behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

পাকিস্তান ক্রিকেট সমর্থক এবং বিবিসি বাংলা

হারুন উর রশীদ১৫:৩৪, মার্চ ০৬, ২০১৬

হারুন উর রশীদপাকিস্তান ক্রিকেট সমর্থক, পাকিস্তানি নাগরিক বশির আহমেদ যাকে ঢাকার ক্রিকেট মাঠে সবাই ‘বশির চাচা’ নামে জানেন তাকে নিয়ে ফেসবুকভিত্তিক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে এবার আলোচনা এবং সমালোচনার মুখে রয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা। বিবিসি বাংলা এরইমধ্যে তার অবস্থান থেকে সরে গেলেও দাবি উঠেছে খবরটি প্রত্যাহার ও ক্ষমা চাওয়ার। বিবিসি বাংলা এখনও এই দাবির প্রতি কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
বিবিসি বাংলা ৪ মার্চ তাদের অনলাইনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যার শিরোনাম ‘ঢাকার মাঠে পাকিস্তানি সমর্থককে হেনস্তার অভিযোগ’। আর এই প্রতিবেদনের তথ্য ও ছবি সূত্র হলো একটি ফেসবুক পোস্ট। পোস্টটি দেন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লাকী আক্তার।
বিবিসি তাদের রিপোর্টে বলেছে, ‘ঢাকার মিরপুরে শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে একজন পাকিস্তানি নাগরিককে জোর করে বাংলাদেশের পতাকা পরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।’
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার সামনে বাংলাদেশি পতাকা জড়ানো সেই পাকিস্তানি সমর্থক কাঁদছেন।
ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্টে জানা যাচ্ছে, সেই পাকিস্তানি নাগরিকের নাম বশির আহমেদ। পাকিস্তান দল যেখানেই খেলতে যায়, বশির আহমেদ সে মাঠে গিয়ে তার দলকে সমর্থন জানান।
অভিযোগ উঠেছে, ঢাকার মিরপুর এলাকার বাসিন্দা আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার উৎসাহে এবং তার সামনেই জোর করে পাকিস্তানি নাগরিককে বাংলাদেশের পতাকা পরিয়ে দেওয়া হয়।’
এই প্রতিবেদনে বিবিসি ‘ঘটনার শিকার’ বশির আহমেদ এবং যার বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার কোনও বক্তব্য নেয়নি। অথবা ঘটনাটি আসলে কী তা নিয়ে তারা সরেজমিন তথ্য সংগ্রহেরও কোনও চেষ্টা করেনি। চেষ্টা করেনি কোনও প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলতে।

শুধুমাত্র  লাকী আক্তারের ফেসবুক পোস্টের ছবি এবং বক্তব্য দিয়েই লিড আইটেম হিসেবে খবরটি প্রকাশ করে।

আর তার প্রতিক্রিয়া যা হওয়ার তাই হয়েছে। নিন্দার ঝড় উঠেছে। শান্তি দাবি করা হয়েছে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের। এই প্রতিক্রিয়াই স্বাভাবিক।

বিবিসি বাংলা এখানেই থামেনি। ওই প্রতিবেদনে আরও জুড়ে দিয়েছে যে, ‘এর আগে গত বছর বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচের সময় সুধীর গৌতম নামের একজন ভারতীয় নাগরিককে মিরপুর স্টেডিয়ামে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছিল।’

সব মিলিয়ে বিবিসি বাংলার এই খবর ভাইরাল হয়ে যায়। আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমও রিপোর্টটি পিক করে। বাংলাদেশের ক্রিকেট এবং ক্রিকেট দর্শকদের মুখে কালির দাগ পড়তে থাকে।

কিন্তু বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন প্রকাশের পর ৪ মার্চই পাকিস্তানি ক্রিকেট সমর্থক বশির আহমেদের সঙ্গে কথা বলে বাংলা ট্রিবিউর-এর সিনিয়র রিপোর্টার জাকিয়া আহমেদ। আর সেই সাক্ষাৎকারে (অডিও এবং ভিডিও) বশির আহমেদ তাকে হেনস্তার বিষয়টি উড়য়ে দেন। তিনি বলেন, ‘কেউ আমাকে জোর করে বাংলাদেশের পতাকা পরায়নি (নো বডি ফোর্সড), আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি, এখানকার মানুষ খুবই ভালো। এমনকি ফাইনালে বাংলাদেশের জয় নিয়েও আমি আশাবাদী।’

কিন্তু ছবি দেখে মনে হয়েছে আপনি কাঁদছেন- এমন প্রশ্ন করা হলে বশির আহমেদ বলেন, ‘নো নো, আই ফিল হ্যাপি, আই ওয়াজ নট ক্রায়িং। হতে পারে যে, মে-বি, পাকিস্তান ম্যাচে হেরে গিয়েছে একটা কষ্ট তো থাকতেই পারে, আই বর্ন ইন পাকিস্তান, পাকিস্তান লস্ট। বাট বাংলাদেশি পিপল ভেরি হ্যাপি, বাংলাদেশি পিপল ভেরি গুড, আই অ্যাম হ্যাপি। অ্যান্ড ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ উইল উইন। আই লাভ ধোনি, বাট বাংলাদেশ উইল উইন।’

এই প্রতিবেদনের পর বিবিসি বাংলার টনক নড়ে। তারা পর পর আরও দু’টি প্রতবেদন করে। যার একটি’র শিারোনাম, ‘আমি ওরে ধরিও নাই, ছুঁইও নাই: ইলিয়াস মোল্লা’। আর এর পরের প্রতিবেদনটির শিরোনাম হলো, ‘কেউ জোর করেনি, বাংলাদেশের পতাকা নিজেই নিয়েছিলাম’।

এই শিরোমটি হলো যাকে হেনস্তার কথা বলেছিল বিবিসি বাংলা, সেই পাকিস্তানি সমর্থক বশির আহমেদের বক্তব্য।

স্পষ্টতই বিবিসি বাংলা তাদের প্রথম প্রতিবেদন ‘হেনস্তার অভিযোগ’ থেকে পরের দু’টি প্রতিবেদনে সরে এসেছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো বিবিসি বাংলা শুধুমাত্র ফেসবুক পোস্টের ওপর ভিত্তি করে কীভাবে প্রথমে ‘ঢাকার মাঠে পাকিস্তানি সমর্থককে হেনস্তার অভিযোগ’ শিরোনামে লিড আইটেম প্রকাশ করলো? 

ফেসবুকের তথ্য সংবাদের উৎস হতেই পারে। এই সময়ে ফেসবুক টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সংবাদ এবং ছবির বড় উৎস। কিন্তু সেটা যাচাই করার পরই সংবাদ আকারে প্রকাশ বা প্রচার হয়। আর এই যাচাই করার কিছু কৌশল বা পদ্ধতি আছে। প্রথম দেখতে হবে যে ফেসবুক পেজে পোস্ট দেওয়া হয়েছে সেটা ‘ভ্যারিফায়েড’ পেজ কীনা। এরপর দেখতে হবে যে বিষয় নিয়ে পোস্ট বা কনটেন্ট ( টেক্সট, ছবি , অডিও, ভিডিও) তার পক্ষগুলো কারা, ওইসব কনটেন্টের কপিরাইট কার।

ফেসবুকের সব পেজ ভ্যারিফায়েড নয়। তাই পরের বিষয়গুলো নিশ্চিত হয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে কথা বলে বা যোগাযোগ করে তা প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করা যেতে পারে। আর ভ্যারিফায়েড পেজে (ফেসবুক, টুইটার বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম) যদি কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাদের সংশিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেন আর তা যদি পাবলিক পোস্ট হয় তাহলে তা খবরের উপদান হতে পারে। তাতে যদি কোনও প্রতিপক্ষ থাকে তাহলে প্রতিপক্ষের মতামতও প্রয়োজন হয়। এ বিষয়ে আর বিস্তারিত না বলে আবার বিবিসি বাংলা প্রসঙ্গে আসি।

ছাত্র ইউনিয়ন নেতা লাকী আক্তারের ফেসবুক পোস্টের ওপর ভিত্তি করে বিবিসি বাংলা ‘ঢাকার মাঠে পাকিস্তানি সমর্থককে হেনস্তার অভিযোগ’ শিরোনামে যে প্রতিবেদন ছেপেছে তা একটু বিশ্লেষণ করা দরকার। এখানে তিনটি প্রধান পক্ষ আছে-

১. হেনস্তার শিকার পাকিস্তান ক্রিকেট সমর্থক বশির আহমেদ।

২. হেনস্তার জন্য অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা।

৩. লাকি আক্তারের ফেসবুক পোস্ট।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনটির বৈশিষ্ট্য কী?

১. বিবিসি বাংলা তাদের প্রথম প্রতিবেদনে ‘হেনস্তার শিকার’ বশির আহমেদের সঙ্গে কথা বলেনি।

২. তারা অভিযুক্ত সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার সঙ্গেও কথা বলেনি। 

৩. লাকি আক্তারের ফেসবুক পোস্টে দেওয়া ছবি নিজের তোলা কীনা তাও জানার চেষ্টা করেনি।

অর্থাৎ প্রধান তিনটি পক্ষের কারও সঙ্গে যোগাযোগ বা কথা না বলেই বিবিসি বাংলা একটি অতি সংবেদনশীল প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যা সাংবাদিকতা নীতিমালার শতভাগ বিরোধী।

আর বাকি বিষয়গুলোতো বাদই দিলাম। ছবি ভ্যারিফাই করা। ছবির কন্টেন্ট সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। ছবিতে কান্না দেখলেই কান্নার কারণ মনের মাধুরি মিশিয়ে লিখে দেওয়ার সুযোগ নেই। মনের মাধুরি মিশিয়ে লেখা ভালো সাহিত্য হতে পারে, সংবাদ প্রতিবেদন হতে পারে না। কান্নার কারণ যিনি কেঁদেছেন তার কাছ থেকে জানাই হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা।

বিবিসি বাংলা যখন অন্য সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে বশির আহমেদের বক্তব্য দেখলো তখন তারা তৎপর হল। তার সঙ্গে কথা বললো। তার বক্তব্য প্রকাশ করলো, ‘কেউ জোর করেনি, বাংলাদেশের পতাকা নিজেই নিয়েছিলাম’। প্রকাশ করলো ইলিয়াস মোল্লার বক্তব্যও। এই কাজগুলো আগেই করা হলে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা হতো।  

কিন্তু একটি দায়িত্বহীন, মানহীন বা ত্রুটিপূর্ণ প্রতিবেদন পরবর্তীতে এভাবে পট্টি বা ব্যাকআপ দিয়ে কোনওভাবে মানসম্পন্ন করা যায় না। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা হলো ওই দায়িত্বহীন প্রতিবেদন প্রত্যাহার করা। আর আরও ভালো হয় ক্ষমা চেয়ে বা দুঃখ প্রকাশ করে প্রত্যাহার করা। পৃথিবীতে এর অনেক নজির আছে।

বাংলা ট্রিবিউনকে বিবিসি বাংলার ঢাকা ব্যুরো প্রধান ওয়ালিউর রহমান মিরাজ ৪ মার্চ বলেছেন, ‘ফেসবুক স্ট্যাটাস ও ছবির সূত্র ধরেই বিবিসি বাংলায় ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।’ কিন্তু ভিকটিম বশির আহমেদের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন ছিল কিনা কিংবা তার বক্তব্য না নিয়ে এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করা ঠিক হয়েছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কোনও বক্তব্য নেই।’

আমি মনে করি বিবিসি বাংলার ঢাকা ব্যুরো প্রধান-এর কোনও বক্তব্য না থাকলেও বিবিসি বাংলা বিভাগ অথবা বিবিসিকে পুরো বিষয়টি দেখতে হবে। বাংলাদেশের ক্রিকেট এবং ক্রিকেট দর্শক-সমর্থকদের ওই প্রতিবেদনের মাধ্যমে যে হেয় করা হলো, ক্ষতি করা হলো তার কী প্রতিকার করবে বিবিসি? নিশ্চয়ই এর প্রতিকার করা উচিৎ। অনৈতিক প্রতিবেদনের দায় নিয়ে তার প্রতিকার না করলে বিবিসি’র মতো একটি প্রাচীন এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের কাছ থেকে আমরা হতাশ হবো। 

পাদটীকা: বিবিসি বাংলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লাকী আক্তারের যে ফেসবুক পোস্ট ধরে প্রতিবেদনটি করেছে তা এরই মধ্যে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন তিনি। আর প্রত্যাহার নোটে বলেছেন, ‘দুঃখ প্রকাশ করছি তাদের কাছে- যারা আমার মারফত একটি সংবাদ পেয়ে তা নির্দ্বিধায় ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। মিডিয়াতে বশির চাচার বক্তব্যে উঠে এসেছে- তিনি সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ করেননি। আর আমার দাবি ছিল ঠিক উল্টো। আপাত দৃষ্টিতে আমি ভুল করেছি। এবং পোস্টটি বহাল থাকলে ভুলের পরিণাম আরও ডাল-পালা গজাতো।’

এরপর বিবিসি বাংলার ওই প্রতিবেদনের আর কোনও ধরণের ভিত্তিই থাকল না। লাকী আক্তার দুঃখ প্রকাশ  করেছেন, পোস্ট প্রত্যাহার করেছেন। এখন বিবিসি বাংলার কী করা করা উচিৎ?

লেখক: সাংবাদিক

ইমেইল: swapansg@yahoo.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ