behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

রেল: চলছে চুরি, বাড়ছে ভাড়া

শুভ কিবরিয়া১৭:৪৬, জানুয়ারি ২২, ২০১৬

Shuvo Kibriaসরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে পরিবহনে যাত্রী ভাড়া এবং পরিবহন ভাড়া বাড়াবে। সরকারের হিসাবে এ ভাড়া বাড়ানো হবে মাত্র শতকরা সাড়ে সাত ভাগ। সরকারের যুক্তি দুটি-
এক:
বছর তিনেক আগে রেল ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল। তিন বছর পেরিয়ে গেছে। অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে দেশ। অর্থনীতির বাড় বেড়েছে। মানুষের আয় বেড়েছে। সুতরাং ভাড়া বাড়ানো চাই-ই চাই।
দুই:
সরকারের যুক্তি হচ্ছে ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে মাত্র সাড়ে সাত শতাংশ। তিন বছর পর এই সামান্য হারে ভাড়া বাড়ালে মানুষের ওপর চাপ এমন কিছু বাড়বে না।
সরকার এসব যুক্তির ওপর জোর দিয়ে রেলওয়ের ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু বাস্তব তথ্য হচ্ছে, রেলের চুরি বাড়ছে। লোকসান বাড়ছে। লোকসানের কথা বলা হয় বটে, কিন্তু এ লোকসানের নেপথ্যে গল্পটি হচ্ছে চুরি। আয়ে চুরি, ব্যয়ে চুরি। সর্বত্র চুরি। শেষে এসে লোকসানের নাম নেয় মাত্র। তো রেলওয়ের এই লোকসানের চেহারাটা একবার দেখা যাক।
২০০৯-২০১০ সালে রেলওয়ের বার্ষিক লোকসান ছিল ৭৫৮ কোটি টাকা। ২০১১-১২তে তা এসে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকায়। ২০১২-১৩’তে তা ৮৮১ কোটি, ২০১৩-১৪তে ৮০৩ কোটি এবং ২০১৪-১৫ তে দাঁড়ায় ৯০০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ গত অর্ধযুগে রেলওয়ের আর্থিক লোকসান বছরে ছিল সর্বনিম্ন ৭৫৮ কোটি টাকা এবং সর্বোচ্চ ছিল ১৫৫০ কোটি টাকা। এখন বলা হচ্ছে, রেলের খরচও বেড়েছে বছরে ৪৫ কোটি টাকা। খরচ ও লোকসান দুটোই বাড়ছে বলে সেই ঘাটতি পূরণ করতে রেলওয়ের ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সরকার।

রেলওয়ের ভাড়া ২০১২ সালে বাড়ানো হয়েছিল প্রায় ৫০ শতাংশ। ইতোমধ্যে রেলওয়েতে ভর্তুকি তুলে নেওয়া হয়েছে। কাজেই রেলওয়ের লোকসানের ভার কমাতেই ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

কিন্তু এই দাবি কি যৌক্তিক?

বাংলাদেশ রেলওয়েতে সর্বত্র যে কালো বিড়ালের দাপট, তা না কমিয়ে, অসৎ চক্রের চুরি বন্ধ না করে ভাড়া বাড়িয়ে চুরির ক্ষতি পুষিয়ে দেবার এই তত্ত্বের আড়ালে আসলে কী কাজ করছে?

প্রথমত,

আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ একটি অসৎ চক্র দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়েকে অবহেলা করতে শিখিয়েছে। রেল যোগাযোগ পরিবেশ বান্ধব, অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী এবং একসঙ্গে বহু মানুষ ও বহু মালামাল পরিবহন করতে পারে বলে পৃথিবীর সর্বত্র রেলখাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও বাংলাদেশে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। এখানে সড়ক যোগাযোগকে প্রাধান্য দিতে অসাধু চক্র সক্রিয় ছিল। তারা পরিকল্পিতভাবে রেল ও নৌ-পথকে নানা উপায়ে সংকুচিত করেছে।

দ্বিতীয়ত,

রেলপথে মালামাল পরিবহন অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী বলে, এখানে পরিকল্পিতভাবে সুশাসন নষ্ট করা হয়েছে। ফলে, সময়মতো ট্রেন চলে না। মালামাল যথাসময়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছায় না। মালামাল পরিবহনের সময় মালামালের চুরি হয়। যে কারণে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে অনেকেই এখন রেলপথকে পরিহার করে।

তৃতীয়ত,

রেলপথ লাভবান হয় মূলত মালামাল পরিবহন করেই। অন্য কৌশলে রেলওয়েতে এই সুযোগটি ধ্বংস করা হয়েছে। চুরি, দুর্নীতি, সুশাসনের অনুপস্থিতি রেল ব্যবস্থাকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করায় রেলপথে যাত্রী যাতায়াত ও মালামাল পরিবহন কমেছে।

চতুর্থত,

রেলের রাজস্ব আয় কমেছে। যে কোনও রেলরুটে ভ্রমণ করলে দেখা যাবে টিকিট কেটে রেলে চড়ার চাইতে, স্থানীয়ভাবে চেকারদের নগদ পয়সা দিয়ে চলা লাভজনক। টিকিট চেকাররাও এটাকেই উৎসাহিত করে। অর্থাৎ চুরির ক্ষেত্রে দুপক্ষই উৎসাহী। রেলওয়েতে এই চোর চক্রের সিন্ডিকেট নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত বিস্তৃত।

পঞ্চমত,

সড়ক, নৌ, আকাশপথে পরিবহনখাত এখন প্রায় অনেকাংশেই বেসরকারি ব্যক্তিখাতের হাতে ন্যস্ত। রেলওয়ে খাতই মোটামুটি পাবলিক খাত। অর্থাৎ এখানে ব্যক্তিখাতের উপস্থিতি খুবই সামান্য। সুতরাং পাবলিক খাত যাতে বিন্যস্ত না হয়, জনকল্যাণে সাশ্রয়ী খরচের এই খাত যাতে বিকশিত না হয়, তার চেষ্টা দীর্ঘকাল চলেছে। ক্রমাগত ভাড়া বাড়িয়ে, চুরি অব্যাহত রেখে, সুশাসন নষ্ট করে সেই চেষ্টাই এখনও চলছে।

 

তিন:

সারা পৃথিবীতে তেলের দাম কমছে। বাংলাদেশে কমেনি। কেননা কম দামে তেল কিনে বেশি দামে বিক্রি করে সরকার যে বাড়তি আয় করছে, সেই টাকা সরকার ঢালছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান পূরণে। এই লোকসানের একটা বড় অংশ দুর্নীতিঘটিত। সুতরাং তত্ত্ব হচ্ছে, তেলের দাম বাড়িয়ে চুরির ব্যয় মেটানো। রেলওয়ের ক্ষেত্রেও সরকার একই নীতি নিয়েছে। রেলওয়ের আয়ের বিবিধ উৎস রয়েছে। পরিকল্পনা নিয়ে চোরচক্রের হাত থেকে রেলওয়েকে বাঁচাতে পারলে, নানা উপায়ে রেলের আয় বাড়ানো যেতে পারে। এখনও সেরকম অনেক সুযোগ আছে

ক.

রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ জমি ও সম্পদ বেহাত, বেদখল ও অব্যবহৃত আছে। এই সম্পদ উদ্ধার করা যেতে পারে। এই সম্পদের বিকল্প ও বাণিজ্যিক ব্যবহার করলে রেলওয়ের যে প্রচুর আর্থিক সম্পদ মিলবে তা রেলের উন্নয়নে ব্যবহার করা যেতে পারে।

খ.

রেলের ব্যবস্থাপনায় আধুনিকতা আনা যেতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ে ট্রেন চালিয়ে সেবার মান উন্নত করতে পারলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের আয় বাড়বে। টিকিট বুকিং, টিকিট বিক্রি, টিকিট চেক সর্বত্র প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে আধুনিক ব্যবস্থাপনা আনলে রেলের উপর জনগণের আস্থা বাড়বে। সেটাই রেলকে লাভজনক করতে যথেষ্ট।

গ.

রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ অডিট আপত্তি আছে। প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি করা যেতে পারে। রেলওয়ের জনবল শূন্যের সংখ্যাও বিপুল। অনুমোদিত পদের বিপরীতে রেলওয়েতে শূন্য পদের সংখ্যা ১২ হাজার ৭২৯। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির পদ ১০২টি, দ্বিতীয় শ্রেণির পদ ৪০৯টি শূন্য আছে। এ পদগুলো যোগ্য প্রার্থীদের দ্বারা পূরণ করলে রেল সেবার মান বাড়বে। যা রেলওয়ের লাভজনক সংখ্যায় পরিণত করতে সহায়তা করবে।

ঘ.

রেলওয়ের  লক্ষ্য হচ্ছে ব্যয়সাশ্রয়ী বা কস্ট ইফেকটিভ এবং সময়ানুবর্তীতা (টাইম ইফিসিয়েন্ট) পরিবহন সেবা নিশ্চিত করা। একটা ন্যায়ানুগ পরিকল্পনার আওতায় রেলওয়েকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারলে রেলওয়েই হতে পারে দেশের সেরা পরিবহন খাত। রেলওয়ের সেই অবকাঠামো বিদ্যমান। শুধু পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলেই এ সুযোগ জনগণ পেতে পারে।

চার:

এ সরকার রেলওয়েকে আলাদা মন্ত্রণালয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এখন দরকার বাস্তব কর্মসূচি। রেলওয়েতে দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ইতোমধ্যে রেলওয়ের অনেক অবকাঠামো সংকুচিত করতে হয়েছে। ১৮৬২ সালের ১৫ই নভেম্বর ভারতীয় উপমহাদেশের এ অংশে রেলওয়ের শুভ সূচনা হয়। দেড় শতবর্ষী পুরনো এই পরিবহন ব্যবস্থা এখন এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ হাজার ৮ শত ৭৭ দশমিক ১০ কিলোমিটার নেটওয়ার্কে। ব্রডগেজ, মিটারগেজ, ডুয়েলগেজ এই তিন স্তরে বিন্যস্ত রেলওয়ের এখন ভগ্নদশা। নিয়োগ, পদোন্নতি, ব্যবস্থাপনাসর্বত্র দুর্নীতি রোগে আক্রান্ত রেলওয়ে। এটি যেমন একটি অবস্থা তেমনি রেলওয়ে যাতে বিকশিত না হয় সেজন্য ব্যক্তিখাত ও সড়কপথের প্রমোটাররাও দুষ্ট চক্রের অসাধু পরিকল্পনাকে উৎসাহিত করতে আগ্রহী। ফলে ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি রোধের কোনও বাস্তবিক পদক্ষেপ না নিয়েই রেলওয়ের ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

পাঁচ:

ইউরোপসহ পৃথিবীর অনেক জায়গায় রেল ব্যবস্থাকে আধুনিক করে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে এ খাতকে অধিকতর কার্যকর করা হয়েছে। পাশের দেশ ভারতে রেলওয়েকে লাভজনক সংস্থায় পরিণত করার চেষ্টা অবিরাম চলছে। সেখানে রেলওয়ের মর্যাদা কি বিশাল, তা বোঝা যায় রেলওয়ে খাতের সম্পূর্ণ আলাদা বাজেট প্রণয়নের নীতি দেখে। বাংলাদেশ যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় যোগাযোগের কথা ভাবছে, এশিয়াব্যাপী যে কানেকটিভিটির কথা ভাবছে সেখানেও রেলওয়ে হতে পারে সর্ববৃহৎ ব্যবসায় বান্ধব, পরিবেশবান্ধব ও আরামপ্রদ যোগাযোগ ব্যবস্থা।

সরকারকে এখন রেলওয়ে খাতের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তাই সুদৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। চুরি ও দুর্নীতি জিইয়ে রেখে একটা খাতকে জনপ্রিয় করা যায় না। তার সেবার মান বাড়ানো যায় না। চুরি কীভাবে কমানো যায়, সে দিকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। চুরি না ঠেকিয়ে ভাড়া বাড়িয়ে লোকসান কমানোর দুর্বল, অর্জনপ্রিয় এবং ব্যর্থ নীতি থেকে না সরলে রেলওয়ের সার্বিক সেবা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা আরও রসাতলে যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে জনগণ। লাভবান হবে কুচক্রী মহল।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক 

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ