গণমাধ্যমের চরিত্র

Send
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১২:৩১, মার্চ ০৭, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৩৩, মার্চ ০৭, ২০১৬

চিররঞ্জন সরকারআগ্রহ না থাকলেও প্রতিদিন বাংলা ও ইংরেজি বেশ কয়েকটা খবরের কাগজে চোখ বুলাই। এক সময় সংবাদপত্রে চাকরি করার কারণে এই অভ্যাসটা হয়েছে। জাতীয়-বিজাতীয় মিলে দু’চারটা টিভি চ্যানেলও দেখি। কখনও কখনও সুযোগ হলে রেডিও শুনি। বিভিন্ন পত্র–পত্রিকার ঈদ, পূজা ও বিশেষ সংখ্যা, বিশেষত বাংলায়, বহু বছরের অভ্যাস, তাই পড়ি।
কিন্তু একটু-একটু করে এই সব গণমাধ্যমের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্ম নিচ্ছে। কিন্তু কেন? এত বছরের অভ্যাস, এত বছরের সঞ্চিত সব তথ্য, সাহিত্য, খবর সব কেন পানসে হয়ে গেল? এর ব্যাখ্যা হলো-আমাদের সংবাদমাধ্যম শুধু একপেশে নয়, একঘেয়ে ও বৈচিত্র্যহীন। বিকল্প নেই, তাই মানুষ এই সংবাদমাধ্যম আঁকড়ে আছে। যেদিন পশ্চিমা দেশগুলোর মতো এ দেশের মানুষও ই–নিউজে, সামাজিক মাধ্যমে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে, আজকের দেশি সংবাদমাধ্যমের বাঘ–সিংহরা পরিণত হবে নেংটি ইঁদুর বা মেনি বিড়ালে।
কেন এ কথা বলছি? পত্র-পত্রিকাগুলোর চেহারা দেখে।
ভুলে ভরা, যাচ্ছেতাই হাবিজাবি দিয়ে কাগজ ভরে দিচ্ছে। সংবাদপত্র-সাংবাদিকতা তথা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কিন্তু তারপরও এ নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য নেই। বরং উল্টো করে বলা হয় যতোসব বাজে অভিযোগ। কী নেই সংবাদপত্রে? আগে শুধু সংবাদ থাকতো। এখন সংবাদের সঙ্গে সংবাদ বিশ্লেষণ, ব্যবসা-বাণিজ্য, সিনেমা, ফ্যাশন, আইটি, রান্নাবান্না কতো কী দেওয়া হচ্ছে! এমনকি ছাত্রদের নোট পর্যন্ত।
পাঠক আর কী চায়? আগে পত্রিকা ছিল আট পৃষ্ঠার। এখন ষোল, বিশ, বাইশ, চব্বিশ পৃষ্ঠার। শুধু তাই নয়, পত্রিকার সঙ্গে বিনামূল্যে একাধিক ম্যাগাজিন, যা আগে কেউ কোনওদিন কল্পনাই করতে পারতো না। তারপরও অভিযোগ-সংবাদপত্রে কিছু নেই, কিছুই থাকে না। বিষয়টা বিবেচনার দাবি রাখে। তাই এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা ও অনুসন্ধান জরুরি। প্রথমেই অনুসন্ধান করা দরকার কেন এ অভিযোগ। এ বিষয়ে যতোদূর জানা গেছে তা হলো- আগের দিনে সংবাদপত্রে কিছু লেখা হলে সর্বত্র তোলপাড় হতো। ঘুষ, দুর্নীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, রাজনীতি যে কোনও বিষয়েই হোক না কেন। কিন্তু আজ, আজ কোনও কিছু নিয়ে লিখলে তোলপাড় হয় না বরং তা নিয়ে নানান প্রশ্ন, সন্দেহ-সংশয় দেখা দেয়। সংবাদ মাধ্যম সবচেয়ে বেশি হারিয়েছে বিশ্বাসযোগ্যতা। মানুষ এখন আর গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বিশ্বাস করতে চায় না। মিথ্যা, ভুল, খণ্ডিত, মতলবি খবর প্রকাশ করে করে সংবাদমাধ্যমই নিজেদের সর্বনাশ নিজেরা করেছে।
পত্রিকা হাতে নিলেই এখন মেজাজটা বিগড়ে যায়। কেন, এগুলো ভেতরের পৃষ্ঠায় দিলে কী হয়? পত্রিকার প্রথম পাতাতেই ঢাউস সাইজের সব বিজ্ঞাপন দেখলে কী আর একজন মননশীল পাঠকের ভালো লাগে? তারপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় সাজপোশাক, ফ্যাশন, শোবিজ, খেলা বিশেষ করে ক্রিকেটের খবর। কিছু খুন-খারাবির খবর। কিছু ভারাটে লেখকের একই ধরনের মত-মন্তব্য, নিকৃষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, ফালতু সব সম্পাদকীয় মন্তব্য, কিছু ধর্মীয় বয়ান ইত্যাদি। কিন্তু বিজ্ঞানের খবর তাতে দেখা যায় না।
কালে-ভদ্রে মৃত একআধজন বিজ্ঞানীর ঢাউস ছবি দিয়ে হয়তো টেক্সটবুক স্টাইলে একটা রস-কষহীন বর্ণনা ছাপা হয়। দৈনিক বাংলা বা ইংরেজি কাগজ পড়লে দেখা যায় সবচেয়ে গুরুত্ব পায় দেশিয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি । তারপরই থাকে খেলা, বিশেষ করে ক্রিকেট ও ফুটবল আর সিনেমা। ছবিও ছাপা হচ্ছে রাজনীতি, ক্রিকেট ও ফুটবল আর সিনেমার সেলিব্রিটি(?)–দের। এর বাইরে অন্য খবর তখনই গুরুত্ব পায় খুন, ধর্ষণ ও শাসক দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব যখন মাত্রা ছাড়া হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের হিসেব অনুযায়ী দেশে ৩৮টি পাবলিক এবং ৮৪টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ১৬ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে ১২২টি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি সাধারণ কলেজ আছে ২৫২টি, বেসরকারি সাধারণ কলেজ রয়েছে ২,৮৯৯টি, সরকারি মেডিকেল কলেজ ৩৪টি, আর রয়েছে ৫৮টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ। উচ্চশিক্ষার এই যে বিপুল আয়োজন, সেই আয়োজন কি সত্য–সত্যই অন্তঃসারশূন্য? কোথাও কোনও গবেষণা হয় না? কোথাও কোনও ভালো ছাত্র ও ছাত্রী আন্তর্জাতিক মানের কাজ করে না? সেসব খবর কোথায়?

কি ইংরেজি, কি বাংলা- কোনও দৈনিকে চাষবাসের খবর বলতে গেলে কোনও উল্লেখই থাকে না। কোনও কোনও বাংলা কাগজে কৃষির জন্য একটি সাপ্তাহিক পাতা বরাদ্দ আছে বটে, কিন্তু সে সব লেখা পড়লে মনে হয় সরকারের কৃষি দফতরের হ্যান্ড আউট পড়ছি বাংলায়। অথচ গোটা দেশে মোট জনসংখ্যার অন্তত ৭০ শতাংশ আজও কৃষিনির্ভর। এবং সবার আগে মনে রাখা দরকার আজ থেকে ৫০/৫৫ বছর আগেও আমরা আমেরিকার দয়ার দান পি এল‍ ৪৮০’র গম খেয়ে বেঁচে থেকেছি। একটা প্রচণ্ড খাদ্য–ঘাটতির দেশ আজ খাদ্যে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর।

হাতেকলমে কাজ করে যে মানুষগুলো দুর্ভিক্ষ থেকে দেশকে উদ্ধার করলেন, দুধ উৎপাদনে দেশকে এগিয়ে নিলেন, মৎসচাষে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনলেন, তাদের স্বীকৃতি সংবাদমাধ্যমের পাতায় বা পর্দায় কোথায়? ফি বছর আমের মরশুমে বা ফুলের সিজনে একজন, দু’জন চাষীর কাহিনি ঘুরেফিরে সংবাদমাধ্যমের দাক্ষিণ্য পায়। কিন্তু প্রতিনিয়ত যারা সাফল্যের ফুল ফোটাচ্ছেন, তাদের আমরা চিনি না।  

বন্যা বা খরায় ধান, আলু, সবজি মার খেলে তাবৎ সংবাদমাধ্যমে গেল গেল রব ওঠে। তখন কৃষিমন্ত্রী, কৃষি সচিব, কৃষি পরামর্শদাতা, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের বক্তব্য ফলাও করে সংবাদমাধ্যমে প্রচার পায়। ক’জন কৃষিজীবী, যাদের ফলিত জ্ঞান যে কোনও মন্ত্রী, সচিব, অধ্যাপক ও পরামর্শদাতাদের চেয়ে বেশি ছাড়া কম নয় ওই প্রচারের আলোতে আসেন?

কৃষির পরেই সবচেয়ে বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয় ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র শিল্পে, যেখানে এক একটি সংস্থায় মালিকসহ কর্মচারীর সংখ্যা নয় থেকে দশ। কই কখনও ওই ধরনের সফল সংস্থার মালিক ও কর্মচারীদের কথা সংবাদমাধ্যমে দেখি না। কেন দেখি না— এর উত্তর নেই।

সংবাদমাধ্যম তো দেশ ঘুরে প্রকৃত সংবাদ তুলে ধরবে। তার বদলে আমরা নিত্য দিন কী দেখছি এ দেশে— আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পর্টি, জঙ্গি এবং আজকাল প্রায়ই হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট কী বলছে, তার বিস্তারিত বিবরণ কাগজের পাতায়, টিভির পর্দায় ও বেতার তরঙ্গে। এ সবই বস্তাপচা ও একঘেয়ে। সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে আমাদের সংবাদমাধ্যম যদি এ সত্য আজও না বুঝে থাকে তা হলে আমেরিকায় পত্রপত্রিকাগুলোর যে হাল হয়েছে, এখানকার পত্র–পত্রিকা ও টিভির সেই হালই হবে। নিউজ উইকের মতো সাপ্তাহিক উঠে যায়, টিকে থাকে তার অনলাইন সংস্করণ। যে ওয়াশিংটন পোস্ট সর্ব শক্তিমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের চাকরি খেয়েছিল, তার নিজের অস্তিত্বই আজ বিপন্ন। আর ওদেশের  পত্র–পত্রিকা কবে বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়েছে বস্তাপচা সংবাদ ফেরিওয়ালা টিভি চ্যানেলগুলো। তবে এখানে হতে হতে আরও ১৫ থেকে ২০ বছর হয়ত লাগবে, যদি পরিবর্তন না আসে। তবে হবেই। কারণ পাঠক, দর্শকরাই মুখ ফিরিয়ে নেবে।

বিগত দুই দশকে এক শ্রেণির সাংবাদিকদের জীবনমানের উন্নয়ন হলেও গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার উন্নয়ন হয়নি বরং অবনতি হয়েছে। এ অবনতির কারণ গণমাধ্যমকে ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রভাব-প্রতিপত্তির হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা। এ সময় অধিকাংশ পত্রিকায় পেশাদার সম্পাদকের পরিবর্তে আমরা দেখেছি মালিক সম্পাদক। নয়তো আজ্ঞাবাহী মাফিয়া সম্পাদক। এ মালিক ও আজ্ঞাবাহী মাফিয়া সম্পাদকরা প্রথমেই সচিবালয়ে অবাধ যাতায়াতের অধিকার নিশ্চিত করেছেন। সেই সঙ্গে নিশ্চিত করেছেন গণভবন, বঙ্গভবন, অ্যাম্বাসিসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুবিধা। তারপর অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা তো আছেই। এর মধ্যদিয়ে আজ্ঞাবাহী মাফিয়া ও মালিক সম্পাদকরা গণমাধ্যম নয়, তাদের অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়েছেন। গণমাধ্যম মালিকরা যদি তাদের অন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটায় তাতে আপত্তির কিছু নেই। বরং এ ক্ষেত্রে খুশি হওয়ার কথা। কারণ ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার মানেই কর্মসংস্থান। কিন্তু না, বিষয়টা এখানে সীমাবদ্ধ নয়। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব যেমন আছে তেমনি সাংবাদিকতায় এর প্রভাব পড়েছে তাৎক্ষণিক, যার পরিণতি হিসেবে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মালিকরা সরাসরি সংবাদপত্রের সঙ্গে জড়িত বলে সংবাদপত্রগুলোতে সাংবাদিকতার পরিবর্তে মালিকদের ব্যবসা-বাণিজ্য রক্ষা ও প্রসারের বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার লাভ করছে।

শুধু তাই নয়, নিরপেক্ষতা আর বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে সাংবাদিকতার নামে এখন মিথ্যাচার আর নির্লজ্জ দালালি চাটুকারিতার প্রতিযোগিতা চলছে। এ প্রতিযোগিতায় জয়ের জন্য কতিপয় সাংবাদিক নামধারী গণমাধ্যমে কর্মরত সম্পাদক থেকে শুরু করে সহসম্পাদক, রিপোর্টার কম-বেশি সবাই যাচ্ছেতাই লিখে যাচ্ছেন। এতে পাঠক শুধু বিভ্রান্তই হচ্ছে না, নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্তও হচ্ছে। কারণ চাটুকারিতা করার জন্য প্রায়ই তথ্য বিকৃতি ও বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন করতে হয়। এরপর আছে প্রকৃত তথ্য গোপন। ফলে পাঠক সংবাদপত্রের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। এ জন্য শুধু মালিক, সম্পাদক বা তাদের খাস নিয়োগকৃত লোকই নয়, এ জন্য অনেক পেশাদার সাংবাদিকও দায়ী। কারণ বিগত দু’দশকে সাংবাদিকদের মন-মানসিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। অতীতে সাংবাদিক মানে একজন আদর্শ নীতিনিষ্ঠ সাহসী ব্যক্তিত্বকে বোঝাতো। কিন্তু এখন বিষয়টা সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। এখন সাংবাদিকতায় আদর্শের কোনও বালাই নেই। সাংবাদিকরা অনেকেই এখন রাতারাতি ধনী হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে ফ্ল্যাট, গাড়ি, বাড়ি করেছে। এ প্রতিযোগিতায় ইতিমধ্যে কেউ কেউ কোটিপতি পর্যন্ত হয়েছে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে।

গণমাধ্যমের এই অধঃপতন ঠেকানোর উপায় কী? এ ব্যাপারে উদ্যোগই বা কে নেবে?

লেখক: কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ