তাহার সঙ্গে কথোপকথন

আহসান কবির২০:১৫, মার্চ ০৬, ২০১৬

Ahsan Kabirকিছু কিছু মানুষ থাকেন যাদের নামটা বললেই হয়! আর সবাই বুঝে যান মানুষটা কে, কী করেন, এমন কী কোথায় থাকেন, ব্যক্তি জীবনটা তাদের কেমন। এইসব মানুষেরা অন্যদের খুব সহজেই প্রভাবিত করতে পারেন, অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়াতে পারেন। এমন একজন মানুষ মামুনুর রশীদ।
মামুনুর রশীদের ১৭তম জন্মদিন ছিল গত ২৯ ফেব্রুয়ারি। তার সাথে কথোপকথন-
আহসান কবির: সতেরকে চার দিয়ে গুণ করলেই আসল আপনি?
মামুনুর রশীদ: আমি কোনওরকম যোগ-বিয়োগ গুণ-ভাগে নেই,ছিলামও না। যা ছিলাম সেটাই আমি, এখনকার আমিও তাই। চার বছর পরপর একবার জন্মদিন আসে,এই যা!
আ.ক: আপনি কি ২৯ ফেব্রুয়ারি ক্লাবের সদস্য? সারা পৃথিবীজুড়ে এইদিনে জন্ম নেওয়া মানুষদের ক্লাব আছে।
মা.র: এই ক্লাব সম্পর্কে আমার তেমন কোনও ধারণাই নাই। তবে যাই কিছু করি, যে সংগঠনের সঙ্গেই জড়িত থাকি না কেন, প্রায়ই মনে হয় মানুষ মূলত একা!
আ.ক: কবি আবুল হাসান আর নির্মলেন্দু গুণের বন্ধুত্বের সেই অমলিন দিনগুলোতে আপনিও ছিলেন। কবিতার লাইনটা কি তাই মনে পড়লো?
মা.র: বলতে পারো। অথবা ধর নির্মল গুণের সেই লাইন টা-এতো যে আমি ওখানে যাই/ ওখানে পাই কাছে/ ওখানে তার পায়ের কিছু চিহ্ন পরে আছে!

আ.ক: হ্যাঁ। সবচেয়ে বড় চিহ্ন সম্ভবত স্মৃতি। কিন্তু ফেব্রুয়ারি নিয়ে আপনার ভালো আগ্রহ থাকার কথা। ভুল বললাম?

মা.র: না। তাহলে একটু শোনো। নামকরণের বাতিক শুধু যে আমাদের দেশেই আছে তা নয়। হাজার বছর আগে থেকেই ছিলো।  রোম সম্রাট জুলিয়াস সিজারের শখ হলো তিনি তার নামে একটা মাসের নাম রাখবেন। সেই মাস ত্রিশ দিনের হলে চলবে না। একত্রিশ দিনের হতে হবে। যেই কথা সেই কাজ। ইংরেজি মাসের তালিকায় জুলাই মাস যুক্ত হয়ে গেল।

(আমার মন্তব্য-আগে এই মাসটির নাম ছিল কুইন্টালিস। সম্ভবত বাংলাদেশের ইদানিংকালের শাসকরা এটা জানতেন না। জানলে চন্দ্রিমা উদ্যান,পদ্মা সেতু আর ঢাকা এয়ারপোর্টের মত বাংলা মাসের নামকরণটাও তারা নিজেদের নামে করে নিতেন!)

সিজারের পরে অগাস্টাস এসে ভাবলেন তিনিও বা কম কিসে? তার নামেও একটা মাস থাকা দরকার। সেই মাসও একত্রিশ দিনে হতে হবে! সুতরাং তাই হয়ে গেল। এসে গেল আগস্ট মাস এবং সেটাতে যুক্ত হলো একত্রিশ দিন।(আগে এই মাসটির নাম ছিল সেকসটেলিস) কিন্তু গোল বাধলো অন্য জায়গায়।

আ.ক: সেই গোলের জায়গাটা কী?

মা.র: আগে পাঁচ মাসের ঘরে ৩১ দিন ছিল এবং পরে সেটা সাত মাসের ঘরে চলে গেল। এখন বাড়তি দুই দিন কিভাবে পাওয়া যাবে? সৌরমণ্ডল তো আর গ্রীক সম্রাটরা কন্ট্রোল করেন না। সুতরাং সবচেয়ে সুইট মান্থ বা মিষ্টি মাস খ্যাত (সম্ভবত একটু দুর্বলও! নাহলে এমন করে কেউ চেপে বসতো না) ফেব্রুয়ারির ওপরই হামলা হলো এবং দুই দিন কেড়ে নেওয়া হলো। তখন থেকে ফেব্রুয়ারি শুধুমাত্র আটাশ দিনের! এর আগে এই মাসটাও ত্রিশ দিনের ছিল।

আ.ক: তারপর?

মা.র: তারপর আর কী? সমস্যায় পড়লেন জোতির্বিদরা। প্রতিবছর প্রায় ছয়ঘণ্টা সময় কম পড়ছে। পৃথিবীর ঘোরাঘুরি আর অধিবর্ষের হিসাব নিয়ে পৃথিবীজুড়ে মানুষের সমস্যাটা সমাধান হলো অন্যভাবে। প্রতি বছর ছয়ঘণ্টা করে করে চার বছর পর বাড়তি যে একদিন সেটা ঢুকে গেল এই ফেব্রুয়ারিতেই! ২৯ দিনের এই ফেব্রুয়ারি সম্বলিত বছরকে পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি নাম দিয়েছিলেন লিপ-ইয়ার।

আ.ক: কখনও মনে হয়নি যে জীবন এতো ছোট কেন?

মা.র: তারাশংকরের কবি উপন্যাসের সেই অসাধারণ লাইন- হায়, মিটিল না সাধ এ জীবনে/জীবন এতো ছোট কেন? কার না এটা মনে হয়? মানুষের সবচেয়ে বড় সাধ বোধ করি এই যে সে এই পৃথিবীতে সুস্থভাবে বেশিদিন বাঁচতে চায়।

আ.ক: কোনটাকে বেশি ভালোবেসেছিলেন। মঞ্চ না টেলিভিশন?

মা.র: দুটোকে কখনও তেমন আলাদা চোখে দেখি নি। শরীরের ডান আর বাম হাতের মতো। তারপরও মঞ্চ অনেকটাই একাডেমিক,অন্তঃত নাটক শেখা, দেখা কিংবা লেখার জন্যও!

আ.ক: আবারও ২৯ ফেব্রুয়ারির কাহিনিতে ফিরি। আপনি অসম্ভব জনপ্রিয় একজন মানুষ। কিন্তু বলা হয়ে থাকে এদিন যারা জন্মায় তারা নাকি আনলাকি হয়?

মা.র: না। এসব হয়তো নিতান্তই প্রচারণা বা গুজবের মত। যেমন- পৃথিবীর অনেক দেশে ২৯ ফেব্রুয়ারি ব্যাচেলর ডে হিসেবে পরিচিত। এইদিন ছেলে ও মেয়েরা পরস্পরকে নাকি বিয়ের প্রস্তাব দেয়! তবে এরা অসহায় ব্যাচেলর। যাদের কপালে বিয়ে জোটেনি তারা নাকি এইদিন খুব চেষ্টা করে একজন সঙ্গী পাওয়ার জন্য!

আবার ইউরোপের কোনও কোনও দেশে মেয়েরা বেশি বেশি বিয়ে প্রস্তাব দেয় এইদিন। কারণ রেওয়াজ অনুযায়ী কোনও ছেলে তাদের প্রত্যাখান করলেও মুখে বলতে পারবে না। মেয়েদেরকে তখন এক ডজন হাতমোজা কিংবা দামী গাউন উপহার দিতে হবে। এই উপহার পেলেই মেয়েরা বুঝবে তাদের প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আমাদের দেশেও একদা মেয়ে দেখে (পছন্দ হোক কিংবা নাই হোক) টাকা দেওয়ার রেওয়াজ ছিল।

আ.ক: অপূর্ণতা কিছু নেই? নাকি এক জীবনের যা কিছু অর্জন তাতেই সন্তুষ্ট আপনি?

মা.র: দীর্ঘশ্বাস আছে কিছু। আজ না হয় সে সব থাক কবির!

শ্রদ্ধেয় মামুনুর রশীদের কথাই মানছি। দীর্ঘশ্বাস বা বেদনার সব কথা মানুষ বলে না। তবে ২৯ ফেব্রুয়ারি নিয়ে আর যা বলা হয় নি তা এমন-

শুরু থেকেই একদল লোক এই লিপ-ইয়ার তথা ২৯ ফেব্রুয়ারির বিপক্ষে উঠে পড়ে লেগেছিলেন। প্রথম লাফালাফি শুরু করেছিলেন জোতির্বিদরা। তারা দেখালেন যে সাল শুধু চার দিয়ে বিভাজিত সেই সব সালই লিপিয়ার না। যেমন ২০০০ বা ২৪০০ সাল চার দিয়ে বিভাজিত এবং লিপ-ইয়ার। কিন্তু ১৮০০, ১৯০০, ২১০০, ২২০০ বা ২৩০০ সাল চার দিয়ে বিভাজিত হলেও লিপ-ইয়ার না। কারণ কী? তখন জোতির্বিজ্ঞানীরাই এর সমাধাণ দিলেন এভাবে যে- শুধু চার দিয়ে বিভাজিত হলেই হবে না, ১০০ ও ৪০০ দিয়েও বিভাজিত হতে হবে। ২০১২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ছিল বুধবার, ২০১৬ তে সোমবার, ২০২০ ও ২০২৪ সালে হবে শনি আর বৃহস্পতিবার।

আর স্কটল্যান্ডে ২৯ ফেব্রুয়ারি ‘ব্যাডলাক ডে’ হিসেবে পরিচিত! এদিন যারা জন্মগ্রহণ করে তারা নাকি খুব কপালপোড়া হয়। আবার আফ্রিকার কোনও কোনও দেশ আর পুরোনো কালে চীনে এমন কথা প্রচলিত ছিল যে এদিন যারা জন্মগ্রহণ করে তারা নাকি অতীব সৌভাগ্যবান এবং ধনসম্পদের মালিক হয়। কোনটা মানুষ বিশ্বাস করবে? তবে যে গ্রীক সম্রাটরা দুটো মাস অন্তত নিজেদের নামে দখল করেছিলেন সেই বর্তমান গ্রীসে ২৯ ফেব্রুয়ারিতে খুব কম লোকই বিয়ে করে। তাদের ধারণা এই দিনের বিয়ের পরিণতি শুভ হয় না!

রাশিয়ার অনেক মানুষ আজো বিশ্বাস করেন কোনও এক ২৯ ফেব্রুয়ারি পৃথিবীটাই ধ্বংস হয়ে যাবে! আবার অনেকে এটাও বিশ্বাস করেন যে ২৯ ফেব্রুয়ারি নাকি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি লোক মৃত্যুবরণ করে।

তবে যে যেমনই বিশ্বাস করুক না কেন ক্যারিন হেনরিকসনের রেকর্ড এখনও কেউ ভাঙতে পারেনি। ভদ্রলোকের তিন সন্তানের জন্ম হয়েছিল ২৯ ফেব্রুয়ারি! ১৯৬০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি জন্মেছিল মেয়ে হেইদী, ৬৪ সালের ২৯ মেয়ে ছেলে ওলাভ এবং ৬৮ সালের ২৯ মে জন্মেছিল হেনরিকসনের আরেক ছেলে মার্টিন!

লেখক: রম্যলেখক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ