Vision  ad on bangla Tribune

কার হাতে হাতকড়া?

আহসান কবির১২:১৬, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৬

Ahsan Kabirপ্রিয় দীপন
তোর কাছে আগেও চিঠি লিখেছিলাম একবার। পেয়েছিস কিনা জানি না। তোর স্ত্রী জলি আর সন্তান রিদাত ও রিদমা কেমন আছে সেটা কি তুই বুঝতে পারিস? না ফেরার দেশ থেকে কি অনুভব করতে পারিস তোর বাবা-মা আর বোনের দুঃখটা? পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী দুঃখটার ব্যাপারে তোর কোনও ধারণা আছে?
ধারণা আছে- কেমন চলছে তোর প্রিয় বইমেলা? কেমন করে চলছে তোর স্বপ্নের প্রকাশনী জাগৃতি? আজিজ মার্কেটের তিনতলায় জাগৃতির যে অফিসে তুই খুন হয়েছিলি সেটা যেদিন বন্ধ করে দেওয়া হয়, যেদিন তোর অফিসের সব কাগজপত্র বুঝে নিতে রিদাত, জলি আর তোর বাবা গিয়েছিলেন সেখানে, সেদিনকার দৃশ্য কেউ সম্ভবত লিখে প্রকাশ করতে পারবে না!
তবু আজিজ মার্কেটের নিচতলায় জাগৃতি প্রকাশনীর বই-এর শোরুমটা এখনও আছে। তোর স্মৃতি নিয়ে শোরুমটা যেমন আছে, তেমন আছে তোর স্বপ্নটা বাস্তবায়নের জন্য জলির প্রাণান্তকর চেষ্টা, যেমন আছে হাতে গোনা কয়েকজন বন্ধুবান্ধবের কাছে তোর চলে যাওয়ার স্মৃতি ঠিক উল্টোভাবে তুই হয়তো নেই বিচারের তালিকায়। মনে হচ্ছে তুই অনেক আগেই চলে গেছিস বিচারহীনতার সংস্কৃতির উদাহরণে। তোর হত্যাকাণ্ডের পর থেকে (দীপন ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর খুন হয়েছিল) এ পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে এমন শুনিনি। এমনকি তুই নেই সরকারিভাবে বাংলা একাডেমিতে, নেই তোর বেশির ভাগ প্রকাশক বন্ধুদের ভালোবাসার তালিকাতেও! অবশ্য মাঝে মাঝে তোকে দেখি সংবাদপত্রের ছবি হয়ে আসতে কিংবা টেলিভিশন চ্যানেলের খবরে!
দীপন, তোর মৃত্যুর পর এই প্রথম বইমেলা করছে জাগৃতি। এবারও নতুন কিছু বই এনেছে তোর প্রকাশনী। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নিয়ে তোর স্ত্রী জলি শুধু একবার বলেছিল- আমি দীপনের গায়ের ঘ্রাণ পাচ্ছি! নাকি তোর রক্তের গন্ধ আছে নতুন সব বইতে? দীপন তুই জেনে কতখানি কষ্ট পাবি আমি জানি না, এই বইমেলাতে তুই সরকারিভাবে নেই! মেলার কোথাও তোর কোনও ছবি বা তোকে স্মরণের কোনও বাহ্যিকতা নেই। তুই আছিস শুধু তোর জাগৃতির স্টলে ছবি হয়ে! যেন যতবার তোর ছবির দিকে চোখ যায় ততবার শুধু যেন জলি কিংবা তোর ছেলে মেয়েরাই কষ্ট পায়! এখনও সভা হয় প্রতিদিন, মেলার মূল চত্বরে আলোচনা আর গানের মেলা বসে, কোথাও কেউ তোকে নিয়ে কথা বলেনি! বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক থেকে শুরু করে কেউ তোর হত্যাকাণ্ড নিয়ে এই মেলাতে কোনও কিছু বলেনি, একটা বিবৃতিও দেয়নি! দীপন খুব সহজেই ভুলে যাওয়া শিখেছে মানুষ!

দীপন তোর মতো তোর আজীবন বন্ধু অভিজিৎকেও বাংলা একাডেমি মনে রাখেনি! একাডেমির কোনও কার্যক্রম চোখে পড়েনি আমাদের। এক বছর পরেও রাষ্ট্র নির্দিষ্ট করে বলতে পারেনি কারা হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল, কেন উম্মাদ আক্রোশে মৌলবাদী অন্ধরা কুপিয়ে হত্যা করেছিল একজন মুক্তচিন্তার বাহক অভিজিৎকে! তোর আর অভিজিতের মতো হুমায়ুন আজাদ, প্রফেসর ইউনুস, আবু তাহের এবং শফিউল আলম একই রকম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। কেউ কারও বিকল্প হতে পারে না ঠিকই তবে মুক্তবুদ্ধির এইসব মানুষের শূন্যতা পূরণ হয়নি, হয়তো হবেও না। দীপন, বেছে বেছে কেন মুক্তবুদ্ধির মানুষেরাই শুধু আক্রোশ আর খুনের শিকার হচ্ছেন? ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর মুক্তবুদ্ধির মানুষদের এভাবে খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হয়েছিল। তোর আর অভিজিতের পর চাপাতির নিচে কার জীবন ঝুলছে?

দীপন, এদেশে মাদ্রাসা খুলতে অনুমতি নিতে হয় না, ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করলেও কোনও ক্ষতি নেই। জঙ্গি ভরণপোষণের সব ধরনের সহযোগিতা করে বদনাম কামানোর পরেও ইসলামী ব্যাংক রাষ্ট্রীয় বহু অনুষ্ঠানের স্পন্সর হতে পারে! উল্টোদিকে শুধু মুক্তবুদ্ধির চর্চা (ব্লগে লেখালেখির নামে যারা ধর্মকে ব্যঙ্গ করে, যুক্তিহীন গালাগালি করে তারা ব্লগার কিনা সন্দেহ আছে) করার কারণে সুব্রত শুভ, রাসেল পারভেজ কিংবা মশিউর রহমানকে গ্রেফতার হতে হয়। তোদেরকে খুন হয়ে যেতে হয়!

দীপন একবার ভেবে দেখ, প্রায় ৭৪ বছর বয়সের একজন মানুষ যার নাম শামসুজ্জোহা মানিক। আমারও জন্মের আগে ১৯৬৬ সালে যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে মাস্টার্স করেছেন। হাতে হাতকড়া পরিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আদালতে, এজলাসে থাকাকালীনও তার হাত থেকে হাতকড়া খোলা হয়নি! এরপর হাতকড়া পরা অবস্থায় পুলিশ ভ্যানে তুলে তাকে রিমান্ডে আনা হয়েছে। হাতকড়া আসলে কার হাতে সেটা আমি বুঝতে পারছি না দীপন। রাষ্ট্র নিজেই কি হাতকড়া আর রিমান্ড নিয়ে মুক্তবুদ্ধির বিপক্ষে নেমেছে?

দীপন, শামসুজ্জোহা মানিক ‘ইসলাম বিতর্ক’ নামের একটি বই সম্পাদনা করেছিলেন যেটি ছেপেছিল ব-দ্বীপ প্রকাশনী। বইটি ২০১৩-১৪ সাল থেকেই বাজারে ছিল, ছিল অনলাইনেও! ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এসে বাংলা একাডেমি বইটি নিষিদ্ধ করলো, বইমেলাতে ব-দ্বীপ প্রকাশনীকেও নিষিদ্ধ করা হলো! কাদম্বিনীকে যেমন মরিয়া প্রমাণ করিতে হইয়াছিল ঠিক তেমনি শামসুজ্জোহাকে হাতকড়া পরিয়া প্রমাণ করিতে হইলো যে বইটি ধর্ম অবমাননা করেছে। রাষ্ট্রের পুলিশ বাদী হয়ে তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের ৫৭(২) ধারায় একটি মামলা করে এবং শামসুজ্জোহা, ব-দ্বীপের প্রকাশক ফকির তসলিমউদ্দিন কাজল এবং লেখক শামসুল আলম চঞ্চলকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। ২০১৫ সালেও রোদেলা প্রকাশনীকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, ২০১৬তে ব-দ্বীপ। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড.শামসুজ্জামান খান বলেছেন- এত অশ্লীলভাবে কেউ মহানবী, তার স্ত্রী ও বিভিন্ন ঘটনাবলী নিয়ে লিখতে পারে সেটি তার কল্পনাতেও ছিল না। এরপর মহাপরিচালক সাহেব বইটির অংশবিশেষ পড়ে শুনিয়েছেন জনপ্রিয় লেখক ও শিক্ষক মুহম্মদ জাফর ইকবালকে। তিনিও একই মত প্রকাশ করে কাউকে বইটি না পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন!

বইটি হয়তো নিষিদ্ধ করা যেত (নিষিদ্ধ করা ঠিক না বেঠিক হতো সেই বিতর্ক না হয় পরেই হতো!) কিন্তু বইমেলা থেকে স্টলটাই ভ্যানিস করে দেওয়া হলো। মৌলবাদী জঙ্গিদের যেভাবে গ্রেফতার করা হয় ঠিক একই স্টাইলে গ্রেফতার করা হলো লেখক ও প্রকাশককে। জঙ্গি আর লেখকরা এদেশে একই ব্যবহার পেয়ে থাকে! দীপন, হয়তো এটাই ভালো যে হাতকড়া পরে শামসুজ্জোহা সাহেব রিমান্ডে গিয়েছেন, হয়তো কয়েকদিন জেলও খাটবেন, কিন্তু তাকে তোর বা অভিজিতের মতো কোপ খেয়ে মরতে হলো না!

পুলিশের দাবি, তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শামসুজ্জোহা মানিক সম্পাদিত বইটি সম্পর্কে অভিযোগ পেয়েছে। দুই-তিন বছর বই হিসেবে কিংবা অনলাইনে ইসলাম বিতর্ক বইটা থাকলেও সেটা নিয়ে কেউ কখনো আলোচনা তোলেনি। ছদ্মনামে নয়ন চ্যাটার্জী খ্যাত চরম মৌলবাদী একজন নিক ভ্যালেন্টাইনস এ পোস্ট দেয় এটা নিয়ে। এরপর সামসুজ্জোহা সাহেবের চেহারা কেমন, তার বাসার ঠিকানা কী, তাকে কুপিয়ে মারা হবে নাকি গণপিটুনি দিয়ে মারা হবে এমন মন্তব্য সম্বলিত পোস্ট ছড়িয়ে দেওয়া হয় ইউটিউবে। এরপরও এটা নিয়ে কোনও আলোচনার সৃষ্টি হয়নি। এরপর আরেক মৌলবাদী সাইট বাঁশেরকেল্লা এটা নিয়ে প্রচারণায় নামে। সঙ্গে সঙ্গে ঝাপিয়ে পড়ে পুলিশ, সামসুজ্জোহা সাহেবকে হাতকড়া পরিয়ে গ্রেফতার করা হয়!

দীপন, মৌলবাদীরা প্রচারণা চালায়, সরকার গ্রেফতার করে কথিত ব্লগারদের, খুন হয়ে যেতে হয় ওয়াশিকুর বাবু, অনন্ত বিজয়, নিলয় নীল, অভিজিৎ আর তোকে। আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে হয় আহমেদুর রশীদ টুটুল, তারেক রহিম আর রনদীপম বসুকে! আসলে সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকেই মানুষের বিশ্বাস আর বিজ্ঞান ভাবনা সমান্তরালভাবে চলে এসেছে। আর এই দুইয়ের সংঘাত শত শত বছর ধরে মানুষকে নিয়ে গেছে মৃত্যুর দুয়ারে। মৃত্যুর এই রিলে রেস কবে থামবে কেউ বলতে পারে না!

দীপন, আমাদের এই সম্মিলিত উদাসীনতার কারণে সবকিছু নষ্টদের অধিকারে চলে যাচ্ছে, ক্রমাগত আরও বেশি যাবে। মনের ভেতরে মুক্তবুদ্ধি আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার যে খোলা জানালা সেখানে বাসা বাঁধবে মৌলবাদী ঘুণ! আর এই চেতনার পক্ষে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত যুদ্ধ করতে করতে হয়তো আরও বেশি একা হয়ে যাবে তোর স্ত্রী আর ছেলেমেয়েরা। বাংলা একাডেমি হয়তো আরও বেশি করপোরেট আর বাণিজ্যিক হবে, হয়তো আরও বেশি ধুলামুক্ত আর খোলামেলা হবে কিন্তু মনের ভেতরের সেই খোলা জানালাটা হয়ে পড়বে অবরুদ্ধ। তোর স্টল ছাড়া আর কোথাও হয়তো তোর ছবিটাও থাকবে না, রাষ্ট্র চিরদিনই হয়তো মুক্তবুদ্ধির এই মানুষগুলোর হত্যাকাণ্ড নিয়ে চুপচাপই থেকে যাবে!

তবু কোনও একদিন দীপন তোর জন্মদিন আসবে। সম্ভব হলে হয়তো তোর প্রিয় আজিজ মার্কেটের কোনও এক কোণে আগামী বারই জুলাই দীপন স্মৃতি বইমেলার আয়োজন করবো আমরা। হয়তো তোর জন্য একটা দীপন স্মারকগ্রন্থও বের করা হবে। তবু তোর ছেলেমেয়েরা ক্রমাগত আরও বেশি একা হবে, হয়তো তোর হত্যাকাণ্ডের বিচার আমরা পাবো না। জানি না কোনও একদিন তোর স্ত্রী আর ছেলেমেয়েরা আহমেদুর রশীদ টুটুলের পরিবারের মতো নিঃশব্দে নীরবে দেশ ছেড়ে চলে যাবে কিনা!

আমি বা আমরা এর বেশি কিইবা করতে পারবো? বড়জোর হেলাল হাফিজের কবিতাটা মনে করে সান্ত্বনা নেব-

গিয়ে থাকলে আমার গেছে কার কি তাতে?

আমি না হয় ভালোবেসেই ভুল করেছি ভুল করেছি...

ইতি

আহসান কবির

লেখক: রম্যলেখক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ