behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

মাহফুজ আনাম বিতর্ক

মাসুদা ভাট্টি১২:০৪, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৬

Masuda-Vatti-Cবিতর্ক যে সব সময়ই একটা ভালো কিছু নিয়ে আসে তা আবারও প্রমাণিত হলো ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের ভুল স্বীকারের মধ্য দিয়ে। ১/১১'র আমলে সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থার সরবরাহকৃত সংবাদ বিশেষ করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যেসব দুর্নীতির গল্প তখন ছাপানো হয়েছিল তার পত্রিকায় সেগুলো অত্যন্ত দুঃখজনক ভুল ছিল বলে মাহফুজ আনাম মনে করেন। এতোদিন পরে হলেও তিনি যে তার ভুল বুঝতে পেরেছেন সেজন্য তিনি ধন্যবাদ দাবি করতে পারেন এবং সকলেরই সেজন্য তাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। তবে এই ধন্যবাদ দেওয়ার পরও কিছু কথা থেকে যায়, সেগুলো নিয়েই কথা বলতে চাই আজ।
১/১১-র আমলটা যদি ফিরে দেখি তাহলে দেখতে পাই যে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে কেবল মিথ্যা সংবাদ কিংবা নির্যাতনের মুখে বিভিন্ন রাজননৈতিক নেতৃত্বের স্বীকারোক্তিই প্রকাশিত হয়েছে তা নয়, বরং গণমাধ্যম বিশেষ করে গণমাধ্যমের সম্পাদকগণ রাজনীতিবিদদের সরিয়ে তাদের জায়গাটি দখল করার চেষ্টায়ও লিপ্ত ছিলেন। ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো এই চেষ্টার অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছে। আমরা জানি যে, ১/১১-র সরকার গঠনে ড. ইউনূস নেপথ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরবর্তীকালে প্রকাশিত বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও সংবাদ থেকে এও জানা যায় যে, তিনি আসলে ১/১১-র সরকারকে সামনে রেখে নিজে রাজনীতিতে আসার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। এবং এই প্রক্রিয়ায় মাহফুজ আনাম যে ভূমিকা পালন করেছিলেন তাও এখন আর গোপন নেই। যে রাজনৈতিক দল ড. ইউনূস গঠন করতে চেয়েছিলেন তার দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি বা আহ্বায়ক হিসেবে মাহফুজ আনাম কাজ করেছেন। তার মানে ১/১১-র সরকারের গঠনপর্বটা ছিল এরকম:
ক) সেনাবাহিনীর সমর্থনে ফখরুদ্দিন একটি সরকার পরিচালনা করবেন, সঙ্গে থাকবেন কয়েকজন উপদেষ্টা এবং এই উপদেষ্টারা কারা থাকবেন তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল সম্ভবতঃ ড. ইউনূসের তত্ত্বাবধানে এবং তাতে মাহফুজ আনামদের অংশগ্রহণ ছিল না সেকথা মানা যায় না।

খ) গণমাধ্যমে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের চরিত্র হননের জন্য সেনাবাহিনী থেকে মাল-মসল্লার জোগান দেওয়া হবে এবং তা প্রকাশিত হবে গণমাধ্যমে। তারপর গণমাধ্যমের কর্তা ব্যক্তিগণ ও সমাজের গণ্যমান্যদের নিয়ে (যারা কিনা ড. ইউনূস সাহেবের ঘনিষ্ঠ) একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের পর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার সরে যাবে এবং সেই রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় বসবে দীর্ঘকালের জন্য। এই ভরসাতেই হয়তো ‘দুই নেত্রীকে যেতে হবে’ ধরনের মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল ডেইলি স্টারের সহদোরা বাংলা পত্রিকায়। যদিও আলোচ্য টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে মাহফুজ আনাম সেই বাংলা পত্রিকার কোনও দায় নেননি। মাহফুজ আনাম উপস্থাপক মুন্নী সাহাকে বার বার পাল্টা প্রশ্ন করছিলেন ‘পারসেপশন’ বিষয়ে, কিন্তু ১/১১’র আমলে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন এবং সেনা সমর্থিত অগণতান্ত্রিক সরকারকে সমর্থন দেওয়াটাতো আসলে পারসেপশন ছিল না, ছিল বাস্তবতা এবং এই বাস্তবতায় মাহফুজ আনাম প্রথম সারির কুশীলবদের অন্যতম।

গ) ১/১১’র সেনা সমর্থিত সরকার যেমন দেশিয় এই সম্পাদক, নোবেল বিজয়ীদের সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়েছে তেমনই পেয়েছিল বিদেশি রাষ্ট্রসমূহ বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ইউরোপিয় ইউনিয়নের অকুণ্ঠ সমর্থন। বলাই বাহুল্য যে, ড. ইউনূস ও মাহফুজ আনামদের যে রাজনৈতিক দল খোলার খায়েশ হয়েছিল সেটিও এই বিদেশিদের সাহায্য ও পরামর্শে কিনা তা জানা না গেলেও আমরা ধারণা করতে পারি যে, বিদেশিরা বিষয়টি জানতো এবং তাদের এতে সমর্থন ছিল। আমরা এও জানি যে, বাংলাদেশে বিদেশি সাহায্য-নির্ভর রাজনীতি কারা করেন এবং তাদের লক্ষ্যটাও আসলে কী।

প্রশ্ন হলো, এখন যখন দুঃখপ্রকাশের সময় এসেছে তখন মাহফুজ আনাম তার এই রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে একটু হলেও দুঃখিত কিনা? কারণ, দেশের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বকে নোংরা ও অসত্য দিয়ে আঘাত করে সেই জায়গায় নিজেদের রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার যে কূটকৌশল তারা গ্রহণ করেছিলেন তা কোনও সুস্থ ও স্বাভাবিক সময়ের কাজ নয়, রাষ্ট্রকে একটি অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দিয়ে তার ভেতর দিয়ে নিজেদের রাষ্ট্র পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা। আমার মতে, ডিজিএফআই সরবরাকৃত সংবাদ ছাপানো গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ না হলেও রাষ্ট্রকে নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলা নিঃসন্দেহে বড় ধরনের অপরাধ। এই অপরাধ বিষয়ে মাহফুজ আনামের বক্তব্য জানার ইচ্ছে রইলো। মাহফুজ আনাম ১/১১ সরকার গঠনের অনেক পরে জুলাই মাসের দিকে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা সম্পর্কিত যে লেখাটি দিয়ে এখন আত্মপক্ষ সমর্থন করতে চাইছেন তা আসলে নিজেদের অবস্থান বুঝতে পারার পরের ঘটনা, অর্থাৎ যখন ক্ষমতার খেলায় তিনি ও ড. ইউনূস আর পেরে উঠছিলেন তা তখন তার মনে হয়েছে যে, গণতন্ত্রকে এভাবে রক্ষা করা যায় না। বিলম্বে হলেও বোধোদয় হয়েছে বুঝতে পারি কিন্তু তাতে কি তার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা উচ্চাভিলাসের অতীত কর্মকাণ্ডকে ঢাকা যায়? যায় না। বাংলাদেশের ভাগ্য ভালো বলতে হবে যে, তখন ড. ইউনূস বা মাহফুজ আনামরা তাদের এই উচ্চাভিলাসকে চরিতার্থ করতে পারেননি, পারলে আজকে বাংলাদেশের অবস্থা কী হতো? সে কারণেই বলছি যে, সম্পাদক হিসেবে মাহফুজ আনাম আজকে ভুল স্বীকার করলেও, সে সময়কার তার রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা দখলের চেষ্টাকে তিনি কিন্তু আমাদের সামনে এখনও ব্যাখ্যা করেননি, করেছেন কি?

আরও কিছু বিষয়ে মাহফুজ আনামের বক্তব্য আমরা জানি না বা তার অবস্থান কি আমরা বুঝতে পারি না। সম্পাদক হিসেবে তিনি তার পত্রিকায় কর্মরত সাংবাদিকদের অভিভাবক এবং সেনাবাহিনীর হাতে যখন তারই রিপোর্টার তাসনিম খলিল নির্যাতনের শিকার হন তখন তিনি সাক্ষাতকার দিয়ে বলেন যে, তাসনিম খলিলের করা কোনও রিপোর্টের জন্য নয়, বরং তাসনিমের ব্লগের জন্য তাকে সেনাবাহিনী নির্যাতন করেছে। অর্থাৎ আমরা ধরে নিতেই পারি যে, মাহফুজ আনাম মনে করেন রিপোর্টের জন্য না হলেও ব্লগে লেখার জন্য যে কেউ নির্যাতনের শিকার হতেই পারেন এবং তা মোটামুটি বৈধ। আমরা তাসনিমের লেখা থেকেই জানি যে, তাকে মাহফুজ আনামের বাসায়ও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কই তাসনিমকে তার স্ত্রী ও শিশুদের সামনে থেকে তুলে এনে সেনা নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষায় সম্পাদক হিসেবে মাহফুজ আনাম কি ভূমিকা পালন করেছিলেন? সেজন্য কি তিনি এখন দুঃখ প্রকাশ করবেন? একই কথা আমরা বলতে পারি ডেইলি স্টারের সহদোরা বাংলা পত্রিকার কার্টুনিস্টের ব্যাপারেও। কার্টুনিস্ট আরিফকে জেলে দিয়ে এবং তার সঙ্গে সুমন্ত আসলামের চাকরি খেয়ে খতিবের কাছে মাফ চেয়ে গা বাঁচানোর যে ঘটনা ঘটেছিল মাহফুজ আনাম কি সেই দায়ও চাইলেই এড়াতে পারেন? পারেন না। আমারতো মনে হয়, সম্পাদক হিসেবে ডিজিএফআই-এর দেওয়া তথ্য প্রকাশের চেয়ে নিজেদের রিপোর্টারদের নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচাতে না পারাটা আরও বড় দুঃখপ্রকাশের বিষয় হওয়া উচিত।

এমটাতো হতেই পারে যে, তখন যদি তাসনিম খলিলকে ব্লগ লেখার দায়ে নির্যাতিত হওয়ার ব্যাপারে চোখকান বন্ধ না রেখে মাহফুজ আনাম তার পত্রিকায় কমেন্টারি লিখতেন তাহলে আজকে যে একের পর এক ব্লগার চাপাতির কোপে নিহত হচ্ছেন সেই দুর্ঘটনা ঘটাতে তারা একটু হলেও ভীত বোধ করতো। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি, বাংলাদেশে সাংবাদিক ও ব্লগারদের কোনও নিরাপত্তা নেই এবং সম্পাদকরা যে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে মোটেও উদ্বিগ্ন নন। তখনকার ঘটনাতে সেটা আরও স্পষ্ট হয়ে যাওয়াতে এই চাপাতিওয়ালারা তাতে উৎসাহিই হয়েছিল বরং। কে জানে সেই সময় যদি মাহফুজ আনাম নূরুল কবীরের মতোও সেনা সমর্থিত সরকারের নির্দেশনাকে অমান্য করার সাহস দেখাতেন তাহলে আজকে তার ভূমিকা নিয়ে অতো প্রশ্ন উঠতো না।

তবে আবারও একথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই যে, মাহফুজ আনাম বিষয়টি সাহসের সঙ্গে একটি জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেলের জনপ্রিয় টকশো’তে তার ভুল স্বীকারের জন্য অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য কাজটিই করেছেন। মাত্র কিছুদিন আগেই তিনি সম্পাদক পরিষদের বরাতে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছিলেন যেখানে দাবি করেছিলেন যে, বাংলাদেশে সাংবাদিকতার জন্য এখনকার খারাপ সময় নাকি আর কখনও আসেনি। কিন্তু ওপরে দেখতে পাচ্ছি যে, সাংবাদিকতার জন্য, কার্টুন প্রকাশের জন্য দু’জন জাঁদরেল সম্পাদকের সামনে থেকে সাংবাদিক, কার্টুনিস্টদের ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে, সম্পাদককে গিয়ে জাতীয় মসজিদে ক্ষমা চাইতে হয়েছে এবং সম্পাদকরা রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য প্রকাশ্যে তৎপরতা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন। সাংবাদিকতার জন্য খারাপ সময় আমরা কাকে বলবো? ওই সময়টাকে? নাকি এখনকার বাস্তবতাকে, যখন টকশো’য় বসে জাতীয় ইতিহাসের বিকৃতি থেকে শুরু করে সংবাদপত্রে অঢেল মিথ্যাচারের সংবাদ প্রকাশের পরও এরকম নির্যাতনের কিংবা রাষ্ট্রকে কোথাও হস্তক্ষেপ করতে দেখা যায় না? আমারতো মনে হয় মাহফুজ আনাম নিজেই নিজের বক্তব্যের সঙ্গে স্ববিরোধী আচরণ করছেন। এবং এখানেই মনে হয় মাহফুজ আনাম বা তার মতো অনেক গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যায়, যা এক ধরনের শাস্তিও। কারণ সম্পাদক মাহফুজ আনাম যে আসলে ড. ইউনূসের রাজনৈতিক দল গঠন-প্রক্রিয়ার অন্যতম কুশীলবও এবং শেখ হাসিনার সঙ্গে ড. ইউনূসের যে ক্ষমতার লড়াই বিগত কয়েক বছর ধরে চলছে তাতে মাহফুজ আনাম ও তার পত্রিকা ডেইলি স্টার যে তার অতীত অবস্থান থেকে এক চুলও নড়েননি, তার প্রমাণ বার বারই পত্রিকাটির পাঠক পাচ্ছে।

সুতরাং সম্পাদক মাহফুজ আনামের ভুল স্বীকারে খুব একটা কিছু এসে যায় না, কারণ তিনি এখনও রাজনীতিবিদদের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতিকের মতোই আচরণ করছেন বলে প্রমাণ পাই আমরা। আর এ কারণেই, সংসদে দাঁড়িয়ে এমপিদের কিংবা রাজনীতিবিদদের আলাদা করে সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিচার দাবি করা কিংবা এ কারণে ডেইলি স্টার বন্ধ করে দেওয়ার দাবি আসলে অসার বলে মনে হয়।

যে মানুষটি নিজেই নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং তা প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেন তাকে নতুন করে শাস্তি দেওয়ার দাবিটি আসলেই একটু বেশি বেশি হয়ে যায়। এতে শাস্তি দাবিকারীদের মান বাড়ে না, বরং কমেই।

লেখক: কবি ও কলামিস্ট।

ইমেইল: masuda.bhatti@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ