behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

মধ্যবিত্ত আবার সচেতন হোক

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা১৩:০১, মার্চ ০৯, ২০১৬






সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাগত বছর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ (বিসিজি) এক গবেষণায় জানিয়েছিল- বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সামর্থ্য বাড়ছে। প্রতিবছর ২০ লাখ মানুষ মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে। স্বচ্ছল বা উচ্চবিত্তের সংখ্যাও বাড়ছে সমানতালে। ফাস্ট মুভিং কনজিউমার গুডস (এফএমসিজি) বা ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাংলাদেশ বিশাল সম্ভাবনাময় বাজার।

সারমর্ম এই যে, ভোগ বিলাসী এক নাগরিক সমাজ এখন শক্তিশালী বাংলাদেশে। বলা যেতে পারে এক সময়ের রাজনৈতিক সচেতন মধ্যবিত্ত এখন এক ‘অ্যাসপিরেশনাল গ্রুপ’। এই মধ্যবিত্ত এখন সমাজের গভীরে তাকায় না। সকলেই চায় স্থায়ী আর্থ-সামাজিক উন্নতি। হাতে স্মার্ট ফোন চায়, শহরে ফ্ল্যাট চায়, নিজের গাড়ি চায়। বছরে পরিবার নিয়ে ইউরোপ কিংবা নিদেনপক্ষে ব্যাংকক-পাতায়া, সিঙ্গাপুর, মারয়েশিয়া, বালি ট্রিপ চায়।

নাগরিক উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্তদের মনের মতো নায়ক হতে চায় আমাদের রাজনীতিকরা। তারা এখন অনেক বেশি সুবক্তা রক শো স্টাইলের টেলিভিশন টক-শোতে। কেউ কেউতো রীতিমতো মানুষকে আপ্লুত করেন বিশেষ বিশেষ দিবসে গান টান গেয়ে।

প্রবৃদ্ধির মাপকাঠিতে অগ্রগতি আছে। কিন্তু এই দেশের নগর বন্দর দেখলে কেবলই চোখে পড়ে অস্থিরতা। খানা-খন্দকে ভরা, যানজটে স্থবির আমাদের রাজধানী যদি হয় এক শহুরে ভোটারের সমাজ, তাহলে বাকী পুরো দেশটির সিংহভাগ গ্রামীণ, পিছিয়ে পড়া। কিন্তু এই সিংহভাগের কোনও অবদান নেই কাজ করে যাওয়া ছাড়া। বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত শুধুমাত্র মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত, নাগরিক সমাজের হাতে। শহুরে ড্রইংরুমে, ক্লাবে, পার্টিতে ঠিক করে নেওয়া হয় কোথায় পাওয়ার প্লান্ট হবে, কোথায় উড়াল সেতু হবে, কারা কাজ পাবে। সিংহভাগের কাজ শুধু দূর থেকে সেটা দেখে যাওয়া, আর হাততালি দেওয়া।

নাগরিক সমাজের যেসব মুখ নীতি নৈতকতা, দেশপ্রেম আর জীবন ধারণের বাণী শুনিয়ে যান, তারা নিজেদের জীবনে সেসব পালন করেন না। দু’একটি প্রতিবাদী মুখকে শিক্ষিত নাগরিক সমাজ তুমুল নিন্দা করে যে কারণে সেটি হলো সরকারের কাজের দোষ ধরে তারা। বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থলে পরিবেশের কি দশা হবে এটা জানতে চাইলে নাসিকা কুঞ্চিত করে নাগরিক উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এরা সুবিধা খোঁজে, তাই প্রতিবাদী রাজনীতির বিরোধী তারা।

স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হয়। এই জনপ্রতিনিধিরা তৃণমূলে থাকা মানুষের সবচেয়ে কাছের নেতৃত্ব। কিন্তু সেই মুখগুলোও নির্ধারণ করে দেন শহুরে নাগরিক সমাজের রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা। মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত এককভাবে কোনও ভোটে জেতাতে পারে না, কিন্তু তারা ঠিক করে দিতে পারে ভোটের রাজনীতিটা কেমন হবে। তাদের দেখানো পথেই হেঁটে যায় প্রিয় স্বদেশ, বাংলাদেশ।

কিন্তু সমাজকে বদলাতে হয় যদি এগোতে হয়। তাই গ্রামকে উপহার দিয়ে, খুশি করে, গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করে এবং বিশেষ করে গ্রামের মানুষের কাছে কর্মসংস্থান আর অর্থ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করলে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যায় তা বুঝতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়া আর টিভি চ্যানেল খবরের কাগজের দ্বারা আবৃত শহরের আপার মিডল ক্লাসকে ক্যাপটিভ ভোটব্যাংক না ভেবে এগোতে হয় প্রান্তকে আঁকড়ে ধরেই।

তাই এমাসের তৃতীয় সপ্তাহে ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্যায়ের যে যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে, তাতে গ্রামীণ সমাজে এর প্রভাব এবং প্রতিক্রিয়ার ব্যাপকতা নিয়ে সুস্পষ্ট আলোচনা প্রয়োজন আরও বেশি করে। জনতার কাছে নির্বাচন উৎসবের, আর সেটি যদি হয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন তাহলে তো কথাই নেই। কেননা স্থানীয় সরকারকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী নিজেদের সরকার বিবেচনা করে।

আমাদের শহরকেন্দ্রিক রাজনীতিকরা কখনও কি ভেবে দেখেছেন কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেলে শ্রমিকরা যান কোথায়? তাদের হাজার হাজার ছেলেমেয়ে কোথায় লেখাপড়া করেন? যদি না করেন তবে তারা কোথায় হারিয়ে যান? আর্থ-সামাজিক অন্বেষণ নেই রাজনীতিতে, কারণ পুরোটাইতো কেবল নিজে পাওয়ার, কারা পেলোনা সেই ভাবনার নয়।

সমাজে হিংসা কমানোর দিকে নজরতো একেবারেই নেই। কোনও অন্যায়ের প্রতিকার হয়না। বরং অন্যায় কর্মে যুক্ত হয় আমলা, পুলিশ, আর এদের সাথে জড়িয়ে থাকে রাজনৈতিক শক্তি। “শাসন মেনে নাও, চেষ্টা করব যাতে তুমিও কিছু পাও”, এমন এক দর্শনে পরাভূত এক সময়ের সচেতন মধ্যবিত্ত। রাজনৈতিক সমাজ নির্মিত হয়েছে, গণতন্ত্র প্রসারিত হয়েছে কীনা কে বলবে? সর্বব্যাপী হিংসা যেন বিস্তৃত হয়েছে।

তিরিশের দশকে মৌলানা ভাসানী বা ফজলুল হকের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ছিল সংগঠিত দলের পরিবর্তে ভ্রাম্যমাণ নেতৃত্ব নিয়ে জনরাজনীতিকে পরিচালনা করা, ফ্রন্ট গড়া, আগুন নেভানোর কায়দায় যেখানেই অসন্তোষ বা সমস্যা, সেখানে ছুটে যাওয়া। এখন আর ওসব নে্ই। সময় কোথায়? কারণ, রাজনীতিতো এখন করপোরেট নিয়মে লাভক্ষতির অংক কষে চলে। এই ধরনের রাজনীতি বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘমেয়াদে জনগণের মনে বিরাজ করেনা।

অন্যায়ের প্রতিকার এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার দাবিতে যেমন কথাবার্তা চলে, সেই রকম এই অন্যায়ের প্রতিকার অন্বেষণ এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার নিরন্তর প্রয়াস কথোপকথনের প্রক্রিয়াকে দ্বন্দ্বদীর্ণ করে তোলে। আমাদের শাসকদের কাছে চমকপ্রদ কিছু জনসাধারণ আশাও করে না। করে শুধু এটুকু যে, বেঁচে থাকতে দেওয়া হোক।

একটা সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রয়োজন বড় বেশি। সমাজের নিচু স্তর থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব উঠে আসছেনা সেভাবে। তবে মেয়েদের উৎসাহ জেগেছে ব্যাপকভাবে। বর্তমানের রোম্যান্স এবং অনিশ্চয়তাকে নতুন করে স্বাগত জানানোর সময় এসেছে মদ্যবিত্তের। প্রয়োজন, সমাজের গতিশীলতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেদের গতিশীল করা, সুবিধার সাগরে ভাসা নয়।

লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ