রাষ্ট্র তুমি লজ্জিত হও

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১১:১৪, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:১৬, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৬

Tushar Abdullahনিদ্রাদের পরিবারের সবাই মিলে শুক্রবার বইমেলায় যাবে। খাবার টেবিলে বসে সেই পরিকল্পনা হলো। সবার সঙ্গে নিদ্রাও যাবে। নিদ্রা সবার কাছে দৌড়ে গিয়ে বলছে শুক্রবার মানে কবে? শুক্রবার বলতে আসলে ও কী জানে? ইংরেজি কোন দিনটির সঙ্গে মেলাবে ও শুক্রবারকে। যদি সেদিন ওর ছুটি না থাকে, তবে তো বইমেলায় যাওয়া হবে না। যখন ওকে জানানো হলো শুক্রবার মানে‘ফ্রাইডে’। তখন ও আনন্দে আত্মহারা।
তার মানে সেদিন স্কুল ছুটি। ওর বই মেলায় যাওয়া হচ্ছে। রাজধানীর স্বনামখ্যাত একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী নিদ্রা সপ্তাহের কোনও বাংলা বার’কে আলাদা করে জানেনা। তাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিতে হয়। নিদ্রা ছাড়াও এমন অনেক শিশু-কিশোরকে আমি জানি, যাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আছে, তারা বাংলায় ঘুড়ি শব্দের সঙ্গে পরিচিত নয়। বলতে হয় কাইট। কুয়াশা, সূর্যকে ফগ এবং সান বলে জানে। ট্রেনে চড়ে যেতে যেতেও জানে না, একে বলে রেলগাড়ি।
যে প্রজন্মের কথা বলছি, তারা আমাদের সন্তান। তারা পুকুর না চেনে, হাঁস না চেনে পনড এবং ডাক চেনে বলে আমরা অভিভাবকরা আত্মশ্লাঘায় ভুগি। সমাজে বুঝি উপর তলায় স্থায়ী আবাস হয়ে গেলো, এই অহমিকার আলো ছড়াতে চাই।
২১ শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের শহীদ দিবস। এই তথ্যকে অনেকটাই আড়াল করেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের উদযাপন। দুটি তথ্য এবং উদযাপনই আমাদের জন্য অহংকারের। কিন্তু ২১শে ফেব্রুয়ারি কী ঘটেছিল, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কেন পালিত হয়? এই প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছ থেকেই আসে না।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে মিশেল হয়ে যায় ভাষা আন্দোলন, ভাষার সংগ্রাম। কেবল যে শিশু কিশোররা এবিষয়ে দ্বিধামিশ্রিত জবাব দিচ্ছে তা নয়। তাদের অভিভাবকদের চিন্তার জায়গাটিতেও অস্পষ্টতা রয়েছে। যে অস্পষ্টতার সংক্রমিত হয়েছে তাদের সন্তানদের মনোজগতে।

ভাষার জন্য বাঙালির লড়াই বিষয়টি অনেকটাই অবহেলার শিকার, একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারির আগে থেকে পৃথক রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পাওয়ার যে দাবি ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মাধ্যমে উথাপিত হয়েছিল। এবং ধীরে ধীরে আন্দোলনটি যে চূড়ান্ত রূপ নেয়, সেই সংগ্রামের কথা ইতিহাসের কাঠামো অনুসা্রে যে মাত্রায় হওয়ার কথা তা হয়নি।এখনও অসম্পূর্ণ। যারা সেই সময়ে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ লেখনীর মাধ্যমে খানিকটা ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ঐতিহাসিকরা এই ইতিহাস লেখার দায়িত্ব নেননি। ১৯৯৭ সালের আগে পর্যন্ত স্পষ্ট ছিলনা, স্বীকার করা হতো না ভাষা সংগ্রামে নারীদের ভূমিকার কথা।

ঐতিহাসিকেরা যেমন ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে নিষ্ক্রিয়, তেমনি সক্রিয়তা দেখা যায়নি আমাদের লেখকদের মাঝে। বায়ান্নোর পর গান, কবিতা, ছড়া যতোটা রচিত হয়েছে ভাষা এবং ভাষা সংগ্রামকে নিয়ে তার তুলনায় গল্প-উপন্যাস রচিত হয়েছে কম। ভাষা আন্দোলনের পটভূমি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসের কথা স্মরণে আসে না পাঠকের। ভাষা সংগ্রাম ও সংগ্রামীদের চরিত্র বা বিষয় করে গল্প রচিত হয়েছে খুব একটা, সেই দাবিও আমাদের জেষ্ঠ্য এবং সমকালীন লেখকরা করতে পারবেন না। এই জায়গাগুলোতে কাজ করা জরুরি ছিল এজন্য যে, একটি জাতি গোষ্ঠীর সংকট, সংগ্রাম, মুক্তি ও গৌরবের কথা সাধারণ জনমানুষ যতোটা না ইতিহাস থেকে পাঠ করে, তার চেয়ে সাহিত্য থেকে তারা সহজে ইতিহাসকে গ্রহণ করে। সুতরাং যেহেতেু আমাদের লেখকরা এদিকটায় মনোযোগ দিয়েছেন কম, সেহেতু ভাষা নিয়ে আমাদের ঔপনিবেশিক মানসিকতা, ভাষা সংগ্রামের কথা স্পষ্ট করে না জানার দায় তাদেরকেও নিতে হবে। সার্বিকভাবে রাষ্ট্রকে বড় দায় এবং অপরাধী হতে হয় এজন্য যে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা পাওয়ার এতো বছর পর, নিজস্ব মানচিত্র পাওয়ার এতো বছর পরেও, মাতৃভাষা নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারেনি। বাংলা ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের চেয়ে ইংরেজি ভাষায় শিক্ষা নিতে পারাটা এখনও এই জনগোষ্ঠীর একটি শ্রেণির গৌরব ও মর্যাদার বিষয়। যা সমাজের সকল স্তরকে দ্রুতি সংক্রামিত করছে। এই প্রবণতায় রাষ্ট্রের লজ্জিত হওয়ার কথা। জানি না, রাষ্ট্র লজ্জিত হবার স্বজ্ঞানে আছে কিনা!

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ