behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

মার্কিনিদের নির্বাচন

আনিস আলমগীর১০:৩০, ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০১৬

Anis Alamgirআমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাথমিক পর্ব আইওয়া রাজ্য থেকে আরম্ভ হয়েছে গত ২রা ফেব্রুয়ারি। ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকানের প্রেসিডেন্ট-প্রার্থীরা আইওয়া ককাসের মধ্য দিয়ে প্রার্থী বাছাই-পর্বের কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। রিপাবলিকান-প্রার্থীদের মাঝে ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোড়ন সৃষ্টি করে জনমত জরিপে এগিয়েছিলেন। কিন্তু আইওয়ার প্রাইমারিতে হেরে গেলেন টেড ক্রুজের কাছে।
টেড ক্রুজ রক্ষণশীল রিপাবলিকান। টেড ক্রুজের বিজয় এসেছে আইওয়ার ইভানজেলিক্যাল ভোটারদের সমর্থনের কারণে। আইওয়ার ককাসে নিচের থেকে উঠে এসেছেন ফ্লোরিডারসিনেটর মার্কো রুবিও। ট্রেড ক্রুজ পেয়েছেন ২৭.৭%, ডোনাল্ড ট্রাম্প পেয়েছেন ২৩.৪% আর মার্কো রুবিও পেয়েছেন ২৩.১% ভোট। আইওয়া তার অতি রক্ষণশীল ইনভানজেলিক্যাল প্রবণতার জন্য সুবিদিত। এ রাজ্যের রিপাবলিকান সমর্থকেরা চোখে সব চেয়ে বেশি যিনি ‘খ্রিস্টপন্থী’ তাকেই ভোট দিয়ে থাকেন।
আমেরিকা সম্পর্কে একটা কথা প্রচলিত আছে এভরি থার্ড হাউস ইজ এ বাইবেল হাউস। এ কথাটা আইওয়ার ব্যাপারে বেশি প্রযোজ্য। রিপাবলিকানদের ধর্মপ্রীতি ডেমোক্রেটদের চেয়ে বেশি। আসলে ডেমোক্রেটেরা স্যেকুলার মতাদর্শে বিশ্বাসী। আইওয়ার রিপাবলিকান সমর্থকের মাঝে ট্রেড ক্রুজ নিজেকে ভালো খ্রিস্টের অনুসারী হিসেবে উপস্থিত করতে পেরেছেন।সর্বোপরি তৃণমূল স্তরে তার সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনাও ছিল মজবুত। ডোনাল্ড ট্রাম্প হেরেছেন মিডিয়ার কাছ থেকে অতিরিক্ত মনযোগ পেয়ে নিজেকে বিজয়ী ভাবতে শুরু করেছিলেন বলে। যে কারণে তৃণমূলের প্রতি তার কোনও মনোযোগই  ছিল না। ফ্লোরিডার সিনেটর মার্কো রুবিও তৃতীয় স্থানে থাকলেও তার সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর ব্যবধান খুবই সামান্য, পয়েন্ট ওয়ান মাত্র। মিডিয়া বলছে এতেই তিনি নাকি নিজেকে বিজয়ী মনে করছেন।

আরেক প্রার্থী রাজনৈতিক ঘরের সন্তান জেব বুশ দৌড়ে খুব বেশি ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েছেন। তার বাবাও আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন তার বড় ভাইও প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি ছিলেন ফ্লোরিডার গভর্নর। তিনি পেয়েছেন ২.৮% ভোট। তারা আইরিশ বংশোদ্ভূত। আইরিশেরা জেদি হন। নিউ হ্যাম্প-শায়ারের ককাসের ফলাফলের ওপর তার নির্বাচনি দৌঁড়ে থাকা না থাকার বিষয় নির্ভর করছে। কারণ তিনি এ রাজ্যের প্রাইমারিতে লড়বেন। এ রাজ্যে দলীয় প্রাইমারি হবে ৯ ফেব্রুয়ারি। জেব বুশ রিপাবলিকান দলের কাজে খুবই জনপ্রিয়।

ট্রেড ক্রুজ ও ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয়ের রিপাবলিকান পার্টির কাছে গ্রহণযোগ্যতা কম। উভয় প্রার্থীর আফ্রিকান-আমেরিকান, এশিয়ান-আমেরিকান ও ম্যাক্সিকান-আমেরিকানদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নেই। শুধু রক্ষণশীল সাদা খ্রিস্টানদের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতে আসা সম্ভব নয়। পার্টির কাছে তাদের দুজনেরই জনপ্রিয়তা শূন্যের কোটায়। ফ্লোরিডার সিনেটর মার্কো রুবিও মধ্যপন্থী লোক। তৃতীয়স্থান অধিকার করে দলের সুনজরে এসেছেন এবং তিনি রিপাবলিকান দলের চাঁদা দাতাদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হবেন।

প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে প্রাইমারিতে রিপাবলিকান দলের এ তিনজনের মাঝেই সম্ভবত ঘুরে-ফিরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে বার-বার নির্বাচনে জেতার রিপাবলিকান কৌশলটি এবার আগের মতো শানিত হবে বলে মনে হয় না। রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট ২০০০ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। দুই দফে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে বুশ মুক্ত বাজারকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দিয়েছিলেন। ধনীদের জন্য কর নেই। আইন নেই, গরিবের জন্য কোনও নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই। ব্যক্তিগত সম্পদ রক্ষা এবং জাতির প্রতিরক্ষার দিকে নজরদেয়া ছাড়া সরকারের কোনও কাজও ছিল না। অর্থনীতি বিধ্বস্ত হয়েছিল তাদের সময়ে অকারণ যুদ্ধে।

২০০৮ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ডেমোক্রেট দলের বারাক ওবামা দুই দফে ক্ষমতায় আছেন। ওবামা যখন ২০০৮ সালে প্রথম ক্ষমতায় আসেন তখন তার শপথ নেওয়ার পরপরই তিনটা ব্যাংক দেউলিয়া হয়েছিল। ফোর্ড কোম্পানি নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু বারাক ওবামা বিচক্ষণতার সঙ্গে তা সামাল দিয়েছিলেন। ডেমোক্রেট দল কথা দিয়েছিল—ইরাক আর আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করবে। তাও তারা প্রায় সম্পন্ন করেছে। গত ১৬ বছর আমেরিকাকে পরিচালনা করেছেন প্রেসিডেন্ট বুশ জুনিয়র ৮ বছর, আর বারাক ওবামা ৮ বছর। একজন রিপাবলিকান আর অন্যজন ডেমোক্রেট। এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনটা আমেরিকার মানুষকে তুলনা করে ভোট দেওয়ার অবকাশ দিয়েছে।

আইওয়ার ককাসের ডেমোক্রেট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন এবং সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স-এর মাঝে হাড্ডহাড্ডি লড়াই হয়েছে। আইওয়ার ডেমোক্রেট সমর্থকদের ভোট হিলারি পেয়েছেন ৪৯.৯% আর সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স পেয়েছেন ৪৯.৬% মাত্র পয়েন্ট। তিন পয়েন্টের ব্যবধানে হিলারি ক্লিনটন অগ্রগামী ছিলেন। প্রাইমারিতে দলীয় ডেলিগেইট নির্বাচনও সম্পন্ন হয়। আইওয়াতে ডেমোক্রেট ডেলিকেট ৪৪ জন। হিলারি পেয়েছেন ২৩ জন সিনেটর বার্নি স্যান্ডাস পেয়েছেন ২১ জন। জাতীয় কনভেনশনে ডেলিগেটদের ভোটে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়। জাতীয় কনভেনশনে ডেমেক্রেটাদের মোট ডেলিগেট সংখ্যা ৪ হাজার ৭৬৩ জন। প্রেসিডেন্টের মনোনয়ন পেতে হলে প্রয়োজন হয় ২ হাজার ৪৭২ জন ডেলগেটের সমর্থন। রিপাবালিকান দলের মোট ডেলিগেটের সংখ্যা ২৪৭২ জন। মনোনয়নের জন্য প্রয়োজন ১২৩৭ ডেলিগেটের সমর্থন।

ডেমোক্রেট প্রার্থীদের মাঝে অর্থবিত্তে সংগঠনে হিলারি খুবই শক্তিশালী কিন্তু এগুলো শক্তির খুটি হলেও ডেমোক্রেট সমর্থকেরা ভোটদেবে প্রার্থীর বক্তব্যের নির্যাসের আকর্ষণে। যে কারণে ২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বারাক ওবামার সঙ্গে হিলারি পেরে ওঠেননি। আগামী ৯ই ফেব্রুয়ারি নিউ হ্যাম্পশায়ারের ককাসের দিকে সবাইর দৃষ্টি। সিনেটর বার্নি স্যান্ডারসের সঙ্গে হিলারির বিজয় ক্ষুদ্রতম বিজয়। শুরুতে এ ক্ষুদ্রতম বিজয় দিয়ে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার লড়াইয়ে হিলারির ঘাম ঝরাতে পারে সিনেটর বার্নি স্যান্ডারস। আইওয়ার লড়াইকে বার্নি স্যান্ডারস রাজনৈতিক বিপ্লবের লড়াইয়ের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেছেন।

বাজারের হাতে সব ছেড়ে দিয়ে আমেরিকা নিজের জন্য, বিশ্বের জন্য এক সংকট সৃষ্টি করেছে। বিশ্বায়নের পরিবর্তিত পরিস্থিতির উপযোগী এখন নূতন চিন্তাধারার প্রয়োজন। ডেমোক্রেটের সমর্থকেরা রিপাবলিকান সমর্থকদের চেয়ে বেশি প্রগতিশীল এবং স্যেকুলার। হিলারি কিন্তু আমেরিকার সেনা-বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখে চলার পক্ষপাতি আর তিনি পুঁজিবাদের প্রতি আস্থাশীল। হিলারির চিন্তা-চেতনা আর রিপাবলিকানদের চিন্তা-চেতনার ফারাক কিন্তু খুব বেশি নয়

আর সিনেটর বার্নি-সান্ডারস আমেরিকান সমাজের জন্য একেবারে নূতন বৈপ্লবিক কথাবার্তা নিয়ে মাঠে এসেছেন। তিনি বাজার ব্যবস্থায় সম্পদ যে কয়েকজন হাতে নিয়ে পুঞ্জিভূত করে ফেলেছে এবং সাধারণ মানুষের দূঃখ দুর্দশা বাড়িয়ে দিয়েছে, তার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পক্ষে। ভারমন্টের সিনেটর সান্ডারস তার প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার জন্য সুখ্যাত। তার কথায় ও কাজে কোনও ভণ্ডামি নেই এ কথা তার জাত শত্রুও বিশ্বাস করেন। বাংলাদেশের ড. ইউনূস সম্পদ পুঞ্জিভূতকরণের পক্ষে বিরাট ব্রোকার ছিলেন। তিনি সম্প্রতি  সম্পদ কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করছেন বলে মনে হয়।

বাজারি অর্থনীতি এখন হুমকির মূখে। ভোক্তা কী খাবেন, কী পরবেন, তাও তারা শিখিয়ে দিয়েছেন। কী ইচ্ছা করবেন, তাও তারা শিখিয়ে দিয়েছেন, এমনকি কী স্বপ্ন দেখবেন, কিভাবে দেখবেন, তাও ঠিক করে দিয়েছেন তারা। এভাবে বাজারিরা সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। সম্পদ বৈষ্যম্যের ক্রমাগত বিস্ফোরণ আমেরিকার সমাজকে বিস্ফোরণের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। যিনি আগামী দিনগুলোয় আমেরিকাকে নেতৃত্ব দেবেন, তার কাছে এ বিপদ—তিনি আমেরিকান সমাজটাকে উদ্ধার করবেন কি না, তার একটা সুস্পষ্ট জবাব নিশ্চয়ই চাইবেন।

জিতবেন না পরাজিত হবেন, তার তোয়াক্কা না করে সিনেটর স্যান্ডারস সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন খোলাখুলিভাবে। তিনি হিলারিকে লক্ষ করে বলেছেন ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট-এর চাঁদা নিয়ে নির্বাচন করে সমাজ পরিবর্তন করা যাবে না। কথাটা সর্বাংশে সত্য। কিন্তু আমেরিকান সমাজে সঠিক সত্যটা উন্মোচন করার চেষ্টা করলে বেঁচে থাকার গ্যারান্টি থাকে না। কেনেডি হত্যা যথাযথ বিচার কি হতে পেরেছে?

নির্বাচনের প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়ে আলোচনা করলাম পরবর্তী সময়ে আরও একটা আলোচনা পাঠকের কাছে উপস্থিত করার ইচ্ছা আছে।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anisalamgir@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ