্চা। কিন্তু এর বাইরে অতি ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী, যারা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং কোনও ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার ধান্ধায় থাকে, তাদের প্রতিক্রিয়ার ভেতরে কোনও যুক্তি, তর্ক বা বিজ্ঞানের অবকাশ থাকে না। তাদের প্রতিক্রিয়া অস্ত্রে। সুতরাং কলমের সঙ্গে তখন অস্ত্রের একটা অসম যুদ্ধ শুরু হয়। এটি ওই অর্থে যুদ্ধও নয়। ফলে এখানে রাজীব হত্যা মামলার বিচারকের সেই  প্রশ্নটিই ঘুরেফিরে আসে, ‘কেউ কিছু লিখলেই তাঁকে মেরে ফেলতে হবে?’

আইনের শাসন

কেউ কিছু লিখলেই যেহেতু তার অর্থ তাকে মেরে ফেলা নয়, সুতরাং এ যাবত যারা লেখালেখির কারণে খুন হয়েছেন, তা যে ধরনের লেখাই হোক না কেন- সেই খুনের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এবং এই বিচার প্রক্রিয়ায় কোনও ধরনের রাজনীতি বা পক্ষপাত কাম্য নয়। শুধু বাক স্বাধীনতা বা মুক্তচিন্তাই নয়, বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যও প্রতিটি হত্যার বিচার জরুরি। বছরের পর বছর ধরে আমরা এক ধরনের বিচারহীনতার মধ্যে বাস করছি বলেই ধর্মের দোহাই দিয়ে, নাস্তিক আখ্যা দিয়ে লেখকের কল্লা ফেলে দেওয়া হচ্ছে। আবার আমাদের সংবিধান বাক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিলেও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের অদ্ভুত ৫৭ ধারার করাতে আমাদের জিহ্বা কেটে নেওয়ার বিধান রয়েছে; যা কোনও অর্থেই গণতন্ত্র এবং একটি মুক্ত সমাজ গঠনের পক্ষে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।    

অতএব রাজীব হত্যার বিচারের মধ্য দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে আইনমন্ত্রী যে দাবি করেছেন, তাকে চূড়ান্ত অর্থে সত্য প্রমাণের জন্য অভিজিৎ, ওয়াশিক, অনন্ত, নিলাদ্রী এবং দীপন হত্যার বিচার হতে হবে। দীপনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক ‘বিচার চাই না’ বলে যে খেদ প্রকাশ করেছেন, তার সেই খেদ নিরসনে রাষ্ট্রকেই বলতে হবে, ‘মি. হক, এই যে দেখুন, আপনার সন্তানের হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে। বিচার পাবেন না বলে আপনি যে বিচার চাননি, সেই বিচার রাষ্ট্র নিশ্চিত করেছে।’ আইমন্ত্রীকে তখন রাজধানীর পরিবাগে সুপারনিউমারারি এই অধ্যাপকের বাসায় গিয়ে তার কাঁধে হাত রেখে বলতে হবে, ‘স্যার, আপনার সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে পারব না। কিন্তু যারা আপনার সন্তানকে হত্যা করেছে, এই দেখুন আজ তাদের সামনে ফাঁসির দড়ি।’ এই কথাটি যেদিন আইনমন্ত্রী বলতে পারবেন, তখনই এটি বলা যাবে যে, দেশে সত্যিই আইনের শাসন কায়েম হয়েছে। এবং শুধু লেখক-ব্লগার বা প্রকাশকই নয়, অন্য সব হত্যারও বিচার হতে হবে। বিচারহীনতার যে ভয়ঙ্কর সংস্কৃতি আমরা চালু করেছি, তার অবসান ঘটাতে হবে। নইলে আজ অভিজিত কাল দীপন… এভাবে চলতেই থাকবে এবং একটা অদ্ভুত ভয়ের সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে যেতে যেতে এই সমাজ আর পথ খুঁজে পাবে না। একটা অন্ধগলির ভেতরে খাবি খাবে।

অতএব রাষ্ট্রকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, এখানে মত প্রকাশের জন্য আর কাউকে প্রাণ দিতে হবে কিনা। রাষ্ট্র নাগরিকের কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করবে নাকি তার জিহ্বার সামনে সব সময়ই একটা ৫৭ ধারার করাত ঝুলিয়ে রাখবে এবং ডিজিটাল সিকিউরিটির নামে নাগরিককে সব সময়ই একটা ভয়ের মধ্যে রাখবে?

লেখক : যুগ্ম বার্তা সম্পাদক ও উপস্থাপক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ