behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

ধর্মব্যবসায়ীদের জয়যাত্রা

তসলিমা নাসরিন১১:০০, জানুয়ারি ৩১, ২০১৬



Tasleema Nasrinধর্মব্যবসায়ীদের বারবার জয় হচ্ছে। যে কোনও অন্যায় দাবিই তারা করুক, তাদের দাবিকে মেনে নেয় সরকার, মেনে নেয় সাধারণ মানুষ। যারা নিভৃতে নামাজ কালাম পড়ে, রমজান মাসে রোজা রাখে, মিথ্যে কথা বলে না, ঘুষ খায় না, মানুষের অনিষ্ট করে না, ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে না, তারা ভালো মানুষ, তাদের নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। সমস্যাটা ধর্ম ব্যবসায়ীদের নিয়ে, ধর্ম ব্যবসায়ীরা মূলত নারী বিদ্বেষী, অমুসলিম বিদ্বেষী, শিয়া-আহমদীয়া বিদ্বেষী, বিজ্ঞানবিরোধী, প্রগতিবিরোধী। নিজের স্বার্থের জন্য, মূলত টাকা-পয়সা-ক্ষমতা আত্মসাৎ করার জন্য তারা ধর্মকে ব্যবহার করে। কুড়ি বছর আগে আমার বিরুদ্ধে সারা দেশ জুড়ে তাণ্ডব করেছে ধর্মব্যবসায়ীরা। সরকার আর সচেতন সমাজ চুপচাপ দেখেছে সব। আমি বনাম মৌলবাদী। কার বিজয় হলো? অবশ্যই ধর্মব্যবসায়ীদের। আমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে দেশ থেকে বের করে দিলো সরকার। আর ধর্মব্যবসায়ীদের তো পরম আদরে রাখলোই দেশে, কাউকে দলে টানলো, কাউকে এমপি বানালো, কাউকে মন্ত্রী।
আমি না হয় নাস্তিক ছিলাম। কিন্তু ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন তো আপাদমস্তক আস্তিক। তিনি নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন, আল্লাহ রসুলে বিশ্বাস করেন। তাঁকে কেন হেনস্থা করছে ধর্মব্যবসায়ীরা?নিশ্চয়ই তারা মনে করে  মহিলাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে যুদ্ধে জেতার সম্ভাবনা বেশি। জিতলে টাকা-পয়সা-ক্ষমতার সুযোগ সুবিধে বেশি। ধর্ম নিয়ে ব্যবসা যারা করে, আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, তারা ভয়ংকর রকম নাস্তিক। তারা আল্লাহকে মানে না বলে নির্দ্বিধায়  লোক ঠকায় আর রাজ্যের অপকর্ম করে। তাদের কাউকে ভয়-ডর নেই। তাদের নাস্তিকতার সঙ্গে নারীর অধিকার, মানবাধিকার, যুক্তিবাদের কোনও সম্পর্ক নেই। সততার কোনও সম্পর্ক নেই। ধর্মব্যাবসায়ীরা ধর্মের নামে লোক ঠকাতে পারে। আস্তিক হলে এত বড় অধর্ম তারা করতে পারতো না।
তাসমীমা হোসেন ঢাকার মেয়রের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় শব্দদূষণ প্রসঙ্গে কিছু কথা বলেছেন, যা বিকৃতভাবে কিছু সংবাদপত্রে ছাপা  হয়েছে। তাসমিমা হোসেন এ প্রসঙ্গে গতকাল রবিবার এক বিবৃতিতে বলেন,
‘শব্দদূষণের ক্ষতিকর দিক এখন সচেতন নাগরিক মাত্রই জানেন। বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুদের জন্য এর ক্ষতির দিক সবিশেষ উল্লেখ করার মতো। শিক্ষার্থীদের জন্য শব্দদূষণ বিশেষ সমস্যার সৃষ্টি করে। পবিত্র কোরআন শরিফেও মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন কাউকে সীমা লঙ্ঘন না করতে। মানুষের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর শব্দদূষণের সেই সীমাও নিশ্চয়ই লঙ্ঘন করা উচিত নয়’।
তিনি   বলেছেন শব্দদূষণ না ঘটিয়েও যে কোনও ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও আচারবিধি পালন করা সম্ভব। শব্দ একটি শক্তি। আল্লাহ্তায়ালা কোনও কিছু অপচয় পছন্দ করেন না। তিনি নিশ্চয়ই শব্দশক্তির অপচয়ও পছন্দ করেন না। মূলত এই ধর্মীয় বোধ থেকেই তাসমিমা হোসেন সর্বক্ষেত্রে পরিমিতি বোধের পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।  

মৌলবাদী ধর্মব্যবসায়ীরা আজ এতটাই শক্তিশালী যে দেশের এক মন্ত্রীর স্ত্রী হয়েও,মিডিয়া মুগল হয়েও মূর্খ, কূপমণ্ডুপ, নারীবিদ্বেষী, স্বার্থান্ধ অপশক্তির কাছে নত হতে হয়,  কোনও ভুল না করেও, কোনও অন্যায় না করেও তাসমীমা হোসেনকে দুঃখ প্রকাশ করতে হয়। তিনি বলতে পারছেন না ‘যা বলেছি ঠিক বলেছি’। কারণ  মূর্খদের সংখ্যা বাংলাদেশে আশংকাজনকভাবে  বেশি এবং তারা ভায়োলেন্সে বিশ্বাসী। যে কারও রগ কেটে ফেলতে অথবা যে কারও গলা কেটে ফেলতে তাদের হাত এতটুকু কাঁপে না। তারা ভয় এতটুকু পায় না।  বরং তারা বিশ্বাস করে অন্যকে খুন করলে তাদের বেহেস্ত নিশ্চিত হয়। 

আমার কথাও বিকৃতভাবে দেশের এই অপশক্তিটি উপস্থাপন করতো। আমি যা বলিনি, সেসব কথাই আমি বলেছি বলে প্রচার করতো। বলতো আমি নাকি মেয়েদের উপদেশ দিই দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করতে, কাপড়চোপড় খুলে ফেলে ন্যাংটো হয়ে চলাফেরা করতে, যার তার সঙ্গে শুতে, চারটে বিয়ে করতে। আমার কোনও লেখার উদ্ধৃতি কিন্তু ওরা দিতে পারবে না। ধার্মিকদের ক্ষেপানোর জন্য মিথ্যের আশ্রয় এই মিথ্যুকদের নিতে হয়। মিথ্যুক আর অসৎ এই লোকগুলো দাবি করে তারা ইসলামের সেবক। এখনও কি এই ভন্ড সেবকদের চিহ্নিত করার সময় আসেনি?  শান্তিকামী মানুষদের উত্যক্ত করার কারণে এদের কি শাস্তি প্রাপ্য নয়।

হেফাজতে ইসলাম ইউরোপের সভাপতি ও জমিয়তুল উলামা ইউরোপের সভাপতি শায়খুল হাদীস মুফতি শাহ সদর উদ্দীন এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘তাসমিমা আজান, তাবলীগ এবং ওয়াজ মাহফিল বন্ধের দাবী সত্যিই দুঃখজনক। পুত্রবধূ হয়ে তিনি মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত হানার জন্য অবিলম্বে তাকে তাওবা করে মুসলমানদের নিকট ক্ষমা চাইতে হবে। অন্যথায় তাসমিমা মুসলমানদের কাতারে থাকতে পারেন না। কোনও মুসলমানের পক্ষে তার জানাযায় অংশগ্রহণ ও জায়েজ হবে না। এমনকি মন্ত্রী আনোয়ার হুসেন মঞ্জুর সাথে তার তালাক হয়ে যেতে পারে। কারণ কেউ ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত হানার পর মুসলমানের স্ত্রী থাকতে পারেন না ,আরও বলেন , কোনও সরকারের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন নয়। আমাদের আন্দোলন নাস্তিক-মুরতাদদের বিরুদ্ধে। যে ব্যক্তিই ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে আমরা তার বিরুদ্ধেই আন্দোলন করবো। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’।

এখন প্রশ্ন হলো, আস্তিক তাসমীমা হোসেন কি এখন  ক্ষমা চাইবেন? অন্যায় না করেও কি ক্ষমা চাইবেন তিনি, তাও আবার ভণ্ড পাষণ্ড ধর্মব্যবসায়ীদের কাছে?

আমেরিকার  ইউনাইটেড উলামা কাউন্সিল থেকে বলা হয়, অবিলম্বে তাসমীমা হোসেনকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দিতে হবে। তাসমীমা হোসেন নাকি  ধর্মপ্রাণ মুসল্লীদের ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত হেনেছেন। তাঁকে প্রথমে আল্লাহ তা’য়ালার কাছে তাওবাহ করতে হবে এবং পরে সমগ্র মুসলিম জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। তা না হলে নাকি দেশ-বিদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা  তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলবে। মুশকিল হলো, মূর্খরা অন্যের গণতান্ত্রিক অধিকার, এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা সম্পর্কে কিছুই জানে না। নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করার জন্য ধর্মের দোহাই দিয়ে আর সরকারের নীরবতার সুযোগ নিয়ে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রগতিশীলদের টার্গেট করে।  তারা নিশ্চিতই আইসিসদের পথ অনুসরণ করে দেশকে রসাতলে নিয়ে যেতে চাইছে।

সিলেটেও অপশক্তির মিছিল বের হয়।  জামে মসজিদ থেকে মিছিলটি বের হয়। মসজিদগুলোকে যে কেন এদের দখলে দিয়ে দেওয়া হয়েছে!  মিছিলের গুণ্ডারা কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘তাসমিমা এদেশের ৯৫ ভাগ মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত হেনেছেন। আগামী ৭২ ঘন্টার মধ্যে তাঁকে বক্তব্য প্রত্যাহার করে প্রকাশ্য ক্ষমা চাইতে হবে। অন্যথায় তৌহিদী জনতা গণআন্দোলন গড়ে তোলতে বাধ্য হবে। তাসমিমার পরিনতি তসলিমা নাসরিনের চাইতে আরো ভয়াভহ হতে পারে’।

তসলিমাকে আক্রমণ করছিল যে  ধর্মব্যবসায়ীরা, তাদের বিজয় নিশান ওড়াতে সাহায্য করেছিল খালেদা সরকার। তখন যদি ওরা বিজয় নিশান ওড়াতে না পারতো, তাহলে আজ ওরা বুঝতে পারতো ধর্মের নামে দেশের মানুষের বাক স্বাধীনতা হরণ করা, ভায়োলেন্স করা, জেলে ভরা,  নির্বাসনদণ্ড দেওয়া, যাকে ইচ্ছে তাকে খুন করা সম্ভব নয়। তারা আজ জানে যে তাদের পক্ষে সবই সম্ভব, কারণ সব সরকারই তাদের সমীহ করে চলে, তাদের  গায়ে ফুলের টোকা পর্যন্ত দিতে ভয় পায়। 

কেউ কেউ তাসমীমা হোসেনকে ডিফেন্ড করছেন এই বলে , ‘তাসমীমা হোসেন বলেছেন উচ্চ শব্দে আজান দিয়ে শব্দ দূষণ করা হচ্ছে ! উনি তো  মাইক ব্যবহারে তো নিষেধের কথা বলেননি ! বাংলাদেশে অনেক মসজিদ, ঢাকা শহরকে তো মসজিদের শহর বলা হয়। তাই এই ঘন বসতি এলাকার দেশে বেশি উচ্চ আওয়াজে একের পর এক পাশাপাশি মসজিদ থেকে  আজান প্রচার করলে তো শব্দ দূষণ হবেই ! হজরত মুহাম্মদ (স:) এর সময়ে তো মাইকই ছিলো না ! ২০০৯ সালে স্বয়ং সৌদি সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে  উচ্চ আওয়াজে মাইকে আজান দেওয়ায় অনেক মসজিদ থেকে মাইক খুলে নিয়ে গেছে! ভারতেও ২০১৪ সালে অতি উচ্চ আওয়াজে আজান দেয়ার উপরে হাই কোর্টের নিষেধাজ্ঞা এসেছে এবং সেই রায়কে মুসলিম নেতারা স্বাগত জানিয়েছিলেন’!

মুফাসসিল ইসলাম নামের একজন ধার্মিক সৌদি আরব থেকে একটি পত্রিকায় লিখেছেন, ‘সৌদি আরবের মসজিদ থেকে বাড়তি মাইক খুলে নেবে সৌদি সরকার, এই খবরটা পড়ার পর আমার নিজের দেশের কথা মনে পড়ছে। শুধু পাঁচ ওয়াক্ত আযান নয়,প্রতি জুম্মার দিন আযানের মেইন মাইক অন রাখা হয়। এখানে ওখানে ওয়াজ-মাহ্‌ফিলের সময় শত শত মাইক লাগানো হয় তো বটেই তার উপর লম্বা তার টেনে মাইলখানেক দুরেও মাইক বসানো হয়। শব্দের দাপটে মানুষের বিশ্রামের সমস্যা হয়। ছেলে মেয়েদের লেখা পড়ার ক্ষতি হয়। অন্যান্য ধর্মালম্বী যাঁরা আছেন তাদের প্রতি অবিচার করা হয়। অসুস্থ এবং বয়োঃবৃদ্ধ যাঁরা আছেন তাঁদের কথা না হয় বাদই দিলাম।

এই সবই সহ্য করতে হয় নীরবে। দাঁতে দাঁত চেপে। এতে করে ইসলামের কতখানি উপকার হচ্ছে শিক্ষিত শ্রেণি সেটা বোঝেন। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ওপর দিয়ে কী যাচ্ছে, সেটাও সবাই উপলব্ধি করতে পারেন। কিন্তু কিছু বলার উপায় নেই কারও।

ইবাদতের নামে শব্দ দুষণ হচ্ছে, এই শব্দ দুষণ  রোধে সৌদি সরকারের এই সিদ্ধান্তের খবরটা জানার পর এতো ভালো লাগছে! আমাদের দেশের কোনও সরকার এটা রোধে ব্যাবস্থা নেবার সাহস পায় নি। কিন্তু ইসলামের পীঠস্থান থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। আমাদের দেশে শুরু হবে না কেন?

ইসলাম শান্তির ধর্ম। এখন সময় এসেছে সবাইকে বোঝানোর। ধর্মের দোহাই দিয়ে অন্য সবাইকে বিরক্ত করলে নিজের ধর্মকে খাটো করা হয়। এটা গুনাহ্‌র কাজ। আসুন আমরা আমাদের ধর্মের মর্যাদা বিষয়ে সচেতন হই’।

 তাসমীমা হোসেনের  বাক স্বাধীনতাকে লঙ্ঘন করতে ধর্মব্যবসায়ীরা উঠে পড়ে লেগেছে। এই সময় সরকারকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে অপশক্তির সবরকম অপপ্রচার এবং মিছিল মিটিংএর নামে হুমকি আর ভায়োলেন্স। তাসমীমা হোসেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। এখনও সময় আছে, ধর্ম নিয়ে যারা অধর্ম করে, তাদের হাতের মুঠোয় দেশটিকে ছেড়ে দেবেন না।

লেখক: কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ