behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা১২:০৪, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৬

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাএক এগারোর সময় নিজের ভূমিকা নিয়ে টেলিভিশন টক-শোতে ভুল স্বীকার করে নতুন করে রাজনীতিবিদদের, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চাঙা করে দিয়েছেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তবে একই সঙ্গে তার বক্তব্য সাংবাদিকদেরও দাঁড় করিয়েছে আত্মজিজ্ঞাসার সামনে।
মাহফুজ আনাম একাই সেসময় অতি উৎসাহ নিয়ে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীদের নিয়ে রিপোর্ট করেছেন তা নয়, আরও অনেকেই করেছেন। মাহফুজ আনাম স্বীকার করেছেন, অন্যরা করেননি। বরং তারা এখন আওয়ামী লীগের কাছের লোক হয়ে গেছেন।
ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলো সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবাধায়ক সরকারের পক্ষে ছিল তা শুধু নয়, এই সরকারকে ক্ষমতায় আনা, মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়ন করতে চাওয়া, বিরাজনীতিকরণ উৎসাহিত করা, নোবেল জয়ী ড. ইউনূসকে দিয়ে রাজনৈতিক দল গড়ানোর চেষ্টা করা, সবই করেছেন। কিন্তু আরও অনেক সাংবাদিক, যাদের বেশ ক’জন এখন সম্পাদক, তাদের ভূমিকাও সেসময় কেমন ছিল, তা আর মনে করতে চাইনা। বাদ যাননি রাজনীতিবিদও। অনেকেই তখন নিজ-নিজ দল প্রধানের বিরুদ্ধে নানা কথা বলেছেন, কর্মকাণ্ড করেছেন। তারা এখন বহাল তবিয়তে আছেন, দল তাদের বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারণ করছে না।
রাষ্ট্রীয় আর গোষ্ঠীগত চাপের মুখে সাংবাদিকতা কেমন হয়, সম্পাদকীয় বিচার-বিবেচনা কেমন হতে পারে, সেই আলোচনার একটা দরজা খুলে দিয়েছেন মাহফুজ আনাম। ডেইলি স্টারের স্লোগান হলে Fear (ভয়) অথবা Favor (সুবিধানা) না করে সাংবাদিকতা করা। মাহফুজ আনামের কথা থেকে প্রমাণিত হয় এ দুটোর যেকোনও একটি তখন তাদের ঘাড়ে ভর করেছিল। ভয় ছিল না, তবে সুবিধা যে তারা পেয়েছিলেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

তবুও স্বাগত জানাতে হয় যে, তিনি আজ দোষ স্বীকার করেছেন। অন্যরা এটুকু নৈতিক অবস্থানও নেননি।

সাংবাদিকতায় নীতি-নৈতিকতার বিষয়টি নিয়ে এর মাধ্যমে বিস্তারিত আলোচনার একটা ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে যা একটি ইতিবাচক দিক। সাংবাদিকের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব সত্য প্রকাশ করা। বোঝা গেলো শেখ হাসিনা সম্পর্কে যে প্রতিবেদনটি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে দেওয়া হয়েছিল তা ঠিক ছিল না। ডেইলি স্টারের সেই রিপোর্টটির মূল দুর্বলতা ছিল, কোনও বরাত বা সোর্স উল্লেখ করা হয়নি প্রতিবেদনটিতে। প্রশ্ন হলো এখনওতো কত কি লেখা হয়ে যায় সোর্স উল্লেখ ছাড়াই। কত অসত্য, কত আংশিক সত্য কতভাবেই না প্রকাশিত বা প্রচারিত হচ্ছে। কিন্তু সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় কে দেখছে কে রুখছে এসব?

ন্যায্যতা নামে একটি কথা আছে গণমাধ্যমে, বিশেষ করে রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে, তাই বা কয়জন মানছি আমরা? দায়িত্বশীলতা আর উদ্যমী হয়ে সত্য খোঁজার যে সাংবাদিকতা, তার নজির কয়টি প্রতিষ্ঠান দেখাতে পেরেছে। অবশ্য কয়টি মিডিয়া হাউজইবা প্রতিষ্ঠান হতে পেরেছে? প্রাতিষ্ঠানিকতার প্রথম শর্ত তার কর্মী বাহিনীর মূল্যায়ন। আমাদের গণমাধ্যমে সাংবাদিকসহ সব স্তরের এবং বিভাগের কর্মী বাহিনীকে মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা। সেটা কতজন করে?

চাকরির কোনও নিশ্চয়তা নেই। সকালে এসাইনমেন্ট করে বিকেলে হয়তো কেউ অফিসে গিয়ে শুনছেন তার চাকরি নেই। বেতন নিয়মিত হয় এমন প্রতিষ্ঠান কয়টি? সংবাদপত্রের জন্য ওয়েজ বোর্ড আছে, সেটিও মানে কয়টি পত্রিকা? ইলেকট্রনিক মাধ্যমে তাও নেই। প্রভিডেন্ড ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, বিনোদন ভাতা, মেডিক্যাল ভাতা কোনওটিই দেওয়া হয়না, কোথাও কোথাও দিলেও তা প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে দেওয়া হয় না।

এমন এক বাস্তবতায় গণমাধ্যম কি করে গণমানুষের হয় তা আশা করি কারও বুঝতে অসুবিধা হয় না। ম্যাস-মিডিয়া এখন ক্লাস মিডিয়ায় পরিণত হয়েছে বাংলাদেশে। সেই ক্লাশ বা শ্রেণি হলো মালিকরা, তাদের রাজনৈতিক আর ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগত ভাই বন্ধুরা আর তাদের ভৃত্যরা। সাংবাদিকের স্বাধীনতা বলতে কী অবশিষ্ট আছে কারও কাছে স্পষ্ট নয়। কনটেন্ট বা আধেয় কার নিয়ন্ত্রণে তাও এক প্রশ্ন। সাংবাদিকরা মানুষের অধিকারের, ন্যায্যতার জন্য কাজ করেন, কিন্তু নিজের লড়াইয়ের জায়গাটাও খণ্ডিত করে রেখেছে ইউনিয়নকে রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত রেখে।

নথিপত্র/প্রামাণ্যবস্তু পরীক্ষা করে, নিজে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে রিপোর্ট করতে হয়। সেই এক এগারো সরকারের সময় ডেইলি স্টারসহ অনেক পত্রিকাই তা করেনি। প্রশ্ন হলো এখনও কি তা করা হচ্ছে? তথ্যের সূত্র/উৎস নির্দিষ্ট করে কয়টি রিপোর্ট হয়? বলা হয় সাংবাদিকের বিবেচনায় সবার আগে মানুষ। তাই মানুষের প্রেক্ষাপট থাকা জরুরি। সেই মানুষকেই অবজ্ঞা করে চলেছে কতনা মিডিয়া হাউজ। সাংবাদিকতা হলো সাংবাদিকের পেশাদারিত্ব ও দায়িত্ববোধের সমন্বয়।

সংসদ সদস্যরা সংসদে কথা বলছেন, রাজনীতিবিদরা তাদের মতো করে বলছেন। পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে আমাদের ভাবনাটা আশা করি ভিন্ন হবে। আত্মজিজ্ঞাসার কথা বলছিলাম, আশা করবো শুধু টেলিভিশন টক-শোতে নয়, কথা বলবো নিজেদের ফোরামেও।

নীতি-নৈতিকতা, পেশাদারিত্বের যে প্রসঙ্গ উপস্থাপিত হয়েছে তা নিয়ে সম্পাদক পরিষদ, সাংবাদিক ইউনিয়ন ভাবতে পারে। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের একটি লিখিত বিধিমালা আছে। কিন্তু তার আরও বিস্তৃতি প্রয়োজন। কারণ যখন এটি করা হয়েছিল তখন দেশে ইলেকট্রনিক মাধ্যম ছিল না। মানুষের জানান অধিকার আছে। কিন্তু মানুষের ব্যক্তিগত গোপণীয়তার অধিকারকেও মূল্য দিতে হবে।

আমাদের ভাবনা জায়গাটা পরিষ্কার করা দরকার কোন বিষয়ে কতটুকু যেতে পারি আমরা। স্পর্শকাতর বিষয়ে ব্যক্তির ক্ষতি ও সমষ্টির কল্যাণ—এ দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে পারছি আমরা সব ক্ষেত্রে। সাংবাদিকতার সাথে নিজ স্বার্থের দ্বন্দ্ব অর্থাৎ কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট নিয়েতো কথাই বলা যায় না। মানুষের মানবিক মর্যাদার প্রতি কতটা সংবেদনশীল থাকছি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল থাকছি, লেজুরবৃত্তি ছেড়ে কতটা সত্য বলছি তা অনুসন্ধানের সময় এখন।

করপোরেট পুঁজির নামে সামন্ত অর্থ আর ক্ষমতার প্রবেশ ঘটে কিছু কিছু মাধ্যমে প্রতিপক্ষের নামে কুৎসা লেখার নগ্নতা দেখছি আমরা, দিন দিন হয়তো এসব লেখায় অভ্যস্ততা বাড়বে আমাদের, কিছু মানুষের বড় বড় মূল্যে মিডিয়া বাজারে কেনা-বেচা দেখছি আমরা, কিন্তু সাংবাদিকতা হবে কতটুকু?

লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ