Vision  ad on bangla Tribune

বিপন্ন বহুত্ববাদ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা১৩:৪৫, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৬

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাবাংলাদেশের সমাজ আজ বিপন্ন। দীর্ঘদিনের সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম। দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকেছে, সাথে সাম্প্রদায়িকতা এসে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে আমাদের সব অর্জন। নাগরিকদের সুখদুঃখের চেতনাও যেন চাপাতির নীচে পড়ছে প্রায় প্রতিদিন।
চার দশকেরও বেশি পার করে এসেছি আমরা স্বাধীনতা অর্জনের। সেই ১৯৭১ সালে জন্ম নেওয়া মানুষটির বয়স আজ অর্ধ শতাব্দি হওয়ার পথে। সময়টা অনেকখানি। যে স্বাধীনতা লড়াইয়ের ভিত্তিমূল ছিলো উদার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, সেই দেশে কেন একজন নিরীহ, ধর্মপ্রাণ মঠ অধ্যক্ষকে খুন হতে হয়? তাহলে এতো বছর পরে এসেতো প্রশ্ন উঠে আমাদের অর্জনটা তাহলে কী?
ধর্মের নামে লেখক হত্যা, প্রকাশক হত্যা, বিদেশি হত্যা, পীর হত্যা, আর এই মঠ অধ্যক্ষ হত্যা আমাদের কোন বার্তা দেয়? জঙ্গি নাশকতা বা নাশকতার প্রচেষ্টাতো এখন রোজকার খবর প্রায়। কাগজ পড়ে বা ছবি দেখে, টিভিতে পরবর্তী রিপোর্টগুলো দেখে শিউরে উঠতে হয়। দেখেশুনে এও মনে হয় কারা কোথায় যেন মেতে উঠেছে তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে। সেই পরাজয় ১৯৭১-এ পরাজিত হওয়া। কিন্তু আমরা এই বিপ্রতীপ অবস্থার গাছটি কখনওই মুড়িয়ে ফেলতে পারিনি। যে দল বা যাদের আমরা জানতাম সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করে না, তাদের বদলে যাওয়াও দেখছি। দেখছি নাগরিক সমাজের নির্লিপ্ততা। রাজনীতির তুখোড় চতুরতা বন্যার মতোই সর্বগ্রাসী। সমস্ত বাঁধ ভেঙে সে সর্বত্র ঢুকে পরে সব নীতিকেই ভেস্তে দেয়। কখনও ভাষা, কখনও ধর্ম, কখনও সমাজ, কখনও বিভিন্ন নাশকতার মাধ্যমে অশুদ্ধ ভাবনার প্রতিফলন হচ্ছে। অন্ধ ভাবাবেগের দ্বারা চালিত কিছু শ্রেণির মানুষ সমস্ত কিছুকে কুক্ষিগত করে রাখছে বা রাখতে চাইছে, তার নিজস্ব দলগত কোটরের মধ্যে।
দেবীগঞ্জ উপজেলার শ্রী-শ্রী সন্তগৌড়ীয় মঠের অধ্যক্ষকে গলা কেটে হত্যার ঘটনাটি আমাদের ভালো করে বুঝিয়ে দিচ্ছে আমাদের যা কিছু অর্জন হোক না কোন, সব নস্যাৎ করার আয়োজন চলছে। ধারণা করা হচ্ছে সাম্প্রতিক বিদেশি হত্যা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলারই ধারাবাহিকতা এই হত্যাকাণ্ড। পুলিশ আগের হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে এ হত্যাকাণ্ডের কিছুক্ষেত্রে মিল পাচ্ছে। আগের বেশিরভাগ ঘটনার মতো এক্ষেত্রেও দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেল ব্যবহার করেছে। এক্ষেত্রেও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে বলে দাবি করেছে জঙ্গিগোষ্ঠীর ইন্টারনেটভিত্তিক তৎপরতা নজরদারিতে নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ।

গত বছর ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় দুই বিদেশি নাগরিক হত্যা, একাধিক খ্রিস্টান পাদরিকে হত্যার চেষ্টা এবং আহমদিয়া ও শিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদে বোমা হামলাসহ নয়টি ঘটনার দায় আইএস জড়িত বলে দাবি করেছে সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ। অবশ্য এসব দাবির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এসব দাবি জোরালোভাবে নাকচ করে বলা হয়, এ দেশে আইএসের কোনও অস্তিত্ব নেই। এবারও পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার মঠের অধ্যক্ষের হত্যার ঘটনায় আইএসের দায় স্বীকারকে নাকচ করে দিয়েছেন।

আইএস আছে কি নেই, এই বিতর্কে না গিয়ে বলা যায় ধর্মীয় সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক হামলা হচ্ছে পরিকল্পিত ভাবেই। এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক, দেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। পাকিস্তান যেভাবে জঙ্গিবাদকে আমলে না নিয়ে নিয়ে আজ আর দেশ নয়, বাংলাদেশও যদি অন্য উৎসবে আমেজে এসব হত্যাকাণ্ডকে ভুলে যেতে চায়, তার কপালেও এমন কিছু লিখন হয়ে যেতে পারে। সংখ্যালঘু ধর্মগুরুদের ওপর হামলা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর একটি আঘাত। আপাতত হয়তো অনেকে বলবেন এটি দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বিচ্ছিন্ন আঘাত। সত্যি বলতে কি যেকোনও বিবেক সম্পন্ন মানুষই আজ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

এখন পর্যন্ত আইএসের নামে সংঘটিত কোনও ঘটনারই প্রকৃত হোতাদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে পারেনি গোয়েন্দারা। ফলে আইএসের নামে একটি ধূম্রজাল সৃষ্টি হচ্ছে, একটির পর একটি ঘটনা ঘটেই চলেছে।

আমাদের আনেকেই বলে থাকেন বাংলাদেশের অতীত বহুত্ববাদের। নানা মত নানা পরিধানের। অনেক প্রচেষ্টার পরও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাতে যখন পড়েছে তখন সেই ধারা সচল রেখেছে। তবে একথাও সত্য যে, বহুত্বের পাশাপাশি এদেশে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ইতিহাসও বেশ বড়। নির্বাচন বা রাজনীতি যেকোনও ইস্যুত শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়েছে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর।  

তারপরও বলতে হবে যে, আমাদের বহুত্ববাদের ভেতরকার অভ্যন্তরীণ সংঘাত যাই থাক, সংহতি ও সমন্বয়ের এক বৃহৎ চিত্র ছিল এবং এখনও তা বহুলাংশে বিরাজমান। কিন্তু হাল ছেড়ে দেওয়ার, উদাসীন থাকার সুযোগ নিশ্চয়ই আর থাকছে না।

রাজনীতিই শেষ ভরসা। শেখ হাসিনার সামনে চ্যালেঞ্জ বহুত্ববাদের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হওয়ায় আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে শুধু জামাতে ইসলাম নয়, আরও রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক গোষ্ঠি এবং ব্যক্তিও কতটা সাম্প্রদায়িক হতে পারে। এতোদিন এদের অনেককেই আমরা জানতাম উদারনৈতিক বলে।

বাংলাদেশের সমাজকে বাংলাদেশের ইতিহাস আর সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিচার না করে মুসলিম সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে নির্দেশনা দিচ্ছে বিএনপি, জামাত, জাতীয় পার্টিসহ অনেক দল। সাথে আছে এক শ্রেণির সুশীল। এর অর্থ হলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে সমাজে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। দৃষ্টিভঙ্গির এই গ্রাস থেকে দেশকে মুক্ত করা খুব সহজ নয়। খুব সাধারণভাবে এসব হত্যাকাণ্ডকে আইনশৃংখলা সমস্যা হিসেবে দেখলে বা বিচার করলে সংখ্যায় ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি বেশি হলেও দেশ ধর্মনিরপেক্ষ থাকবে না।

বাংলাদেশ শক্তিশালী অর্থনৈতিক রাষ্ট্র হতে চায়। সে পথে অর্জনও আছে অনেক। কিন্তু সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠলে সমস্যা আছে। সমস্যা আছে এজন্য যে, ওলামা লীগ নামের এক ভয়ঙ্কর সংগঠনের অস্তিত্ব নিরবে মেনে নিয়েছে আওয়ামী লীগ।  

বাংলাদেশের গণতন্ত্র, বাংলাদেশের অর্থনীতি, দুইয়ের সাফল্যই নির্ভর করছে নারী প্রগতি, উদারতা, আর অসাম্প্রদায়িকতায়। অন্ধকারের শক্তি বেড়ে ওঠে আর্থিক অসাম্য বাড়লে। শক্তিশালী অর্থনীতি চাই, কিন্তু তার নামে মানুষের মধ্যে শ্রেণি বৈষম্য বাড়তে থাকলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও শুরু হয়, আর তার সুযোগ নেয় বহুত্ববাদ বিরোধীরা।  

লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ