‘হট জিহাদি’

Send
হারুন উর রশীদ
প্রকাশিত : ১৯:৫১, জানুয়ারি ২৫, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৫৩, জানুয়ারি ২৫, ২০১৬

Harun Ur Rashid_01সহজ করার জন্য শিরোনামে দুটি শব্দ- ‘হট জিহাদি’। তবে আসল শব্দ হলো ‘জিহটিস’। প্রিয় পাঠক, এই ‘জিহটিস’ (jihotties) শব্দটি আপনাদের কাছে পরিচিত নাও হতে পারে। কারণ এই শব্দটি ‘নিউ অ্যারাইভাল’, বাজারে নতুন। এর সঙ্গে সম্পর্ক আছে জঙ্গিবাদের। এটা নাকি আইএস (ইসলামিক স্টেট) -এর নতুন কৌশল। নারীদের আইএস-এ টানার অভিনব পদ্ধতি। আর এই জিহটিস শব্দটি ‘হট’ এবং ‘জিহাদিস’ শব্দ দু’টির সন্ধি।
খবরটি প্রথম প্রকাশ করে মার্কিন সংবাদ মাধ্যম সিএনএন। আর এখন তাই ভাইরালের মতো বিশ্বের নানান দেশের নানান ভাষার সংবাদ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
খবরে বলা হয়েছে, তরুণীদের জিহাদে আকৃষ্ট করতে আইএস ‘সুদর্শন পুরুষ’দের ব্যবহার করছে। সুদর্শন ওই পুরুষদের আইএস ‘জিহটি’ বলে সম্বোধন করে। ‘জিহটি’রা তরুণীদের সামনে তাদের সুদর্শন পৌরুষের গৌরব নিয়ে আবির্ভূত হয়। তাদেরকে ইসলামের পথে আসার আহ্বান জানায়। আর তরুণীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হয়। তাদের বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তারপর জিহাদের পথে আহ্বান করা হয়। সিএনএন তাদের রিপোটে বলেছে, ব্লগে কথিত নারী জিহাদিদের সঙ্গে সুদর্শন জিহাদীদের সম্পর্কের গল্প ছড়িয়ে নারীদের আকৃষ্ট করার কৌশল নেওয়া হয়েছে।
‘বার্ড অব জান্না’ নামের একটি ব্লগের কথা উল্লেখ করে সিএনএন জানায়, ব্লগে লেখক হিসেবে শ্যাম নামের একজন নারীর পরিচয় দেওয়া আছে। সেই নারীর দাবি, তিনি পশ্চিমা এক দেশের বাসিন্দা ছিলেন। ইসলামের আদর্শে আকৃষ্ট হয়ে আইএস-এ যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং সিরিয়ায় পৌঁছার পর সুদর্শন এক জিহাদির সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়।
নিজের বিবাহিত জীবনের সুখ শান্তির বর্ণনা রয়েছে তার ব্লগে। ওই ব্লগ থেকে সিএনএন কথিত নারী আইএস সদস্য শ্যাম-এর কথা তুলে ধরেছে। শ্যাম জানায়, ‘কয়েক মিনিট পর আমি আমার চোখ  থেকে নিকাব সরাই। ও আমার দিকে তাকায়। আমাদের চোখাচোখি হতেই আমার হৃদয় আলোর চেয়ে দ্রুতবেগে দৌড়াতে শুরু করে।’
সিএনএন দাবি করেছে, ম্যাচ.কম নামের একটি ব্লগ সাইটে এই ধরনের ব্লগপোস্ট দেওয়া হয়, যা আদতে আইএসের নিজস্ব ব্লগসাইট। আইএস উদ্দেশ্যমূলকভাবে এ ধরনের ব্লগ লিখে তরুণীদের দলে টানার চেষ্টা করে।

সিএনএন-এর এই প্রতিবেদনে স্পষ্ট যে জিহটি’দেরও টার্গেট মার্কিন বা পশ্চিমা বিশ্বের নারী। তবে এই কৌশল নতুন হলেও পশ্চিমা বিশ্বেও নারীদের আইএস প্রীতির খবর নতুন নয়।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে সিরিয়ার আইএস-এ যোগ দেন ব্রিটিশ তরুণী আকসা মাহমুদ। তরুণী আকসার বাবা মুজাফফর মাহমুদ সিএনএনকে আকসার এসএমএস পড়ে শোনান। যেখানে লেখা আছে, ‘তোমার সঙ্গে আমার কেয়ামতের দিন দেখা হবে। আমি হাতে ধরে তোমাকে বেহেশতে নিয়ে যাব।’ আকসার মা খালিদা মাহমুদ আকসাকে ফিরে পেতে পাল্টা এসএমএস করেন। যেখানে তিনি লেখেন, ‘আকসা, আমার প্রিয় সন্তান, তুমি ফিরে আসো। তোমার অভাব আমাকে অসুস্থ করে ফেলেছে। তোমার আল্লাহর দোহাই তুমি ফিরে আসো। আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ কিন্তু আকসা ফিরে আসেননি।

স্কটল্যান্ডের কিংস কলেজের জঙ্গিবাদ বিষয়ক গবেষক মেলাইন স্মিথ ওই বছরই জানান, ‘আইএস জঙ্গিদের তৎপরতা শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২০০-এর অধিক পশ্চিমা তরুণী ওই ভয়াবহ কর্মকাণ্ডে নিজের যুক্ত করেছেন।’ সামাজিক গণমাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট এবং পোস্ট দেখে মেলাইন জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে ২১ জন ব্রিটিশ নারী আইএস-এ যোগ দিয়েছেন।

আর গত বছরের ২৭ জুলাই সালের গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে বলেছে, এ পর্যন্ত ৭০০ ব্রিটিশ নাগরিক আইএস-এ যোগ দিতে সিরিয়া ভ্রমণ করেছে। তাদের মধ্যে ১০০ জন ব্রিটিশ তরুণী।

ওই সময়ে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ব্রিটিশ তরুণীদের আইএস-এ যোগদানের আগ্রহ আতঙ্কে সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে কেন তারা আইএস-এ যোগ দিতে চায়।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ব্রিটেনে আইএস দম্পতিরাই তরুণীদের উদ্বুদ্ধ করছে। তাদের জিহাদী জীবনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।’

আইএস ২০১৩ সালে জিহাদ আল নিকা বা যৌন জিহাদের ধারণা চালু করে।  তখন নারীদের প্রতি আইএস যোদ্ধাদের যৌন সেবাদানের আহ্বান জানানো হয়। যাতে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে যেসব যোদ্ধা লড়ছেন তারা প্রেরণা পান। আশ্চর্য হলেও সত্য, তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে তখন মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ব্রিটেনসহ পশ্চিমা দেশগুলো থেকে নারীরা মধ্যপ্রাচ্যে যান আইএস মিশনে যোগ দিতে।

কয়েকদিন আগেই জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, ‘দমন পীড়ন নয় জঙ্গিবাদ দূর করতে হলে এর কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। মূলে হাত দিতে হবে। তাহলেই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা যাবে।’

সিরিয়া, ইরাকসহ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের  দেশগুলোতে যে প্রেক্ষাপটে আইএস বা জঙ্গিবাদের বিস্তার হচ্ছে সেই প্রেক্ষাপট কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে ইউরোপ আমেরিকায় নেই। তাহলে সেখানকার নারীরা কেন আইএস-এ যোগ দেবেন? পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম নারীদের আকৃষ্ট করার নানা ফাঁদের কথা বলছে, কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনও কারণ বলছে না। জানাচ্ছে না ঠিক কী কারণে পশ্চিমের আধুনিক নারীরা আইএসমুখী হচ্ছে।  জিহটিস-এ আকৃষ্ট হচ্ছে। অথবা যোগ দিচ্ছে যৌন জিহাদে।

কারণ? আমার মনে হয় শূন্যতা। আর এই শূন্যতার নানা ব্যাখ্যা আছে। আছে নানা তত্ত্ব। সেই ব্যাখ্যায় আজ আর যাচ্ছি না।

লেখক: সাংবাদিক

ইমেইল: swapansg@yahoo.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ