Vision  ad on bangla Tribune

ক্রিকেট বিশ্বের রাজনীতি: বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতা!

তানভীর আহমেদ১২:২১, মার্চ ১০, ২০১৬

তানভীর আহমেদটি-টোয়েন্টি ফাইনালের দিনটি টাইগারদের ছিলো না, মাশরাফি বাহিনীর সঙ্গে গোটা জাতির স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত ফাইনালের বৃত্তান্ত লিখলে ক্রীড়া সাংবাদিকরা বৃষ্টির সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে ধোনি, ধাওয়ান আর কোহলির সাফল্যের কথাই বলবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের খেলায় বাংলাদেশও যে সেরাদের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে সেটা হয়তো উপেক্ষা করতে পারবে না ক্রিকেট বিশ্ব।
বাংলাদেশ এশিয়া কাপে তাদের টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে জাত চিনিয়েছে। কিন্তু পাঠক, আজকে বাংলাদেশ ক্রিকেট কতটুকু এগিয়েছে সেকথা লিখবো না, ক্রিকেটের যে বিভাগে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে সেই দিকটা নিয়ে বিশ্লেষণের চেষ্টা করবো। টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপের ২ মার্চ দিনটি ছিলো বাংলাদেশের। পাকিস্তানকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দেওয়ার পর কেমন ছিলো ইএসপিএন-এর কভারেজ তার উদাহরণ দিয়ে মূল আলোচনায় যাবো। ইএসপিএন-এর ক্রিক ইনফো‘র সিনিয়র এডিটর ভারতীয় বংশোদ্ভূত সাংবাদিক গৌরভ কালরা তার ফেসবুক ভেরিফাইড পেইজে বাংলাদেশ দলের জয়ের খবরের বদলে পাকিস্তানের বোলার মোহাম্মদ আমিরকে নিয়ে বন্দনায় মেতেছিলেন, আর টুইটারে লিখেছেন- ‘ওহ পাকিস্তান!’ অথচ দিনটি ছিলো বাংলাদেশের। শুধু তাই নয় ক্রিক-ইনফো’র ওই দিনের এশিয়া কাপের পেইজে দুটি ভিডিও আপলোড করা হয়েছিলো, প্রথম ভিডিওটি খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানি ক্রিকেট কোচ ওয়াকার ইউনূসের ১ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডের একটি সাক্ষাৎকার। ভিডিওটিতে সংবাদ সম্মেলনে ওয়াকার তার দল কেন পরাজিত হলো তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
দ্বিতীয় ভিডিওটি পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার বাজিত খানের। সাড়ে ৫ মিনিটের ওই স্কাইপ সাক্ষাৎকারটির আলোচ্য বিষয় ছিলো পাকিস্তানের বিদায়ের কারণ বিশ্লেষণ। প্রয়োজনের সময় হাফিজ পাকিস্তান দলকে কিছুই দিতে পারে না; সামি কেন ২ টি নো বল দিলো; এই হারের পর আগামী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তান দলে সম্ভাব্য  কী কী পরিবর্তন আসবে তার আলোচনা। কিন্তু নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যদি আমরা ইএসপিএন-এর ২ মার্চের দুটি ভিডিও রিপোর্টকে বিশ্লেষণ করি তাহলে ক্রিকেটের রাজনীতিটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
espn-cricinfoপ্রথম ভিডিওতে পাকিস্তানের কোচ ওয়াকার ইউনূসের বক্তব্য থাকলেও বাংলাদেশের কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের কোনও বক্তব্য ছিলো না। ওয়াকার ইউনূসের দল হেরে গিয়ে ১ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডের কভারেজ পেলে বিজয়ী দলের কোচ হাথুরুসিংহ কেন ২ মিনিটের সাক্ষাৎকার প্রচার হবে না? কিন্তু সেই ভিডিওতে বাংলাদেশের কোনও বক্তব্য নেই! পাকিস্তান-বাংলাদেশের খেলায় তো বাংলাদেশ জয়ী হয়েছিলো। দ্বিতীয় ভিডিওতে দর্শক ও পাঠকদের বিজয়ী দলের সাফল্যের গল্প থেকে বঞ্চিত করে পাকিস্তান কেন পরাজিত হয়েছে সেই কারণ তল্লাসীর জন্য ইএসপিএন হাজির করলো পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার বাজিত খানকে। সাড়ে ৫ মিনিটের ওই সাক্ষাৎকারের কোথাও বলা হলো না বাংলাদেশ ভালো খেলে জয়লাভ করেছে! তাহলে এখানে আমরা দেখলাম ইএসপিএন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে তার প্রাপ্য কভারেজ দিলো না! তবে ইএসপিএন বাংলাদেশকে নিয়ে কখনওই ভালো স্টোরি ছাপেনি এমন নয়, তবে পাকিস্তান-বাংলাদেশ ম্যাচের দিন ইএসপিএন‘র দৈন্যতা ছিলো স্পষ্ট।
এখন কথা হচ্ছে আর্ন্তজাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশ যে তার যোগ্য ট্রিটমেন্ট পাচ্ছে না সেটা নিয়ে কি আমাদের কারও মাথা ব্যথা আছে? অথবা যোগ্য ট্রিটমেন্ট পাওয়ার জন্য যে বিশ্বমানের পিআর নিয়োগ করা প্রয়োজন সেই বিষয়টা কি বিসিবি অনুধাবন করতে পেরেছে? অথবা ক্রিক-ইনফো কেন তার ভিডিওতে ওয়াকার ইউনূসের বক্তব্যের সঙ্গে হাথুরুসিংহের সাক্ষাৎকার প্রচার করলো না তার ব্যাখ্যা কি বিসিবি ইএসপিএন‘র কাছে চেয়েছে? চায়নি, কারণ বিসিবিতে বিশ্বগণমাধ্যমে এধরণের ট্রিটমেন্ট গেলে তার প্রতিবাদ করার মতো লোকবল নেই। শুধু ইএসপিএনই নয়, বিশ্বের অন্যান্য শক্তিশালী গণমাধ্যমে সংবাদের ক্ষেত্রে ভালো ট্রিটমেন্ট নিশ্চিত করার জন্য একটা প্রশিক্ষিত ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন তরুণ টিম বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নেই। এর সমাধান তাহলে কী? এর সহজ উত্তর হলো বাংলাদেশ যেমন করে কোচ হায়ার করে, বোলার হায়ার করে, ফিজিও হায়ার করে, ঠিক তেমনি বিশ্বের সেরা পিআর, অনলাইন মনিটরিং টিম ও লিগ্যাল ফার্মকেও বাংলাদেশকে হায়ার করতে হবে। এধরনের প্রফেশনাল টিম থাকলে বিবিসি‘র মতো গণমাধ্যম যখন পাকিস্তানি ফ্যান বশির চাচাকে নিয়ে ভুল সংবাদ ছাপবে কিংবা টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতো সংবাদপত্র যখন অনলাইন থেকে ধোনীর মুণ্ডু হাতে তাসকিনের ছবি প্রকাশ করে বিশ্বের ক্রিটেকপ্রেমীদের ভুল বার্তা দেবে এর দায় কেন বাংলাদেশের ক্রিকেট দল নেবে? এধরনের পরিস্থিতিতে বিসিবি‘র অনলাইন মনিটরিং প্রফেশনাল লিগ্যাল টিম সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমে প্রতিবাদলিপি পাঠিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারবে। শুধু বিদেশি সংবাদ পত্রকেই নোটিস নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কারা কি উদ্দেশ্য নিয়ে তাসকিনের হাতে ধোনীর মুণ্ডু দিয়ে বাংলাদেশকে বিব্রত করতে চেয়েছে তার কারণ তল্লাসি করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারবে সেই লিগ্যালটিম। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সাংবাদিক, লেখক, ব্লগার ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক রয়েছেন তাদের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের সঙ্গে বিদেশি দূতাবাসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্থায়ী যোগাযোগ গড়ে তোলা দরকার।

শুধু ভালো পিআর হলেই চলবে না, আামাদের প্রয়োজন ডজন খানেক আতাহার আলী ও গাজী আশরাফ লিপু। আমাদের যত বেশি ধারাভাষ্যকার থাকবেন, বাংলাদেশকে নিয়ে আলোচনায় রমিজ রাজা, সিধুরা ততবেশি সতর্ক থাকবেন। বিশ্বমানের ধারাভাষ্যকার তৈরিতে বাড়তি নজর দিতে হবে। বিকেএসপি‘তে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই এই পেশাটির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। ঘরোয়া ক্রিকেটে, অনুর্ধ ১৯ দলের খেলায় কিংবা ক্লাব পর্যায়ের খেলায় ধারাভাষ্যকার পদ সৃষ্টি করে অনুশীলন করতে হবে।
গেল বিশ্বকাপে ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচের খলনায়ক ছিলেন আম্পায়ার আলিম দার, লেগ আম্পায়ার ইয়ান গোল্ড ও থার্ড আম্পায়ার। তিনজনের যৌথ প্রয়াসে বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তিনটি ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল দিতে হয়েছে বাংলাদেশ দলকে। আর নিরব ভূমিকায় ছিলো আইসিসি। এখানে আমরা দেখেছি সেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারক ছিলেন আম্পায়ররাই এবং খোদ আইসিসির কর্তাব্যক্তিরা। আমাদের প্রয়োজন এনামুল হক মনির মতো আরও আন্তর্জাতিক মানের আম্পায়ার।

আইসিসি‘র দুবাই হেড কোয়ার্টার, লন্ডন অফিস কিংবা বিভিন্ন দেশে যেসকল ভার্চুয়াল অফিস রয়েছে সেখানে কত শতাংশ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কর্মকতা ও কর্মচারি রয়েছে  আর বিশ্বের অন্যান্য ক্রিকেট প্লেয়িং দেশগুলোর কত শতাংশ প্রতিনিধিত্ব রয়েছে তার অনুসন্ধান করতে হবে দেশের ক্রীড়া সাংবাদিকদের। সেই পদগুলোতে কখন নিয়োগ দেওয়া হয় কিংবা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি সম্পর্কে আইসিসি‘র সদস্য দেশ বাংলাদেশ কতটুকু খবর রাখে? আইসিসি‘র গেটকিপার থেকে শুরু করে ম্যাচ রেফারির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রচারের বাধ্যবাধকতার বিষয়ে বিসিবি কথা বলতে পারে আইসিসি’র সঙ্গে। বাংলাদেশ যদি বিশ্ব ক্রিকেটে ১০টি দেশের একটি হয় তাহলে বিশ্ব ক্রিকেটের সকল অফিসিয়াল পদে বাংলাদেশি বংশদ্ভূত ১০ শতাংশ কর্মকতা ও কর্মচারির অংশগ্রহণ নেই কেন সেই কারণ খুঁজতে হবে আমাদের। যদি বাংলাদেশ থেকে  এসকল পদে চাকরির আবেদনে বাধা থাকে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রবাসী বাংলাদেশিরা যাতে সেখানে আবেদন করতে পারেন সে ব্যাপারে হাই কমিশনগুলোতে নির্দেশনা দিতে হবে।

gaurav

বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক মানের পিআর কনসালটেন্ট নিয়োগ, ধারাভাষ্যকার, আম্পায়ার তৈরির পাশাপাশি আইসিসি’র প্রশাসনিক পদগুলোতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ব্যাপারে পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয় তাহলে নিকট ভবিষ্যতে ক্রিকেট মোড়লরা বাংলাদেশকে নিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ পাবে না। ক্রিকেট বিশ্বে মোড়লদের শুধু খেলায় হারালে চলবে না, সমান তালে ক্রিকেটের রাজনীতি’র কৌশলটাও বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কর্তাব্যক্তিদের রপ্ত করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক (একাত্তর টিভির লন্ডন প্রতিনিধি ও বাংলা ট্রিবিউনের বিশেষ প্রতিনিধি)

tvjournalistuk@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

samsung ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ