behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

মাহফুজ আনামের দেশ ভ্রমণের সুযোগ

আমীন আল রশীদ১২:২২, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৬

আমীন আল রশীদরাষ্ট্রদ্রোহ ও মানহানির অভিযোগে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে মামলার সেঞ্চুরি পূর্ণ হতে বেশি বাকি নেই। এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে মামলা হয়েছে ৭৯টি, যার মধ্যে ১৭টি রাষ্ট্রদ্রোহ এবং ৬২টি মানহানির মামলা।
অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, পর্যায়ক্রমে দেশের ৬৪ জেলাতেই তার বিরুদ্ধে মামলা হবে এবং যদি এসব মামলায় সমন জারি হয়, তখন তাকে আদালতে হাজির হতে হবে। আর এই সুযোগে জনাব মাহফুজ আনাম সারাদেশ ভ্রমণের একটা সুযোগ পাবেন। যেসব জেলায় তার এখনও যাওয়া হয়নি, সেসব জেলা ঘোরার একটা দারুণ সুযোগ করে দেওয়ায় তিনি বরং ধন্যবাদ দিতে পারেন মামলার বাদীদের।
পাঠক এক্ষেত্রে মনে করতে পারেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানকেও এরকম মানহানির মামলায় জেলায় জেলায় ঘুরতে হয়েছিল আদালতে হাজিরা দেওয়ার জন্য।
গত বছরের ৪ আগস্ট প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক মন্তব্য প্রতিবেদনে জনাব মতিউর রহমান লিখেছিলেন, ‘প্রথম আলোর একটি সংবাদকে কেন্দ্র করে আটটি মামলা আমার জন্য নতুন একটি রেকর্ড। বর্তমান সরকারের সময়ে এর আগের রেকর্ডটি ছিল একই অভিযোগে পাঁচ জেলায় পাঁচটি মামলার। গত বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে পাঁচটি মিথ্যা মামলা দেওয়ার পেছনে কোনও কোনও গোয়েন্দা সংস্থার হাত ছিল বলে অনেকে বলেছেন। সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই ওই মামলাগুলোর বাদী।  মামলাগুলোয় জামিন নিতে ও হাজিরা দিতে আমাকে এসব জেলায় প্রায়ই যেতে হচ্ছে। আরও কত দিন যেতে হবে জানি না!’
রসিকতা করে মতিউর রহমান লেখেন, ‘এবার অবশ্য সব মামলাই করা হয়েছে ঝিনাইদহ আদালতে। এখন আমাকে প্রায়ই যেতে হবে ঝিনাইদহ শহরে। সেটা একদিক থেকে ভালো হলো আমার জন্য। একটি জেলা শহরকে আমার ঘনিষ্ঠভাবে জানা-বোঝার সুযোগ ঘটবে। স্থানীয় অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয়ও হবে। তাদের কাছ থেকে অনেক কিছুই জানতে পারবো, শিখতে পারবো। তাই মতিয়া আপাকে ধন্যবাদ জানাই।’ এবার ডেইলি স্টার সম্পাদকের সংশ্লিষ্ট জেলাগুলো ভ্রমণের মাধ্যমে সেসব জেলা সম্পর্কে জানাবোঝার সুযোগ তৈরি হলো।
২.

গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে বেসরকাটি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজের এক আলোচনায় বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অর্থাৎ আলোচিত ওয়ান ইলেভেন বা এক-এগারোর সময় সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের বিচ্যুতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মাহ্ফুজ আনাম বলেন, ওই সময়ে সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী-ডিজিএফআইয়ের দেওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই না করেই তারা ছেপেছিলেন। তার এই সিদ্ধান্ত ভুল ছিল এবং এজন্য তিনি দুঃখিত বলেও জানান।

এর পর থেকেই তার বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। সবশেষ ২২ ফেব্রুয়ারি বিকেলে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, সৎ সাহস থাকলে মাহফুজ আনাম পদত্যাগ করতেন এবং তিনি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারকে ইঙ্গিত করে বলেন, এ দুটি পত্রিকা বরাবরই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কুৎসা রটায়।

মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে এই যে এত এত মামলা হচ্ছে এবং হাজার হাজার কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা হচ্ছে, দোষী প্রমাণিত হলে এত টাকা তিনি কীভাবে দেবেন? 

মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে সবগুলো মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, এক-এগারোর সময় একটি গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশনা বাস্তবায়নে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তিকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে মাহ্ফুজ আনাম তার সম্পাদিত পত্রিকায় মিথ্যা ও বিকৃত তথ্য প্রকাশ করেন, যা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। এ কারণে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে দীর্ঘদিন কারাভোগ করতে হয়। এতে তাঁর দল ও মামলার বাদীদের মানহানি হয়েছে। বাস্তবতা হলো, মানহানি মামলা করেন যার মানহানি হয়েছে তিনি নিজে। আর রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা চাইলেই যে কেউ করতে পারেন না। কিন্তু মাহফুজ আনামের ক্ষেত্রে এসব নিয়ম-কানুনের কোনও বালাই চোখে পড়ছে না। কারণ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্যরাই যখন মাহফুজ আনামের বিচার দাবি করছেন, তখন এসব মামলা না নেওয়ার মতো ধৃষ্ঠতা যে কেউ দেখাবেন না, সেটিই স্বাভাবিক।

৩. 

এক-এগারোর সময় গণমাধ্যমের ওপর সরকারের বা সামরিক বাহিনীর কী ধরনের প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ ছিল তা খুব বেশি ভেঙে বলার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ডিজিএফআইয়ের পাঠানো চোথা (গ্রেফতার রাজনৈতিক নেতাদের তথাকথিত জবানবন্দি) ছাপানো অনেকটা বাধ্যতামূলক ছিল এবং কেউ কেউ অতি উৎসাহ নিয়েই সেগুলো ছাপতেন। রাজনীতিতে একটা পরিবর্তনের যে ইঙ্গিত সে সময়ে দেওয়া হয়, সেটিকে অনেকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখেছিলেন এবং ফলে অনেক প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ সংস্কারপন্থি হয়ে যান। যাদের মধ্যে অনেককে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বেশ চড়া মূল্যও দিতে হয়।

বাস্তবতা হলো, মাহফুজ আনাম একটি তিক্ত সত্য প্রকাশ করেছেন, যার সাহস অন্য কোনও সম্পাদক দেখাননি। এমনকি সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদও এ ঘটনায় শুরুর দিকে নিরব ছিল এবং অব্যাহতভাবে মামলা হতে থাকার পরে এ ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দেয়।  যেখানে এ ধরনের ঘটনাকে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী উল্লেখ করে মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

এখন অনেকেই এটি বলছেন যে,মাহফুজ আনাম একটি অস্বাভাবিক সময়ের যে তিক্ত বাস্তবতার কথা স্বীকার করেছেন, তার জন্য তাকে বরং অভিনন্দন জানানো উচিত ছিল। সেইসাথে গ্রেফতার বা বিচার যদি করতে হয়, তাহলে সেটি করা উচিত যারা এক-এগারো এনেছেন এবং ওই সময়ে যেসব রাজনীতিবিদ তাদের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিয়েছেন, তাদের।

এ কথা অস্বীকার করার নিশ্চয়ই কোনও অবকাশ নেই যে, ওয়ান-ইলেভেন এসেছে রাজনীতিবিদদের কারণেই। তাদের সীমাহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অসহিষ্ণুতা, ক্ষমতা ধরে রাখা আর ক্ষমতায় যাওয়ার উদগ্র বাসনার ফল ওয়ান-ইলেভেন। কেননা রাজনীতিবিদরা সৎ ও দেশপ্রেমিক হলে সেখানে তৃতীয় কারও যেমন সেনাসমর্থিত কারও ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ নেই। রাজনীতিবিদরাই বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি করেন, যাতে তৃতীয় শক্তি  সুযোগ পেয়ে যায়।

সুতরাং এখন যদি বিচারের প্রশ্ন আসে, তাহলে এ নিয়ে অবশ্যই নিরপেক্ষ আলোচনা হতে হবে খোদ জাতীয় সংসদেই। এমনকি ওয়ান-ইলেভেন কমিশন গঠনের যে প্রস্তাব কেউ কেউ দিয়েছেন, সেটি নিয়েও ভাববার সময় এসেছে।

কেননা একজন মাহফুজ আনামকে গ্রেফতার বা একটি ডেইলি স্টার বন্ধের মধ্য দিয়ে এটি নিশ্চিত করা যাবে না যে, দেশে আর কখনও ওয়ান-ইলেভের মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে না। একজন মাহফুজ আনামের বিচারের মধ্য দিয়ে এটি নিশ্চিত হবে না যে, রাজনীতিবিদরা আবারও তাদের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এরকম জবানবন্দি দিতে বাধ্য হবেন না।

লেখক: সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ