behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে মামলা, বাকস্বাধীনতা ও অন্যান্য

চিররঞ্জন সরকার১২:২৮, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৬

চিররঞ্জন সরকারইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর মামলা হচ্ছে। ইতিমধ্যে মামলার সংখ্যা প্রায় অর্ধশতক ছাড়িয়েছে। এর বেশিরভাগই মানহানির মামলা। তবে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগেও ডজন খানেক মামলা দায়ের হয়েছে।
২০০৭ সালে সেনানিয়ন্ত্রিত ফখরুদ্দীন সরকারের আমলে গোয়েন্দা সংস্থার সরবরাহকৃত বানোয়াট তথ্য কোনও যাচাই-বাছাই না করে সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মান-সম্মান ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ এনে এই মামলাগুলো দায়ের করা হচ্ছে। সম্প্রতি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের টক শোতে তিনি এ কথা স্বীকারও করেছেন। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আওয়ামী লীগের নেতারা মনের সাধে মানহানি ও রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে মামলা করে যাচ্ছেন।
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম ও প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা সেনাসমর্থিত সরকারের সময় এবং তার আগে-পরে ‘মাইনাস টু ফর্মূলা’ বাস্তবায়ন এজেন্ডার পক্ষে কাজ করেছেন। এই অভিযোগের পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই। তবে সে সময় এই দুটি পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক সরকার ও দলের বিরুদ্ধে নানা রকম প্রতিবেদন-নিবন্ধ ইত্যাদি প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরাগভাজন হয়। প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে, এই দুই দলের শীর্ষ নেত্রীর বিরুদ্ধে এই পত্রিকা দুটি যে নানা কৌশলে ভূমিকা পালন করেছে, সেটা শুধু কিছু মানুষের ‘পারসেপশন’ নয়, তার প্রমাণও রয়েছে। গত দেড় দশকে প্রকাশিত পত্রিকা দুটির নিউজ-ভিউজ পড়লে এই অভিযোগকে শক্ত ভাবে নস্যাৎ করা যাবে বলে মনে হয় না। অনেকের মতে, দেশের বিভিন্ন সমস্যা ও অনুন্নয়নের জন্য রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলের ওপর ধারাবাহিকভাবে দোষারোপ করে, সব মন্দ কাজের দায় চাপিয়ে, দুই নেত্রীকে অযোগ্য-ব্যর্থ হিসেবে দেখিয়ে রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের প্রতি মধ্যবিত্ত নাগরিকদের মনকে বিষিয়ে তোলা, এক ধরনের ‘বিরাজনীতিকরণ’ প্রক্রিয়া চালুর ক্ষেত্রে এই পত্রিকা দুটি অসামান্য ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে একটি টিভি টকশোর বক্তব্যের জের ধরে এখন সব দায় গিয়ে বর্তেছে মাহফুজ আনামের ঘাড়ে। এর শেষ যে কীভাবে হবে, তা বলা মুশকিল!
মাহফুজ আনাম দোষী না নির্দোষ সে আলোচনায় যাবো না। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে ইতিমধ্যে অনেক মতামত প্রকাশিত হয়েছে। তবে দেশের শীর্ষ একটি পত্রিকার সম্পাদকের নামে এভাবে লাগাতার মামলা করার ঘটনাটি ভীষণ উদ্বেগের বিষয় বলে মনে হয়। এর ফলে আখেরে ক্ষতি হবে গণমাধ্যমের, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সর্বোপরি দেশের ভবিষ্যৎ সমাজের।
বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে সমাজের কেউ যখন আইন-বিচার-পুলিশ-সালিশ কোনও কিছুর কাছে আশ্রয় পায় না, তখন তারা মনে করে যে, গণমাধ্যমই বরং তাদের দুর্দশা এবং ব্যক্তি বা পরিবারের প্রতি ক্ষমতা ও বিত্তবান মানুষদের (আবার কখনও কখনও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক) অত্যাচার-অনাচার তুলে ধরার একমাত্র জায়গা। এ দেশে এ সময় কার্যকর বিরোধী দল বা বিরোধী রাজনীতির অভাব পূরণের প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে বরং গণমাধ্যম। এই গণমাধ্যম যদি কোনও কারণে আক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তা সামষ্টিক ক্ষতি। তবে গণমাধ্যম সম্পর্কে মানুষের অভিযোগও কিন্তু কম নয়। কোনও কোনও গণমাধ্যম ঘটনাকে একপেশে বা খণ্ডিত আকারে প্রকাশ-প্রচার করে কখনও কখনও সামাজিক অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে না, তা জোর দিয়ে বলা যাবে না। বিডিআর বিদ্রোহ, জামায়াত-হেফাজতের মতিঝিল তাণ্ডবসহ বহু ঘটনা রয়েছে, যা কিছু কিছু গণমাধ্যমকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
আজকাল তথ্যই হচ্ছে শক্তি, সবচেয়ে বড় অস্ত্র। বস্তুনিষ্ঠ এবং দায়িত্বশীলভাবে এটির ব্যবহার করা না হলে সমাজে বহু অনাচারের উদ্ভব ঘটবে। এতদসংশ্লিষ্ট পেশার সঙ্গে সরাসরি যেসব মানুষ জড়িত এ বিষয়ে তাদের দায় সবচেয়ে বেশি। অবশ্য এ জন্য তাদের পেশাগত এমনকি জানমালের ঝুঁকিও কম নয়। বোধকরি আখেরে রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে এই বহুমাত্রিক ঝুঁকি থেকে ব্যক্তি, পেশা এবং সমাজকে রক্ষা করার জন্য।

তবে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ব্যাপারটি সব সময়ই প্রায় বাড়াবাড়িতে গিয়ে ঠেকে। এ ক্ষেত্রে করণীয় কী? বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক হওয়া দরকার। দরকার একটা গ্রহণযোগ্য ও সম্মানজনক সমাধানে পৌঁছুনো।

‘কিন্তু’ বাকস্বাধীনতার দোহাই দিয়ে যা খুশি তা-ই বলা বা ছাপাও তো যায় না। বিশেষত তা যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা হয়। কিংবা যদি একটি গোষ্ঠীর মনে আঘাত লাগে। কিছু মানুষ নিশ্চয়ই বলবেন, কোন কথায় কার মনে আঘাত লাগল সেটা বিবেচ্যই নয়। বাকস্বাধীনতা শুধু স্বাধীনতাটুকুর কারণেই জরুরি। যে কোনও বিশ্বাসভিত্তিক অবস্থানের মতো, এই অবস্থানটির সঙ্গেও তর্ক চলে না। কিন্তু এ রকম বিশ্বাসভিত্তিক অবস্থানের বদলে আর পাঁচটা বিষয়ের মতো এখানেও আমরা ফলাফলের দিক থেকে তার বিচার করতে পারি। অর্থাৎ, সবার অবাধ বাকস্বাধীনতা স্বীকার করে নিলে তার ফল কী, আর রাষ্ট্রকে সেই স্বাধীনতা খর্ব করতে দিলে তার ফলই বা কী? অর্থনীতির ভাষায় স্বাধীন বাকের ‘কুফল’কে এক্সটার্নালিটি বা অতিক্রিয়া ভাবলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব আমরা? নদীর জলে আমার কারখানার দূষিত জল মিশলে অন্যদের ওপর তার যে কুপ্রভাব পড়ে, সেটাই অতিক্রিয়া। ধরা যাক, আমার স্বাধীন কথায় আপনার মনে আঘাত লাগলে সেটাও আমার কথার অতিক্রিয়াই। অর্থাৎ, কথাটা বলে আমার নিজের আনন্দ হচ্ছে বটে, কিন্তু সেই চক্করে আপনার খারাপ থাকা বাড়ছে। যে প্রক্রিয়ায় অতিক্রিয়া আছে, তাকে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকারও রাষ্ট্রের আছে, অন্তত কোনও রাষ্ট্র তেমনটা মনে করলে আপত্তি করার উপায় নেই। অতএব এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ঘোষণা করতেই পারে, ‘আজ থেকে কোনও একটি কথা আর বলা চলবে না।’

কিন্তু প্রায় সব কাজেরই যেমন অতিক্রিয়া থাকে, তেমন প্রায় সব কথাতেই কারও না কারও মনে আঘাত লাগতে পারে। আপনি যে গান শোনেন তা আমার কুরুচিকর মনে হতে পারে, এবং সেই গান লোকে শোনে ভাবলে সমাজ কোথায় তলিয়ে যাচ্ছে গোছের চিন্তাও আমাকে যন্ত্রণা দিতে পারে। কিন্তু যতক্ষণ না মাইকে সজোরে সেই গান চালিয়ে আপনি আমার জীবন অতিষ্ঠ করছেন, ততক্ষণ আপনার সেই গান শোনায় হস্তক্ষেপ করার পক্ষে যুক্তি দুর্বল, কারণ আপনার যা ঘোর অপছন্দের, তা হয়তো আর এক জনের কাছে বেঁচে থাকার মন্ত্র। এটা ঠিক যে এই নানা উদাহরণে, যাঁরা অপছন্দ করছেন তাঁদের প্রত্যেকের কাছেই এই ঘটনাগুলোর নেতিবাচক অতিক্রিয়া মারাত্মক। কিন্তু, যতক্ষণ সেই অতিক্রিয়াকে এড়িয়ে যাওয়া যায়, রাষ্ট্রের হাত গুটিয়ে থাকাই সমীচীন। অবশ্য, কারও পক্ষে কোনও অতিক্রিয়া যখন এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব হবে, তখন রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে বিলক্ষণ। কিন্তু সেটা হওয়া উচিত বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের মানসিকতা থেকে নয়, মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রক্রিয়া সমুন্নত রাখার মানসে।

শুধু তা-ই নয়, অতিক্রিয়া থাকলেই যদি রাষ্ট্র বাকস্বাধীনতা খর্ব করতে থাকে, তা হলে কি এমন একটা সমাজে পৌঁছনো যাবে যেখানে সব্বাই একে অপরকে ‘কিন্তু সবার চাইতে ভাল পাউরুটি আর ঝোলাগুড়’-এর বাইরে কোনও কথা বলবে না? মুশকিল হলো, বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিতে দিলে এমন আলুনি সমাজে পৌঁছনোও অসম্ভব। কারণ, রাষ্ট্র তো কোনও বায়বীয়, বিমূর্ত অস্তিত্ব নয়। সেই ক্ষমতার চূড়ায় যারা বসে থাকেন, তাদের দিব্য রঙ থাকে, নিজস্ব ‘ভাবাবেগ’ থাকে, এবং তাতে আঘাতও লাগে বড় সহজেই। সেই রাষ্ট্র ‘সমদর্শী’ হবে, অর্থাৎ সবার ভাবাবেগকে সমান মর্যাদা দেবে, এমনটা ভেবে নেওয়ার কোনও কারণ নেই। অতএব রাষ্ট্রের হাতে বাকস্বাধীনতা খর্ব করার অধিকার এক বার তুলে দিলে শেষ পর্যন্ত তাদের অধিকারটুকুই খর্ব হবে, যারা রাষ্ট্রের চালকদের বিরুদ্ধে কোনও কথা বলার সাহস দেখায়।

আজ কোনও প্রকাশনা নিষিদ্ধ করলে, একজন মাহফুজ আনামকে মামলায় মামলায় জর্জরিত করলে কী হবে, তা অনুমান করতে খুব বেশি কল্পনাশক্তির বোধহয় প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ, এই পিছল রাস্তা দিয়ে হাঁটলে আমরা যেখানে পৌঁছাবো তাতে শুধু প্রতিবেদন লেখা, বই প্রকাশই নয়, কোনও কিছুই বলা বা লেখার স্বাধীনতা থাকবে না।

এখানে একটা কথা মনে রাখা ভাল। বাকস্বাধীনতা জিনিসটা কিন্তু বিনে পয়সায় মেলে না। বহু ক্ষেত্রেই তার জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়। বন্ধুবিচ্ছেদ থেকে মানহানির মামলা, সবই হতে পারে। অফিসে বসের বিরুদ্ধে বাকস্বাধীনতার অধিকার প্রয়োগ করলে চাকরি যাওয়াও বিচিত্র নয়। কিন্তু সেই বিরুদ্ধতাগুলোও অপর দিকের স্বাধীনতারই প্রকাশ। যতক্ষণ তা আইনের স্বীকৃত গণ্ডিতে থাকছে, অর্থাৎ কোনও কথায় ক্ষুণ্ণ হয়ে কেউ বন্দুক হাতে তেড়ে না আসছে, ততক্ষণ এতে আপত্তির কোনও কারণ নেই। কিন্তু রাষ্ট্র যদি বাকস্বাধীনতায় লাগাম পরাতে আসে, সেটা বিপজ্জনক, কারণ রাষ্ট্রই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যার হাতে দমনপীড়নের আইনি অধিকার আছে। আর রাষ্ট্রযন্ত্রে যেহেতু ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর প্রভাব বেশি, তাই সেই ক্ষমতার ওপর লাগাম পরানোই গণতান্ত্রিক সমাজের উদ্দেশ্য, তার প্রসার নয়।

কেউই আইনের উর্ধ্বে নয়। হাইকোর্টের বিচারপতি বিচারবিভাগের স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে যেমন স্বেচ্ছাচারিতা করতে পারেন না। তেমনি একজন মন্ত্রী পেশীর বলে যাচ্ছেতাই করে পার পাবেন না। ঠিক একই ভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলে স্বেচ্ছাচারিতাও মেনে নেওয়া ঠিক হবে না।

লেখক: কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ