behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

পাকিস্তানি এজেন্ডা বাস্তবায়ন অসম্ভব

আনিস আলমগীর১২:০৮, ফেব্রুয়ারি ০২, ২০১৬

Anis Alamgirমুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে পুনরায় বিতর্কের পথে পা বাড়ালেন খালেদা জিয়া। ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে এই নিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলাও হয়েছে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার দলের নেতাদের নিত্য-নতুন বিতর্ক থেমে নেই। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের অযাচিত নাক গলানোতে দেশটির সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের মাত্রা এখন তলানিতে। তারা অস্বীকার করছে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যাকে, চেষ্টা করছে মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার। এজেন্ডাটি সরাসরি আইএসআই-এর। খালেদা জিয়ার মন্তব্য পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাটিকে পুলকিত করার মতোই।
এ কথা যখন লিখছি, তখনও পরিষ্কার আইএসআই কতটা ক্রেজি বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার কাজে। ১ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টা থেকে ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনের স্টাফ জাহাঙ্গীর হোসেন নিখোঁজ। মিশন থেকে বের হয়ে মেয়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পথে তাকে তুলে নিয়েছিল। আমাদের মিশন কর্মকর্তারা তাকে খুঁজে হয়রান। এই ঘটনা তখনই ঘটল, যখন ঢাকায় খালেদা জিয়ার বাসার সামনে থেকে একজন লোককে কয়েকদিন ধরে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখার কারণে আটক করা হয়েছে। তাকে থানায় নিয়ে জানা যায়, তিনি পাকিস্তান হাইকমিশনে কাজ করেন। তাকে তার হাইকমিশনের লোকদের উপস্থিতিতে সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দেওয়া হয়। সে লোক একটি মোটরসাইকেল ব্যবহার করছিলেন, যেটার কোনও লাইসেন্স নেই এবং স্থানীয় নম্বর প্লেট লাগানো। ওদিকে জাহাঙ্গীরকেও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে গভীর রাতে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানি দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা আটকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসলামাবাদে বাংলাদেশি দূতাবাসের প্রেস সেকশনের পারসোনাল অফিসার জাহাঙ্গীর হোসেন নিখোঁজ হওয়া এবং নিখোঁজ হওয়ার সাত ঘণ্টা পর ফিরে আসা যতই রহস্য সৃষ্টি করুক, বুঝতে কারও বাকি নেই এটা আইএসআই-এর খেলা।

খালেদা জিয়া গত ২১ ডিসেম্বর তার দলের  মুক্তিযোদ্ধাদের এক সমাবেশে বলেছেন শহীদের সংখ্যা নিয়ে নাকি বিতর্ক আছে। এ অসতর্ক কথার জন্য খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট বারের প্রাক্তন সেক্রেটারি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করেছেন। আইনজীবী মমতাজ মেহেদি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।  তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যথাযথ অনুমতিও নিয়েছেন। খালেদা জিয়া নোটিশ গ্রহণ না করলেও আদালতের আদেশ অমান্য করা তার পক্ষে কখনও সম্ভব হবে না। বলা যায়, আদালতে হাজিরা দেওয়ার আর একটা বাড়তি ঝামেলা কুড়িয়ে নিলেন খালেদা জিয়া।  মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ লোক শহীদ হয়েছিলেন, এ কথাটি ৪৪ বছরব্যাপী প্রচারিত সত্য।  কম বেশি হতেই পারে কিন্তু ২৯ লক্ষ ৫২ হাজার ৩০০ বা ৩০ লক্ষ ৩ হাজার ৩৩৩ এ জাতীয় একটি সংখ্যা খালেদা জিয়া এবং তার সঙ্গীদের এত প্রয়োজন হয়ে উঠল কেন? যখন পাকিস্তানিরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করতে চায়, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

জিয়াউর রহমানও তার এক লেখায় ৩০ লাখ সংখ্যাটি উল্লেখ করেছিলেন। জিয়াউর রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি যখন এ সংখ্যাটা স্বীকার করে নিয়েছেন, তখন বিএনপির কারও জন্য সংখ্যাটা নিয়ে বিতর্ক উত্থাপন করা বুদ্ধিদীপ্ত বিষয় মনে হচ্ছে না। শাহ মোয়াজ্জেমের মতো পতিত-দুর্গন্ধময় রাজনীতিবিদরা খালেদা জিয়াকে বছরের পর বছর বিশ্রী ভাষায় গালি দিয়ে এখন মুক্তিযুদ্ধে তার অনেক অবদান খুঁজে পেলেও জাতি জানে, মুক্তিযুদ্ধে খালেদা জিয়ার কোনও ভূমিকাই ছিল না। বরং মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস তিনি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কেন ছিলেন—সে কথা নিয়ে বহু বিতর্ক আছে। তিনি দু’বার পূর্ণ সময়ের জন্য এবং আর একবার ৩৫ দিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। যে জাতি তাকে এত সম্মান দিল, সে জাতির গর্বের ধন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনি বিতর্ক সৃষ্টি করতে যাওয়া সুচিন্তিত কাজ হয়নি মোটেই।

খালেদা জিয়ার কোনওভাবেই অবস্থান ভালো নয়। রাজনৈতিকভাবে তিনি বিধ্বস্ত অবস্থায় আছেন। শারীরিক অবস্থাও যে ভালো, তাও নয়। অসংখ্য মামলায় জড়িত। তার অপরিকল্পিত আন্দোলনের কারণে বিএনপির হাজার হাজার কর্মী জেলে রয়েছেন, আবার হাজার-হাজার কর্মী মামলা নিয়ে আদালতে দিন কাটাচ্ছেন। কর্মীদের আর্থিক ও আইনি কোনও সাহায্য দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। কর্মীরাও মানুষ, নেতৃত্বের ভুলের কারণে বার বার তারা বিপদে পড়বেন, তা মেনে নেওয়া এক সময়ে কর্মীদের পক্ষে হয়ত অসম্ভব হয়ে পড়বে। মামলার গতি-প্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে সব মামলা রুজু করা আছে এবং মামলা চলছে তার মাঝে কিছু মামলার রায় অচিরেই হয়ে যাবে।

কোনও মামলায় খালেদা জিয়া জেলের সম্মুখীন হলে, তার মুক্তি চাওয়ার সুসংগঠিত দল আর কর্মীবাহিনী তো তাকে রেখে যেতে হবে। সে পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর না হয়ে দুর্যোগ সৃষ্টির চেষ্টা করা কোনওভাবেই ভালো হবে না। রাজনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তন করতে না পারা আর ঘটনার গতির সঙ্গে নিজেদের সামাঞ্জস্য বিধানের ধারণা করতে না পারাটাও নেতৃত্বের ব্যর্থতা।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধশক্তির রাজনীতিচর্চায় ব্যস্ত। কথা যে একেবারে মিথ্যা, তাও নয়। জিয়া ও খালেদা জিয়ার পরিচর্যায় পাকিস্তানপন্থী সংগঠনগুলোর পুনর্জ্জীবন সম্ভব হয়েছে। খালেদা জিয়া তো জামায়াতকে সঙ্গে রেখে পরিপুষ্ট করেছেন। জামায়াত কোনও মুসলিম লীগ জাতীয় সংগঠন নয়, তারা মৌলবাদী সংগঠন। মওদুদীবাদ আর ওহাবীবাদ একই মতাদর্শ। এ কারণেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন জামায়াত ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে বিএনপিকে। শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী যে মিশরের ইকওয়ানুল মুসলিমিনের মতো হবে, সে কথা নিশ্চয়ই তারা উপলব্ধি করতে পেরেছে। পশ্চিমা বিশ্ব মনে করে ফান্ডামেন্টাল ইসলাম গণতন্ত্রের সঙ্গে সংঘাতময় এবং অন্যকোনও মতাদর্শকে সহ্য করে না।

৪৪ বছর আগে পাকিস্তানের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। মধ্যখানে বিরাট এক ভারতবর্ষ। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষে পাকিস্তানের হয়ে কাজ করার চেষ্টা করা আত্মহননের শামিল। খালেদা জিয়া যখন অষ্টম সংসদ নির্বাচনের পরে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, তখন আসামের উলফাকে অস্ত্র সাহায্য করার জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছিলেন। বন্দর-রাস্তা-ঘাট ব্যবহারের অনুমতিও দিয়েছিলেন। ১০ ট্রাক অস্ত্র আটক হওয়ার পর সব ষড়যন্ত্রই ফাঁস হয়ে যায়। তারেকের হাওয়াভবন, মতিউর রহমান নিজামী, বাংলাদেশের ডিজিএফআই, গোয়েন্দা বিভাগ—সবাই যে জড়িত ছিলেন, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব ওমর ফারুকের সাক্ষী সবই উঠে এসেছিল। অস্ত্র মামলায় গোয়েন্দা প্রধান, জিডিএফআই-এর প্রধান, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জমান বাবর, শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামীসহ অনেকের ফাঁসির আদেশ হয়েছে।

এই মামলার তথ্য বিবরণীতে প্রমাণিত হয় যে বেগম জিয়া সরকার পাকিস্তান বান্ধব সরকারই ছিল এবং ভারত ভাঙার ষড়যন্ত্রে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন পাকিস্তানিদের সঙ্গে। পাকিস্তানিদের সঙ্গে কারও সম্পর্ক থাকলে এর মাঝে কারও আপত্তি করার কিছু নেই। তবে সরকারে বসে পাকিস্তানিদের ভারত ভাঙার অপচেষ্টায় শামিল হতে চাইলে বহু প্রশ্নের অবতারণা করতে হয়।

ভারত বৃহত্তর দেশ, এটমিক ক্লাবের মেম্বার। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনীর অধিকারী। তাদের সঙ্গে সামরিক সংঘাত হলে আমাদের পক্ষে পেরে ওঠা সম্ভব নয়। আমাদের ৫৪ টা নদীর উৎপত্তিস্থল ভারতে। আমরা ভাটির দেশ। পানি বন্ধ করলে আমাদের খাল-বিল সব শুকিয়ে যাবে। সুতরাং ভারতের সঙ্গে আমাদের সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করে চলতে হবে।

শেখ হাসিনার সরকার সৎ-প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করে গঙ্গার পানির হিস্যা আদায় করেছে, সীমান্ত সমস্যার সমাধান করেছে। ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে সমুদ্র সীমানাও নির্ধারণ করা হয়েছে।  সমস্যা  সমাধান আলাপ-আলোচনা করে সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করে ভারত থেকে আদায় করা হয়েছে। কোনও সংঘাতের মাধ্যমে আদায় করা সম্ভব হতো না। খালেদা জিয়ার সরকার পাকিস্তানিদের সঙ্গে মিলেমিশে ভারত ভাঙার চেষ্টা করে খুবই গর্হিত কাজ করেছিলেন। এতে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। এই বিষয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া বিজ্ঞতার পরিচয় দেননি।

খালেদা জিয়া শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক উত্থাপনের পর তার দলের কিছু মাঝারি নেতা অসংলগ্ন কথাবার্তা বলা আরম্ভ করেছেন। গয়েশ্বর রায় বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে উপহাসমূলক কথা বলেছেন। যুগ্ম-সম্পাদক রিজভী তো বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষক, জাতির পিতা ইত্যাদি কিছু মানতে রাজি নন। বঙ্গবন্ধু যদি স্বাধীনতার ঘোষণা না দেন, তবে জিয়াউর রহমান কোন ঘোষণা শুনে কালুরঘাটের ব্রিজের নিচে অবস্থান নিয়েছিলেন প্রশ্ন উঠতে পারে। ২৭ মার্চ জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা তারপক্ষ থেকে পাঠ করেছিলেন মাত্র।

খালেদা জিয়ার উচিত হবে, তার অতি উৎসাহী মাঝারি নেতাগুলোর জিহ্বা সংবরণ করতে পরামর্শ দেওয়া। বিএনপির কিছু বন্ধুর মুখে শুনেছি রিজভী ৪/৫ মাস জেল খেটে বের হওয়ার পর তার ভাবখানা নাকি এরূপ হয়েছে যে, তিনি যেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বের হয়েছেন। কর্মীরা আন্দোলন করে জেল ভেঙে তাকে বের করেছেন। আগেই উনি ভাবে ছিলেন, এখন ওভার ইস্টিমেশনে ভুগছেন। এ সমস্ত লোককে সামাল দেওয়া উচিত। সমান-অসমান সবাই সমান—এই অবস্থা আমাদের সমাজে নয়।

খালেদা জিয়া কোন কারণে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক বিষয়গুলোকে বিতর্কিত করে গুরুত্বহীন করার চেষ্টা করছেন তা তিনিই ভালো জানেন। পাকিস্তানের ফাঁদে পা দিয়ে অস্ত্র চোরাচালানে সহযোগিতা করতে গিয়ে একবার তিনি বাংলাদেশকেই বিপদের মুখোমুখি করেছিলেন, আবার যেন পাকিস্তানিদের কোনও নকশা বাস্তবায়নে সহযোগিতা না করেন—সে অনুরোধ করব। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর, অকার্যকর রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রেমিক হতে চাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

 

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anisalamgir@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ