behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

প্রধান বিচারপতির বক্তব্য প্রসঙ্গে

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী১৯:১৮, জানুয়ারি ২৮, ২০১৬

Bakhtiar Uddin Chowdhuryবিচার বিভাগ আর সেনাবাহিনী সম্পর্কে কোনও কিছু লেখার রেওয়াজ আগে ছিল না। সাধারণত কোনও কলামিস্ট কখনও এই দুই বিভাগ সম্পর্কে কোনও কলাম লেখার চেষ্টাও করেন না। আদালত অবমাননার ঝামেলা আর সেনাবাহিনীকে সবাই সবসময়ে এড়িয়ে চলেন। আমি নিজেও যে তেমন লিখেছি বলা যাবে না। গত ২৫ বছরের লেখালেখির মধ্যে অধুনালুপ্ত দৈনিক আজকের কাগজে একবার ‘আদালত অবমাননার’ ওপর একটি মাত্র কলাম লিখেছিলাম।
ব্রিটিশ আমলে বিচারপতিরা কখনও প্রকাশ্যে কোনও বক্তব্য দিতেন না। এমনকি সামাজিক অনুষ্ঠানেও যোগদান থেকে বিরত থাকতেন। পাকিস্তান আমলে বিচারপতিরা বিচার বিভাগীয় অনুষ্ঠানে যোগদান করতেন কিন্তু বক্তব্য পেশ করতেন খুবই সতর্কতার সঙ্গে। অনেক বিচারপতি বিবেকের তাড়নায় অনেক সময় অবসরের পরে প্রকাশ্য সমাবেশে বক্তব্য প্রদান করেছেন। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি জনাব মির্জা রুস্তম কায়ানী (তার জনপ্রিয় নাম এম. আর কায়ানী) অবসরের পর আইয়ুব খানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে উভয় পাকিস্তানের বারগুলোতে বক্তৃতা দিয়ে বেড়িয়েছেন। তার বক্তৃতার সুদূর প্রসারী প্রতিক্রিয়াও হয়েছিল। তিনি যখন চট্টগ্রাম বার সমিতিতে বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলেন, সেখানেই বার সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার সাইফুদ্দীন ছিদ্দিকীর বাসভবন ‘লিংকন ইন’-এ মারা যান। তার বক্তৃতা গুলোর একটা বইও বের হয়েছিল। নাম ছিল ‘নট হোল দ্যা ট্রুথ’ [Not whole the truth]।
আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালের ২৩ অক্টোবর যখন পাকিস্তানে মার্শাল ল’ জারি করেন এম. আর কায়ানী নাকি তখন হাইকোর্টে ছিলেন। তিনি যখন ছুটির পর হাইকোর্ট থেকে বাসায় যান তখন তিনি দেখেন যে তার ছেলে বাসায়। তার ছেলে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর। কায়ানী নাকি তখন তার ছেলেকে সেল্যুট করেছিলেন। তার ছেলে যখন কারণ জিজ্ঞেস করেছিলেন তখন তিনি বলেছিলেন, এখন তো তোমরাই সুপ্রিম সুতরাং তোমাদেরকে সেল্যুট করতে হয়।
বুড়ো পাঠান কৃষকায় লোকটার বক্তৃতায় তেজও ছিল, রসও ছিল। পূর্ব-পাকিস্তান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বি.এ. ছিদ্দিকীও অবসরে রাজনীতিতে এসেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি জেনারেল টিক্কা খানকে গভর্নর হিসেবে শপৎ পাঠ করাতে অস্বীকার করেছিলেন। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ভয়ে হয়তো সেদিন তাকে হত্যা করেনি, না হয় তাকে হত্যা করা বিচিত্র ছিল না। বাংলাদেশ সরকার তাকে মরণোত্তর একটা পদবী দিয়ে সম্মানিত করতে পারতো।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় প্রধান বিচারপতি এস. কে. সিনহার সম্প্রতি সময়ে প্রদত্ত কিছু কথার প্রতিক্রিয়া হয়েছে ব্যাপক। তার বক্তব্যের কারণে রাজনৈতিক স্থিতিও বিনষ্ট হতে পারে। জাতীয় সংসদেও মাননীয় সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজীর পয়েন্ট অব অর্ডারে উত্থাপিত বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। আইনমন্ত্রীসহ বিশিষ্ট পার্লামেন্টেরিয়ানরা বিষয়টা নিয়ে দীর্ঘসময় আলোচনা করেছেন, যা থেকে জাতি একটা স্বচ্ছ ধারণা লাভ করতে পারবে।
বিচারপতি সাত্তার যখন রাষ্ট্রপতি তখন তার যুব বিষয়ক দফতরের মন্ত্রী ছিলেন কুমিল্লার আবুল কাসেম। তার বাসভবন থেকে এক উচ্চমানের সন্ত্রাসী গ্রেফতার হয়েছিল। পুলিশ মন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও করে সন্ত্রাসীকেও গ্রেফতার করেছিল। এটা ছিল সাত্তার সরকারের সন্ত্রাস নির্মূলের আন্তরিক প্রচেষ্টা। মন্ত্রীর সরকারি বাসভবন থেকে সন্ত্রাসী গ্রেফতার করার জন্য সাত্তার সরকার কলঙ্কিত হবেন এ কথা জেনেও রাষ্ট্রপতি সাত্তার গ্রেফতারের বিষয়ে কোনও রাকডাক রাখার তোয়াক্কা করেননি।

এটা সত্যই রাষ্ট্রপতি সাত্তার সরকারের আন্তরিক প্রয়াস ছিল। কিন্তু বিষয়টা তৎকালীন সময়ের অন্যতম নামকরা-বিচারপতি-মরহুম আব্দুর রহমান চৌধুরী এক অনুষ্ঠানে খুবই উত্তেজনাকর ভাষায় উপস্থিত করেছিলেন। আব্দুর রহমান চৌধুরীর বিচারপতি ভিন্ন অন্য পরিচয় ছিল। তিনি ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা ছাত্রনেতা ছিলেন এবং ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তার গৌরবউজ্জ্বল ভূমিকা ছিল। সুতরাং আব্দুর রহমান চৌধুরীর বক্তব্যের শুধু বিচারপতি হিসেবে নয় জাতীয় সংকটকালের ছাত্রনেতা হিসেবেও একটা প্রতিক্রিয়া ছিল।

আব্দুর রহমান চৌধুরী তার বক্তব্য প্রদানের দুদিনের মাথায় সেনাপ্রধান এইচএম এরশাদ রাষ্ট্রপতি সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেছিলেন এবং সামরিক শাসন জারি করেছিলেন। সামরিক শাসন জারির পর এরশাদ জাতির উদ্দেশ্যে তার প্রদত্ত ভাষণে বার বার আব্দুর রহমান চৌধুরীর বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেছিলেন। অথচ তখন রাষ্ট্রপতি সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করার কোনও কারণ বিরাজমান ছিল বলে মনে হয় না। রাষ্ট্রপতি সাত্তার জিয়ার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এবং আওয়ামী লীগ প্রার্থী ড. কামাল হোসেনকে পরাজিত করে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

রাষ্ট্রপতি সাত্তার দীর্ঘ সময়ব্যাপী কলকাতা হাইকোর্টে শের-ই বাংলা ফজলুল হকের জুনিয়র হিসেবে কাজ করেছেন। ভারত বিভক্তির পর তিনি পূর্ব-পাকিস্তান হাইকোর্টের দীর্ঘদিন বিচারপতি ছিলেন। কিছু সময় চিফ ইলেকশন কমিশনারও ছিলেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার কোনও বিতর্কিত ভূমিকাও ছিল না। তার কোনও সন্তান-সন্ততিও ছিল না, কোনও দুর্নীতিও ছিল না, কোনও হাওয়া ভবনও ছিল না। উচ্চভিলাশী সামরিক কর্মকর্তারাই অহেতুক তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন।

বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরীর কথা ব্যবহার করে জেনারেল এরশাদ যেমন ফায়দা লুটে ছিলেন, বর্তমান মাননীয় প্রধান বিচারপতি এস.কে. সিনহার কথা ব্যবহার করে তেমন একটা ফায়দা হাসেলের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে গত ১৫/২০ দিনব্যাপী কিন্তু ফায়দা লুটার শক্তির অভাবে মাননীয় প্রধান বিচারপতির বক্তব্যটা মাঠে মারা গেছে। তিনি বলেছেন- অবসরে যাওয়ার পর রায় লেখা অসংবিধানিক। প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক যে রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছেন সে রায়ের সিদ্ধান্তমূলক অংশটা রায়ের দিন প্রদান করেছিলেন সত্য কিন্তু বিস্তারিত রায় লিখে দিয়েছিলেন তিনি অবসরের যাওয়ার পর।

মাননীয় প্রধান বিচারপতি এস.কে. সিনহার কথা যদি মেনে নিতে হয় তবে বর্তমান সরকারেরই কোনও শাসনতান্ত্রিক ভিত্তি থাকে না। অথচ তিনি যে কথাটা বললেন সে কথাটারই কোনও শাসনতান্ত্রিক ভিত্তি নেই। শাসনতন্ত্রে এমন কোনও বিধি নিষেধ নেই। এটা কনভেনশন। ব্রিটেনে অলিখিত শাসনতন্ত্র সেখানে কনভেনশনও শাসনতন্ত্রের মর্যাদা পেয়ে থাকে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট ও তার হাইকোর্ট ডিভিশন টিউডোর যুগের ‘কোর্ট অব স্টার চেম্বার’ নয়। এটা স্বাধীন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। তবে এ বিচারালয়ের বিচারপতিরা যদি নিজেরা নিজেদেরকে বিতর্কে জড়াতে চান তা হবে দুর্ভাগ্যজনক। কেউ বা কোনও কাজ সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। বিচারপতিদের কেউ সমালোচনা করেন না তাদের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখার জন্য। অ্যাথেন্স এর বিচারালয় যখন সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল তখন সক্রেটিসের বন্ধুরা তাকে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন কিন্তু সক্রেটিস কারাগার থেকে পালিয়ে যাননি। তিনি হ্যামলক পান করে কারাগারকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে সহায়তা করেছিলেন। কিন্তু এটা কি ন্যায় বিচার ছিল? পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরে বলায় গ্যালিলিওকে আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। কিন্তু এটাও কি ন্যায় বিচার ছিল? বিশ্বের মানুষ বিচারপতিদের অবিচারও কম দেখেনি। বাংলাদেশও কোনও অনাচার দেখতে সম্মত নয়।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ