behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

অন্যরকম শিক্ষার সন্ধানে: টাচ! নো টাচ!

ফারহানা মান্নান১২:১০, জানুয়ারি ২১, ২০১৬

ফারহানা মান্নানহ্যামিলটন পাবলিক লাইব্রেরিতে আর্লি চাইল্ডহুড পর্যায়ের (৩ থেকে ৮ বছর) শিশুদের জন্য গ্রীষ্মকালীন সময়ে ‘রিডিং বাডিজ প্রোগ্রাম’ বলে একটা কার্যক্রম হতো। দেড় মাসের এই ভলান্টিয়ার প্রোগ্রামে আমি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছিলাম। কাজটা ছিল গল্প পড়ে শোনানো আর উদ্দেশ্য ছিল ওই পর্যায়ের শিশুদের মধ্যে ভাষাগত দক্ষতা তৈরি করা। কার্যক্রম শুরুর আগে একটা সতর্কপত্র সাইন করতে হয়েছিল। ওতে লেখা ছিল, ওই বয়সের বাচ্চাদের সঙ্গে কি করা যাবে আর কি করা যাবে না। বিশেষভাবে উল্লেখ ছিল, কোনও মতেই বাচ্চাদের গায়ে হাত দেওয়া যাবে না। নিষেধাজ্ঞার কারণ ছিল যাতে করে স্পর্শের মধ্য দিয়ে তাদের মধ্যে কোনও রোগ জীবাণু প্রবাহিত না হয়।
২০০৬ সালে ওটা আমার জন্য একটা অভিজ্ঞতাই ছিল। এরপরে প্রায় আড়াই বছর কানাডায় ছিলাম। কখনই মনে করতে পারি না ভুলেও কোনও কানাডিয়ান শিশুকে স্পর্শ করেছি। এরপর দেশে ফিরে এসে সেই নিয়মটা অত কড়াকড়িভাবে পালন করার প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু ২০১৬ সালে ভারত ভ্রমণে এসে আবার সেই নিয়মের সঙ্গে নতুন করে মোলাকাত হয়ে গেল (মাঝখানে বহুবার বহুদেশ ভ্রমণে গিয়েছি কিন্তু স্পর্শ না করার নিয়মটি আর সামনে আসেনি) একটু অন্যভাবেই।
এক বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে তার ক্লাস ফোরে পড়ুয়া সুন্দর, স্মার্ট, সদা হাসিমুখ ছেলেটিকে বড় ভালো লেগে যায়। ছেলেটিকে অসংখ্য আশির্বাদের স্পর্শে যখন ভরিয়ে দিচ্ছিলাম তখন লক্ষ করলাম ছেলেটি বেশ সংকোচিত বোধ করছে। আমার কাজের ক্ষেত্র শিক্ষা। আর সম্প্রতি আর্লি চাইল্ডহুড নিয়ে নতুন করে একাডেমিক শিক্ষাও শুরু করেছি। কাজেই আমার ভীষণ কৌতূহল হলো, মনে হলো ব্যাপারটা কি? ওর অভিভাবকের সঙ্গে আড্ডা শেষে বিদায় সময় বললাম, বাবা ‘গিভ আন্টি অ্যা হাগ’। শুনে দৌড়ে পালাল ও। ছেলেটির বাবা তখন বললেন, ওদের স্কুলে এখন ‘গুড টাচ আর ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে শেখানো হচ্ছে।
শিশুদের সেক্সচুয়ালি অ্যাবিউজ হওয়া, ভারতের একটি প্রধানতম সমস্যা। ভারতের সার্ভে অনুযায়ী এই সকল অ্যাবিউজের ঘটনায় সাধারণত পরিচিত আত্মীয়-স্বজনরাই দায়ী থাকেন। ওখানে প্রতি ৩ জন ধর্ষিতের মধ্যে ১ জনই হচ্ছে শিশু। যাহোক তবু এই সকল বিষয়ে ভারতে সমীক্ষার কিছু রিপোর্ট পাওয়া যায় কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি ভিন্ন। ইউনিসেফের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে এই সকল ঘটনার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘটনা প্রকাশই হয় না।    

আমাদের দেশে, সমাজে- শিশুদের হাত বুলিয়ে, স্পর্শ করে বা জড়িয়ে আদর করতে কোনও নিষেধাজ্ঞার কথা শুনিনি, স্কুলে চাকরি করার সময়ও নয়। তবে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে শিক্ষকদের-বাচ্চাদের (বিশেষ করে স্কুলে নতুন ভর্তি হওয়া বাচ্চাদের) সাথে আচরণের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে সেটা নির্ভর করে আপনি কত আধুনিক স্কুলে পড়ছেন তার ওপর। গ্রামের সাধারণ স্কুল, এমনকি শহরের সাধারণ স্কুলগুলোতেও কিন্তু এ বিষয়ে কোনও আলোচনা হয় না বা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। কিন্তু এ বিষয়ে আলোচনা হওয়া চাই এবং প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন আছে। এই বিষয়ে স্কুল তাদের শিক্ষকদের বোঝাতে পারেন। তবে খুব ভালো হয় যদি সকল অভিভাবক তাদের সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের মধ্য দিয়ে বিষয়টি তাদের সন্তানদের বোঝান। শিক্ষকরাও এই বিষয়ে কথা বলতে পারেন তবে বোঝানোর দক্ষতা না থাকলে এই বোঝানোটা হয়ে যাবে রুটিন কথা। এক্ষেত্রে শিশুদের মধ্যে একটা অহেতুক ভয় তৈরি হতে পারে। যেহেতু শিশু বয়সে কোনও মানুষের স্পর্শে অসৎ উদ্দেশ্য বোঝা সম্ভব নয়। কাজেই দেখা যেতে পারে একমাত্র বাবা-মা বাদে বাকি সকলের সম্পর্কেই তাদের মধ্যে একটা ভয় তৈরি হয়েছে। 

এই বয়সে বাচ্চাদের বলা যায় যে- ‘অপরিচিতের সাথে কথা বলবে না’। কিন্তু খুব অল্প বয়সে যদি বাচ্চাদের ওপেন ডিসকাশনের মাধ্যমে এই স্পর্শ নিয়ে বোঝানো হয় তাহলে বাচ্চার স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে একটা নেতবাচক প্রভাব পড়েই। যেহেতু সেক্সচুয়াল হ্যারাসমেন্ট নিকটজনদের কাছ থেকেই সব থেকে বেশি হয়, তাই শিশু বয়সে পরিবারের মানুষ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার জন্ম নিলে সুস্থ সামাজিক বন্ধন তৈরির ক্ষেত্রে সেটা হবে বড় রকমের বাধা।

আসলে অভিভাবকদের চাইতে বড় কিছুই হয় না। সেটা শেখানোর ক্ষেত্রে আর নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রেও। একই সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। স্পর্শের কথা, সমাজিক বিধি বা বয়ঃসন্ধিকালের কথাই বলুন না কেন, শেখানোর ক্ষেত্রে অভিভাবকই শেষ কথা।

নিজের শৈশবের একটা ঘটনা খুব মনে পড়ছে। ছেলেবেলায় আমার এক আত্মীয়ের বন্ধু প্রায়ই আসা যাওয়া করতেন। ভাগ্নি পরিচয়ে স্পর্শের ক্ষেত্রে একটা অস্বাভাবিকতা সেই সময়ই টের পেয়েছিলাম। কিন্তু এই কথা মাকে কখনওই বলা হয়নি। যখন এই লেখাটি লিখেছি, সে সময় পর্যন্ত কাউকেই নয়। মেয়ে বলে মনে হতো, মেয়ে হলেই এগুলো সহ্য করতে হয়। কিন্তু একটু বয়স হলে জানতে পেরেছি ছেলেদেরকেও ফিজিক্যালি অ্যাবিউজ করা হয়। যৌন শিক্ষা বিষয়ে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার ক্ষুদ্র সার্ভে চালিয়ে ছিলাম। সার্ভেতে দেখা গেছে ২৪ জন ছেলের মধ্যে ৩ জন ছেলে পারিবারিকভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এই ক্ষুদ্র রিপোর্ট দিয়ে পুরো বাংলাদেশের চিত্র বোঝানো সম্ভব নয়, তবু এই ক্ষুদ্র সার্ভে থেকে বোঝা যায় যে মুখে না বললেও আমাদের সমাজে মেয়েদের পাশাপাশি বহু ছেলেই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। আর এর শুরুটা হয় ওই স্পর্শ থেকেই।

এখন আমরা যারা সুন্দর দালানে বসবাস করি তাদের জন্য সন্তানদের নিরাপত্তার বিষয়টা নিশ্চিত করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। কারণ শহরের বাইরে একজন স্বল্প শিক্ষিত মায়ের কথা ভাবুন। ভাবুন শহরের ছিন্নমূলদের কথা। ভাবুন সেই সব মানুষদের কথা যারা বস্তিতে থাকে! সেখানে কে কাকে বোঝায়?

এ ব্যাপারে যথেষ্ট প্রচারণা চালালে হয়তোবা এই সকল মানুষ কিছু হলেও এ সম্পর্কে জানতে পারবেন কিন্তু তাতে বাস্তব অবস্থায় কতখানি পরিবর্তন আসবে বলা যায় না। কিন্তু চেষ্টা করা যেতেই পারে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর প্রায় সকল অনুষ্ঠান জুড়েই থাকেন তারকারা। আমরা তাদের নাটকে দেখি, বিজ্ঞাপনে দেখি, সাক্ষাৎকারে দেখি, দেখি বিনোদনমূলক সকল অনুষ্ঠানগুলোতে। এখান থেকে একটি অনুষ্ঠানের সময় যদি শিশুর বেড়ে ওঠার বিষয়ে অভিভাবকদের দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা হয় তাহলে আর যাই হোক চ্যানেল নিশ্চয়ই বন্ধ হয়ে যাবে না! টেলিভিশনের পাশাপাশি রেডিও চ্যানেলগুলোও এই বিষয়ে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে। দূরপাঠের মাধ্যমেও এই বিষয়ে অভিভাবকদের শিক্ষা দেওয়া সম্ভব। এমনকি বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমেও এই বিষয়ে শেখানোও যেতে পারে এমনকি প্রচারণাও চালানো সম্ভব। তবে স্পর্শ করা বা না করার বিষয়টি বেশ স্পর্শকাতর। এই বিষয়ে প্রচারণা চালানোর ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করা চাই। যারা প্রচারণা চালাবেন তাদেরকেও এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে পারলে ভালো।

সুযোগ এবং সুবিধার ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে। সীমাবদ্ধতা আছে অন্যান্য দেশেও। পৃথিবীর বহু দেশ চাইল্ড রাইটস নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। সীমাবদ্ধতা আছে সেখানেও। কাজেই সীমাবদ্ধতাই প্রকৃত বিষয় নয়। আসল কথা হলো ইচ্ছা শক্তি আর বদলে দেওয়ার মানসিকতা। দেশের প্রতিটি শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াটা আমাদের সকলের প্রত্যাশা হওয়া উচিত। কাজেই সুরক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে গল্পের মতো করেই শিশুদের ভালো স্পর্শ, খারাপ স্পর্শ সম্পর্কে ধারণা দিন। মনে রাখবেন সচেতনতা তৈরিই হচ্ছে মূল উদ্দেশ্য, আতঙ্ক তৈরি করা নয়। কারণ একটি সতর্ক সমাজ চাই, বিকৃত মানুষ আদৌ নয়!  

লেখক: শিক্ষা বিষয়ক গবেষক

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ