Vision  ad on bangla Tribune

ভুল স্বীকার করে আবারও ভুল করলেন মাহফুজ আনাম

তানভীর আহমেদ১১:৩৫, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১৬

তানভীর আহমেদডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে এরইমধ্যে ডজন খানেক মামলা হয়েছে সারা দেশে। কয়েকটি মামলায় সমনও জারি করা হয়েছে। এখন একজন সম্পাদক তার ভুল স্বীকারের কারণে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে অভিযুক্ত হতে পারেন কিনা সেটি নিয়ে আইনি বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন রয়েছে বটে, কেননা ব্যক্তিটি যেহেতু মাহফুজ আনাম। তাই এমন একজন রোল মডেলকে সামনে রেখে একটি আলোচনার যদি সমাপ্তি টানা যায়, তাহলে এই ঘটনা ভবিষ্যতে গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
মাহফুজ আনামের ভুল স্বীকারের আইনি বিশ্লেষণের আগে ওয়ান-ইলেভেনে ফিরে যেতে চাই, সেনা শাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কুশীলবদের তৈরি প্লটে যখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের কিছুক্ষণ পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে সজীব ওয়াজেদ জয় আমাকে টেলিফোনের মাধ্যমে লন্ডন স্টুডিওতে একটা সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। চ্যানেল এস টেলিভিশনের ‘অভিমত’ অনুষ্ঠানে সেই টেলিফোন সাক্ষাৎকারটি আমরা লাইভ প্রচার করেছিলাম। ইউটউিব লিংক থেকে ২০০৭ সালের টেলিভিশন টকশোটিতে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সেই বক্তব্যটি কোট করছি।
‘এটি একটি ষড়যন্ত্র, আমার মাকে সরানোর জন্য এই নকল মামলা, এই মামলার কোনও সত্যতা নাই। আমার মা কোনওদিন কারো কাছ থেকে চাঁদাবাজি করেননি, করবেনও না। পুরো মামলাটি ছিলো একটি সাজানো নাটক। বাংলাদেশে এখন কোনও মানবাধিকার নেই। অনির্দিষ্টকাল এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পাওয়ার ধরে রাখতে চায়, আর শেখ হাসিনাকে না সরানো পর্যন্ত সেটা তারা পারবে না বলে তারা এই ষড়যন্ত্র খেলছে।'
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের পর সম্ভবত এটিই ছিলো প্রথম কোনও প্রতিবাদ। সেই প্রতিবাদটি করেছিলেন তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। সুদূর যুক্তরাষ্ট্র থেকে লন্ডনের একটি টেলিভিশনের মাধ্যমে। পরে অবশ্য তিনি বাংলাদেশ ও বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে টেলিফোনে বক্তব্য দিয়েছেন। মাহফুজ আনাম যখন ডিজিএফআইয়ের দেওয়া তথ্য যাচাই না করে সংবাদ প্রকাশের ভুল স্বীকার করলেন, তখনও প্রথম প্রতিবাদ করেন প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। মূলত সজীব ওয়াজেদ জয় তার ফেসবুক স্ট্যাটসে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের গ্রেফতার ও শাস্তি দাবি করার পর একাধিক এমপি পত্রিকাটির সম্পাদকের শাস্তি ও পদত্যাগের দাবিতে সংসদে বিতর্ক করেছেন। তার পর শুরু হয়েছে বিতর্ক ও মামলা।
মাহফুজ আনাম স্বীকার করেছেন, তিনি ডিজিএফআইয়ের প্রদানকৃত তথ্য যাচাই ছাড়া সংবাদ ছেপে ভুল করেছিলেন। যদি তাই হয়, এই ভুল কি এখনও প্রতিদিনই আমাদের কতিপয় গণমাধ্যম করছে না? তথ্যসূত্র উল্লেখ ছাড়া, যাচাই বাছাই ছাড়া প্রতিদিনই কোনও না কোনও সংবাদ কি বাংলাদেশে ছাপা হচ্ছে না? কোনও বড় অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা বড় ব্যবসায়ীর দুর্নীতির খবর কি আমাদের গণমাধ্যমে অপ্রকাশিত থেকে যাচ্ছে না? তাহলে সবাই কেন শুধু ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামেরই বিচার চাইছেন, তার একটা আইনি পর্যালোচনা করতে চাই।

ব্রিটেনের আইনজীবী ব্যারিস্টার মেহেদী হাসান তালুকদার বলছেন, ‘মাহফুজ আনামের অপরাধ রাষ্ট্রদ্রোহের সমতুল্য। কারণ তিনি নিজে একটি অসাংবিধানিক সরকারকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন অথবা ডিজিএফআইয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ করে অসাংবিধানিক একটি গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছেন অথবা তাদের ইচ্ছেকে সমর্থন যুগিয়েছেন। হতে পারে, এটি তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে। এক্ষেত্রে সম্পাদক জার্নালিজমের এথিক্সের কাছে পরাজিত হয়েছেন।‘

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, শেখ হাসিনা তো সেই সময় রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন না এবং সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারই তখন প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী, তাহলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয় কীভাবে? এর আইনি ব্যাখ্যাটা হলো, যদি শেখ হাসিনা কিংবা খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে ডক্টর ইউনূসের নেতৃত্বে নতুন একটি অসাংবিধানিক শক্তিকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় দেখার স্বপ্ন মাহফুজ আনাম দেখে থাকেন অথবা অন্যের দেখা স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সহায়তা করে থাকেন, তাহলেও তিনি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারেন। কেননা সেই সময়ে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দুজনই সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাদের দু‘জনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রচার করে, ‘মাইনাস টু ফর্মুলা‘ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে তাদের সম্পর্কে জনগণকে বিভ্রান্ত করে তৃতীয় অসাংবিধানিক শক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রেক্ষাপট তৈরিতে সহায়তা দেওয়াও রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল।

কেবলমাত্র মাহফুজ আনামই কি এই সংবাদ প্রচার করেছেন বা যারা এই তথ্য দিলেন, ভিডিওতে জবানবন্দি দিলেন, তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে কিনা? এক্ষেত্রে আইনি ব্যাখ্যা হলো, ১/১১ পরবর্তী পরিস্থিতিতে যারাই রিমান্ডে থাকার সময় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তারা পরবর্তী সময়ে অস্বীকার করে বলেছেন, তারা ডিজিএফআইয়ে চাপে এ ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। অন্যদিকে এ সব বক্তব্য যেহেতু কোনও ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে রেকর্ড করে আদালতে উত্থাপন করা হয়নি, তাই এসব বক্তব্যের কোনও আইনগত ভিত্তি নেই। তাহলে এই পয়েন্টে চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হলো- তথ্য যাচাই না করে সংবাদ প্রচারের দায় মাহফুজ আনামকে সম্পাদক হিসেবে নিতেই হবে।

যদি প্রশ্ন আসে, যে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো, সেই মামলা তো নিষ্পত্তি হয়ে গেছে, শেখ হাসিনা মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার প্রায় ৭/৮ বছর পর এই মামলা কি তামাদি হয়ে যাবে না? এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাজ্যের একজন সিনিয়র ব্যারিস্টার বলছেন, ‘ঐতিহাসিক মামলা কখনো তামাদি হয় না। ক্রিমিনাল ল কিংবা হিস্টোরিক্যাল ল প্রয়োজনে ৫০ বছর পরও চালু করা সম্ভব। এক্ষেত্রে ব্রিটিশ সাংবাদিক ও টিভি ব্যক্তিত্ব স্যার জিমি স্যাভিলের কথা বলা যেতে পারে। মৃত্যুর পর প্রমাণিত হয়েছে তিনি শিশুদের যৌন হয়রানির সাথে জড়িত ছিলেন। তার মৃত্যুর পর রানীর দেওয়া নাইটহুড তুলে নেওয়া হয়। এমনকি তার কবরের ফলক থেকেও সেই স্যার উপাধি সরিয়ে দেওয়া হয়।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে উইলিয়াম ব্রুক জয়েস নামে এক ব্রিটিশ নাগরিক জার্মানির নাৎসি বাহিনীর সাথে জোট বেঁধে জার্মানি থেকে ‘হো হো‘ নামে একটি রেডিওতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা চালাতেন। এর মাধ্যমে ব্রিটেনে প্রায় ১৮ মিলিয়ন শ্রোতা তৈরি হয়েছিলো। এই প্রপাগান্ডার ফলে বহু ব্রিটিশ আর্মির মনোবল ভেঙে যায়। বিশ্বযুদ্ধের পর উইলিয়াম জয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হয় এবং ১৯৪৬ সালে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। (ব্রিটেন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ব্যবস্থা থেকে সরে আসে ১৯৯৮ সালে)

এক-এগারোর সময় ডেইলি স্টার সম্পাদক ডিজিএফআইয়ের চাপে পড়ে যে সংবাদ ছেপে ভুল করেছিলেন বলে স্বীকার করেছেন ৮ বছর পর তিনি কি শুধুই বিবেকের তাড়নায় নাকি নতুন কোনও চাপে সেই সত্যটি স্বীকার করেছেন, তাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। তবে শুধু ভুল স্বীকার করলেই দায় মুক্তি হবে না। ভুল স্বীকার করে ডেইলি স্টার সম্পাদক বরং আরেকটি ভুল করলেন।

২০১২ সালে বিবিসির ফ্ল্যাগশিপ অনুষ্ঠান ‘নিউজ নাইটে‘ মার্গারেট থ্যাচার সরকার ক্যাবিনেটের একজন রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানীর অভিযোগ প্রচার করেছিলো। পরবর্তী সময়ে সেই অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া গেলে বিবিসির মতো প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিলো। সেই সময়ে বিবিসির ওপর রুপার্ট মারডকের মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে বিরাট একটি চাপ এসেছিলো। বিবিসির ডিরেক্টর জেনারেল জর্জ অনটুইসেল শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেছিলেন। এই ঘটনা প্রসঙ্গে বিবিসি ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ক্রিস প্যাটেন বলেছিলেন, ‘বিবিসির বর্তমান অবস্থান তৈরি হয়েছে মানুষের ভরসার কারণেই, বিবিসি যদি এটা হারিয়ে ফেলে তাহলে সবকিছু শেষ।‘

মাহফুজ আনামও, তার প্রতিষ্ঠান ডেইলি স্টারের বর্তমান অবস্থান তৈরি হওিয়ার পেছনে মানুষের যে আস্থা ছিলো সেই জায়গাটা সম্পাদকের ভুল স্বীকারের মাধ্যমে হারিয়ে ফেলেছেন।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক। বাংলা ট্রিবিউন এবং একাত্তর টেলিভিশনের লন্ডন প্রতিনিধি

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ