behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

মাহফুজ আনামের ক্ষমা চাওয়া প্রসঙ্গে

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী১২:৫৯, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৬

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীকিছু কিছু সংবাদপত্র পাঠক-প্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে আমাদের সমাজে। পাঠক-প্রিয়তাকে মূলধন করে সংবাদপত্র সংশ্লিষ্টরা যদি নিজের ব্যক্তিগত ডিজাইন চরিতার্থ করার উদ্যোগ নেন তবে তাতে সাংবাদিকতার মূলধর্ম উপেক্ষিত হয়। সাংবাদিকেরা নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেললে সাংবাদিক ধর্মচ্যুত হয়। অধর্ম-সংবাদপত্র জগতে খুবই নিন্দিত বিষয়।
ইত্তেফাকের মরহুম মানিক মিঞা যখন ইত্তেফাককে দৈনিক পত্রিকার রূপ দিলেন তখন তিনি আওয়ামী লীগের কার্যকরী সংসদের সদস্যপদ ত্যাগ করেছিলেন। সেদিন থেকে তিনি সম্পূর্ণণভাবে সত্যের সেবক হিসাবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করলেন এবং আমৃত্যু সত্যের পূঁজারি হিসাবে সাংবাদিকতা করেছেন। সত্যের জন্য সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য তাকে আত্মত্যাগের পরীক্ষার সম্মুখীনও হতে হয়েছে। বছরের পর বছর জেলেও ছিলেন। ইত্তেফাকের পাঠক-প্রিয়তা এতো বেশি ছিলো যে ইত্তেফাক ১০টা বিক্রি হলে আজাদ পত্রিকা বা সংবাদ পত্রিকা ১টা করে বিক্রি হতো। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খাঁন বছরের শেষে একবার সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হতেন এবং দীর্ঘ সময়ব্যাপী সম্পাদকদের সঙ্গে দেশের সমস্যা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন।
একটা মিটিংয়ে ‘ডন’ পত্রিকার সম্পাদক জেড এ সুলেরি বলে বসলেন পূর্ব-পাকিস্তানের পত্রিকাগুলোর সম্পাদকেরা বেশি রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন। তখন মানিক মিঞা বলেছিলেন, আমরা সাংবাদিক, আমরা সত্যের সাধক, পাকিস্তানের রাজনীতিতে সত্য উপেক্ষিত তাই রাজনীতি নিয়ে কথা বলি। আজাদ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন আবুল কালাম শামসুদ্দীন সাহেব। তিনি পূর্ব-পাকিস্তান আইন পরিষদেরও মুসলিম লীগ দলীয় সদস্য ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যখন রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে ছাত্র মিছিলে গুলি চালানো হয় এবং গুলিবিদ্ধ হয়ে মানুষ মারা যান তার প্রতিবাদে তিনি আইন পরিষদের সদস্যপদ ত্যাগ করেছিলেন। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন শামসুদ্দীন সাহেবকে যুক্ত ফ্রন্টের মনোনয়ন প্রদানের জন্য। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। তিনি তার পুরানো দল মুসলিম লীগের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনের প্রতিদ্বন্ধিতা করেছিলেন এবং যুক্তফ্রন্ট প্রার্থীর কাছে পরাজিতও হয়েছিলেন।
আমি উপরে দু’জন সম্পাদকের কথা উল্লেখ করেছি এ সময়ে ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের অসহায়ত্ব দেখে। সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকলে মাহফুজ আনাম কখনও উপেক্ষিত হতেন না। কিন্তু তিনি সাংবাদিকতার ধর্ম পালন করেননি। এ প্রসঙ্গে আর একটা কথা উল্লেখ করতে চাই। দৈনিক আজাদ পত্রিকার মালিক ছিলেন মরহুম মওলানা আকরাম খাঁন আর পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন মরহুম মুজিবুর রহমান খাঁন। উভয়ে মুসলিম লীগের লোক। যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা আরম্ভ হয় তখন ইত্তেফাক সরকারি আদেশে বন্ধ আর মানিক মিঞা কারারুদ্ধ। সবাই উদ্বিগ্ন হলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পেপার কাভারেজ নিয়ে। অথচ যেদিন মামলা আরম্ভ হয় সেদিন থেকে মামলা প্রত্যাহারের দিন পর্যন্ত দৈনিক আজাদ এমন লেখনি ধারণ করলেন তাতে জন-প্রতিক্রিয়া এমন হলো যে পূর্ব পাকিস্তানের লোক শেখ মুজিবের মুক্তি কামনা করে ঘরে ঘরে নফল রোজা রাখা আরম্ভ করেছিলেন।
আজাদ প্রথম দিনেই বলেছিলো এটা পূর্ব-পাকিস্তানের মানুষের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করার ষড়যন্ত্র মামলা। ১৯৬৯ সালে শেখ সাহেবকে বাঙালি জাতির প্রতীক রূপে রূপ দেওয়ার পেছনে আজাদ পত্রিকার ভূমিকা খুবই স্মরণীয়। এক সময় ছিলো যখন পত্রিকাগুলো ছিলো সত্যের পূজারি। এখন সে ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।

এক-এগারোর সময় বহু পত্রিকার বিরুদ্ধে ডিজিএফআই-এর হয়ে কাজ করার অভিযোগও শোনা গেছে। তার মধ্যে ডেইলি স্টার আর প্রথম আলোর ভূমিকার কথাই বার বার উঠে এসেছিল। ২০০৭-২০০৮ এর মেয়াদে কেয়ারটেকার সরকার গঠনের প্রস্তুতির সময় ডেইলি স্টার, প্রথম আলো এবং সিপিডির সক্রিয় উদ্যোগে ২০শে মার্চ (২০০৬) শেরাটন হোটেলে সিভিল সোসাইটি সিটিজেনস গ্রুপ গঠন করা হয়। তখন তারা বলেছিলো- তাদের কাজ হবে নির্বাচনে সৎ প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া।

আবার দেখি ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থার ঘোষণার পর ১১ ফেব্রুয়ারি ড. ইউনূস খোলা চিঠিতে একটি দল গঠনের প্রস্তাব দেন। ২০০৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ড. ইউনূস-এর নেতৃত্বে নাগরিক শক্তি নামে একটা দল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা আসে। তখন বাজারে এমনও কথা শুনেছি মাহফুজ আনাম এ দলের সেক্রেটারি হবেন। মাহফুজ আনাম রাজনীতি করলে কার অসুবিধা?

মাহফুজ আনামের মরহুম পিতা আবুল মনসুর সাহেবও ইত্তেহাদ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, আবার রাজনীতিও করতেন। ইত্তেহাদ পত্রিকার মালিক ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১৯৪৬ সালে সোহরাওয়ার্দী সাহেব বৃহত্তম বাংলার প্রিমিয়ার ছিলেন। সোহরাওয়ার্দী সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে ইত্তেহাদ পত্রিকা যত সম্পাদকীয় লিখেছিলেন, কলকাতার আজাদ, আনন্দবাজার, যুগান্তর এবং লোকসেবক পত্রিকা তত মূখর হয়ে তখন আবুল মনসুর সাহেবের মতো সম্পাদকীয় লেখেননি।  যথাযথ সমালোচনা করা বন্ধুত্বেরও লক্ষণ।

এক-এগারোর আগে পরে ডেইলি ষ্টার, প্রথম আলো, সিপিডি, ড. ইউনূস এবং শেষ পর্যায়ে এসে ফেরদৌস আহাম্মদ কোরেশীর পিডিপি নামে দল গঠন সবকিছুর মূখ্য উদ্দেশ্য ছিলো জিয়া, এরশাদ এর মতো মঈন ইউ আহমদকে ক্ষমতায় বসানোর একটা খেলা। তখন শেখ হাসিনাই ছিলো এ পথের প্রধান বাধা। কারণ তখন তিনিই ছিলেন জনপ্রিয় নেত্রী। খালেদার জনপ্রিয়তার তখন ভাটার টান। যদিওবা শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের পর বেগম জিয়াকেও গ্রেফতার করা হয়েছিলো। বেগম জিয়ার গ্রেফতার ছিলো হাসিনার গ্রেফতারকে ব্যালেন্স করার গ্রেফতার।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অসংখ্য দুর্নীতির মামলা দেওয়া হলো। ওয়েস্ট মন্ট গ্রুপের তাজুল ইসলাম তো দাবি করে বসলেন যে তিনি ১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গণভবনে ব্রিফকেস করে পৌনে তিন কোটি টাকা ঘুষ পৌঁছিয়ে দিয়েছিলেন। ডেইলি স্টার, প্রথম আলোতে ফলাও করে এসব রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছিলো।

যাহোক, কোনও ষড়যন্ত্র শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি সম্ভবতো ঢাকা বিম্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রথম মহড়ায় মঈন ইউ আহমেদ-এর বোধ উদয় হয়েছিলো। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে যথাযথ নির্বাচন আয়োজন করে তারা বিদায় নেয়। আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হয়। শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়ে জাতিগঠনে আত্ম-নিয়োগ করেন। উন্নয়নের মহাযজ্ঞ চলছে এখন বাংলাদেশে।

নয় বছর পর মাহফুজ আনাম তম্বিৎ ফিরে পেয়েছেন। তিনি এখন তার ভ্রান্তি উপলব্ধি করে অনুতপ্ত হয়েছেন, ভুল স্বীকার করেছেন এবং ক্ষমা চেয়েছেন। শেখ হাসিনার ইমেজ এত ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে যে তিনি এখন বাঙালি জাতির মাতৃরূপে পৌঁছেছেন। মাহফুজ আনামকে ক্ষমা করাই হবে এখন উত্তম। ক্ষমা মহত্মের লক্ষণ।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ