behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

অচলায়তনে আটকা পড়েছেন মোদি

আনিস আলমগীর১৩:০৩, মার্চ ০১, ২০১৬

Anis Alamgirনরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি এক জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমি চা-ওয়ালা, আমি প্রধানমন্ত্রী হয়েছি, আমাকে অনেকে মেনে নিতে পারছেন না। তাই আমার বিরুদ্ধে চারদিকে ষড়যন্ত্র।’ বাক বিভূতিতে পারদর্শী নরেন্দ্র মোদির কণ্ঠে এখন হতাশার সুর।
গত লোকসভা নির্বাচনে ৪/৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছিলেন ভারতীয় ধনবাদী গোষ্ঠী শুধু নরেন্দ্র মোদিকে জিতিয়ে এনে প্রধানমন্ত্রী বানানোর অভিপ্রায়ে। তাদের অভিলাষ পূর্ণ হয়েছে। নরেন্দ্র মোদিতো এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু মুশকিল হয়েছে নরেন্দ্র মোদিকে দিয়ে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। সম্ভব হচ্ছে না নরেন্দ্রর মোদির অনাগ্রহের কারণে নয়। আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও তার পক্ষে ইচ্ছে মতো কোনও বিল পাস করানো সম্ভব হচ্ছে না। কারণ লোকসভায় তার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও রাজ্যসভায় বিজেপি মাইনরিটি। বিরোধীরা সম্মত না হলে বিল পাস করা নরেন্দ্র মোদির পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার ব্যবস্থা রেখে ভারতের স্থপতিরা সুন্দর সুরক্ষার ব্যবস্থা করে গেছেন। এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় না। বিজেপি মনে করেছিলো লোকসভার নির্বাচনের পর দিল্লি, বিহার, পশ্চিম বাংলা, আসাম, কেরালা, তামিলনাড়ু, পন্ডিচেরী বিধানসভার নির্বাচন হবে। তাতে তারা রাজ্যসভায় তাদের সংখ্যা বাড়াতে পারবে। কিন্তু দিল্লি ও বিহার বিধানসভার নির্বাচনে বিজেপি যে ফল প্রত্যাশা করেছিলো তা লাভ করা সম্ভব হয়নি। এখন বড় বিধানসভার মাঝে পশ্চিম বাংলার বিধানসভার নির্বাচন হবে আগামী মে মাসে। পশ্চিম বাংলায় এখন তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায়। তৃণমূল কংগ্রেস-এর বিরুদ্ধে জোট গঠন করছে সিপিএম এবং কংগ্রেস। সুতরাং পশ্চিম বাংলায় লড়াইটা তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিএম-কংগ্রেস জোটের মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। সর্বোপরি এখানে ৩০% ভোট হচ্ছে মুসলিম ভোট। বিজেপি এখানে মুসলমানদের ১টা ভোটও প্রত্যাশা করতে পারে না। শুধু পশ্চিম বাংলায় নয়, ভারতের সব জায়গায় মুসলিম ভোট ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোই শুধু প্রত্যাশা করতে পারে। কারণ নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর মুসলমানদের ওপর সংঘ পরিবারের অত্যাচার বেড়ে গেছে বহুগুণ বেশি।
মুসলমানেরা শুধু গরু জবেহ করতে পারে পশ্চিম বাংলা এবং কেরালায়। ভারতের সর্বত্র গো জবেহ নিষিদ্ধ, এমন কি কাশ্মীরেও। কয়দিন আগে ফ্রিজে গো মাংস আছে এমন অভিযোগ তুলে উত্তর প্রদেশের দাদারি পরগণার বিসারা গ্রামে মুহাম্মদ আখলাককে নির্মমভাবে পিটিয়ে খুন করেছে বিজেপির কর্মীরা। অথচ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে আখলাকের ফ্রিজে গো মাংস ছিলো না। যা ছিলো তা হচ্ছে ছাগলের মাংস। অথচ গো-মাতার সন্তানেরা মাতৃপূজায় ঈশ্বরের সন্তানকে মিথ্যা অভিযোগ এনে বলি দিয়ে রক্তোল্লাসে মেতে উঠলো।
ভারতের শিক্ষা রাজ্য সরকারের অধীন কিন্তু ৭০টি বিশ্ববিদ্যালয় আছে যা কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিচালনা করে। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ) তার মধ্যে একটা। প্রগতিবাদীদের আখড়া হলো জেএনইউ। ছাত্র সংগঠন ডেমোক্রেটিক স্টুডেন্টস ইউনিয়ন কাশ্মীরী নেতা আফজল গুরুর তৃতীয় মৃত্যু বার্ষিকীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে একটা সাংস্কৃতিক সমাবেশ আয়োজন করেছিলো। বিজেপির ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের অভিযোগের কারণে সাংস্কৃতিক সমাবেশটি শুরুর প্রস্তুতিপর্বে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দেয়। এটা নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সভাপতি এসেছিলো ঘটনাটা-মিটানোর জন্য কিন্তু কানাইয়া কুমার নিজেই রাষ্ট্রদ্রোহের মামলার আসামী হয়ে গ্রেফতার হন। অভিযোগ সেখানে রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান হয়েছে, কানাইয়ার তাতে ইন্ধন ছিল। আদালত প্রাঙ্গনে কানাইয়া কুমারকে অমানুষিকভাবে পিটিয়েছে বিজেপির আইনজীবীরা এবং বহিরাগত বিজেপির কর্মীরা। এটা নিয়ে ৭০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই উত্তেজিত। বিজেপি আর তার মিত্ররা ছাড়া আজ গোটা দেশ যেন জেএনইউ-এর ছাত্রদের আন্দোলনের পক্ষে।
জেএনইউ-এর ঘটনায় জাতীয়তাবাদের জিকির তুলে দেশজুড়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার সুযোগও খুঁজছে বিজেপি নেতৃত্ব। মুসলিমদের ‘রাক্ষস’ এবং ‘রাবণের বংশধর' আখ্যা দিয়ে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য বিজেপি এবং সংঘপরিবার ভারতজুড়ে চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বলছে, যারা সত্যিকার হিন্দু মায়ের গর্ভ থেকে জন্মেছে তাদেরকে। মোদির দলের এসব কর্মকাণ্ডে চোখ পড়েছে বিশ্ব বিবেকের। ভারতের বিবেকেরও। হায়দ্রাবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রোহিদের মৃত্যু, এরপর জেএনইউতে আফজল গুরুর অনুষ্ঠানে দেশদ্রোহী স্লোগান দেওয়া হয়েছে বলে যে বিতর্ক তার ছোঁয়া লাগছে মোদির মসনদে, পার্লামেন্ট অধিবেশনে। সর্বশেষ দিল্লির চিফ মিনিস্টার কেজরিওয়াল আর কংগ্রেস দলীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধীসহ নয় জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে এফআইআর  আনা হয়েছে। অভিযোগ- দিল্লি পুলিশ কানাইয়া কুমারের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ করেছে- এটা জানা সত্ত্বেও রাহুল ও অন্য নেতারা জেএনইউয়ে গিয়েছিলেন এবং তারা দেশদ্রোহীদের সমর্থন করেছেন।
২০১৭ সালে উত্তর প্রদেশে বিধানসভার নির্বাচন। এখন উত্তর প্রদেশে সমাজবাদী পার্টি ক্ষমতায়। বিজেপি এখন থেকেই সাম্প্রদায়িকতাকে ধীরে ধীরে একরোখা করার প্রয়াসে আখলাককে বলি দিলো। ২০১৭ সালের উত্তর প্রদেশ বিধানসভার নির্বাচনের পূর্বে বিজেপি আরও বহু নরবলি দেবে আর এরা সবাই হবে ম্লেচ্ছ্য। নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রী সাক্ষী মহারাজ সব ফন্দি-ফিকিরের ছক আঁকা এরই মাঝে আরম্ভ করেছেন। এবারের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির টিকেটে বহু সাধুসন্ত নির্বাচিত হয়ে লোকসভায় এসেছেন। সাক্ষী মহারাজও একজন নামজাদা সন্ত। নারী কেলেঙ্কারীর মামলায় তিনি বহুদিন তিহাড় জেলে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। সাক্ষী মহারাজ এর আগে রাজ্যসভার বিজেপি দলীয় সদস্য ছিলেন। তহবিল তসরুফের অভিযোগে তার রাজ্যসভার সদস্যপদ খারিজ হয়েছিলো। এমন সাক্ষী মহারাজেরা হচ্ছেন নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভার সদস্য।
এ বছর কেরালা বিধানসভারও নির্বাচন। ১৯৫৬ সালে বিচারপতি ফজল আলির রোয়েদাদ অনুসারে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি ভেঙে যে চারটি রাজ্যের জন্ম হয় কেরেলা তার অন্যতম। এ চারটি রাজ্য গঠিত হয়েছিলো ভাষার ভিত্তিতে। তামিলভাষী তামিলনাড়ু, তেলেগুভাষী অন্ধ্র প্রদেশ, কানাডা ভাষী কর্ণাটক বা মহিশুর আর মালয়ালাম ভাষী কেরেলা। কেরালা বিধানসভার সদস্য সংখ্যা ১২৬ জন। ১৯৫৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে সিপিআই ৬০ আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। পরে ৫ জন সদস্য নিয়ে নামদ্রিপাদ মূখ্যমন্ত্রী হয়ে সরকার গঠন করেন। ১৯৬২ সালের নির্বাচন থেকে কেরালা দুই জোটে বিভক্ত হয়ে নির্বাচন করে আসছে। কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে প্রগতিশীল জোট আর কংগ্রেসের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক জোট। এখন কংগ্রেস জোট ক্ষমতায়। ২০১৬ সালের নির্বাচনে কমিউনিস্ট জোট ক্ষমতায় আসবে। কারণ কখনও কোনও জোট পর-পর দু’বার ক্ষমতায় আসেনি। কেরেলায় কংগ্রেস জোটের অন্যতম অংশীদার মুসলীম লীগ। কেরালায় মুসলমানেরা মুসলিম লীগ করে। সেখানে হিন্দু-মুসলমান-খৃস্টান সামনে সমান। বিজেপির শক্তিশালী কোনও রাজ্য কমিটিও নেই কেরালায়।
তামিলনাড়ুর বিধানসভার নির্বাচনও হবে আগামী মে/জুন মাসে। এ রাজ্যে শক্তিশালী দল হচ্ছে দু’টি। ডিএমকে আর আন্না ডিএমকে। তৃতীয় দল হচ্ছে কংগ্রেস। এখানেও দুই জোট। ডিএমকে নেতা করুণানিধি আর আন্না ডিএমকে নেতা জয়ললিতা। কংগ্রেস জোট গঠন করেছে ডিএমকের সঙ্গে। বিজেপির উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি নেই এ রাজ্যে। বর্তমান এ রাজ্যে আন্না ডিএমকে ক্ষমতায়। আগামী নির্বাচনে ডিএমকে কংগ্রেস জোট ক্ষমতায় আসবে বলে মনে হয়। কারণ এ রাজ্যে পর্যায়ক্রমে ডিএমকে এবং আন্না ডিমএকের হার-জিত হয়।
পন্ডিচেরি ছোট বিধানসভা। এবছর তারও নির্বাচন। এ বছর আসাম বিধানসভারও নির্বাচন হচ্ছে। আসাম বিধানসভার সদস্য সংখ্যা ১২৬ জন। টানা ১৫ বছর কংগ্রেস ক্ষমতাসীন। তরুণ গেগী মূখ্যমন্ত্রী। তরুণেরা একবার জাতিভেদের কথা তুলে আসাম গণপরিষদ গঠন করেছিলো। স্লোগান ছিলো বিদেশি খেদাও। উগ্র জাতীয়তাবাদকে উস্কে দেওয়া যায় কিন্তু সামাল দেওয়া যে কত কঠিন আসাম গণ পরিষদ তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। আসাম গণ-পরিষদ এখন পরিত্যাক্ত। তাদের ইস্যুকে মূলধন করে বিজেপি এখন মাঠে নেমেছে। প্রফুল্ল মোহন্তও ময়দানে আছে। বিজেপি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর জোট গঠনের চেষ্টা করছে। আসামের ৭টি জেলায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। মুসলিম ভোটকে বিভ্রান্ত করার জন্য তারা করিমগঞ্জের ধনকুবের  বদরুদ্দীন আজমলের সঙ্গেও গোপনে হাত মেলাবার চেষ্টা করছে। মুসলিম নেতা এবং তরুণ গৈগীর মন্ত্রিসভার মন্ত্রী ছিদ্দিক আহাম্মদ এ বিষয়টা নিয়ে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে মিছিল মিটিং করে যাচ্ছে। মুসলিম ভোট বিভ্রান্ত না হলে কংগ্রেসের বিজয় ঠেকানো সম্ভব হবে না।
উপরে যে বিধানসভাগুলোর আসন্ন নির্বাচনের কথা বললাম তাতে দেখা যাচ্ছে যে বিজেপি উল্লেখযোগ্য কোনও বিজয় লাভ করবে না। সুতরাং রাজ্যসভায় তার আসন ভাড়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। তাই মনে হচ্ছে নরেন্দ্র মোদি সহজে সংকট উত্তরণ করতে পারবেন না। বরঞ্চ সংঘ পরিবারের কর্মকাণ্ডে সংকট আরও জটিল হবে। ২৪ ফেব্রুয়ারি লোকসভার অধিবেশন শুরু হয়েছে। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুর্খীজ সবার প্রতি আবেদন জানিয়েছেন লোকসভাকে সচল রাখার জন্য।
গত লোকসভা নির্বাচনে মোদিকে ক্ষমতায় বসিয়ে এক বছরের মাথায় তার নেতৃত্বের প্রতি মানুষ বিতৃষ্ণা হয়ে উঠেছে। ভারতের মধ্যবিত্ত সমাজ মনে করেছিলো মোদি চীনের দেং জিয়াও পিং এর মতো একজন আর্থ-সামাজিক সংস্কারক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করবেন। কিন্তু তিনি সংঘ-পরিবারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিরোধীদের সব মহানুভূতির  হারিয়ে এখন ষড়যন্ত্রের কথা বলছেন। তিনি যদি সংঘ-পরিবারের পায়ে পা রেখে চলেন তবে খুব সম্ভব বিরাট এক অচলায়তনের মাঝে অবশিষ্ট সময় ঘুরপাক খাবেন এবং ধনবাদী গোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষ উভয়ের বিরাগভাজন হয়ে অবশেষে পরিত্যক্ত হবেন।
লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক
anisalamgir@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ