behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

চিকিৎসা: দেশে না বিদেশে?

প্রভাষ আমিন১২:২০, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৬

Probhash Aminপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অসুস্থ হলে তাঁকে যেন এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তোলা না হয়। চিকিৎসা তিনি বাংলাদেশেই নেবেন, বিদেশে যেন তাঁকে নেওয়া না হয়। এই সিদ্ধান্তের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপিরা যখন কথায় কথায় স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিদেশে যান, তখন দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থাহীনতা প্রকাশ পায়, আস্থা নষ্ট হয়ে যায় সাধারণ মানুষেরও। তবে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের খুব একটা আস্থা আছে বলে মনে হয় না। প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণা সে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করতে পারে। তবে প্রধানমন্ত্রীর মুখের কথায় বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা রাতারাতি বদলে যাবে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা চলে আসবে, ব্যাপারটা এত সহজ নয়। সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা মনে পড়ছে।
আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হলে সবাই তাকে অন্তত পাশের দেশ সিঙ্গাপুরে গিয়ে উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এই পরামর্শ তার ইগোতে লেগেছিল। সিঙ্গাপুরের চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত হলে মালয়েশিয়ায় হবে না কেন? তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, মালয়েশিয়ার চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নয়নের। হৃদরোগের ঝুঁকি নিয়েও তিনি অপেক্ষা করেছেন। দ্রুততম সময়ে চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নয়নের পর তিনি দেশেই চিকিৎসা নিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে ইদানিং অনেকেই মাহাথির মোহাম্মদের উদাহরণ টানেন। শেখ হাসিনা যদি মাহাথিরের মতো বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড না হোক, নিদেনপক্ষে পাশের দেশ ভারতের পর্যায়ে উন্নীত করতে পারেন, দেশের মানুষের এত দোয়া পাবেন যে নিশ্চিত তাঁকে কখনও এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার মতো অসুস্থ্ই হতে হবে না।
শেখ হাসিনার আবেগের সঙ্গে আমি একমত তবে বাস্তবতার সঙ্গে নয়। এমনিতে বাংলাদেশের অনেক ডাক্তারের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশে অনেক ঋষিতুল্য ডাক্তার আছেন, যাদের দেখলে শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে। আমার অফিস, আত্মীয়-স্বজন এবং পরিচিতজনদের অনেকেই অসুস্থ হলে প্রথমেই আমাকে স্মরণ করেন। আমিও আমার পরিচিত ডাক্তারদের সহায়তায় তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করি। কোন ডাক্তারের কাছে যাবেন, কোন হাসপাতালে ভর্তি হবেন, ব্যস্ত ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ইত্যাদি কাজে আমি চেষ্টা করি তাদের পাশে দাঁড়ানোর। কিন্তু সামর্থ্য থাকলেই আমি সবাইকে ভারত, থাইল্যান্ড বা ব্যাংককে যাওয়ার পরামর্শ দেই। যদিও সামর্থ্যের অভাবে আমি কখনও চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে পারিননি। আমার মেরুদণ্ডে দুটি স্পর্শকাতর ও জটিল অপারেশনসহ শরীর বিভিন্ন অংশে মোট ছয়টি অপারেশন হয়েছে। সবগুলোই করিয়েছি দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে। ডাক্তার এবং হাসপাতালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণেই বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আমার আস্থা নেই।

রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপিরা এমনিতেই দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ সুবিধা পান। তাদের দেশের বাইরে না গেলেও চলে। ব্যক্তিগত পরিচয়ের সুবাদে আমিও অন্য অনেকের চেয়ে বাড়তি সুবিধা পাই। কিন্তু আমরা কি জানি প্রতিদিন কত শত হাসপাতালে, কত হাজার অসহায় মানুষের আহাজারিতে বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস ভারি হয়? আমরা তার কতটুকুই বা শুনতে পাই? খুব বড় কোনও অনিয়ম হলে মিডিয়াতে একটু হইচই হলেও তা মিলিয়ে যেতে সময় লাগে না। অল্প দুয়েকটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক মেলে না, চিকিৎসা মেলে না। বেসরকারি হাসপাতালে গেলে গলা কাটে। কোন দিকে যাবে সাধারণ মানুষ? ক’দিন আগে আমাদের এক সহকর্মী ফুটবল খেলতে গিয়ে মুখে আঘাত পান। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মতো নিরর্ভরতার জায়গায়ও নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাকে ভর্তি করার মতো অসুস্থ নয় বলে ছেড়ে দেয়। পরে আমরা তাকে দেশের একটি নামকরা বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করাই। সেখানকার এক সিনিয়র অধ্যাপক কানে কানে আমাদের দ্রুত তাকে বিদেশে পাঠাতে বলেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল যাকে ভর্তি করার মতো অসুস্থ নয় বলে ছেড়ে দিয়েছিল, সেই তাকেই কলকাতা অ্যাপোলো হাসপাতালে সাড়ে ৫ ঘণ্টার এক জটিল অপারেশনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। এখন যদি তিনি ঢাকা মেডিক্যালের ডাক্তারদের পরামর্শ শুনে বাসায় চলে যেতেন, তাহলে তাকে আজীবন পঙ্গু জীবনযাপন করতে হতো। আমাদের আরেক বন্ধু ব্রেইন স্ট্রোক করে সরকারি হাসপাতাল ঘুরে বাংলাদেশের এক ফাইভ স্টার মানের হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানকার ডাক্তাররা তাকে প্রায় মৃত ঘোষণা করে দেয়। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে নয়াদিল্লী নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। এখন তিনি অফিস করে বেড়াচ্ছেন। শেখ হাসিনার পরামর্শ মেনে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে না তুললে এতদিনে তার মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়ে যেতো। ক’দিন আগে আমার আরেক বন্ধুর বাবা লিভার সিরোসিস নিয়ে একটি স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি হন। দ্বিতীয় দিনে তার কিডনি প্রায় কলাপ্স করে। কিন্তু লিভারের সেই হাসপাতালে কিডনির কোনও ডাক্তার ছিল না। তাই তারা সেটি ধরতেই পারেননি। অন্য এক ডাক্তার বন্ধু দেখতে গিয়ে সমস্যা দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেন। অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার এমন শত উদাহরণ প্রতিদিন দেওয়া যাবে।

ডাক্তাররা সরকারি হাসপাতালে ঠিকমত রোগী না দেখলেও প্রাইভেট চেম্বারের সামনে বাজার বসে যায়। কিন্তু রোগীদের তারা মনোযোগ দিয়ে দেখেন না। অপ্রয়োজনে গাদা গাদা টেস্ট করান। প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞের কাছে না পাঠিয়ে দিনের পরা দিন আটকে রাখেন। এমন শত অভিযোগ ডাক্তারদের বিরুদ্ধে। টেস্ট দিলে তারা কমিশন পান, নির্দিষ্ট ওষুধ কোম্পানির কমিশনের টাকা ব্যাংক একাউন্টে চলে যায়, গিফট পৌঁছে যায় বাসায়। এই প্রত্যেকটি অভিযোগের যৌক্তিক জবাব আমি জানি। ১৬ কোটি মানুষের দেশে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। আর সবাই শুরুতেই বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে চান। তাই অল্পসংখ্যক ডাক্তারের চেম্বারের সামনে মধ্যরাত অব্দি মানুষের ভিড়। কিন্তু সেই ডাক্তারও তো মানুষ। একজন ডাক্তারকে চিনি, যিনি রাত দুইটা-আড়াইটা পর্যন্ত রোগী দেখেন। এখন সন্ধ্যা থেকে শুরু করে মধ্যরাতে একশ নম্বর রোগীর প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেওয়া কোনও মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। টানা ছয় ঘণ্টা রোগী দেখা তো দূরের কথা, আমার পক্ষে তো প্রিয় সিনেমা দেখাও সম্ভব না। পরদিন আবার তাকে সময়মত অফিসে পৌঁছাতে হয়। আরেক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মধ্যরাত অব্দি রোগী দেখেন। কিন্তু তদ্বিরের অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য ফোন করলে ভোর সাড়ে ৬টায় সময় দেন। ভাবি তিনি ঘুমান কখন? অনেক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের দিনের রুটিন শুনে আমারই কান্না পায়। আমার তাদের মানুষ মনে হয় না, দেবতা মনে হয়, ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছা করে। ভাবি কেন মানুষ শখ করে ডাক্তার হয়। অনেকে ভাবেন ডাক্তার হলেই বুঝি অঢেল টাকা। ব্যাপারটা অত সহজ নয়। পাস করে চাকরির খোঁজে জুতার শুকতলি ক্ষয় করা অনেক ডাক্তার আছেন দেশে। পসার জমতে জমতে বয়স ফুরিয়ে যায়। টাকা যখন আসা শুরু হয় তখন আর সেই টাকা ভোগ করার সময় থাকে না। অনেকে রোগী কমানোর জন্য ফি বাড়িয়ে দেন, অ্যাপয়েন্টমেন্ট জটিল করে রাখেন; তবুও রোগীর ভিড় কমে না। তিনি তাহলে কী করবেন? মধ্যরাত পর্যন্ত রোগী দেখলেও আমরা গালি দেই, না দেখলে রোগীরা চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করবে। ডাক্তার বেচারারা যাবেন কোথায়? ডাক্তারদের আমার খুব অসহায় মনে হয়। এক ডাক্তার বন্ধু খুব অসহায় কণ্ঠে বললেন, এই যে টেস্ট দিলে আপনারা এত গালিগালাজ করেন। কিন্তু ক্লিনিকগুলো তো আমাদের টার্গেট দিয়ে দেয়। পরপর তিন মাস টার্গেট পূরণ করতে না পারলে আমার চেম্বার ক্যান্সেল হয়ে যাবে। তখন আমি খাবো কী?

ডাক্তাররাও তো মানুষ। আমি জানি, আপনাদের সাধারণ মানুষের অনুভূতি অনেক প্রবল। কোনও দুর্ঘটনা বা হত্যার খবর শুনলে আপনাদের প্রাণ কাঁদে। আমাদের অনুভূতি আরেকটু ভোতা। কারণ আমাদের হত্যা-দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হিসাব করতে হয়। মৃত্যু কখনও কখনও আমাদের কাছে সংখ্যা মাত্র। ‘সড়ক দুর্ঘটনায় সারাদেশে তিন শিশুসহ ২২ জন নিহত’- এই নিউজ আমাদের মধ্যে কোনও আলাদা বেদনা বোধ তৈরি করে না। বড় জোর ভাবি, একটা হেডলাইন বাড়লো। প্রতিদিন মৃত্যু, রক্ত দেখতে দেখতে নিশ্চয়ই ডাক্তারদের অনুভূতি আরেকটু কম। তাই তারা মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর সঙ্গেও হেসে কথা বলতে পারেন। লাশ দেখে এসেই চা খেতে পারেন। তাদেরকে কসাই বলে গালি দেওয়াটা অন্যায়। 

বাংলাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর মান নিয়ে এক কোটি প্রশ্ন আছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সব জানেন, সংসদে স্বীকারও করেন। কিন্তু তারপরও দেশে হাসপাতাল বা ক্লিনিকের নামে অনেকগুলো মৃত্যু ফাঁদ বা অন্তত পকেট কাটা ঘর আছে। একই টেস্টে একেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একেক রিপোর্ট আসবে। আপনি কোনটা বিশ্বাস করবেন? ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নাকি গড় করে রিপোর্ট দেয়। অনেক বেসরকারি হাসপাতালে মোটামুটি অসুস্থ রোগী গেলেই আইসিইউতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। তারপর লাইফ সাপোর্টের নামে স্বজনদের ফতুর বানিয়ে দেওয়া হয়। রোগী মারা যাওয়ার পরও লাইফ সাপোর্টে রেখে বিল বাড়ানোর অভিযোগেরও কমতি নেই। টাকার জন্য লাশ আটকে রাখার ঘটনাও আকছারই ঘটে।

আরেকটা অভিযোগ হর-হামেশাই পাওয়া যায়- ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু। বাংলাদেশের সিনিয়র ডাক্তারদের অনেকেই জানেন এবং স্বীকার করেন, ভুল চিকিৎসা করার মতো অদক্ষ ডাক্তার দেশে প্রচুর আছে। আর এখন যেভাবে বাপের পয়সার জোরে আর প্রশ্নপত্র ফাঁসের সুবাদে গড়পড়তা মানের শিক্ষার্থীরাও ডাক্তার বনে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, তাতে ভবিষ্যতে দেশে অদক্ষ ডাক্তারের সংখ্যা আরও বাড়বেই শুধু। ডাক্তারের অদক্ষতায়, অবহেলায়, ভুল চিকিৎসায় রোগী মারা যান; এটা ডাক্তাররাও জানেন। কিন্তু কোনও ডাক্তারের বিরুদ্ধে মামলা করলেই সবাই ক্ষেপে যান। যেন ডাক্তাররা সব আইন এবং জবাবদিহিতার উর্ধ্বে। এটা ঠিক সত্যি সত্যি ভুল চিকিৎসা হয়েছিল কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। মৃত্যু এক অনিবার্য নিয়তি। সঠিক চিকিৎসার পরও রোগী মারা যেতে পারে। আর কারও মৃত্যুর পর যত সঠিক চিকিৎসাই হোক, ক্ষুব্ধ স্বজনদের কাছে ভুল চিকিৎসা মনে হতেই পারে। কিন্তু তাই বলে সত্যি সত্যি ভুল চিকিৎসা হলেও ডাক্তারদের বিরুদ্ধে মামলা করাই যাবে না, এটা তো ঠিক নয়। আদালত হোক, বিএমএনডিসি হোক; কোথাও না কোথাও ডাক্তারদের ভুলের, অদক্ষতার, অবহেলার প্রতিকার হতেই হবে। ডাক্তাররা তো সবকিছুর উর্ধ্বে নন, অন্য গ্রহের মানুষ নন।

তবে আমার কাছে ডাক্তারদের অন্য গ্রহের মানুষই মনে হয়। অনেক বাঘা-বাঘা মানুষ ডাক্তারের চেম্বারের সামনে বসে থাকেন অসহায়ের মতো। অসুস্থ অসহায় মানুষ ডাক্তারের কাছে যান বাঁচার আশায়। ডাক্তারদের তখন মানুষ নয়, ফেরেশতা মনে হয়। সব আশা শেষ হয়ে যাওয়া রোগীও ডাক্তারের কাছে যান গভীর আশা নিয়ে, নিশ্চয়ই কোনও অলৌকিক উপায়ে ডাক্তার সাহেব তাদের ভালো করে দেবেন। সঠিক ওষুধ তো বটেই; ডাক্তারের একটি মুখের কথা, একটু ভালো ব্যবহার, একটু আশ্বাসে বদলে যায় অনেক রোগীর অবস্থা। অসুস্থতা যতই শারীরিক হোক, অনেক সময় রোগীর মানসিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে তার সুস্থতা। নিছক মানসিক শক্তির জোরে ক্যান্সারকে জয় করার অনেক উদাহরণ আছে। আবার ক্যান্সার হয়েছে শুনেই অনেকে অর্ধেক মরে যান। তাই সব ডাক্তারকেই এখন একটু আধটু মনের ডাক্তারও হতে হয়। নাড়ি দেখে, গাদা গাদা টেস্টের রিপোর্ট দেখে, রাগী মুখে খ্যাচ খ্যাচ করে প্রেসক্রিপশন লেখা বা সহকারীর লিখে দেওয়া প্রেসক্রিপশনে সই দিয়ে চিকিৎসা করার দিন ফুরাবেই। এই ঢাকায়ও এখন অনেক ব্যস্ত ডাক্তারের চেম্বারে সারাক্ষণ রবীন্দ্র সঙ্গীত বাজে। চেম্বারে ঢুকলেই মন ভালো হয়ে যায়। অসুস্থ রোগীরও মন ভালো হয়ে যায়, মনে হয়, আহা বেঁচে থাকাটা নেহায়েত মন্দ নয়।

এই যে আমরা ডাক্তারদের ভিনগ্রহের মানুষ বা ফেরেশতা মনে করি, অন্যরকম মর্যাদা দেই। কিন্তু ডাক্তাররা কিন্তু বারবার প্রমাণ করেন, তারা আমাদের মতই সাধারণ। ক্ষুব্ধ হলে তারাও ট্রাক ড্রাইভারদের মতো ধর্মঘট করে বসেন। এটা অবিশ্বাস্য। ডাক্তারি পেশা আর দশটা পেশার মতো নয়। আপনি তো জেনেশুনেই ডাক্তার হয়েছেন। তাই যত যাই হোক, দাবি আদায়ে আপনারা ধর্মঘট করতে পারবেন না। কখনও শুনেছেন পুলিশ ধর্মঘট বা ফায়ার সার্ভিসের কেউ ধর্মঘট করেছে? কিন্তু ডাক্তাররা বারবার দাবি আদায়ে ধর্মঘট করেছেন। এই কদিন আগেও চট্টগ্রামে ভুল চিকিৎসার অভিযোগে তিন ডাক্তারের বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবাদে ডাক্তাররা রোগীদের জিম্মি করে বেসরকারি চিকিৎসায় ধর্মঘট করেন। পাঁচদিনের এই ধর্মঘটে হাজার হাজার রোগী চিকিৎসা বঞ্চিত হয়েছেন।

অভিযুক্ত তিন ডাক্তারকে আদালত জামিন দিয়েছেন। তবে জামিন দেওয়ার সময় আদালত তার পর্যবেক্ষণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। ডাক্তারদের উচিত সেই পর্যবেক্ষণ অনুসরণ করা। আদালত বলেছেন, ‘রোগীদের জিম্মি করার অধিকার চিকিৎসকদের সংগঠন সংরক্ষণ করে না। চিকিৎসকেরা অপরাধ করলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলবে না, এটি গোষ্ঠীগত দাম্ভিকতা। গোষ্ঠীগত স্বার্থে অপরাধীকে আড়াল করা যাবে না।’ আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘একটি পেশাজীবী সংগঠনের কার্যক্রম হওয়া উচিত তার পেশাকে আরও উন্নত করা এবং পেশাজীবী কেউ অপরাধ করলে সে বিষয়ে প্রতিকার করে পেশাকে আরও জনকল্যাণমুখী করার প্রচেষ্টা চালানো।’ পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, ‘এক-দুজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সব চিকিৎসককে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া এবং বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধ করা চিকিৎসা পেশাকে লাঞ্ছিত করার শামিল, যা গ্রহণযোগ্য নয়’। পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, ‘চিকিৎসকেরা রাষ্ট্রীয় আইনের উর্ধ্বে নন। রোগীকে জিম্মি করে মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকারকে অগ্রাহ্য করা রাষ্ট্রে বিদ্যমান আইনের অনেকগুলো ধারায় বিচার্য অপরাধ। এই কাজের সঙ্গে সংখ্যায় যত ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট থাকুক না কেন, কিংবা বাদীকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য প্রকাশ্যে সমাবেশ করে হুমকি প্রদানকারীর যত বড় পরিচয় থাকুক না কেন, তারা প্রত্যেকেই রাষ্ট্রের বিদ্যমান আইন লঙ্ঘনকারী অপরাধী’।

কিন্তু আমরা কোনও ডাক্তারকেই অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করতে চাই না। আমরা তাদের জীবন রক্ষাকারী ফেরেশতার আসনেই দেখতে চাই। দেশে খারাপ সাংবাদিক যেমন আছে, অসৎ পুলিশ যেমন আছে; অদক্ষ ডাক্তারও আছে। তবে সাংবাদিক খারাপ হলে মান যায়, ডাক্তার খারাপ হলে জান যায়। এটা সত্যি সব পেশাতেই খারাপের সংখ্যা কম, ভালোর সংখ্যাই বেশি। খারাপ ডাক্তার বেশি হলে এতদিনে আমরা সব মরে সাফ হয়ে যেতাম। অদক্ষ ডাক্তার আছে, মাঝে মাঝে তাদের ভুল চিকিৎসায় মানুষ মারা যায়, এই সত্যিটা মেনে নিয়ে তাদের চিহ্নিত করা জরুরি। কিছু হলেই একসঙ্গে মিলে দোষীদের রক্ষা করতে রোগীদের জিম্মি করা কোনও কাজের কথা নয়।

ফুটনোট: এতকিছু জানার পরও যদি কেউ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনুসরণ করে চিকিৎসা নিতে দেশের বাইরে না যান, তাহলে দেশের জন্যই ভালো।

লেখক:  অ্যাসোসিয়েট হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

 ইমেল: probhash2000@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ