behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

জামায়াতও বিলুপ্ত হবে

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী১১:৫৭, মার্চ ১০, ২০১৬

Bakhtiar Uddin Chowdhuryমীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ সুপ্রিম কোর্ট বহাল রেখেছেন। কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এর মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর হয়েছে। এরা তিনজনই ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় নেতা। মীর কাসেম আলী এবং মতিউর রহমান নিজামীও জামায়াতের শীর্ষ নেতা। তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে হয়তোবা আরও কয়দিন সময় লাগবে। মুফতি ইউসুফের মৃত্যু হয়েছে জেলখানায় বিচার চলাকালীন সময়ে আর গোলাম আজমের মৃত্যু হয়েছে সাজা চলাকালীন অবস্থায়। জেলখানায় মাওলানা দেলওয়ার হোসেন সাঈদীর সাজা চলছে। তিনি আমৃত্যু জেলখানায়  থাকবেন। তার সাজার আদেশই হচ্ছে আমৃত্যু জেল। বিএনপির আব্দুল আলিমের মৃত্যু হয়েছে আমৃত্যু জেলখানায় থাকার বিচার বিভাগীয় আদেশ চলাকালীন সময়। বিএনপির সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির আদেশ কার্যকর হয়েছে।
জামায়াতের মূখ্য নেতাদের মধ্যে মাওলানা আজহার এবং মাওলানা আব্দুছ সোবহানের বিচার ট্রায়াল কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। এ দু’জনের বিচার সম্পন্ন হলে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের বিচার শেষ হবে। মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত জামায়াতের তিনজন নেতা পলাতক থাকায় তাদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এখন ট্রাইব্যুনালে যাদের বিচার চলছে তারা প্রায় সবাই রাজাকার কমান্ডার ছিলো এবং স্থানে স্থানে তারা মানুষ হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলো। মীর কাসেম আলী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর ব্যবসায়িক সাম্রারাজ্যের অধিপতি। ইবনে সিনা, ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ, কেয়ারি, ইসলামী ব্যাংক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলো ছিলো জামায়াতেরই প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে সিংহভাগ জামায়াত কর্মীরাই চাকরি করেন আর এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থ দিয়ে দল পরিচালিত হতো।
মীর কাসেম আলী সম্ভবতো দক্ষ পরিচালক ছিলেন এবং সব প্রতিষ্ঠানই নাকি লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিলো। মীর কাসেম আলী নিজেও ব্যাক্তিগতভাবে অর্থবিত্তের মালিক ছিলেন। তারা বিশ্বব্যাপী তাদের মুক্তির পক্ষে কাজ করার জন্য ব্রিটেনে ও আমেরিকায় লবিস্ট ফার্মও নিয়োগ করেছিলেন। এই লবিস্ট ফার্মগুলো বিচার ব্যবস্থাকে বিতর্কিত করার জন্য বহু চেষ্টা করেছে। অথচ যুদ্ধ অপরাধীর বিচারে অতীতে যে সমস্ত ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিলো সেখানে অতি সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে বিচার সমাপ্ত হয়েছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধিদের বিচার হয়েছিলো মাত্র ১৮ দিনের মধ্যে। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল, টোকিও ট্রাইব্যুনাল ও ম্যানিলা ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের কোনও ব্যবস্থা ছিলো না। ঢাকা ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে আপিলের ব্যবস্থা রয়েছে।
জামায়াতের হাতে এত অর্থবিত্ত রয়েছে যে তারা সারা বিশ্বব্যাপী বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে লবিস্টের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে এতো প্রচারণা চালিয়ে ছিলো যে, জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেলকে পর্যন্ত বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। মুজাহিদ ও সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির আদেশ স্থগিত করতে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল বান কি মুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করতে দ্বিধা করেননি। কাতারের আল-জাজিরা প্রচার করে থাকে ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের বিচার হচ্ছে এবং মৃত্যুদণ্ড হচ্ছে। জামায়াতীদের দুর্ভাগ্য যে তারা সৌদি রাজ পরিবারকে বিভ্রান্ত করতে পারেনি। পাকিস্তানের কাদিয়ানি হত্যা মামলায় মওলানা মওদুদীর ফাঁসির আদেশ হয়েছিল। কিন্তু সৌদি বাজার হস্তক্ষেপে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মওদুদীর সব সাজা মওকুফ করে দিয়েছিলেন। রাজ পরিবার হস্তক্ষেপ করলে জামাতীরা কোনও না কোনও সুবিধা হয়তো এখানেও পেতেন। ভারতের আবু আলা মওদুদী এবং মিসরের হাসান আল বান্না ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর মতানুসারী। ১৯২৩ সালে মিসরে হাসান আল বান্না ইকওয়ানুল মুসলিমিন গঠন করেছিলেন আর মওলানা মওদুদী ১৯৪১ সালে ভারতে গঠন করেছিলেন জামায়াতে ইসলামী। মওলানা মওদুদী পূর্ব পাঞ্জাবের পাঠান কোটের লোক। কিন্তু থাকতেন হায়দ্রাবাদে। হায়দ্রাবাদে তরজুমানুল কোরআন নামক পত্রিকা প্রকাশ করে তিনি তার মতবাদ প্রচার করার কাজ শুরু করেছিলেন।

বান্না এবং মওদুদী খুবই শক্তিশালী লেখক ছিলেন। কিন্তু তাদের মতবাদের সঙ্গে ইসলাম জগতের বহু বিখ্যাত পন্ডিতব্যক্তিরা দ্বিমত পোষণ করে থাকেন। ভারতের মওলানা মওদুদীর পূর্বেও ওহাবিরা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন। বালাকোটের যুদ্ধে অসংখ্য অনুসারীসহ সৈয়দ আহাম্মদ বেরলভী পরাজিত ও শাহাদাত বরণ করেছিলেন। তিনিও ওহাবি মতানুসারী ছিলেন। মওলানা মওদুদী পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি ভারত ছেড়ে পাকিস্তান এসে লাহোরে বসতি করেছিলেন।

পূর্ব-পাকিস্তানে জামাতে ইসলামী গঠন করেছিলেন মওলানা আব্দুর রহিম এবং  গোলাম আজম। তাদের ছাত্র সংগঠনের নাম ছিলো-পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘ। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল কিন্তু পূর্ব-পাকিস্তানে একটা আসনও পায়নি। সম্ভবতো পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে শুধু অধ্যাপক আব্দুল গফুর নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ এর মধ্যরাত থেকে যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম আরম্ভ হয় তখন পাকিস্তান রক্ষার এক নির্মম ভূমিকা পালন করেছিলেন জামায়াতে ইসলামী ও তার ছাত্র সংগঠন পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘ। গোলাম আজমের মূখ্য ভূমিকা গ্রহণের কারণে শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী আল বদর বাহিনী, আল শামস্ বাহিনী গঠিত হয়েছিলো। তারা পাকিস্তান বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে সমগ্র বাংলাদেশে নির্মম হত্যাকাণ্ডগুলো পরিচালনা করেছিল। গোলাম আজম এর মূখ্য, সহকর্মী ছিলেন মওলানা আব্দুস সোবহান, মওলানা আব্বাস আলী খান, মুফতি ইউসুফ, মওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, চট্টগ্রামের মীর কাসেম আলী, ময়মনসিংহের কামারুজ্জামান আর রংপুরে এ.টি.এম. আজাহার।

মুসলীম লীগ, পিডিপি, নেজামে ইসলাম ও জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ও ভাসানী ন্যাপের মশিউর রহমানের অংশ পাকিস্তানের সমর্থক হিসেবে থাকলেও তারা জামায়াতের মতো গণহত্যা অংশগ্রহণ করেনি। শুধু বগুড়ায় মুসলিম লীগ নেতা আব্দুল আলিম এবং চট্টগ্রামে ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী গণহত্যায় জড়িত ছিলো।

পাকিস্তানের সময়ে যুদ্ধাপরাধে জড়িত ছিলো যে সব সংগঠন সবগুলোর মৃত্যু হয়েছে শুধু জামায়াতে ইসলামীই এখনও টিকে আছে। সম্ভবতো ধীরে ধীরে এ সংগঠনটিরও অবসান হবে। বাংলাদেশ প্রজন্মের নেতারা নাকি নতুন নামে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করছে। হঠকারী রাজনীতির পথ পরিহার করে নতুন প্রজন্মের নেতারা চেষ্টা করলে হয়তবা পুণরায় নতুন নামে সুসংগঠিত হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হবে। অবশ্য বিপুলভাবে জনসমর্থন কখনও তারা পারে বলে মনে হয় না। কারণ বাংলাদেশের মানুষ ধর্মকর্ম করলেও তারা সেক্যুলার। পাকিস্তানের জেনারেল রাও ফরমান আলী তার পাঁচ বছরের অবস্থানের অভিজ্ঞতার কথা লিখতে গিয়ে বলেছেন তার দৃষ্টিতে নুরুল আমিন সাহেব পর্যন্ত নাকি সেক্যুলার ছিলেন। ভারতে জামায়াত এখন এনজিও হিসেবে কাজ করে আর পাকিস্তানের তারা তালেবানে পাকিস্তানের পদচারণায় কোণ্ঠাসা হয়ে পড়েছে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ