Vision  ad on bangla Tribune

অমর একুশে গ্রন্থমেলা: আধুনিক ওয়েবসাইট জরুরি

আমিনুল ইসলাম সুজন১৪:০৭, ফেব্রুয়ারি ০১, ২০১৬

আমিনুল ইসলাম সুজনবইপ্রেমীদের জন্য মহাসমারোহে শুরু হচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৬, যা সংক্ষেপে বইমেলা হিসেবে পরিচিত। মানুষকে পড়তে ও জ্ঞান অন্বেষণে উৎসাহী করতে বাংলা একাডেমি আয়োজিত এই মেলার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বইমেলা পাঠক, লেখক ও সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থাগুলোর প্রধান মিলনকেন্দ্র হিসেবে সবমহলে পরিচিতি পেয়েছে। বিভিন্ন লেখকের বৈচিত্র্যময় বই পাঠকের কাছে সরাসরি তুলে ধরা, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান-লেখক ও পাঠকদের সম্পর্ক উন্নয়নে এ মেলা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। আগ্রহী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও দর্শনার্থীর আগমন বেড়ে যাওয়ায় গত দু’বছরের মতো এবারও মেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে।
১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তথা পুরাতন বর্ধমান হাউজের সামনে বটতলায় নতুন প্রকাশিত ৩২টি বই সারিবদ্ধ করে বসেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থী/প্রবাসী লেখকদের লেখা এসব বইয়ের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে তাঁর তৎকালীন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ’ (পরবর্তীতে নাম করেন ‘মুক্তধারা’) থেকে প্রকাশ করেছিলেন।
যদিও অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে ও ব্যক্তি উদ্যোগে ১৯৭২ সালে এই মেলা শুরু হয়েছিল। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধে দু’লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম ও তিরিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মহান স্বাধীনতার দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বই বিক্রির মাধ্যমে এ মেলা শুরু করেন চিত্তরঞ্জন সাহা। তাঁর সূচনা করা ৩২টি বইয়ের মেলা বর্তমানে লাখ লাখ বই ও পাঠকের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে। তাঁর নাম একালের পাঠকদের অনেকেই হয়ত জানেন না। বই মেলায় নিয়মিত যান, এমন সাধারণ দর্শনার্থীদের মধ্যেও সবাই যে তাঁকে চেনে, এমনটা দাবি করা যায় না।
যদিও শুরুর দিকে পথ চলা তাঁর জন্য কন্টকাকীর্ণ ছিল। প্রথম পাঁচ বছর তিনি একাই স্রোতের বিপরীতে পাল তুলে এগিয়ে যান। ১৯৭৬ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য প্রকাশনা সংস্থার মধ্যে অনেকে যুক্ত হন। এদের মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড প্রকাশনা সংস্থার রুহুল আমিন নিজামী ও বর্ণমিছিল-এর তাজুল ইসলাম অন্যতম। বাংলা একাডেমির দু’জন প্রাক্তণ মহাপরিচালক যথাক্রমে আশরাফ সিদ্দিকী ও কাজী মনজুরে মওলার নামও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমজন ১৯৭৮ সালে বইমেলার সঙ্গে বাংলা একাডেমিকে যুক্ত করেছিলেন, দ্বিতীয়জন ১৯৮৩ সালে (যদিও রাজনৈতিক কারণে ঐ বছর মেলা হয়নি) বইমেলার সঙ্গে ‘অমর একুশে’ যুক্ত করে একাডেমির প্রত্যক্ষ উদ্যোগে মেলার আয়োজন করেন। মাঝখানে, ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশনা সমিতি যুক্ত হয়, প্রকাশকদের এই সমিতিরও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা।
প্রথম ৪১ বছর মেলা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সীমিত থাকলেও আগ্রহী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে যাওযায় ২০১৪ সাল থেকে এই মেলা বাংলা একাডেমির পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত হচ্ছে। বেসরকারি উদ্যোগে শুরু হওয়া এ মেলা ৮৪ সাল থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিই প্রধান আয়োজক ও নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান।

মেলার সুষ্ঠু ও সৃজনশীল আয়োজন প্রতিবারেরই প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রথাবিরোধী লেখক ও অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদের হত্যাকান্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া হলেও, গতবছর লেখক-ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যাকান্ড শঙ্কা সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িতদের গ্রেফতারে বোঝা যায়, দেশে জঙ্গি গোষ্ঠির অস্তিত্ব শক্তিশালী। বিশেষ করে, নিকট অতীতে বেশ ক’জন ব্লগার আততায়ীর চাপাতির আঘাতে প্রায় একই প্রক্রিয়ায় খুন হয়েছেন। অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশক দীপনও চাপাতির আঘাতে খুন হয়েছেন। আরেকজন প্রকাশক মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা পান।

তাই এবারের মেলায় নিরাপত্তাই প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও ইতোমধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও র‌্যাপিড একশান ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব) -এর পক্ষ থেকে আশ্বস্থ করা হয়েছে, নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা থাকবে। এতে প্রকাশক, লেখক ও দর্শনার্থী, সবাইকে নিরাপত্তা প্রদান করা হবে। এজন্য মেলার শুধু অভ্যন্তরই নয়, বাইরে ওয়াচ টাওয়ার ও ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। সব প্রবেশ পথে বিশেষ যান্ত্রিক গেট থাকবে, যেখানে আগতদের তল্লাশি করা হবে।

যদিও এসব নিরাপত্তার মধ্যেই গতবছরের বই মেলা চলাকালীন অভিজিৎ ও তার স্ত্রী বন্যা আহমেদকে যখন আক্রমন করা হয়েছিল, তখন কাছেই পুলিশ ছিল, এমন ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়া ক্যামেরা, পুলিশ থাকার পরও পহেলা বৈশাখে নারী নিপীড়ন বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। তাই ডিএমপি, র‌্যাব মেলা নিয়ে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেও আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়েছে, এমনটা দাবি করার কারণ নাই।

তদুপরি, মেলা চলাকালীন কয়েকটি বিশেষ দিনে লাখ লাখ মানুষের আগমন ঘটে। এর মধ্যে পহেলা ফাল্গুন (১৩ ফেব্রুয়ারি),ভালোবাসা দিবস (১৪ ফেব্রুয়ারি) এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস (২১ ফেব্রুয়ারি)। অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, এ দিনগুলোতে নারীদের হয়রানির শিকার হতে হয়। গতবছর ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত গ্রন্থমেলার প্রবেশ পথে নারী দর্শণার্থীদের হয়রানি সংক্রান্ত ছবি ও প্রতিবেদন নজরে এসেছিল। আশা করি, কর্তৃপক্ষ এসব বিশেষ দিনসহ প্রতিদিনই নারী, শিশুসহ সববয়সী মানুষের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয়ও ত্বরিৎ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। তাছাড়া, বিপুলসংখ্যক মানুষের আগমন ঘটে বিধায় এসব দিনের নিরাপত্তায় আলাদাভাবে নজর দেওয়া হবে বলে বিশ্বাস করি।

মেলা চলাকালীন সময়ে যাতায়াত ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় যানজট দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। শাহবাগ-নীলক্ষেত ও শহীদ মিনার থেকে টিএসসিমুখী সড়কে ব্যক্তিগত যান্ত্রিক যান (প্রাইভেট কার) নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। ব্যক্তিগত গাড়িতে মাত্র ৫ ভাগের মতো মানুষ আসে, কিন্তু এরা বাকি ৯৫ ভাগ মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। মানুষ যেন নির্দিষ্ট দূরত্বে ব্যক্তিগত গাড়ি রেখে নিরাপদে হেঁটে ও স্বাচ্ছন্দে বইমেলায় প্রবেশ করতে পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শিশু, নারী, বৃদ্ধ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ (প্রতিবন্ধী ব্যক্তি), সব বয়সী মানুষেরই প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য ফুটপাথে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বসা দোকান ও ভিক্ষুকদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

এছাড়া মেলার প্রবেশ পথে অসংখ্য অস্বাস্থ্যকর খাবারের (ফাস্ট ফুড, জাংক ফুড ও অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার) দোকান গড়ে উঠে। অভিযোগ আছে, এতে চাঁদাবাজিও হয়। কিন্তু এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার দোকানের প্রয়োজন আছে কিনা, এটা ভাবতে হবে। বরং নিয়ন্ত্রিত উপায়ে কয়েকটি স্বাস্থ্যকর খাবারের দোকান রাখা জরুরি।

পাশাপাশি মেলায়, বিশেষত সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক পরিস্কার, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও সবরকম মানুষের ব্যবহার উপযোগি ভ্রাম্যমান গণশৌচাগার রাখতে হবে। বাংলাদেশে বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী এবং শিশু-নারীসহ অধূমপায়ী দর্শনার্থীদের রক্ষায় গ্রন্থমেলার প্রাঙ্গণ বিগত কয়েকবছর যাবত ধূমপানমুক্ত। কিন্তু মেলার অভ্যন্তরে এ বিষয়ক নির্দেশনা খুব বেশি লক্ষ্য করা যায় না। যে কারণে অতীতে ধূমপান করতে দেখা যেতো। তাই মেলা প্রাঙ্গণকে সম্পূর্ণভাবে ধূমপানমুক্ত রাখতে আইন অনুযায়ী “ধূমপানমুক্ত এলাকা” লেখাসম্বলিত প্রয়োজনীয় সাইনবোর্ড স্থাপন করা হবে বলে আশা করি। 

প্রায় সাড়ে ১১ একর জায়গাজুড়ে এবারের মেলার পরিধি বিস্তৃত। এতে চারশ’ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ১৫টি প্যাভিলিয়নের পাশাপাশি ১৮টি চার, ৩৮টি তিন, ১০৪টি দুই ও ১৩৮টি এক ইউনিটের স্টল রয়েছে। কোন স্টলই যেন পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর পলিথিন শপিং ব্যাগে কোনো বই প্রদান না করে, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ক্ষতিকর টিস্যু পলিথিন ব্যবহারের প্রচলন বেড়েছে। এসব ক্ষতিকর টিস্যু পলিথিনও কোনও প্রকাশনা সংস্থা যেন ব্যবহার না করে, সেদিকে পরিবেশ অধিদফতর দৃষ্টি দিতে পারে।

নকল বই যেন কোনওভাবেই মেলায় স্থান না পায়, সেদিকে বাংলা একাডেমিকে কড়া নজর রাখতে হবে। ডোরেমনসহ হিন্দি টিভি সিরিয়ালকেন্দ্রিক বইগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যেসব স্টলে এসব বই পাওয়া যাবে, সেসব স্টল বন্ধ করে দিতে হবে।

বই মেলাকে ঘিরে বাংলা একাডেমির মূল ওয়েব পোর্টালের পাশাপাশি একটি স্বতন্ত্র ওয়েব সাইট করা দরকার। যেখানে মেলাসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য থাকবে। মেলার ম্যাপ থাকবে, কোন স্টল কোথায়, যেন স্মার্ট ফোন ব্যবহারকারীরা সহজে প্রয়োজনীয় স্টল খুঁজে পান। পাশাপাশি মেলাসংক্রান্ত কোন অভিযোগ থাকলে মানুষ যেন এই ওয়েব সাইটের মাধ্যমে তা কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারে, সে ব্যবস্থাও রাখতে হবে। ওয়েব সাইটে প্রতিদিনকার নতুন বই পরিচিত, বইয়ের প্রকাশনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসম্পর্কিত তথ্যাবলীও সংযুক্ত থাকতে হবে। পাশাপাশি মেলায় দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বাংলা একাডেমির জরুরি নম্বরগুলো রাখতে হবে। শুধু গ্রন্থ মেলাকে কেন্দ্র করে একটি স্বতন্ত্র ও আধুনিক ওয়েব সাইট ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়ে উঠতে পারে।

বইমেলাকে ঘিরে অনেকগুলো ফেসবুক পেজ রয়েছে, বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থারও আলাদা আলাদা পেজ রয়েছে। কিন্তু বাংলা একাডেমি ওয়েবসাইটের মতো একটি ফেসবুক পেজও চালু করতে পারে। যেখানে মেলা চলাকালীন সময়ে মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য পাবে এবং অভিযোগ জানাতে পারবে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুবিধা নিতে হবে। এতে মানুষ উপকৃত হবে।

মেলা জমে উঠতে আরও কয়েকদিন লাগবে। নিরাপত্তার শঙ্কা দূর হয়ে মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৬, এটাই সবার প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক ও সদস্য, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

samsung ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ