তেল নিয়ে তেলেসমাতি

শুভ কিবরিয়া১৯:০৫, জানুয়ারি ২৬, ২০১৬

Shuvo Kibriaআন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দারুণভাবেই কমেছে। বিশ্বব্যাপী তেলের বাজারের যারা চালক তাদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিযোগিতাই এর আপাত কারণ বলছেন অনেকে। কিন্তু অন্তরালে থাকছে রাজনীতি। তেল ও জ্বালানি নির্ভর আধুনিক বিশ্বঅর্থনীতিতে এই রাজনীতি কাজ করছে নানা উপায়ে।
তেলের বাজার নিয়ন্ত্রক দেশগুলোর সঙ্গে এবার মাঠে নামছে সদ্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া ইরান। সৌদি আরবসহ ওপেকভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে এবার ইরানের তেল বাজারে আগমন তেলের দামের এই ক্রমানবতিকে আরও নিচে নামাতে পারে। প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০৮ মার্কিন ডলার থেকে এসে দাঁড়িয়েছে ২৮ ডলারে। তেলের দাম কমানোর এই রাজনীতিতে নতুন খেলোয়াড় ইরান চাইবে রাজনীতি-অর্থনীতি সবক্ষেত্রে সৌদি আরবের প্রভাব কমাতে। সৌদি আরবসহ সৌদি মিত্ররা ইরানের সঙ্গে নতুন প্রতিযোগিতা গড়ে তুললে তেলের বর্তমান দাম আরও কমতে পারে। কেননা এর অন্তরালে বড় খেলোয়াড় হিসেবে গুটি চালছে খোদ আমেরিকার তেল উৎপাদনকারী শেল কোম্পানি।
এখন প্রধানত তেলের দাম কমিয়ে রেখে এর সুযোগ নিতে চাইবে আমেরিকা ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা। জ্বালানির দাম কমলে ইউরোপের অর্থনীতির বর্তমান স্থিতাবস্থা আরও মজবুত হবে। কিন্তু বেকায়দায় পড়বে রাশিয়া। কেননা রাশিয়ার অর্থনীতি তেল ও জ্বালানি নির্ভর। রাশিয়ান কতৃপক্ষের একটি হিসাব মতে আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের দাম যদি প্রতি ব্যারেল ৮২ মার্কিন ডলার হয়, তবে রাশিয়ার অর্থনীতিতে ভারসাম্য আসবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এখন এর এক তৃতীয়াংশ। তেলের ঝড়ে রাশিয়ার অর্থনীতি ব্যাপক চাপের সম্মুখীন। ইতোমধ্যে ১০ শতাংশ ব্যয় হ্রাসের পরিকল্পনা নিয়েছে তারা। চলতি বাজেট সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে রাশিয়া। মহাকাশ গবেষণার ব্যয় হ্রাস করতে হয়েছে রাশিয়াকে। রাশিয়ান মুদ্রা রুবলের দাম কমছে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ শতাংশে। তেলের দাম আরও কমলে রাশিয়াকে আরও খারাপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য তৈরি থাকতে হবে। এর মধ্যে রাশিয়া সিরিয়ায় যুদ্ধে জড়িয়েছে। এই যুদ্ধব্যয়ও তার জন্য বড় চাপ তৈরি করতে পারে। আমেরিকা এই সুযোগটা কৌশলে সফলভাবে প্রয়োগ করতে চায় রাশিয়ার ওপর। তেলের তেলেসমাতি দিয়ে হালে বিশ্বরাজনীতিতে নতুন করে আমেরিকার একক কর্তৃত্বে বাধা হয়ে দাঁড়ানো রাশিয়াকে নাজুক পরিস্থিতির দিকে ঠেলতে চায় আমেরিকা।
তেলের দাম কমার এই প্রবণতা বিশ্ব অর্থনীতিতেও তৈরি করছে নানান সুযোগ ও বিপদ। অনেক রকম সম্ভাবনার সঙ্গে দেখা দেবে উটকো অনেক ঝামেলা। বাংলাদেশের সামনেও থাকবে সুযোগ ও সম্ভাবনার নানা মাত্রা। এই তেলঘটিত তেলেসমাতি সম্ভাব্য যা ঘটাতে পারে-
এক.

১) ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৯০, ২০০৮- এই বছরগুলোতে তেলের দামের বৃদ্ধি বিশ্বমন্দার পরিস্থিতি তৈরি করে। এবার ঘটছে উল্টো ঘটনা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার কারণেই শুরু হয়েছে বিশ্ব অর্থনীতির শ্লথদশা। এই ঘটনা নতুন বিশ্বমন্দার মতো পরিস্থিতি তৈরি করলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না।

২) তেলের দাম পড়ে যাবার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে সৌদি অর্থনীতি।  ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে তারা। সৌদি আরবের নির্মাণ শিল্প সঙ্কুচিত হতে পারে। জ্বালানি ভর্তুকি কমতে পারে। অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে মজুরি কমতে পারে। সৌদি আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে সাহায্য, অনুদান দেওয়াসহ চ্যারিটি কাজে অংশ নিত, তা ব্যাপকভাবে হ্রাস করতে পারে। সৌদি অর্থনীতির এই দশা জর্ডান, বাহরাইন, লেবানন, মিসর, প্যালেস্টাইনের অর্থনীতিতে মন্দাবস্থা আনতে পারে।

৩) চীনের অর্থনীতিতে এক ধরনের শ্লথ অবস্থা চলছে। চীনের প্রবৃদ্ধি সাত শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে এর প্রভাবসহ নানান রাজনৈতিক সংকটে আগামী দুই বছর উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বেকারত্বের হার ৪.৮ শতাংশ বাড়বে বলছে বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে চীন, ব্রাজিল ও রাশিয়ায় কর্মহীন লোকের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মান, ইউরোপে বেকারত্বের হার হয়তো তেমন প্রকট হবে না। কিন্তু তেলের দরপতন আমেরিকার জ্বালানি সেক্টরে প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি খাতে আমেরিকা এ বছর ৯০ হাজার কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত করতে বাধ্য হবে। তেলের দরপতন আমেরিকার জ্বালানি খাত নির্ভর অনেক অঙ্গরাজ্যকে বিপদগ্রস্ত করে তুলতে পারে। ফলে পৃথিবীর কর্মসংস্থান বাজারে তৈরি হবে অসাম্য। এর স্নো-বল ইফেক্টে পৃথিবীব্যাপী বাড়তে পারে সামাজিক অস্থিতিশীলতা। তা বাড়িয়ে দিতে পারে সকল ধরনের জঙ্গিবাদসহ নানান রাজনৈতিক সহিংসতা। সেটা আবার অর্থনীতিকে ফেলতে পারে নতুন বিপদে।

৪) জ্বালানি তেলের অব্যাহত দরপতন হলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। প্রবৃদ্ধি কমলে বিনিয়োগও কমবে। বিনিয়োগকারীরা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। এই উদ্বেগ ধাক্কা মারবে পুঁজিবাজারে। জ্বালানির শেয়ারের দাম যত কমবে পুঁজিবাজারে তৈরি হবে ততই অস্থিরতা। পুঁজিবাজারের সূচক পড়তির দিকে যেতে থাকলে বিনিয়োগের হার আরও কমবে। এর চাপ সইতে হবে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকে। উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো থেকে গত ১৮ মাসে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ চলে গেছে। তেলের অব্যাহত দরপতন সচল থাকলে বিনিয়োগে আরও মন্দাদশা দেখা দেবে। তেলের এই দরপতন আফ্রিকার বৃহৎ অর্থনীতির দেশ নাইজেরিয়াকে ফেলেছে হুমকির মুখে। তেলনির্ভর ভেনেজুয়েলাসহ ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশের অর্থনীতিও এই চক্রে পড়ে খাবি খাচ্ছে। এই পরিস্থিতির উন্নতি না হলে, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বিকাশমান অর্থনীতির অভিমুখ ঘুরে যেতে পারে।

 দুই.

তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে যতই কমুক না কেন, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বাংলাদেশ সরকার এখনও তেলের দাম কমায়নি। কম দামে তেল কিনে অভ্যন্তরীণ বাজারে বেশি দামে বিক্রি করছে সরকার। ফলে সরকারের প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণে অর্থ আয় হয়েছে। সরকার বলছে  এই টাকা ব্যয় করবে ইতোপূর্বে নানা কারণে তেল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা  বিপিসি যে বিপুল লোকসান করেছিল তা  পোষাতে। যদিও এই লোকসান হয়েছে কতকটা চুরি, কতকটা দুর্নীতি, কতকটা অদক্ষতায়। কতকটা হয়তো তেলখাতে ভর্তুকি মেটাতে। এখন সরকার এই বাড়তি সুযোগকে লোকসান নামের শ্বেতহস্তীর সঙ্গে বিনিময় করছে। সরকারের যুক্তি হচ্ছে, এই ব্যয় এক অর্থে জনকল্যাণেই ব্যয়িত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের কমতিতে বাংলাদেশের বাজারে তার প্রভাবপড়েনি। এতে বেসরকারি উৎপাদকদের লাভ হয়নি। বরং পৃথিবীর অন্য দেশে তেলের দাম কমে যাওয়ায় সেখানে পণ্য উৎপাদন খরচ কমেছে। ফলে বাংলাদেশের বেসরকারি উৎপাদকদের এক অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়েছে।

চীনের অর্থনৈতিক শ্লথগতি বাংলাদেশের জন্য এক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষত চীনের শ্রমবাজার কৃষিখাত থেকে শিল্পখাতে মনোযোগী হওয়ায় সেখানে শ্রমিকের পারিশ্রমিক বেড়েছে। সুতরাং কম শ্রমমূল্যের গার্মেন্ট শিল্প চীন থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিত হতে পারে। সস্তা শ্রমের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য সেটা একটা বাড়তি ও বিরাট সুযোগ হতে পারে। পোশাক খাতে এই সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে বলে অনেকের ধারণা।

তিন.

তেলের তেলেসমাতির বড় কোনও সুযোগ এখনও নিতে পারেনি বাংলাদেশ। বিনিয়োগ বিনিয়োগ বলে যতই আওয়াজ উঠুক না কেন বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ তেমনভাবে আসেনি। আসেনি, প্রকৃত বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি বলে। দেশীয় বিনিয়োগের নানান খাতে বড় কোনও উন্নতিও ঘটেনি। গত একদশকে রিয়েল স্টেট খাতের বুম ঘটলেও এখন তা খুব একটা স্বস্তিতে নেই। গত এক দশকে এখানে বড় শিল্পায়ন ঘটেনি। শুধু বিদ্যুত খাতেই ব্যবসা বাণিজ্য বেড়েছে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের। সরকারি অবকাঠামে খাতের ব্যায়ের সুফল পাচ্ছে কিছু দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু শিল্পায়ন বাড়েনি বলে কর্মসংস্থান যে হারে বাড়ার কথা ছিল তা ছুঁতে পারেনি বাংলাদেশ। তেলের দাম বিশ্ববাজারে যত কমেছে তাতে সংকুচিত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যসহ আরব দেশগুলোর অর্থনীতি। সেই চাপ পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে।

এসব সংকটের মধ্যে তেলের দামের কমতির সুযোগ খুব একটা নিতে পারেনি বাংলাদেশ। তেলের দামের কমতির এই সুফল সরাসরি পায়নি বাংলাদেশের আমজনতা। কিন্তু তেলের তেলেসমাতিতে নানান বিপদে আছে রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ল্যাটিন আমেরিকা, ব্রাজিল আফ্রিকাসহ পৃথিবীর অনেক বড় বড় অর্থনীতির দেশ। বৈশ্বায়নসূত্রে গাঁথা বলে এর নানান রকম দীর্ঘমেয়াদী অভিঘাত থেকে মুক্ত নয় বাংলাদেশ। সেটা জঙ্গিপনার সূত্রে, রেমিট্যান্স প্রবাহের সূত্রে কিংবা অন্য কোনও সূত্রে দেখা দিলে তা মোকাবিলার কতটুকু প্রস্তুতি থাকবে বাংলাদেশের, দেখার বিষয় এখন সেটাই।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ