behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

কে দোষী?

তসলিমা নাসরিন১১:৩৬, মার্চ ১৩, ২০১৬

‘পুরুষবিদ্বেষী’ শব্দটি ভয়ঙ্কর। ভালো কলঙ্ক লেপন হয়। হই-রই করে তেড়ে আসে লোকে। ঘেন্না দেয়। নারীকে যারা পুরুষের অধীন রাখতে চায়, তারা সুযোগ পেলে আমাকে প্রায় কাঁচা খেয়ে ফেলে। খেতে না পারলে প্রায় খাওয়ারই মতো একটি জিনিস করে, পুরুষবিদ্বেষী অপবাদ দেয়। দীর্ঘকাল অপবাদের শিকার আমি। মৌলবাদী এবং একই সঙ্গে যৌগবাদীরাও ঘেন্নায় থুতু ছুড়ছে আমার দিকে। ‘ও সাহিত্য জানে না, ও প্রচার চায়’- এরকম মুখরোচক নিন্দা ভাইরাসের মতো ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এভাবে সত্যের জন্য সাম্যের জন্য আমার লড়াইকে মানুষের চোখে গুরুত্বহীন করার রাজনীতি চলছে। এ নতুন নয়।

‘পুরুষ ভালো, পুরুষতন্ত্র মন্দ।’ এই হলো সোজা কথা, সাফ কথা এবং সবার কথা। এটি শুনতে চমৎকার। কিন্তু আমার প্রশ্ন একটি, সবার কাছে এবং নিজের কাছেও, পুরুষতন্ত্র কি আকাশ থেকে পড়েছে? পুরুষতন্ত্র একটি তন্ত্র যেখানে পুরুষের স্বপক্ষে আইন কানুন, পুরুষের স্বপক্ষে সামাজিক এবং পারিবারিক বিধি ব্যবস্থা, সমাজ সংসারে যাবতীয় যা কিছু সবই পুরুষের স্বপক্ষে এবং সবই পুরুষকেন্দ্রিক। না, এই তন্ত্রটি আকাশ থেকে পড়েনি, এটি পুরুষের তৈরি, এবং পুরুষেরা এই তন্ত্রের সুযোগ সুবিধে সব ভোগ করছে, বেশিরভাগ নারীর ভূমিকা হলো, পুরুষদের এটি ভোগ করতে সাহায্য করা। পুরুষতন্ত্রের সমালোচক আমি, কিন্তু আমি দাবি করতে পারি না পুরুষতন্ত্রের জনক পুরুষ নয়। যখন বলি, আমাকে সত্য কথা বলতেই হয় যে,আমরা যখন সভ্যতার বড়াই করছি, উন্নত প্রযুক্তি এবং নানাবিধ শিল্প সংস্কৃতি দর্শন বিজ্ঞানের সাফল্যের পাশাপাশি মহাসমারোহে বেঁচে থাকছে একটি অসভ্য বর্বর প্রথা, পুরুষতন্ত্র যার নাম। এটিকে কে টিকিয়ে রাখছে? হাওয়া? না হাওয়া নয়? সত্যি বলতে গেলে পুরুষ। নারীও। নারী হলেই যে নারীবাদী হবে তা নয়। আমি অনেক পুরুষকে দেখেছি, যারা অনেক নারীবাদীর চেয়েও বেশি নারীবাদী। আবার এমন অনেক নারীর দেখা আমি পেয়েছি, যারা প্রচণ্ডভাবে পুরুষতন্ত্রের ধারক ও বাহক।

সমতার জন্য বিশ্বজুড়ে কম আন্দোলন হয়নি। আন্দোলনের ফলে বৈষম্য টিকিয়ে রাখে এমন অনেক পুরানো  প্রথা নির্মূল হয়ে গেছে, কিন্তু পুরুষতন্ত্রের গায়ে কোনও আঁচড় আজ অবধি লাগেনি। এর কারণ কী বলে মনে হয়? আকাশ থেকে পড়া পুরুষতন্ত্রটি গা গতর লোহায় গড়া বলে? নাকি এটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য মানুষ প্রাণপণ চেষ্টা করে বলে?  যারা করে, তাদের কি দোষ দেওয়া অন্যায় নাকি অন্যায় নয়? পুরুষতন্ত্র যেহেতু নারীবিরোধী একটি প্রথা, নারীর অধিকারের সঙ্গে যেহেতু পুরুষতন্ত্রের জন্ম জন্মান্তরের বিরোধ, আমাকে তাই মানবাধিকারের কথা বলতে গিয়ে পুরুষতন্ত্র এবং একই সঙ্গে এই তন্ত্রকে যারা টিকিয়ে রাখছে তাদের কথাও বলতে হয়। তা না হলে ধরি মাছ না ছুঁই পানির মতো ব্যাপারটি দাঁড়ায়। আমাকে দেখিয়ে দিতে হয় যে নারীর স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তিগুলো ঠিক কী কী।

‘পুরুষতন্ত্র মন্দ, পুরুষ ভালো’ – এই কথাটি ঠিক সেই কথার মতো, ‘পুঁজিবাদ মন্দ কিন্তু পুঁজিবাদীরা ভালো।’ আমাকে যদি পুরুষবিদ্বেষী বলে অপবাদ না দেওয়া হতো, তা হলে হয়তো পুরুষতন্ত্রের সমালোচনা যেমন করছিলাম, তেমনই করে যেতাম, ওর হোতাদের সন্ধান করতাম না। যারা হোতাদের আদর আহ্লাদ দিয়ে খুশি রেখে শুধু তন্ত্রকে ঢিল ছোঁড়ে, তারা কি জানে না তন্ত্রের কোনও শরীর নেই, নিজস্ব কোনও বোধ বুদ্ধি নেই! তন্ত্র কথা বলতে জানে না? তারা কি জানে না যে তন্ত্র ‘তন্ত্র’ চালায় না, চালায় মানুষ! তারা কি জানে না ঢিল ছুড়লেও তন্ত্র যেমন বহাল তবিয়তে আছে, তেমনই থাকবে। তন্ত্রকে চালায় যারা, তাদের যদি অক্ষত অবস্থায় রেখে দেওয়া হয়! কলকব্জায় তেল ঢেলে তাদের যদি আরও সক্রিয় করা হয়, তবে পুরুষতন্ত্রের জয়জয়কারে জগতের সর্বনাশ হতে বেশি বাকি নেই!

আমার সন্দেহ, যারা শুধু সিস্টেমের ওপর রাগ দেখায়, সিস্টেম প্রস্ততকারক, ও সিস্টেম রক্ষাকারককে ক্ষমা করে দেয়, তারা আসলে পুরুষশাসন এবং শোষণটাই ছলে কৌশলে চায় যে বজায় থাকুক।

না, আমি পুরুষবিদ্বেষী নই, কোনও কালেও ছিলাম না। ব্যক্তি পুরুষদের ওপর রাগ করে, পুরুষের ওপর ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকে আমি এই সংগ্রামে লিপ্ত হইনি। পুরুষদের মধ্যে আমার প্রেমিক আছে, প্রাণের বন্ধু আছে, সহমর্মী, সহযোদ্ধা সবই আছে। আমি শুধুই সেই পুরুষদের চিহ্নিত করতে চাই যে পুরুষেরা পচা পুরানো পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কিছুই বদলাতে দেবে না, নিজেদের নারীবিরোধী মানসিকতাও সামান্য পাল্টাবে না, যারা নারী পুরুষের সমতায় বিশ্বাস করে না, যারা পুরুষতন্ত্রকে দুধকলা দিয়ে পুষছে, যারা নারীকে পায়ের তলায় জীবনভর পিষবে বলে পণ করেছে।

আমি চাই তারা মানুষ হোক। সেই নারীরাও মানুষ হোক, যারা পুরুষতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে সচেতনভাবেই সব রকম সহযোগিতা করছে, চাই তারা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকে অস্বীকার করুক, সততায় আর সাম্যে প্রবলভাবে বিশ্বাসী হোক। মানবতন্ত্রে সত্যিকার বিশ্বাসী হলে, মানবতন্ত্র জীবনে চর্চা করলে, নারী পুরুষের অধিকারে কোনও ফারাক থাকে না।

লেখক: কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ