Vision  ad on bangla Tribune

মাশরাফির অনায়াস আলাপ আর প্রপাগান্ডা-সংস্কৃতি

মানস চৌধুরী১২:৩১, ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০১৬

মানস চৌধুরীমাশরাফি বিন মর্তুজাকে ক্রিকেটার হিসেবে পছন্দ করতে শুরু করার আগেই আমি তাঁর অনায়াস ভঙ্গির একজন গুণগ্রাহী হয়ে পড়েছিলাম। মাঠে তাঁর হাঁটবার ভঙ্গি, খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, পুরস্কার নিতে যাওয়ার সময়ের দেহভাষা, মুখের হাসি এসবই আমার অতীব মনোহর লাগত। বলাই বাহুল্য, এসবের দেখা মিলত টেলিভিশনেই। মাশরাফিকে টেলিভিশনের বাইরে দেখার কোনও সুযোগ বা সম্ভাবনা আমার জীবনে ছিল না, এখনও নেই। শুধু তাই নয়, পরের দিকে তাঁর ইনজুরির বিষয়গুলো জানতে শুরু করেছিলাম। এরকম ইনজুরি নিয়ে সংগ্রাম এবং তার মধ্যে খেলা চালিয়ে যাবার দুর্নিবার মনোবল সকল কিছুই মাশরাফির বিষয়ে আমাকে ক্রমাগত আগ্রহী ও মুগ্ধ করেছে।        
যত সহজে এই আগ্রহ আর মুগ্ধতার কথা বললাম ততটা সহজে বিষয়টা হয়নি। শুরুতেই বলছিলাম যে ক্রিকেটার কিংবা অধিনায়ক মাশরাফিকে আমার পছন্দ করতে সময় লেগেছে। সেটার সম্ভবত একটা গূঢ় কারণ আছে। চলতি ভাষায় যাকে আবেগপ্রবণতা বলা হয়, সেটির অত্যন্ত অপছন্দকারী লোকদের মধ্যে আমি পড়ি। বিশেষত, পাবলিক পরিসরে আবেগের গুরুতর বহিঃপ্রকাশ, আমাকে অত্যন্ত বিরক্ত করে। এমন নয় যে আমি মাত্রার সীমানাটা টানতে পারবো, কিংবা আমি দাবি করতে পারবো আবেগ মানুষের থাকতে নেই। আবার, আবেগকে আমার বিশেষ বয়ামে রাখা লবণ বা চিনিও মনে হয় না যে থাকাথাকির প্রশ্নটাকে এভাবে দেখা যায়। যেভাবেই হোক, আমি বুঝতে পারি কোনটা আমার অপছন্দের বিষয়। ইনজুরি বা অধিনায়কত্ব এখন আর মনে নেই, মাশরাফিকে একাধিকবার জনপরিসরেই আবেগপ্রবণ হতে দেখা গেছে। আমার কখনওই বিশেষ আরাম লাগেনি। হয়তো তাঁকে পছন্দ করতে থাকার ধীরগতির এটা একটা মস্ত কারণ।
এই বিষয়গুলো আবার মনে পড়ল অতি সম্প্রতি মাশরাফি নামে তাঁর জীবনীগ্রন্থটি প্রকাশের খবর পাওয়ার পর। আসলে তাও নয়, দেবব্রত মুখোপাধ্যায় রচিত এই গ্রন্থখানির খবর আগেই কানে এসেছিল। আলাদা করে বিশেষ কৌতূহল বা আগ্রহ বোধ করিনি তখন। তারকাদের অনেকের জীবনীগ্রন্থ দারুণ সুখপাঠ্য, তথাপি প্রথমেই তা নিয়ে অনেক উৎসাহ না তৈরি হতেই পারে। সাইবার পরিমণ্ডলের বরাতে বইটির অংশবিশেষ জানতে পারছিলাম। টুকরো টুকরো কিছু অংশ বইটি থেকে বিভিন্ন পোর্টালে প্রকাশিত হচ্ছিল। নানান বিষয় নিয়ে আমার নির্লিপ্ত পঠন ছিল। বলা যায়, সেই গল্পগুলো মজার, কিন্তু আলাদা করে বিশেষ উল্লেখ করার মতো নয়। কিন্তু ক্রিকেট নিয়ে তাঁর মতামতের চৌম্বক অংশের প্রতি আমার দারুণ আগ্রহ তৈরি হলো। অনায়াস ভঙ্গিতে মাশরাফি এমন কিছু বিষয় বলেছেন যেগুলো বাংলাদেশের বাস্তবতায় রীতিমতো লক্ষ্য করার মতো।             

গ্রন্থকার মাশরাফির সঙ্গে আলাপ করছিলেন ক্রিকেট-তারকা হিসেবে তাঁর প্রফাইল নিয়ে। মাশরাফি প্রায় উড়িয়ে দিলেন সেসব প্রশ্ন। তারকা বা সেলিব্রিটি হিসেবে তিনি নিজেকে কোথায় রাখেন সেই বিষয়ে তাঁর ভাবনা অবতারণা করলেন। আর সেটা করতে গিয়ে আরও বৃহত্তর কিছু বিষয়ের দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। মাশরাফি নিজের বা জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের তারকা-সত্ত্বা নিয়ে যা বলেছেন তার সারাংশ এরকম: তিনি নিজে বা ক্রিকেটাররা কোনও বড় তারকা নন, এমনকি তাঁরা তারকাই নন। তারকা হচ্ছেন তাঁরা যাঁরা দেশের জন্য উৎপাদন করেন। যাঁরা জমিতে চাষ করেন, ফসল ফলান; যাঁরা কারখানায় কাজ করেন, জিনিসপত্র বানান; যাঁরা চিকিৎসা করেন, মানুষজনের জীবন রক্ষা করেন; যাঁরা শিক্ষাদান করেন, মানুষজনকে প্রশিক্ষিত করেন। মাশরাফি কেবল তাঁর জগতবোধের কারিগরদের পরিচিত করিয়ে দিয়েই থামেননি। তিনি জানিয়েছেন মাঠে ক্রিকেটাররা যখন নামেন তখন তাঁদেরকে যখন ১৬ কোটি মানুষের প্রতিনিধি বলা হয় তখন খুবই ভুল বার্তা দেওয়া হয়। মাশরাফির মতে ক্রিকেটাররা ১৬ কোটির মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন না। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে খেলা পরিশেষে খেলাই, এবং একে এত গুরুত্ব দিলে মুখ্য ভাবার জায়গাগুলো আড়ালে থেকে যায়। মূল কাজটা যে দেশের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি সেটাও নির্দেশ করতে মাশরাফি ভুল করেননি।          

আসলে আমার রচনাটি মাশরাফি বন্দনা নয়, যদিও সেটা পাওয়ার মতো কৃতিত্ব তাঁর রয়েই গেছে। এমনকি ক্রিকেটকে ঘিরে উত্তেজনা কিংবা ক্রিকেটে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার বিষয়ে কোনওরকম নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করতে তাঁকে উছিলা হিসেবে ব্যবহার করিনি। এখানে তাঁর কথাগুলো স্মরণ করলাম বাংলাদেশের প্রপাগান্ডা-সংস্কৃতি নিয়ে ভাবতে গিয়ে। তিনি সরল অংকের মতো দেখিয়ে দিয়েছেন কোন জায়গায় দৃকপাত করা একটা রাষ্ট্রের জন্য, সমাজের জন্য, মানুষজনের জন্য জরুরি। কোথায় দৃকপাত করলে মুখ্য প্রসঙ্গগুলো আড়াল হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে।

ক্রিকেটকে আলাদা করে দোষারোপ করা না-করার প্রশ্ন নিয়ে বসিনি আমি। যদিও এটা বলতে কোনও গবেষণা করার দরকার পড়বে না যে এই মুহূর্তের জাতীয়তাবাদী তৎপরতার অন্যতম উপাদান এই ক্রিকেট। তথাপি আমার আগ্রহ ক্রিকেট নয়, সাধারণভাবে জাতীয়তাবাদী প্রবণতা নিয়ে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে আমার এই মুহূর্তের আগ্রহ প্রপাগান্ডা নিয়ে। জাতীয়তাবাদী অবয়ব নির্মাণে প্রপাগান্ডার ভূমিকা নিয়ে। কোনও পর্দা দিয়ে কোনও কিছু আড়াল করার কৃৎকৌশল নিয়ে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় মুখ্য আর গৌণ প্রসঙ্গের ভেদবিচার করতে পারার ক্ষেত্রে জনগণের সামর্থ্যের বিষয়ে। গৌরব আর ঐতিহ্যের ঢাকঢোল বাজানোকেই আমি এখানে প্রপাগান্ডা-সংস্কৃতি বলছি। এই প্রবণতার মধ্য দিয়ে বিশেষ উদ্দেশ্য হাসিলের প্রক্রিয়া কিংবা জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে রাখার প্রক্রিয়াকে আমি রাজনৈতিক মনে করি। ফলে প্রপাগান্ডা একটা গভীর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বা হাতিয়ার। এর সুনির্দিষ্ট লাভক্ষতি রয়েছে। সেই লাভক্ষতি তাহলে প্রপাগান্ডার কারকেরা ভালমতো হিসেব করতে জানেন। ক্রিকেট আসলেই কোনও বিষয়বস্তু নয় আমার, যদিও একজন অত্যন্ত সমর্থ ক্রিকেটার প্রসঙ্গগুলোর সূত্রপাত ঘটাতে উস্কে দিয়েছেন।

ঠিক এই রচনাটি যখন লিখছি ছেদ পড়ল। বাসা থেকে বের হয়েছি। ঢাকার বাইরে যাবো বলে ট্রাফিকের আশঙ্কানুযায়ী যথাসম্ভব আগেই রাস্তায় নেমেছি। রাস্তার পাশে পত্রিকা বিছিয়ে বিক্রি করছেন হকার। পত্রিকার শীর্ষপাতায় ক্রন্দনরত সেই মহিলা। কৌতূহলে বিনে পয়সায় পত্রিকা হাতে নিয়ে দেখতে পাই সেই মহিলার স্বামী মারা গেছেন। ঠিক আগের রাতেই বোধহয় রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে চাঁদা চাইতে গিয়ে পুলিশ, বা মতান্তরে পুলিশের ইনফর্মার, না পেয়ে দোকান-মালিককে পেটাতে গিয়ে কেরোসিনের চুলো উল্টে ফেলে আগুনে লোকটিকে পুড়িয়ে ফেলে। আগের দিন জেনেছিলাম, হাসপাতালের বরাতে, ৯০ ভাগ পুড়ে গেছে লোকটার। পরদিন ন্যায্যমতো জানা গেল লোকটি আর বেঁচে নেই।

বাংলাদেশে সহিংসতার চিত্রাবলী এমন কিছু নতুন নয়। আমাদের সহ্য করার অভ্যাসও এতদিনে পাকাপোক্ত হওয়ার কথা। কত রকমের, কত পক্ষের সহিংসতার এখানে অভিজ্ঞতাশালী হতে হয় কিংবা, আরও দুর্ভাগা হলে, মুখোমুখি হতে হয় তার তালিকাও বিশেষ লম্বা। কিন্তু গত ক’দিনে কেবল পুলিশের কৃতকর্মও বিশেষ মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করার মতো। ক্রিকেট কিংবা যে কোনও গৌরবের হৈহৈ-কাণ্ড রৈরৈ-ব্যাপারে মজে থাকলে এই সমস্যাটাই হয়। আমরা লক্ষ্য না করতে পারি যে ধীরে ধীরে আমলা-পুলিশ নির্ভর এক অদ্ভুত দৈত্য রাষ্ট্র বানিয়ে ফেলা হয়ে গেছে।

মাশরাফি এত সহজে প্রপাগান্ডা-সংস্কৃতির গূঢ় যে বিষয়টা সকলকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন সেই প্রপাগান্ডা-সংস্কৃতির রাজনীতিকে বোঝাপড়া করার জন্য বাংলাদেশের মানুষজন খুব একটা প্রস্তুত বোধ হয় নেই।  

লেখক: জা.বি.তে নৃবিজ্ঞানের শিক্ষক; আর বিশ্লেষক, গল্পকার. অভিনেতা, সম্পাদক। 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ