behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

যুদ্ধবাজদের দুনিয়া...

শুভ কিবরিয়া১২:৫৭, ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০১৬

Shuvo Kibriaসিরিয়ার মাটিতে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা জোটের বিমান হামলার সঙ্গে চলছে রাশিয়ার বিমান হামলা। এখন সেই বিমান হামলা স্থগিত আছে। সিরিয়ার বেসামরিক এলাকায় হামলা আপাতত বন্ধ আছে। সিরিয়ায় কার্যকর হয়েছে যুদ্ধবিরতি। এই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে রাশিয়া ও আমেরিকা। তারাই এর মধ্যস্ততা করছে। তাদের সম্মতিতেই দুই পক্ষের বড় অংশ আপাতত মেনে নিয়েছে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব।
পৃথিবীর বড় শক্তিমান দেশ হিসেবে পরিচিত আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি। তারা সারা দুনিয়ার মাতব্বর হিসেবে সক্রিয়। এরাই দেশে দেশে মানবাধিকার আর গণতন্ত্র ঠিক করে বেড়াচ্ছে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে এরা সবাই এককাট্টা হয়েছে। আপাতত এরাই হচ্ছে পৃথিবীর ত্রাতা। এরা আমাদের শান্তি শেখাচ্ছে। মানবাধিকারের জ্ঞান দিচ্ছে। এদের কাছ থেকে আমরা প্রযুক্তির শিক্ষা নিচ্ছি , পাচ্ছি বাণিজ্যের সবক। অথচ এরাই তলে তলে পৃথিবীকে যুদ্ধক্ষেত্র বানাচ্ছে। এরাই সংঘাত বাধাচ্ছে। এরাই সরবরাহ করছে মৃত্যুঘাতি মারণাস্ত্র।
দুই.
সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই বা সিপরি)’ বিশ্ব নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা করে। সমরাস্ত্র বাণিজ্য নিয়ে নানান ডাটাবেজ তৈরি করে। এদের তথ্য থেকেই জানা যায় পৃথিবীর সমরাস্ত্র বাণিজ্যের হালহকিকত। সম্প্রতি ‘ট্রেন্ডস ইন ইন্টারন্যাশনাল আর্মস ট্রান্সফারস, ২০১৫’ শিরোনামে এক গবেষণা তথ্য প্রকাশ করেছে সিপরি। এই ডাটাবেজ জানাচ্ছে  ২০১১-২০১৫ সালে সারা পৃথিবীতে সমরাস্ত্র সরবরাহ ২০০৬-১০ সময়ের তুলনায় ১৪% বেড়েছে।
২০১১-১৫ সালে সারা পৃথিবীতে সমরাস্ত্র বাণিজ্যের বড় ‘কুতুব’রা হচ্ছে আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স এবং জার্মানি।  এই সময়ে সারা পৃথিবীতে যে সমরাস্ত্র বাণিজ্য হয়েছে তার ৭৪% বাণিজ্য করেছে এই পাঁচ ‘কুতুব’ দেশ। ২০১১-১৫ সময়ে সারা পৃথিবীর অস্ত্র ব্যবসার ৫৮%-এর অংশিদার হচ্ছে  বড় দুই দেশ আমেরিকা ও রাশিয়া। তারাই অস্ত্র রফতানির সিংহভাগ চালিয়ে আসছে। তাদের নির্মিত ও সরবরাহকৃত অস্ত্রেই চলছে বিশ্বব্যাপি সহিংসতা ও জীবনহানি।
তিন.
আমাদের চারপাশে যে রাজনৈতিক এবং সামাজিক অস্থিরতা তার পেছনে থাকছে অস্ত্রব্যবসায়ী দেশগুলোর নানা ইন্ধন। খুব কৌশলে এরা দুইভাগে বিভক্ত হয়ে ঝগড়া লাগায়। রাজনৈতিক অশান্তি তৈরি করে এবং অবশেষে সেই অশান্তিকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়। যাতে করে তাদের উভয় পক্ষের সমরাস্ত্র বাণিজ্য সচল থাকে। তথ্য বলছে ২০০৬-২০১০ সালের তুলনায় ২০১১-১৫ সালে রাশিয়ার অস্ত্র রফতানি বেড়েছে ২৮% , আমেরিকার বেড়েছে ২৭%, চীনের বেড়েছে ৮৮%। যে চীনকে আমরা কোনও রাজনৈতিক বিবাদে সরাসরি পক্ষ হতে দেখি না সেই চীন গত পাঁচ বছরে তার অস্ত্র রফতানি কী বিপুল পরিমাণে বাড়িয়েছে তা ভাবলে অবাক হতে হয়। অথচ এসব দেশকে আমরা দেখি বন্ধু রুপে। বিনিয়োগ সহযাত্রী হিসেবে।অথচ এরাই অস্ত্র বিক্রি করে সমাজ-রাষ্ট্র এমনকি এই পৃথিবীকে ক্রমশ করে তুলছে অশান্ত ।

এভাবেই বিশ্বের ক্ষমতাবান অস্ত্রবিক্রেতারা তাদের অস্ত্র বিক্রি বাড়াচ্ছে।  কিন্তু প্রশ্ন হলো এই অস্ত্রের ক্রেতা কারা?  কারা অর্থলগ্নি করছে তাদের অস্ত্র কিনতে? ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ বা সিপরি তথ্যভাণ্ডার বলছে, বিশ্বের মোট অস্ত্র আমদানির ৩৪% সমবেতভাবে আমদানি করছে ভারত, সৌদি আরব, চীন এবং অস্ট্রেলিয়া । ২০১১-১৫ সালে অঞ্চলভিত্তিতে এশিয়া এবং ওশেনিয়া অঞ্চল বিশ্ব অস্ত্র আমদানির মোট ৪৬% অস্ত্র আমদানি করেছে। এই একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ২৫%, ইউরোপ ১১%, আমেরিকা ৯.৬%, আফ্রিকা ৮% অস্ত্র আমদানি করেছে।

এই তথ্যভাণ্ডার দুটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যনির্দেশ করছে। এক. অস্ত্র রফতানিতে পিছিয়ে পড়েছে জার্মানি। ২০০৬-১০ এর তুলনায় ২০১১-১৫ মেয়াদে তাদের অস্ত্র রফতানি কমেছে প্রায় ৫১%।

 দুই. অস্ত্র আমদানিতে সাম্প্রতিক সময়ে অনেক বেশি এগিয়ে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। ২০০৬-১০ এর চেয়ে ২০১১-১৫ মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের অস্ত্র আমদানি বেড়েছে ৬১ শতাংশ। ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে ২০১১-১৫ মেয়াদে অস্ত্র আমদানি বিপুলতর ভাবে বাড়িয়েছে এশিয়ার শক্তিমান ও উদীয়মান দেশগুলো। ২০০৬-১০ মেয়াদের তুলনায় ২০১১-১৫ মেয়াদে এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের অস্ত্র আমদানি বেড়েছে ২৬ শতাংশ।

চার.

এরমধ্যে শুরু হয়েছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়ন লড়াই। রিপাবলিকান দলের মনোনয়নে এগিয়ে থাকা ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব পরিষ্কার করেই যুদ্ধবাজ বুশ জমানায় ফেরত যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অভিবাসন বিরোধি বক্তব্য দিয়ে তিনি তাতিয়ে দিচ্ছেন গোটা পৃথিবী। মুসলমানদের সম্পর্কে আপত্তিকর বক্তব্যও দিচ্ছেন। আমেরিকায় মুসলমানদের ঢোকা বন্ধ করার দাবিও জানিয়েছেন ট্রাম্প। তার অভিমত হচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমেরিকানরা মুসলমানদের সম্পর্কে নিশ্চিত হতে না পারছে ততক্ষণ তাদের আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা উচিত। ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব সুস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছেন, Ban Muslims from entering the US until we can figure out what's going on.

ইসলামিক স্টেট সম্পর্কেও তার অভিমত হচ্ছে, ‘তাদের মস্তক কতল করো এবং তাদের তেল সম্পদ নিয়ে নাও।’ অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট দলের প্রেসিডেন্ট পদের লড়াইয়ে এগিয়ে থাকা হিলারি ক্লিনটন বলছেন ইসরাইল তোষণের কথা। বলছেন প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যে আরও কঠোর সামরিক প্রস্তুতি নেওয়ার কথা।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী জয়ী হলে দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন রণসজ্জা বাড়তে পারে। যুদ্ধ যুদ্ধ দামামা বাজতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া আরও ‘হটবেড’ হয়ে উঠতে পারে মার্কিন-চীন দ্বৈরথে। অন্যদিকে হিলারি ক্লিনটনের বিজয়, বর্তমান অবস্থা আরও বেগবান করতে পারে।  এ কথা অনস্বীকার্য, রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট যে দলের প্রার্থীই প্রেসিডেন্ট মনোনীত হোন না কেন, আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী চেহারার কোনও হেরফের হচ্ছে না। তার মানে মার্কিন সরকারের ক্ষমতায় যেই আসুক না কেন সমরাস্ত্র বাণিজ্যে মার্কিন নীতির খুব একটা রদবদল হচ্ছে না। দেশে দেশে অস্ত্র রফতানি জিইয়ে রাখার জন্য তাদের বর্তমান কূটনীতি-রণনীতি অব্যাহতই থাকছে।

পাঁচ.
হালে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া সহ পৃথিবীর অনেক দেশে জঙ্গিবাদের বিপদ নেমেছে। দেশে দেশে শাসকশ্রেণির কেউ-কেউ এই জঙ্গিবাদি ভূতকে তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসাবে ব্যবহার করছে। কেউ-কেউ দেখছে রাজনৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার লড়াই হিসেবে। কোনও কোনও দেশের সামরিক বাহিনী জঙ্গিবাদকে দেখছে তাদের ক্ষমতা বাড়ানোর কৌশল হিসেবে। কোথাও কোথাও জঙ্গিবাদি প্রচারণা বাড়ানোর জন্য খোলা হয়েছে নানান বুদ্ধিবৃত্তিক এনজিও ও প্রতিষ্ঠান। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রস্তুতি। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য, দেশের নিরাপত্তা সুরক্ষার জন্য সশস্ত্র প্রস্তুতি চলছে দেশে দেশে নানান পথ ধরে। অস্ত্র-প্রশিক্ষণ-নিরাপত্তা সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ছে। বাড়ছে বেসরকারি পর্যায়ে নিরাপত্তা ব্যয়ও।

খেয়াল করলে দেখা যাবে জঙ্গিবাদিদের অস্ত্র ও সরঞ্জাম যেমন আসছে ক্ষমতাবান দেশগুলো থেকে ঠিক সেসব দেশ থেকেই ক্রয় করতে হচ্ছে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অস্ত্রও। এক ঠিলে দুদিকেই দাঁও মারছে অস্ত্র উৎপাদন ও বিপনণকারি দেশগুলো। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান খাতের বদলে ব্যয় বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে অস্ত্র ও নিরাপত্তা খাতে। এভাবেই জঙ্গিবাদি যুদ্ধের প্যাঁচে ফেলে, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার অভাবের ভয় দেখিয়ে অস্ত্র গছিয়ে দিচ্ছে এইসব ক্ষমতাবান দেশগুলো।

 ছয়.

যুদ্ধবাজদের দুনিয়া ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। সংকুচিত হচ্ছে শুভবুদ্ধি মুক্তবুদ্ধির দুনিয়া। আমাদের নিজেদের রক্তেই রঞ্জিত হচ্ছে আমাদের হাত। ভাতৃঘাতি যুদ্ধ সহিংসতার বাজার পুষ্ট করছে যুদ্ধবাজদের অর্থনীতি। সেই পুষ্ট অর্থনীতি বিকশিত করছে সমরাস্ত্র বাণিজ্যকে। আমাদের ভাগ্যের প্রকৃত উন্নতি হচ্ছে না। বরং দিনকে দিন নিরাপত্তা ব্যয় বাড়িয়ে এক অবরুদ্ধ যুদ্ধদিনের মধ্যেই আমরা ফেলছি আমাদের। এই দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি পেতে হলে যে দূরদৃষ্টি দরকার, তা থেকে আমরা প্রতিদিন সরে যাচ্ছি দূরে, আরও দূরে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ