behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

তারা সবাই বাজনাদার

বখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী১৯:২৯, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০১৬

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীশাহ মোয়াজ্জেম বাজনা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তিনি যখন কারও সম্পর্কে বাজনা বাজান, তখন মুখে খই-ফুটে। সে বাজনা প্রশংসার হোক নিন্দার হোক। এটা তার প্রধানতম গুণ। তিনি শ্রোতার মুখের দিকে দেখেন না তার বাজনার প্রতিক্রিয়া কী। দশদিন আগে যাকে রাজাকার বলে নিন্দা করেছি, দশ দিন পরে তাকে মুক্তিযোদ্ধা বলে প্রশংসা করছি। এ আত্ম-প্রতারণার কী জবাব তিনি তার বিবেককে দেন, তা জানি না। তবে বিবেকসম্পন্ন লোক এতে লজ্জাবোধ করেন। সম্প্রতি  খালেদা জিয়াকে একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধে শেখ হাসিনার কোনও অবদান নেই বলে শাহ মোয়াজ্জেম সে রকম আরেক দৃষ্টান্ত রাখলেন।
শাহ মোয়াজ্জেম অল্প পরিচিত লোক নন। ১৯৬২ সালের ছাত্র নেতা। লৌহমানব আইয়ুবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা নেতা। জেল জুলুমও কম ভোগ করেননি। কম লেখা পড়া জানা লোক তাও নন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় প্রবাসী সরকার তাকে দিল্লিতে ভারতীয় লোকসভার যৌথ অধিবেশনে বক্তৃতা করার জন্য পাঠিয়ে ছিলেন। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি জানানোর আবেদন জানিয়ে তিনি বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-বেদনার কথা বলে দুই ঘণ্টা চল্লিশ মিনিট বক্তৃতা করেছিলেন। অনেক রাষ্ট্র প্রধান-সরকার প্রধান ভারত সফর করে থাকেন। সহজে কাউকেও লোকসভার যৌথ অধিবেশনে বক্তৃতা দিতে আহ্বান জানানো হয় না। ৪০/৪২ বছর বয়সে মোয়াজ্জেম সাহেব সে দুর্লভ সৌভাগ্যের অধিকারী হয়েছিলেন।
মোয়াজ্জেম গৌরবময় ইতিহাসে নিজের জন্য ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের সঙ্গে থাকার একটা ক্ষুদ্র জায়াগা তো সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের পর থেকে তিনি নিজে একজন বাজনাদার-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। নিজের অতীত গৌরবময় ইতিহাসের  সব সঞ্চয়ে তিনি আলকাতার ঢেলে দিলেন। ইতিহাসে মোহনলালের স্থানও হয়েছে মীর জাফরের স্থানও আছে। ইতিহাস পাঠ করতে গেলে মোহন লালকে মানুষ শ্রদ্ধা করে আর মীর জাফরকে মানুষ মীর জাফর হিসাবে ঘৃণা করে।
বঙ্গবন্ধু তার সহকর্মীদের মাঝে যারই একটু প্রতিভার দ্যুতি দেখেছিলেন, তাকে ওপরে টেনে তুলতে কখনও কৃপণতা দেখাননি। মুন্সীগঞ্জের কোরবান আলী আর শাহ  মোয়াজ্জেম বঙ্গবন্ধুর আনুকূল্যে সিক্ত হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু দুজনকেই যতদূর তোলা সম্ভব, ততদূর টেনে তুলেছিলেন। কোরবান আলী একদিন কাকেও কিছু না বলে এরশাদের মন্ত্রিসভায় গিয়ে যোগ দিলেন। এরশাদের মন্ত্রীর মর্যাদা কি আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্যের চেয়ে মর্যাদা বেশি ছিল! কোরবান আলী তো আগেও মন্ত্রী ছিলেন।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর জওহরলাল নেহরু যখন ভারতে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, তখন সর্দার ভল্লব ভাই পেটেল উপ-প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। নেহরু চেয়েছিলেন আরেকটা উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ সৃষ্টি করে জয়প্রকাশ নারায়ণকে উপ-প্রধানমন্ত্রী করতে। কিন্তু জয়-প্রকাশ নারায়ণ নেহরুর সে প্রস্তাবকে বিনীতভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। জয়প্রকাশ নারায়ণ কখনও মন্ত্রী হননি। ভারতের ইউনিয়ন মন্ত্রিসভায় কত মন্ত্রী  এসেছেন, কত মন্ত্রী গেছেন, হয়ত ভারতীয়দের কাছে অনেকে বিস্মৃত হয়ে গেছেন কিন্তু জয় প্রকাশ নারায়ণের কথা ভারতের প্রতিটি মানুষ স্মরণে রেখেছেন। কারণ তিনি তার আত্ম-ত্যাগের ইতিহাসকে ঠুনকো মন্ত্রিত্বের লোভে ম্লান হতে দেননি।
বাংলাদেশের অনেক প্রবাদ প্রতিম রাজনীতিবিদ-জীবনের এক পর্যায়ে এসে নিজের চরিত্র পাল্টিয়ে দ্বিচারিতা, মিথ্যাচার, স্বার্থপরতা ও দায়িত্ব জ্ঞানহীনতার অতলে নিজেদের ডুবিয়েছেন শুধু সামান্য মন্ত্রিত্বের জন্য। আফসোস বক্ষবিদীর্ণ হয় মরহুম মিজানুর রহমান চৌধুরীর কথা স্মরণে এলে। শাহাজান সিরাজের কথা মনে পড়লে। শাহা মেয়াজ্জেম, ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খাঁন, কাজী আরেফ আহাম্মেদ, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহম্মেদ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহাজান সিরাজ, আসম আব্দুর রব, তারাই তো ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ের সর্বজন স্বীকৃত যুবা-বয়সের নেতা। তাদের কথা না লিখলে স্বাধীনতার ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকবে। দেশের স্বাধীনতার জন্য তারা এত আত্ম-ত্যাগ করেছিলেন, স্বাধীনতার পর একত্রিত থেকে দেশটা গড়ার ব্যাপারে তারা সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হলেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে নাকি তাদের কারও কারও যোগসাজসও ছিল।

১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে যখন দেশের ফিরে এসে প্রধানমন্ত্রী হলেন তখন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনঃগঠনের বিরাট এক কর্মযজ্ঞ সম্পাদনের দায়িত্ব অপেক্ষায় ছিল। এমন জরুরি কাজ সম্পাদনেরও সময় দিলেন না সিরাজুল আনম খানেরা। দলটাকে বিধ্বস্ত করে চলে গেলেন তারা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েমের এক হঠকারী কর্মসূচি নিয়ে। যুক্তিযুক্তভাবে উদ্দেশ্য ও উপায় স্থির করে পরস্পরের সহযোগিতার ভিত্তিতে শৃঙ্খলাবদ্ধ কাজের দ্বারাই জাতি সেদিন অগ্রসর হতে পারত। কিছু তারা সেদিকে পদক্ষেপ না করে বিশৃঙ্খলার মাঝে দেশটাকে নিক্ষেপ করেছিলেন। তোহা, মতিন, আলাউদ্দীন, আব্দুল হক, সিরাজ সিকদার তারা তো অস্ত্র হাতে বের হলেন। লেলিন বলেছেন, ‘ভবিষ্যতের কোমল স্বপ্নে বিভোর হয়ে যে উপস্থিত কঠিন কর্তব্য অস্বীকার করে সে-ই সুবিধাবাধী।’ আব্দুল হক সাহেব তো পাকিস্তানের সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। সবাই সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতা গ্রহণের পথ সুগম করে দিয়েছিলেন এবং সাময়িক বাহিনীর চাটুকারী করেছেন। কর্নেল তাহের তো সামরিক বাহিনীর হাতেই মৃত্যুবরণ করলেন। অথচ বঙ্গবন্ধু শাহ আজিজের বাসায় বাসা ভাড়ার টাকা পাঠাতেন কারণ শাহ আজিজকে বঙ্গবন্ধু কলাবোরেটর আইনে জেলে পাঠিয়েছেন। শাহা আজিজের পরিবার যেন বাসা ভাড়ার জন্য অপদস্থ না হন। এই ছিল প্রকৃত মানবতাবাদী রাজনৈতিক নেতার চরিত্র। আর জিয়াউর রহমান কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দিয়েছিলেন ‘মারি অরি পারি যে কৌশল’ মন্ত্রে। যেটা সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তার কাজ থেকে পাওয়ার জিনিস।

গত ২৬ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে দাওয়াত পেয়ে হোটেল রেডিসনে গিয়েছিলাম। দেশ-বিদেশের বহু উচ্চ-পর্যায়ের লোক সেখানে গিয়েছেন। বিরাট এক মিলন মেলা। হঠাৎ দেখলাম বঙ্গবীর কাদের সিদ্দীকী বীর উত্তম কোলাকুলি করছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে। কাদের সিদ্দিকী সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের এক সতন্ত্র অধ্যায় সৃষ্টিকারী ব্যক্তি। বঙ্গবীর, বীরউত্তম উপাধী তাকে অহেতুক দেওয়া হয়নি। তিনি কাদেরীয়া বাহিনী সৃষ্টি করে দেশে থেকেই যুদ্ধ করেছিলেন। ভারতে যাননি। সত্যিকারের বীর তিনি। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। কথা বলতে চেয়েও কথা বললাম না। পত্রিকায় প্রতি সপ্তাহে তার কলাম পড়ি। হা-হুতাশ প্রায় লেখায় থাকে। তিনি এখন আওয়ামী লীগ করেন না। ভিন্ন দল গঠন করেছেন। তার হা-হুতাশ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য না কি দলে ফিরে আসার জন্য, তা বোঝা যায় না। আমি কম বুদ্ধিমান মানুষ, তবু তাকে বলব, হতাশার কারণে যেন কোনও দৃষ্টিকটু কাজ করে না বসেন।

সর্বশেষ শাহ মোয়াজ্জেমের কথায় ফিরে আসি। তিনি এখন বিএনপি করেন। এখন তার বয়স ৭৬ বছর দল না করলেও চলত। এখন তার পাওয়ারও কিছু নেই আর পাওয়ার বয়সও নেই। সুতরাং অহেতুক অমুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযোদ্ধা করে লাভ নেই। খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময় বন্দী ছিলেন। এমন আত্ম-প্রতারণামূলক কথা বলে তথ্য বিকৃতি ঘটিয়ে লাভ কী? মোয়াজ্জেম সাহেবের কাছে অনুরোধ, তিনি যেন মৃত্যুর সময়ে আর বাজনাদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হন।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ