behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

ছোট ডাকাতকে হত্যা, বড় ডাকাতকে সালাম

গোলাম মোর্তোজা১৫:০৮, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৬

গোলাম মোর্তোজা‘সোনালী ব্যাংকে ডাকাতি, বেসিক ব্যাংকে লুট হয়েছে’: অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। (ইত্তেফাক, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)
‘চাল লুট করতে গিয়ে গণপিটুনিতে ৮ ডাকাত নিহত।’ (দৈনিক সমকাল, ১১ ডিসেম্বর ২০১৫)
১. সাধারণত একটি বড় বস্তায় চাল থাকে ১০০ কেজি। একটি ট্রাকে কত বস্তা চাল লুট করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব? ২০ বা ২৫ বস্তার বেশি সম্ভব নয়। তারপরও ধরে নেই ৫০ বস্তা চাল ডাকাতরা লুট করে নিয়ে যেতে পারত। ধরে নেই এক কেজি চালের দাম ৪৫ টাকা। তাহলে ৫০ বস্তা চালের দাম হয় ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এই ২ লাখ ২৫ হাজার টাকার চাল লুট করতে এসে গণপিটুনিতে নিহত হলেন ৮ জন মানুষ (ডাকাত)!  নিহত হওয়ার পর পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করল এবং ‘ডাকাত’ বলে সার্টিফিকেট দিল- কোনও তদন্ত ছাড়া।
২. অর্থমন্ত্রীর ভাষায় ‘সোনালী ব্যাংকে ডাকাতি’ হয়েছে। পরিমাণ ৪ হাজার কোটি টাকা। ডাকাতি করেছে ‘হলমার্ক’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান। যার কর্নধার তানভির নামক একজন ব্যক্তি। তানভিরের শক্তির উৎস ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা, যা পত্র-পত্রিকায় ব্যাপকভাবে আলোচনা হয়েছে। এই ডাকাতির পর অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন ‘৪ হাজার কোটি খুব বেশি টাকা নয়’। পরে এই বক্তব্য প্রত্যাহার করেছেন। শাস্তি কি হয়েছে? তানভির ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা গ্রেফতার হয়েছেন। তানভিরের শক্তির উৎস, যাদের মাধ্যমে তিনি ঋণের নামে ডাকাতি করেছেন, তা থেকে গেছে সম্পূর্ণ উপেক্ষিত।
তানভিরের স্ত্রী টাকা ফেরত দেওয়ার শর্তে জামিন পেয়েছেন। একটি টাকাও ফেরত দেননি। তাতে তার জামিনে কোনও সমস্যা হয়নি। তানভির কারাগারে থাকে। নিজের পাজেরো বা অ্যাম্বুলেন্সে আদালতে আসে, ফিরে যায়।
৩. অর্থমন্ত্রীর ভাষায় ‘বেসিক ব্যাংক থেকে লুট’ হয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। সঠিক অনুসন্ধান হলে লুটের টাকার পরিমাণ দ্বিগুণ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এই লুটের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তির নাম আবদুল হাই বাচ্চু। তিনি ছিলেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান। তার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ বা মামলা হয়নি।
এসব ঘটনা কম-বেশি সবারই জানা। আবারও উল্লেখ করলাম অর্থমন্ত্রীর স্বীকারোক্তির প্রেক্ষিতে। ছোট ডাকাত-দরিদ্র ডাকাত, পেটের দায়ে চাল ডাকাতি করতে এসে প্রাণ হারায়। বড় ডাকাত-ধনী ডাকাত, লুটেরা বিলাসী জীবনযাপনের জন্যে ডাকাতি করে, লুট করে। সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকে।
খেটে খাওয়া হতদরিদ্র শ্রমিক মালয়েশিয়ার পাম বাগানে কাজ করে, বাংলাদেশি টাকার ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বেতন পান। নিজে কোনও রকমে জীবনধারণ করে, প্রায় পুরো অর্থই দেশে পাঠান। বৃদ্ধি পায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। সেই অর্থ ডাকাতি করে বড় লোক ডাকাতেরা। বড় লোক ডাকাতরা এই অর্থ পাচার করে নিয়ে যায় মালয়েশিয়ায়। হয়ে যায় ‘সেকেন্ড হোম’র নিরাপদ বাসিন্দা। ডাকাতদের অর্থ চলে যায় কানাডার ‘বেগম পাড়া’য়। ডাকাতরা গত বছর পাচার করেছে লক্ষাধিক কোটি টাকা।

৪. দরিদ্র চাল ডাকাতদের গণপিটুনিতে হত্যা করার ক্ষেত্রে সহায়তা করে রাষ্ট্র। জনঅর্থ পাচারকারী ধনী ডাকাত-লুটেরাদের পৃষ্ঠপোষকও রাষ্ট্র। তাদের লুট-ডাকাতির অনুসন্ধান করে না রাষ্ট্র, তদন্ত করে না, বিচার তো বহু দূরের কথা।

৫. আমাদের জনগণ ১০ টাকার পকেট মারকে পিটিয়ে ক্ষতবিক্ষত করতে পারে। লাখ টাকার চাল ডাকাতকে পিটিয়ে হত্যা করতে পারে। কারণ জনগণ জানে রাষ্ট্র তার এই হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে। হাজার কোটি টাকার ডাকাত-লুটেরাদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস করে না জনগণ। এসব ডাকাতরা বড় গাড়ি-দামি গাড়িতে ধুলো উড়িয়ে চলে যায়। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে জনগণ তা বিস্মিত হয়ে দেখে, সালাম দেয়। একজন আরেকজনের কাছে বলে, ‘বিরাট বড় লোক, মেলা টাকা!’

যত বড় ডাকাত, যত বড় গাড়ি- তত সম্মান!

জনগণ জানেন ‘ডাকাত’ বললে, গাড়িতে একটি ঢিল ছুঁড়লে, ডাকাতদের বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়বে। পুলিশ ডাকাত-লুটেরাদের পক্ষ নেবে। মামলা হবে হাজার হাজার গ্রামবাসীর নামে। তারপর শুরু হবে ‘গ্রেফতার বাণিজ্য’। বড় ডাকাতদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। হবে না কেন, বড় লোকরাই তো আইন তৈরি করে।

৬. আমাদের সমাজ থেকে ‘আইনের শাসন’, ‘সুশাসন’, ‘গণতন্ত্র’ শব্দগুলো ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। জায়গাগুলো দখল করছে যেসব শব্দ তার মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ‘উন্নয়ন’। ‘উন্নয়ন’ এবং ‘দুর্নীতি’ সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে।

৭. এই সমাজে রাজনৈতিক-আর্থিক-সাংস্কৃতিক কোনও ক্ষেত্রেই ‘ন্যায্যতা’র উপস্থিতি নেই। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ‘উস্কানিমূলক’ কিছু না লেখার ঘোষণা দেয়। কিন্তু প্রকাশক দীপন, লেখক অভিজিত হত্যা বিষয়ে তার কোনও বক্তব্য নেই। লেখক-প্রকাশক হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কোনও কথা বলেন না, কথা বলেন লেখকদের বিরুদ্ধে। একটি বই নিয়ে আপত্তি, বন্ধ করে দিলেন প্রকাশনীর স্টল। কত দ্রুত পুলিশ গ্রেফতার করে ফেলল প্রকাশক, লেখক, মুদ্রাকরকে। চোরের মর্যাদায় লেখক -প্রকাশকদের রিমান্ড, জিজ্ঞাসাবাদ!

আর হাজার হাজার মানুষের সামনে অভিজিত হত্যাকাণ্ডকে বলে ‘ক্লুলেস’। বিশ্বজিৎ সাহার ‘হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো’ আদালত রায় দিল নিষিদ্ধের বিপক্ষে। অথচ বইমেলা থেকে পুলিশ জব্দ করল বইটি, নিষিদ্ধ হয়ে গেল মেলায় ‘হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো’।

যারা স্বীকার করালো, যারা স্বীকার করল, তাদের বিষয়ে কোনও কথা নেই। যত কথা সব মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে।

একটি সড়ক নির্মাণ ৬ বছরের জায়গায় ১১ বছরেও শেষ হয় না। ২১৬৮ কোটি টাকার বাজেট বেড়ে হয় ৩৮১৭ কোটি টাকা। মন্ত্রী জনগণের সঙ্গে রসিকতা করে বলেন, ‘দেশে গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদও বেড়েছে।’

লুট-ডাকাতির নজীর বহু দেশে আছে। এমন অভিনব উপায়ে জনঅর্থ ধ্বংসের নজীর খুব বেশি দেশে নেই।

ন্যায্যতাহীন সমাজে এসবই হয়ত ‘ন্যায্য’।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ