behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

অবসরের পর রায় লেখা: একটি পর্যালোচনা

চিররঞ্জন সরকার১৩:৫২, জানুয়ারি ২৫, ২০১৬

চিররঞ্জন সরকার‘অবসরে যাওয়ার পর রায় লেখা সংবিধান পরিপন্থি’- প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার এ বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক ও আইন অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। ইস্যুর অভাবে রাজনৈতিকভাবে ধুঁকতে থাকা বিএনপির নেতানেত্রীরা যেন নতুন মওকা পেয়েছেন। এই দলের সমর্থক আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির বক্তব্যটি নিয়ে মাঠ গরম করার চেষ্টা করছেন। বিএনপিপন্থিরা বলছেন, প্রধান বিচারপতির বক্তব্য প্রমাণ করে, বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রী অবৈধ।সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হককে গ্রেফতারের দাবিও করেছেন তারা।
সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের মতামতের ভিত্তিতে অর্থাৎ বিভক্ত রায়ে ২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে আপিল বিভাগ। ওই রায়কে ভিত্তি ধরে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সংবিধান সংশোধন করে প্রথম মহাজোট সরকার, যাতে বিলুপ্ত হয় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয় ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বিলোপের পর, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়। জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। এর প্রতিবাদে ২০১৩ ও ২০১৪ সাল জুড়ে রাজপথে সহিংস বিক্ষোভ দেখায় বিএনপি-জামায়াত। এতে নিহত হয় বহু মানুষ, বিপুল সম্পদ নষ্ট হয়।
গত ১৬ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের একবছর পূর্তিতে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা বলেন, বিচারপতিদের অবসরে গিয়ে রায় লেখা আইন ও সংবিধান পরিপন্থি। কোনও কোনও বিচারক রায় লিখতে অস্বাভাবিক বিলম্ব করেন, আবার কেউ কেউ অবসর গ্রহণের দীর্ঘদিন পর পর্যন্ত রায় লেখা অব্যাহত রাখেন, যা আইন ও সংবিধান পরিপন্থি।
প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের উদ্যোগে জিয়াউর রহমানের ৮০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনাসভায় বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘তাহলে যে রায়ের রেফারেন্স দিয়ে আপনারা পঞ্চদশ সংশোধনী করলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে দিলেন; সেই রায় তো আজকের প্রধান বিচারপতির ভাষায় বেআইনি ও অসাংবিধানিক।’ প্রধান বিচারপতির ওই বক্তব্যের পর পঞ্চদশ সংশোধনী ‘বাতিলযোগ্য হয়ে গেছে’ এবং বাংলাদেশের জনগণও ‘তা-ই চায়’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি নেতা নজরুল। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন দাবি করেছেন, ‘ওই রায় যে অবৈধ ছিল’।
বাংলাদেশের মত রাজনৈতিক হানাহানিপূর্ণ দেশে আমাদের মাননীয় প্রধান বিচারপতি এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে এই মন্তব্য কেন করলেন, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কোনও কোনও বিচারক রায় লিখতে অস্বাভাবিক বিলম্ব করেন, আবার কেউ কেউ অবসর গ্রহণের দীর্ঘদিন পর পর্যন্ত রায় লেখা অব্যাহত রাখেন, যা খুবই সত্য কথা। এটা উচিত কর্ম নয়, এটাও মানতে হবে। কিন্তু তা ‘অবৈধ, আইন ও সংবিধান পরিপন্থি’ কথাটি কি ঠিক? প্রধান বিচারপতি এটা কী বললেন?

সত্যিই কী অবসরের পরে রায় লেখা অবৈধ? সংবিধান পরিপন্থি? বিষয়টি বাস্তবতার নিরিখে যাচাই করে দেখা দরকার। রায়ের সংক্ষিপ্ত রূপ তো আদালতে উপস্থাপন করেন বিচারকরা। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায় লিখতে হয় ৩শ’ থেকে ৮শ’ পৃষ্ঠায়। এই রায় পূর্ণাঙ্গ লিখতে হলে সেখানে সময়ের ব্যাপার রয়েছে। রায় ঘোষণা হলো আর পূর্ণাঙ্গ রায় লেখা হলো বিষয়টি এমন নয়। অবসরের পরে বিচারপতিদের রায় লেখার এই ট্রাডিশন তো দীর্ঘদিনের। এতে কোনও সমস্যা হয়েছে বলেও আমাদের জানা নেই। তাহলে প্রধান বিচারপতি মহোদয় এমন কথা কেন বলতে গেলেন?

মনে রাখা দরকার যে, যখন বিচারপতি রায় ঘোষণা করেন, তখন তিনি বিচারক হিসেবে শপথে ছিলেন। ঘোষিত তারিখের দিন হিসেবেই রায়ে সই করা হয়। এই চর্চা দীর্ঘদিনের। এ চর্চা ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে, এমনকি ইংল্যান্ডেও আছে। তা ছাড়া ‘অবসরের পর রায় লেখা যাবে না’ এমন কথা সংবিধানে লেখা নেই, এবং এই উপমহাদেশে এটা প্রথা বা নজির (Precedent) হিসেবে দীর্ঘদিন থেকেই চলছে সুতরাং এক অর্থে তো সেটা 'আইন' হয়েই গেছে।

প্রধান বিচারপতি যেভাবে একটি বিতর্কিত ইস্যু তুলেছেন, সেটা এভাবে বলা উচিত হয়েছে কি-না, সেটা নিয়েও প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। যদি প্রধান বিচারপতি মনে করেন অবসরের পর রায় লেখা যাবে না, তাহলে সুপ্রিম কোর্টের বিধিমালা সংশোধন করে এ বিধান যুক্ত করতে পারেন। তা না করে তিনি কেন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করলেন? প্রধান বিচারপতির বক্তব্য লুফে নিয়ে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে। এর পথ ধরে যদি দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয় তার দায় কে নেবেন? আমরা ঘর পোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলে তো আমাদের মনে ভয় জাগেই!

আগামীর জন্য যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থা, বিধিব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতেই পারে। এ জন্য প্রধান বিচারপতি অনেক উদ্যোগ নিতে পারেন। কিন্তু তাই বলে অতীতে মীমাংসিত বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা দায়িত্বশীল কারও কাছেই কাম্য হতে পারে না।

আমরা জানি, যথার্থ সভ্য সমাজে আইনপুস্তকের ঘা মেরে, নিত্যনতুন বিধিবিধান চালু করে কিংবা ধমক দিয়ে নাগরিককে নীতিবোধের শিক্ষা দেওয়া হয় না। নীতিনিষ্ঠা, সদাচার, কর্তব্যপালন, এগুলো পরিবার, সমাজ এবং কর্মক্ষেত্র থেকে মানুষ আত্মস্থ করে। রায় লেখার ক্ষেত্রে বিলম্ব দূর করতে প্রধান বিচারপতির মন্তব্য তাই উৎসাহ জাগায় না। আইন করে নতুন বিধি চালু করে যদি অসদাচরণ বন্ধ করা সম্ভব হতো, তবে বাংলাদেশ এই বিশ্বের সর্বাধিক শিষ্ট, নীতিনিষ্ঠ রাষ্ট্র হতো, সন্দেহ নেই।

রাজনীতির মঞ্চ, বিচারাঙ্গন থেকে শুরু করে সমাজের সবখানেই আসলে ঔচিত্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি। কোন কাজটি করা উচিত, আর কোনটি নৈতিকতার গণ্ডিতে ঠেকে যায় বলেই করা অনুচিত, এই বোধটির স্থান আইনের ঊর্ধ্বে। বস্তুত, কোনও আইন আদৌ ব্যবহার্য কি না, তা স্থির করবার মাপকাঠি এই ঔচিত্যবোধ।

অবসরের পর বিচারের পূর্ণাঙ্গ রায় যদি অসাংবিধানিক ও অবৈধ হয়, তাহলে তো দেশের বর্তমান শাসনতন্ত্র, শাসনব্যবস্থা, নিকট অতীতের রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর করা বেশ কিছু সিদ্ধান্ত অবৈধ হয়ে যায়। এখন কী উজান ঠেলে ‘বৈধ’ সব কিছু ফিরিয়ে আনা সম্ভব? যে মন্তব্য অনেক ক্ষতি, ক্ষত ও বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে, বিরোধী দলকে নৈরাজ্যমুখি হতে উস্কানি যোগাতে পারে, পুরো দেশের জন্য সর্বনাশের কারণ হতে পারে, তেমন মন্তব্য করা কি রাষ্ট্রের অতিশয় দায়িত্বশীল কোনও ব্যক্তির পক্ষে উচিত?

আরেকটি কথা। আইনের মূলে রয়েছে আদর্শ, নীতি। বাস্তবতার চাপে সেই নীতিকে কখনও বিসর্জন দেওয়া চলে না। একটি সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে কি না, তা কীসের ওপর নির্ভর করে? নীতিশাস্ত্রে সামাজিক নিয়ম এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, নিয়মাবলী যদি যথাযথ হয়, প্রতিষ্ঠানগুলো যদি উপযুক্ত হয়, তবে সমাজ ন্যায়সম্মত পথে চলবে। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান দর্শনবিদ জন রলস-এর তত্ত্বে এই অভিমতের সমর্থন আছে। কিন্তু এই মতটির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। যেমন, অর্থনীতি ও দর্শনের অধ্যাপক অমর্ত্য সেন তর্ক তুলেছেন, সমাজে কেবল নিয়ম ও প্রতিষ্ঠান যথাযথ হলেই ন্যায্যতার লক্ষ্য পূর্ণ হবে, এমন ভরসার সঙ্গত কারণ নেই, সামাজিক মানুষ বাস্তবিক কী রকম আচরণ করছেন, তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দর্শনশাস্ত্রের উচ্চমার্গে এই বিতর্ক কোন পথে চলবে, তার কী মীমাংসা হবে বা কোনও মীমাংসা হবে কি না, তা পণ্ডিতদের বিচার্য। কিন্তু এই আলোচনা থেকে জনজীবনের ওপর যে আলোকরেখা এসে পড়ে তার মূল্য বিস্তর। যারা জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বা যাদের ওপর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আরোপিত হয়, তাদের নৈতিকতা কি কেবল যথাযথ নিয়ম এবং প্রতিষ্ঠান দ্বারা নিশ্চিত করা যেতে পারে? তাদের ব্যক্তিগত সদাচরণই কি শেষ বিচারে সেই নৈতিকতার শর্ত নয়? এই সদাচরণ কি নতুন বিধিবিধান দ্বারা আরোপ করা সম্ভব?

আইন দিয়ে, ধমক দিয়ে, কিংবা নতুন বিধিবিধান চাপিয়ে সমাজের সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের কাউকে পরিবর্তন করার চেষ্টা কেবল করুণ নয়, নিতান্ত অশোভন।

লেখক: কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ