ইরান-মার্কিন দ্বন্দ্ব: শেষ হইয়াও হইলো না শেষ

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১১:৪৫, জানুয়ারি ১৯, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪৬, জানুয়ারি ২৪, ২০১৬

Anis Alamgirগত বছর ছয় জাতির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে ইরান তার আণবিক শক্তি কমানোর সব পদক্ষেপ যথাযথভাবে গ্রহণ করায় এবং এ বিষয়টা আন্তর্জাতিক পরমাণু জ্বালানি সংস্থা নিশ্চিত করার পর পরই আমেরিকা, জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের ওপর তাদের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিল।
ইরান এ ঘোষণার পর-পরই ওয়াশিংটন পোস্টের সংবাদদাতা জ্যামন সহ পাঁচ আমেরিকানকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়েছে একই সঙ্গে আমেরিকার প্রসিকিউটর নিষেধাজ্ঞা লংঘনের অভিযোগে আটক ৭ জন ইরানীকে ক্ষমা মঞ্জুর করেছে। এমন একটা মুহূর্তে পুনরায় আমেরিকা ঘোষণা দিয়েছে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপনাস্ত্র কর্মসূচি আঞ্চলিক এবং বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এর ওপর আন্তর্জাতিক অবরোধ বহাল থাকবে। ১৭ জানুয়ারি ২০১৬ গভীর রাতে এ ঘোষণা এসেছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সন্ত্রাসবাদ ও অর্থনীতি বিষয়ক গোয়েন্দা বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি এডাম জে. সুবিন এর পক্ষ থেকে। আমেরিকার স্থপতিদের অন্যতম ও আমেরিকার দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট অ্যাডামস্ বলেছিলেন, ‘ধ্বংস করার জন্য দানবের সন্ধানে আমেরিকার বাইরে দৌড়ানো সঙ্গত হবে না। অথবা উচিৎ হবে না বিশ্বের নির্দেশক হতে চাওয়া।’ জজ ওয়াশিংটন তার বিদায় ভাষণে ইউরোপীয় শক্তিসমূহের কলোনি স্থাপনে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত সৃষ্টিকে ভাল চোখে দেখেননি। তাই তিনি আমেরিকাকে ইউরোপের সংঘাতময়তা ও খেয়াল-খুশির সঙ্গে মিশিয়ে না ফেলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। স্থপতিদের সব পরামর্শ মান্য করা পরবর্তী নেতাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অমান্য করতে গিয়ে তারা আমেরিকাকে বহু ব্যয়বহুল বিলাসেও জড়িয়েছে।

সাদ্দামের পতন পর্যন্ত ইরাকের পেছনে আমেরিকার সর্বমোট ব্যয় হয়েছিলো ২৫ হাজার কোটি ডলার। প্রেসিডেন্ট ওবামা তার ‘দ্যা অ্যাডিসিটি অব হোপ’ গ্রন্থে হিসাব প্রদান করে বলেছেন ঋণের সুদ এবং যুদ্ধাহতদের জন্য ব্যয় হিসেব করা হলে নাকি এ জন্য আরও কয়েক হাজার কোটি ডলার ব্যয় হবে। আর ইরাকের একাউন্ট আজ পর্যন্ত হিসেব কষলে সম্ভবতো খরচের হিসাব লক্ষ-কোটি ডলারে গিয়ে পৌঁছাবে। অকারণে ঋণ করে অকারণে খরচ করার এ এক অদ্ভুত দেশ। রুজভেল্টের ‘মনরো ডকট্রিন’ এ বলা হয়েছিলো যে সব সরকার আমেরিকার পছন্দ হবে না তাদেরকে আমেরিকা ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিতে পারবে। এটা ছিলো শুধু দক্ষিণ আমেরিকার ব্যাপারে সীমাবদ্ধ কিন্তু ‘বুশ ডকট্রিন’ এর পরিধি হচ্ছে সম্পূর্ণ বিশ্ব। দেশে দেশে রক্ষিতাশ্রেণির সরকার প্রতিষ্ঠাই আমেরিকার উদ্দেশ্য। এ জন্য যত সব কলা-কৌশল।

এক সময়ে ইরাকের সঙ্গে খুবই বন্ধুত্ব, সাদ্দামের সঙ্গে হট-লাইনে পর্যন্ত স্থাপন করা হলো, ইরাককে অকাতরে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা হলো, দীর্ঘ ৮ বছর উৎসাহ দিলেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে, ইরানের এক ইঞ্চি জমি দখল করতেও পারলেন না সাদ্দাম। প্রাচীনকালে পারস্য (ইরান) ও রোমানরাই ছিল বিশ্বের সুপার পাওয়ার। হয়ত তারা গৌরব হারিয়েছে কিন্তু ধুলার সঙ্গে তো মিশে যায়নি।
দীর্ঘ ৫৬ বছর পর  কিউবার সঙ্গে আমেরিকার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। সবার মনে আশা জেগেছিল—সম্ভবত আমেরিকার শুভবুদ্ধির সূচনা হয়েছে। তারা ধীরে-ধীরে হয়তো সব সমস্যার সমাধান করবে। গত বছর নিরাপত্তা পরিষদের ৫ স্থায়ী সদস্য ও জার্মানি যখন উদ্যোগী হলো ইরানের আণবিক শক্তি বিকাশ সম্পর্কিত আলোচনায়, তখন ইরান কোনও অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে দিল না। তারা সম্মত হলো- যতদূর অগ্রসর হয়েছে, প্রয়োজনে সিদ্ধান্ত অনুসারে যতদূর পিছিয়ে যেতে হয়, ততদূর পিছিয়ে যাবে।  এ সম্পর্কে ভিয়েনায় চুক্তি সম্পাদন করা হলো। আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার ক্লিয়ারেন্সের পর জাতিসংঘ, আমেরিকা আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের প্রবর্তিত অবরোধ প্রত্যাহের কথা ঘোষণা দিল। বিশ্ববাসী মনে করল যে আরেকটা সমস্যার সমাধান হলো। কিন্তু  ২৪ ঘণ্টা যাওয়ার আগেই ব্লাস্টিক মিসাইলের প্রশ্ন উপস্থাপন করে আমেরিকা পুনরায় অবরোধ আরোপ করল ইরানের ওপর। ইরানের দশ হাজার কোটি ডলারের সম্পদ আটকানো রয়েছে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাতে। যা ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে চুক্তিতে সবাই সম্মত হয়েছিল। সম্ভবত এখন সে সম্পদ আর ছাড়বে না। সৌদি আরব বার বার তার উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। আটকানো ফান্ড ছেড়ে দিলে নাকি মধ্যপ্রাচ্যকে ইরান ভারসাম্যহীন করে ফেলবে।
সৌদির বাদশাহরা এতদিন ভ্যাটিকান সিটির পোপের মতো ছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ক্ষমতাসীন বাদশাহ সালমান সুন্নিদের নেতা হওয়ার অভিলাষে মাঠে নেমেছেন। ইয়েমেনে তিনি হস্তক্ষেপ করছেন এবং সৌদি বিমানবোমা বর্ষণ করছে ইয়েমেনে। এক শতাংশ সফলতাও নেই ইয়েমেনে। আবার ৩৪টি সুন্নি রাষ্ট্র নিয়ে একটা জোট গঠনেরও চেষ্টা করছেন। ৩ জন শিয়া নেতা ও ৪৪ জন আল-কায়েদার  শিরশ্ছেদ করেছে কয়েকদিন আগে। আল-কায়দার লোকেরা সুন্নি। শিয়া নেতা নিমর আল নিমর সৌদি আরবে যে ২০ শতাংশ শিয়া রয়েছেন, তাদের নেতা ছিলেন। আল-কায়েদা হুমকি দিয়ে বলেছে, তারা সৌদিতে তুলকালাম কাণ্ড ঘটাবে। সম্ভবত শিয়ারাও এখন বাদশাহর বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। আমেরিকা সম্ভবত তার এজেন্ট স্টেট সৌদিকে সন্তুষ্ট করার জন্যই পুনরায় ইরানের ওপর অবরোধ আরোপ  করেছে।

নেপোলিয়নই অবরোধ অস্ত্রটার স্রষ্টা—তিনি তার সময়ে নিজের সুবিধার জন্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ওপর অবরোধ আরোপ করতেন। এমনকি মহাদেশীয় অবরোধ পর্যন্ত আরোপ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত নেপোলিয়ান তার নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব হারিয়ে ওয়াটার লুর যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সেন্ট হেলেনায় নির্বাসিতজীবন অতিবাহিত করার সময় মৃত্যুবরণ করেছিলেন। সম্ভবত আমেরিকার জন্য ফ্রান্সের নেপোলিয়নের চেয়ে করুণ পরিণতি অপেক্ষা করছে। আমেরিকার যথেচ্ছাচারে গোটাবিশ্বই বিরক্ত। এখন আমেরিকা বেঁচে আছে ধার করা নিশ্বাস আর ধার করা অর্থের ওপর। এখন আমেরিকার উচিত সব অপকর্ম ছেড়ে নিজের প্রতি মনযোগী হওয়া। আমেরিকার অর্থনীতি যদি বিধ্বস্ত হয়ে যায়, তবে বিশ্বেরও অপূরণীয় ক্ষতি হবে। বটবৃক্ষের পতন হলে মেদেনি তো কাঁপেই।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anisalamgir@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ